ডাক টিকিটে নজরুল.....
জীবদ্দশাতেই কবি নজরুল নিজেকে দেখে গেছেন ডাকটিকিটে। এমন রাজকীয় সমাদর জগতের কম মনীষীরই জুটেছে। কাজী নজরুল ইসলামকে নিয়ে বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তান থেকে প্রকাশিত ডাকটিকিট নিয়ে আজকের পোস্টঃ-
১৯৬৮ সালে তত্কালীন পাকিস্তান ডাক বিভাগ কবি নজরুলকে নিয়ে প্রথম ডাকটিকিট প্রকাশ করে। ডাকটিকিট অবমুক্ত করার আগেই ডাক বিভাগ টিকিটের ছবিসহ প্রচার মাধ্যমে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। তখন ডাকটিকিটে ধরা পড়ল মস্ত বড় ভুল। কবির জন্মবর্ষ ১০ বছর পিছিয়ে লেখা হয়েছে ১৮৮৯ খ্রিষ্টাব্দ। অবশেষে ভুল সংশোধন করে এক মাস পর অবমুক্ত করে নজরুলের ডাকটিকিট। ভুল তবু রয়েই গেল, এবার কবিতায়। ডাকটিকিটে ছাপা হলো-‘গাহি সাম্যের গান/মানুষের চেয়ে নাহি কিছু বড়/নাহি কিছু মহীয়ান।’
নজরুলের ‘মানুষ’ কবিতায় আছে-‘মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই/নহে কিছু মহীয়ান।’ দ্বিতীয় দফায় আর সংশোধনে না গিয়ে ডাক বিভাগ ওই ভুলসমেতই ডাকটিকিট প্রকাশ করে ১৯৬৮ সালের ২৫ জুন। যদিও তা প্রকাশ হওয়ার কথা ছিল কবির জন্মদিন ২৫ মে তারিখে। ১৫ ও ৫০ পয়সা সমমূল্যের টিকিট দুটো একই নকশায় হলেও ছিল ভিন্ন ভিন্ন রঙের। ডাকটিকিটের পাশাপাশি উদ্বোধনী খাম আর বিশেষ সিলমোহরও প্রকাশ করে।

আমার সৌভাগ্য হয়েছিল জীবিত কবি নজরুলকে সামনা সামনি দেখার এবং তাঁর জানাযায় শরীক হওয়ার। ১৯৭৬ সালে কবি ইন্তেকাল করেন। বাংলাদেশ ডাক বিভাগ কবির প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে দুটো ডাকটিকিট প্রকাশ করে। ১৯৭৭ সালের ২৯ আগস্ট কবির প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে প্রকাশিত ৪০ পয়সা ও দুই টাকা ২৫ পয়সা মূল্যমানের সেই ডাকটিকিটে কবির প্রতিকৃতিসহ তাঁর রচিত বাংলাদেশের রণসংগীতের চারটি চরণ-
‘ঊষার দুয়ারে হানি আঘাত আমরা আনিব রাঙা প্রভাত,আমরা টুটাব তিমির রাত,বাধার বিন্ধ্যাচল’
এবং ‘বিদ্রোহী’ কবিতার দুটি চরণ-
‘বল বীর-চির উন্নত মম শির!’
