
চীনের ই-কমার্স জায়ান্ট আলীবাবার প্রতিষ্ঠাতা জ্যাক মা'র প্রথম জীবনে কেএফসির ওয়েটারের চাকুরী না হাওয়ার গল্পটা হয়ত অনেকেই জানেন। কেএফসি রেস্টুরেন্টে সেবার ওয়েটার নেওয়ার জন্যে ২৪ জনের ইন্টারভিউ নেওয়া হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত ২৩ জনেরই চাকুরী হয়েছে, শুধু বাদ পড়লেন জ্যাক মা। শুধু কেএফসির ওয়েটারের চাকুরীই নয়, জ্যাক মা'র এমন আরো ৩১টি খুব সাধারণ চাকুরীর আবেদন প্রত্যাখ্যাত হয়। পরবর্তী জীবনে এ গল্প বহুবার করেছেন তিনি।
তবে খুব ছোট বেলা থেকেই তাঁর ইংরেজি ভাষার প্রতি আগ্রহ ছিল। নিজের ইংরেজি ভাষার দক্ষতা ঝালাই করার জন্য বিদেশী পর্যটকদের গাইডও হয়েছেন বিনে পয়সায়। পরে ইংরেজি ভাষায় এই আগ্রহ ও শিক্ষার কারণেই শেষ পর্যন্ত ইংরেজি শিক্ষক হবার সুযোগ পান জ্যাক মা, যদিও তখন তাঁর মাসিক বেতন ছিল মাত্র ১২ ডলার। পরবর্তীতে এই ইংরেজি শিক্ষকের চাকুরীর সুবাদেই আমেরিকা যাওয়ার সুযোগ হয়ে যায় তাঁর।
আমেরিকা গিয়ে জ্যাক মা দেখলেন সেখানে ইন্টারনেট নিয়ে অনেক কথাবার্তা হচ্ছে। কৌতুহলবশত "বিয়ার" লিখে সার্চ দিয়ে নিজ দেশ চীনের কোন সাইট না দেখে খুব অবাক হলেন। শুধু বিয়ারই নয়, ইন্টারনেটে চীনের কোন সাইটই পেলেন না জ্যাক মা। তিনি বুঝতে পারলেন পশ্চিম বিশ্বের এই ইন্টারনেট জগতে চীনের যেন কোন নিজস্ব অস্তিত্বই নেই। দেশে এসেই জ্যাক মা যেন তেন একটি ওয়েব সাইট তৈরি করালেন, যেখানে চীন সম্পর্কিত নানা তথ্য পাওয়া যেত।
সাইটটি তিনি লাউঞ্চ করলেন সকাল ৯.৪০ মিনিটে, ঠিক সেদিনই মাত্র তিন ঘন্টার কম সময়ের মধ্যে এক ইনভেস্টর থেকে ইমেইল পেলেন, যিনি নতুন এই উদ্যোগ সম্পর্কে আরও জানাতে আগ্রহ প্রকাশ করেন।
জ্যাক মা'র তখন বোঝার বাকী রইল না, ইন্টারনেট কী অপার সম্ভাবনা নিয়ে আসছে। পরবর্তীতে অনেক চড়াই উৎরাই পেরিয়ে ১৯৯৯ সালে শুরু করেন ইন্টারনেট প্রতিষ্ঠান আলীবাবা।
সাধারণত দু'জন কিংবা তিনজন সহ প্রতিষ্ঠাতা দিয়ে নতুন প্রযুক্তি ষ্টার্টাপ শুরু হয়, জ্যাক মা শুরু করলেন ১৭ জন নিয়ে, যাদের কেউ কেউ একসময়ের বন্ধু, সহকর্মী কিংবা ছাত্র। নিজের এক বেড রুমের এপার্টমেন্টে জ্যাক মা একদিন জড় করলেন সেই ১৭ জনকে।
জ্যাক মা তাদের বললেন, তাদের নতুন এই প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য শুধু চীনে প্রতিযোগিতা করা নয়, বরং বিশ্বব্যাপী বড় আকারে ব্যবসা করা। আমেরিকানরা হার্ডওয়্যারে এগিয়ে আছে, তবে সফটওয়্যারে চীন থেকেও তারা বড় কিছু করতে পারে প্রযুক্তি বিশ্বে। কারণ এরজন্য দরকার মেধা ও দক্ষতা, যেটা তাদের আছে। আমেরিকার সিলিকন ভ্যালির প্রতিষ্ঠানগুলোর মতো তাঁরাও কঠিন পরিশ্রম আর মেধা দিয়েই এগিয়ে যেতে পারবেন।
