ব্যক্তিগত ভাবে আমি কমন বন্ধু সজ্জন হিসেবে গড়পড়তার চাইতেও কয়েক ধাপ নিচে। আমার যেমন বন্ধু স্বজন সিলেক্টিভ তেমনি আমিও খুব বেশী মানুষের বন্ধু স্বজন নই।
নিজের এই অবস্থান অবতারণার কারন হল, আমার জীবনে আমি দেখেছি- কিছু কিছু মানুষ প্রচন্ড রকম শর্ট টেম্পার্ড, বদরাগী এবং বদমেজাজী। তাদের ব্যবহার অত্যন্ত খারাপ এবং বিশ্রি। মানুষের সাথে সুযোগ পেলেই তারা দুর্ব্যবহার করে।
নিজেরদের বদ মেজাজ নিয়ে তাদের আবার বিরাট গর্ব। আড্ডায়-টাড্ডায় আবার বলেও, 'আমি তো এই করেছি সেই করেছি, **ল ছিঁড়ে তাল গাছে তুলে দিয়েছি'- ইত্যাদি ইত্যাদি। চিন্তাশক্তি বলে যে একটা জিনিস আছে সেটা তাদেরকে দেখলে বোঝা যায় না।
কেউ কেউ আছে তাদের দুর্ব্যবহারকেও আবার ডিফেন্ড করে। যেমন বলে, 'আমার মুখে যা আসে আমি বলে ফেলি, আমার মুখে যা মনেও তা, আমি তোমাদের মত সুগার কোট করতে পারি না'- ইত্যাদি(এই ধরনের লোকদের আমি বলি- মিঃ পাতলা পায়খানা, কারণ এরা পায়খানার মতো মুখের লাগামটাও আটকে রাখতে পারেনা)।
আমার কথা হলো, মনে যা তা মুখে বলতে হবে কেন? মুখ থেকে দুর্গন্ধ বের না করে অন্তত চুপ যে থাকা যায়, সেই বিদ্যা তাদের পেটে নাই। ‘আর মনে যা মুখে তা’- এই ফালতু আলাপ তারা করে যারা তাদেরকে সহ্য করে তাদের সাথে। মানে আপনার একটা বদমেজাজী বন্ধু/আত্মীয় আছে, আপনি তাকে সহ্য করে চলেন, আপনার লাইফ মোটামুটি হেল।
বহু বদমেজাজী লোক আমাকে অনেক পছন্দ করেছে জীবনে, সবসময়ই তাদেরকে আমি এভয়েড করে চলেছি। যে মানুষ তার মেজাজের দাস, সে আসলে মূর্খ, তার জানাশোনা, লেখাপড়া সব ব্যর্থ। মেজাজে চলতে চিন্তার দরকার হয় না, একটা বেড়াল কিংবা কুকুরও নিজ মেজাজ অনুযায়ি রিএক্ট করে। আর জিহ্বাকে নিয়ন্ত্রন করতে পারে না, সে অভিশপ্ত। তার ভেতরকার ভালোবাসা, অনুরাগ ইত্যাদি সবকিছু মোটামুটি জীবন্ত লাশের মত। তার জিহ্বা পেরিয়ে সেগুলো মানুষের কাছে পৌঁছায় না।
এই দেশে একটা কালচার আছে, বদমেজাজি মানুষের সবকিছু মেনে নেয়া, তাকে একটু ভয় পাওয়া, তার কথায় একটু গুরুত্ব দেয়া, ইত্যাদি। এটা কেন হয়েছে জানি না।
তবে মনে রাখবেন, অতিরিক্ত বদমেজাজি মানুষ বেসিক্যালি পাগল, মানসিক ভাবে অসুস্থ্য। তাকে গুরুত্ব দেবেন না। তার কথাকে পাত্তাই দেবেন না। সবচেয়ে ভালো হয় তাকে এড়িয়ে চলুন। এমন একটা সমাজ তৈরি করবেন না, যেখানে পাগল তার পাগলামি নিয়ে গর্ব বোধ করতে থাকে।
এতো কথা বললাম একটা ঘটনা প্রসঙ্গে। ঘটনা হলোঃ একজন হেড অব কর্পোরেট এর সাথে পারস্পরিক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয় আলোচনা করতে গিয়েছিলাম। সেই অফিসের দ্বিতীয় কর্তার রুমে কথা বলার সময় আমাকে বারবার সতর্ক করে দেওয়া হচ্ছিল, "স্যার কিন্তু খুব কড়া মেজাজের লোক, কথাবার্তা বুঝেশুনে বলবেন, একবার রেগে গেলে কিন্তু আর হ্যা করাতে পারবেন না"!