পরবর্তীকালে ১৯৯৯ সালে কবির শততম জন্মদিনকে ঘিরে বাংলাদেশ ডাক বিভাগ আরও একটি ডাকটিকিট প্রকাশ করে। ছয় টাকা মূল্যমানের বর্ণিল ডাকটিকিটে পুনরাবৃত্তি হয়েছে ‘মানুষ’ কবিতার অংশবিশেষ।
১৯৯৯ সনে ভারতের ডাক বিভাগও কাজী নজরুল ইসলামের শততম জন্মবর্ষ স্মরণীয় করে তিন রুপি মূল্যমানের একটি ডাকটিকিট প্রকাশ করে।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে সৈনিক কবি নজরুল বাঙালি পল্টনের সঙ্গে করাচিতে অবস্থান করেছেন। তখন তিনি ফারসি ভাষা সাহিত্যে জ্ঞান লাভ করেন। পরবর্তীকালে ফারসি কবিতার প্রতি কবির অনুরাগ আমরা খুঁজে পাই তাঁর অনেক কবিতা ও সংগীতে। ২০০৪ সালের ৩ জুন ইরান-বাংলাদেশের বন্ধুত্ব উপলক্ষে প্রকাশিত ১০ টাকা মূল্যের দুটি আলাদা ডাকটিকিটে প্রাসঙ্গিকভাবেই স্থান পেয়েছেন পারস্যের কবি হাফিজ সিরাজী ও বাংলাদেশের কাজী নজরুল ইসলাম- যা একই সাথে বাংলাদেশস্থ ইরানী দূতাবাস যৌথ ভাবে উন্মোচন করে।
কবি নজরুলের ‘বিদ্রোহী কবি’ ভূষিত হয়েছিলেন তাঁর ‘বিদ্রোহী’ কবিতার জন্য। যা তিনি লিখেছিলেন ১৯২১ সনে। বিদ্রোহী কবিতা রচনার ৯০ বছর পূর্তিতে ‘আন্তর্জাতিক নজরুল সম্মেলন-২০১১’ উপলক্ষে বাংলাদেশ ডাক বিভাগ ২০১১ সালে নজরুলের চারটি ডাকটিকিটসহ একটি ‘স্মারক’ প্রকাশ করে। স্মারকীতে বিদ্রোহী কবিতার নিম্নোক্ত অংশটি ছাপা হয়-
বল বীর-বল উন্নত মম শির! শির নেহারি’ আমারি, নত-শির ওই শিখর হিমাদ্রির! বল বীর-বল মহাবিশ্বের মহাকাশ ফাড়ি’চন্দ্র সূর্য গ্রহ তারা ছাড়ি’ভূলোক দ্যুলোক গোলক ভেদিয়াখোদার আসন ‘আরশ’ ছেদিয়া, উঠিয়াছি চির-বিস্ময় আমি বিশ্ব-বিধাত্রীর! মম ললাটে রুদ্র ভগবান জ্বলে রাজ-রাজটিকা দীপ্ত জয়শ্রীর! বল বীর-আমি চির-উন্নত শির!
সৈনিক বেশে নজরুলের আলোকচিত্র ঘিরে রেখেছে চারটি বর্ণিল ডাকটিকিট, প্রতিটি টিকিটের বুকে রয়েছে কবির নানা বয়সের প্রতিকৃতি আর তার পাশে বিদ্রোহী কবিতার ১২টি চরণ। বিদ্রোহী কবিতার নির্দিষ্ট অংশের ইংরেজি অনুবাদ ‘স্মারক পাতা’র সারসংক্ষেপ। ১০০ টাকা মূল্যমানের এই স্মারক পাতা পারফোরেশন এবং পারফোরেশনবিহীন দুভাবেই ছাপা হয়। প্রতিটি ১০ টাকা মূল্যমানের ডাকটিকিটে কবির প্রতিকৃতি ছাড়াও বাংলাদেশে তার স্মৃতিবিজড়িত স্থাপত্যও উঠে এসেছে। ডাকটিকিট ও স্মারক, উদ্বোধনী খাম ও বিশেষ সিলমোহর অবমুক্ত করেছে ডাক বিভাগ।
কাজী নজরুল ইসলামকে নিয়ে যথাক্রমে পাকিস্তান, বাংলাদেশ, ভারত এককভাবে এবং বাংলাদেশ-ইরান যৌথ ভাবে স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশ করেছে। একই ব্যক্তিকে উপমহাদেশের তিনটি দেশ তাদের ডাক প্রকাশনার মাধ্যমে স্মরণ করেছে এমন ঘটনা বিরল।
তথ্যসূত্রঃ "ডাক টিকিটে কবি নজরুল" স্বারক গ্রন্থ ১৯১১ ইং

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

