somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

এই সেই মা.........

২৫ শে নভেম্বর, ২০২১ সকাল ১০:২৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
এই সেই মা.........



ছোট খাটো চেহারার এই অতি মেধাবী ছাত্রীটির ইচ্ছে ছিল বায়ো-টেকনোলজি নিয়ে উচ্চ শিক্ষার। কিন্তু ভারতের যে কলেজ সে পড়তো, সেই কলেজে তখন সেরকম কিছু পড়ানোই হতো না। অগত্যা "হোম সাইন্স" নিয়ে গ্রাজুয়েশন। বাবা-দাদা-রা মজা করে বলতেন "হোম সাইন্স" সাবজেক্টে আসলে শেখানো হয় বাসন মাজা"! মনে মনে দুঃখ পেলেও মেয়েটি চুপ করে শুনতো।

এরপর একটি পত্রিকাতে সে আবিষ্কার করে আমেরিকাতে বায়ো-টেকনোলজি পড়ানো হয়। কাউকে কিছু না জানিয়ে সে আমেরিকান বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চ শিক্ষার জন্য আবেদন পত্র পাঠিয়ে দেয়। কি আশ্চর্য! ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া-বার্কলে থেকে তার ডাক আসে। এরকম বিশ্ব-বিখ্যাত আমেরিকান ইউনিভার্সিটি তাকে ডাক পাঠিয়েছে শুনে অবাক হয়ে যান তার বাবা-দাদাও!

তাদের অতি রক্ষণশীল তামিল পরিবারে কেউ কখনো ভারতের বাইরে পা রাখেনি, তাই পরিবারের পক্ষ থেকে আসে প্রবল আপত্তি। কিন্তু বাবা মেয়ের পক্ষ নেন এবং বলেন যে তার কাছে যা টাকা-পয়সা আছে তা দিয়ে বড়ো জোর এক বছরের পড়াশুনোর খরচ চলবে, বাকিটা তিনি জানেন না। মেয়েটি বলে সেটাই যথেষ্ট। বাকি পড়ার খরচ তিনি পার্ট টাইম চাকরি করে জোগাড় করবেন।

১৯৫৯ সালে ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া-বার্কলের এডমিশনের লাইনে যে শাড়ি, হাওয়াই চটি পরা মাত্র ৫ ফুট উচ্চতার মেয়েটি দাঁড়িয়েছিল, তার একটু পিছনেই দাঁড়িয়েছিল আর একটি বিদেশী ছাত্র - ৬'-৬" উচ্চতার জ্যামাইকান এক কালো ছেলে, যার নাম ডোনাল্ড হ্যারিস। সে স্কলারশিপ পেয়ে অর্থনীতিতে পিএইচডি করতে এসেছে। আমেরিকার রাজনীতিতে সে এক ভীষণ টালমাটাল সময়। কালো মানুষদের অধিকারের জন্য সারা আমেরিকা জুড়ে শুরু হয়ে গেছে "সিভিল রাইটস মুভমেন্ট"।

১৯৬০ সালে একটি স্টুডেন্ট ফোরামে কালো মানুষদের অধিকারের সপক্ষে একটি অসাধারণ বক্তৃতা দেন ডোনাল্ড হ্যারিস। বক্তৃতার শেষে মুগ্ধ, সেই শাড়ি পরা মেয়েটি, ডোনাল্ড হ্যারিসের সঙ্গে নিজেই আলাপ করে। প্রথম আলাপেই প্রেম আর ১৯৬৩ সালে বিয়ে। ভারতীয় মেয়েটি বিয়ের পর শ্যামলা গোপালন থেকে হয়ে যান শ্যামলা হ্যারিস।



এর পর জন্মায় তাদের প্রথম সন্তান - মেয়েটির নাম রাখেন "কমলা দেবী" - মা লক্ষ্মীর নামে নাম মিলিয়ে! আমেরিকার সিভিল রাইটস মুভমেন্টে ভীষণ ভাবে জড়িয়ে পড়েন শ্যামলা ও ডোনাল্ড হ্যারিস। সেই প্রতিবাদ মিছিলের ভিড়ে, শিশু কন্যাটি পারাম্বুলেটরে বসে বসে দেখেছিলো তার বাবার বক্তৃতা, মায়ের আন্দোলন। পৃথিবীর ইতিহাসে ঘটে যাওয়া সেই ঐতিহাসিক ঘটনা- ডক্টর মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রের নেতৃত্বে আমেরিকাতে কালো মানুষদের অধিকারের লড়াই ও তাতে জয়লাভ।