এক অক্ষর প্রোগ্রামিং না জানা জ্যাক মার কথায় এমন কিছু ছিল যেটার কারণে সেদিনের সেই ছোট একটি কক্ষেই বড় বড় স্বপ্ন দেখতে শুরু করলেন সেই ১৭ জন। নিজেদের শ্রম ও সামর্থ অনুযায়ী অর্থ বিনিয়োগ করে ঝাঁপিয়ে পড়লেন প্রতিষ্ঠানটির কাজে, যেটি খুব অল্প সময়েই প্রতিষ্ঠানটির ভিত্তি দাঁড় করিয়ে দেয়।
শুধু সেই ১৭ জন সহ প্রতিষ্ঠাতাই নয়, জ্যাক মা'র ওপর আস্থা ছিল প্রতিষ্ঠানটির পরবর্তীকালের অন্যান্য সদস্য ও কর্মীদেরও।
জুডি টং ছিলেন আলীবাবার শুরুর দিকের একজন কর্মী। বড় কোন জটিল কাজ নয়, তার দায়িত্ব ছিল ফ্রন্ট ডেস্ক রিসেপশনিস্টের।
প্রতিষ্ঠানের শুরুর দিকে খুব বেশী বেতন দেওয়ার সুযোগ থাকেনা বলে জ্যাক মা আলীবাবা কোম্পানির শেয়ারের অতি ক্ষুদ্র অংশের শেয়ার দেন রিসেপশনিস্ট জুডিকে। আর বলেন, অন্য কোথাও না গিয়ে ঠিক ঠাক মতো কাজ করতে। কোন একদিন আলীবাবার শেয়ার পাবলিক হলে জুডিকে দেয়া আলীবাবা কোম্পানির সেই ০.০২ শতাংশের শেয়ারের দামও কয়েকশ' মিলিয়ন ডলারে ঠেকবে।
জ্যাক মা'র কথা শুনে জুডি দিন গুনতে থাকে। কল্পনায় শুধু বিভোরই থাকেন না, কাজেও মন দেন, লেগে থাকেন নিজের সাধ্যমতো, আলীবাবা প্রতিষ্ঠানটি একদিন বড় মাপের সফল হবে এই আশায়। এর মাঝে কোম্পানী হিসেবে আলীবাবা নানা চড়াই উৎরাইয়ের ভেতর যেতে থাকে।
মাঝে মাঝেই জ্যাক মা'কে দেখলে রিসেপশনিস্ট জুডি জিজ্ঞেস করেন আলীবাবার শেয়ার কবে স্টক মার্কেটে উঠবে।
মৃদু হেসে জ্যাক মা আশ্বাস দেন, সুদিনের আর বেশী বাকী নেই, জুডিকে কাজ করে যেতে বলেন।
অবশেষে অপেক্ষার পালা শেষ হয়। প্রতিষ্ঠানে জুডির যোগ দেওয়ার প্রায় দশ বছর পর ২০১৪ সালে আলীবাবা নিউইয়র্ক স্টক এক্সচেঞ্জে পাবলিক হয়, প্রতিষ্ঠানের সব শেয়ারের মূল্যমান দাঁড়ায় ২৪৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের ওপর।
কিছুদিনের ভেতর জুডির শেয়ার দাম ছাড়িয়ে যায় ৩২০ মিলিয়ন ডলার। আর এক সময়ের রিসেপশনিস্ট জুডি নিষ্ঠা ও পরিশ্রমের কারণে পদন্নোতি পেয়ে হয়ে ওঠেন আলীবাবার ভাইস প্রেসিডেন্ট।

আলীবাবার সেই ১৭ জন কো-ফাউন্ডার প্রত্যেকেই বিলিয়নিয়ার ক্লাবে যোগ দেন, যাদের বেশীর ভাগই এখনো প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন পদে কাজ করে যাচ্ছেন। গুগল, মাইক্রোসফট, ফেসবুকের মতো প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানপগুলোর প্রতিষ্ঠাতাদের মতো জ্যাক মা'র প্রোগ্রামিং বা অন্য কোন প্রযুক্তি সংশ্লিষ্ট দক্ষতা ছিল না।
তবে শুধু বড় আকারের দক্ষতা বা মেধার তকমা নয়, জ্যাক মা'র সাফল্য প্রমাণ করে, মানুষের পথ চলাতে সাথের মানুষদের বিশ্বাস ও আস্থাও তৈরী করতে পারে শূন্য থেকে আকাশ ছোঁওয়ার গল্প। আর সেটা তখনই সম্ভব যখন নিজের ওপর আস্থা থাকে, আর সাথে থাকে ইতিবাচক মানসিকতার কিছু মানুষ।
(জ্যাক মা উইকিপিডিয়া থেকে আমার ভাবানুবাদ)
সর্বশেষ এডিট : ২২ শে অক্টোবর, ২০২৪ রাত ৯:১৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