প্রসঙ্গত বলছিঃ ৩৫/৩৬ বছর আগে মাস্টার্স পাশ করার পর এক বিশাল কোম্পানিতে প্রশাসনিক কর্মকর্তা পদে ইন্টারভিউ দিতে গেছি, দুই ধাপ পেরিয়ে ফাইনাল ইন্টারভিউ। সবকিছু প্রায় ঠিকঠাক, আমাকে তাদের পছন্দ হয়েছে। কথাবার্তা প্রায় শেষ তখন এইচআর এর হেড একটু হেসে এক বয়স্ক লোকের দিকে ইঙ্গিত করে বললেন, "আপনি ওনার আন্ডারে কাজ করবেন। একটু কেয়ারফুল থাকবেন, উনি কিন্তু কড়া লোক, একটু শর্ট টেম্পার্ড।"
যেই লোকের কথা বলছিল তার দিকে তাকিয়ে দেখি উনি গর্বিত মুডে হাসছেন। যেন এগুলা তার খুব ভালো কোয়ালিটি! (আমি স্বগোতক্তি করে শুনিয়ে শুনিয়ে বললাম- বুঝেছি, উনি একজন বিশিষ্ট পাতলা পায়খানা! আটকিয়ে রাখতে পারেননা)! আমি বললাম, 'উনি শর্ট টেম্পার্ট এবং বদরাগী, এই দায়িত্ব আমার নিতে হবে কেন?'
আমার পাল্টা প্রশ্ন শুনে হেড অব এইচআর থতমত খেয়ে গেল। আমতা আমতা করে বলল, "না মানে লিডারশিপের কথা বলছিলাম, হি ইজ এ টাফ লিডার।"
আমি বললাম, আপনাদের উচিৎ তাকে ডাক্তার দেখানো।
তখন বোর্ডের আর এক লোক জিজ্ঞাসা করলেন, "একথা বললেন কেন?"
আমি বললাম, 'মানুষের টেম্পারমেন্টের সমস্যা থাকতে পারে কিন্তু আমার মনে হচ্ছে উনি বদরাগী শুধু না, নিজের এই বদরাগ নিয়ে তিনি বেশ প্রাউড। তাকে তো মানসিক ডাক্তার দেখানো দরকার। বোর্ডের আপনারাও দেখি সেটা বেশ রসিয়ে রসিয়ে বলছেন। ইউ শুড টেইক একশন।'
সেই লোকের হাসিমুখ কালো হয়ে গেল। সম্ভবত তিনি কেবল সম্মান আর জি স্যার পেয়ে অভ্যস্থ।
তখন সেই কম কথা বলা লোকটা জিজ্ঞাসা করল, "আপনি জয়েন করবেন না?"
আমি মাথা নাড়িয়ে বললাম, 'না। আমি আমার সিনসিয়ারিটি দিয়ে পেশাগত কাজ করব, বিনিময়ে কোম্পানি আমাকে টাকা দেবে। এর বাইরে যদি কোম্পানি বলে তোমার বস আনপ্রেডিক্টেবল, বদরাগী- তার দায়িত্ব তোমাকে নিতে হবে, সেটা তো আমি করতে পারব না, স্যরি।'
সেই বদমেজাজি ভদ্রলোক একটা কথাও বলেন নাই সেখানে। আমি যখন বেরিয়ে যাই, তখন তার দিকে একবার তাকিয়েছিলাম। তার চেহারা দেখে মনে হয়েছিল তিনি জীবনেও ভাবতে পারেন নাই, এই ধরনের কথা কেউ চাকরি করতে এসে বলতে পারে!
ও হ্যা, আমি যার সাথে দেখা করতে গিয়েছিলাম(মিঃ পাতলা পায়খানা) তার সাথে দেখা না করেই চলে এসেছি একটা সম্ভাব্য অবাঞ্চিত পরিস্থিতি এড়াতে।
সর্বশেষ এডিট : ২২ শে অক্টোবর, ২০২৪ রাত ৯:১১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