সে লড়াই থামতে না থামতেই শুরু হয় শ্যামলা হ্যারিসের নিজের জীবনের লড়াই। ১৯৭০ সালে দুটি শিশু কন্যা নিয়ে ডিভোর্সড, সিঙ্গেল মাদারের সে লড়াইটা ছিল একা এবং ব্যক্তিগত। পিএইচডি শেষ করে শ্যামলা হ্যারিস শুরু করেন ব্রেস্ট ক্যান্সার নিয়ে গবেষণা। গবেষক হিসেবে তার সুখ্যাতি ছড়িয়ে পরে সারা পৃথিবীতে। গবেষণার কাজে প্রায় অর্ধেক পৃথিবী ঘুরে ফেলেন এই পাঁচ ফুট উচ্চতার ছোট্ট খাট্টো ডক্টর শ্যামলা হ্যারিস।

শিশু কন্যা দুটিকে কখনো ডে কেয়ার-এ রেখে, কখনো বন্ধুর বাড়িতে রেখে নিজের পড়াশুনো, গবেষণা, চাকরি চালিয়ে গেছেন শ্যামলা। একটু মানসিক শান্তির জন্য মেয়েদের নিয়ে গেছেন কখনো চার্চে, কখনো মন্দিরে। তাদের শিখিয়েছেন রান্না করতে, নিজেদের কাজ নিজে করতে। আর শিখিয়েছেন নিজের অধিকারের জন্য লড়াই করতে।

পারাম্বুলেটরে বসে বসে যে মেয়েটি আমেরিকার সব চেয়ে বড় অধিকারের লড়াইটা দেখেছিলো, দেখেছিলো নিজের মায়ের ব্যক্তিগত জীবনের আপোষহীন লড়াই, সেই ছোট্ট মেয়েটাই আজ নামকরা আইনজীবী ও আমেরিকার ভাইস প্রেসিডেন্ট ইলেক্ট - কমলা দেবী হ্যারিস !
‎‎
অনেক কিছুতে-ই প্রথম কমলা দেবী হ্যারিস !
‎মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম মহিলা ভাইস প্রেসিডেন্ট!
প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ!
প্রথম ভারতীয় বংশোদ্ভূত!
তিনি গড়লেন নতুন এক ইতিহাস।

এই ঐতিহাসিক জয়ের পর কমলা হ্যারিস তার মা সম্পর্কে বললেন, মা-ই তাকে শিখিয়েছেন "বাড়িতে বসে থেকে অভিযোগের পর অভিযোগ না করে বরং মাঠে নেমে লড়াই করো"।



কমলা হ্যারিসকে নিয়ে যখন আমেরিকাতে মাতামাতি (তার উইকিপিডিয়া পেজটি এর মধ্যে ৪৮০ বার এডিট হয়েছে) তখন ছোট কন্যা - মায়া হ্যারিস আবার মনে করিয়ে দিয়েছেন:
"You can’t know who Kamala Harris is without knowing who our mother was.”

দুটি শিশু কন্যা কে নিয়ে একা এক ভারতীয় সিঙ্গেল মম, শ্যমলা গোপালন সেদিন ঘরের এবং বাইরের তীব্র লড়াইটা না লড়লে, আমেরিকানরা কি তাদের ইতিহাসে প্রথম মহিলা ভাইস প্রেসিডেন্টটিকে পেত?

ছবি:
১) শিশু কমলা-র সঙ্গে মা, ডক্টর শ্যামলা গোপালন হ্যারিস
২) জেষ্ঠ্যা কন্যা কমলা, মা শ্যামলা, কনিষ্ঠা কন্যা মায়া হ্যারিস
৩) কমলা দেবী হ্যারিস - আমেরিকার ভাইস প্রেসিডেন্ট ইলেক্ট

সৌজন্যঃ দ্যা হিন্দুস্তান টাইমস থেকে নিজের মতো ভাবানুবাদ করে ২০২০ ফেব্রুয়ারী মাসে ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছিলাম।
সর্বশেষ এডিট : ২৫ শে নভেম্বর, ২০২১ সকাল ১০:৩২
১৪টি মন্তব্য ১৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

জেনারেল জিয়ার অন্যায়ের কারণে বেগম জিয়ার অস্বাভাবিক জীবন!

লিখেছেন চাঁদগাজী, ২৭ শে নভেম্বর, ২০২১ বিকাল ৫:২৬



মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে মেজর জিয়ার ঘনিষ্টরা ছিলেন, ক্যা: মাহফুজ, ক্যা: হামিদ, মেজর শওকত আলী, মেজর রফিক, ক্যা: ওলি, ক্যা: শামসুল হক, ক্যা: আলী, ক্যা: এনাম, লে: খালিদ। আজকের দিনে... ...বাকিটুকু পড়ুন

অদ্ভুত রেসিপি-০১(চা দিয়ে লাচ্ছা সেমাই রান্না)

লিখেছেন মোঃ মাইদুল সরকার, ২৭ শে নভেম্বর, ২০২১ বিকাল ৫:৫৮


বাসায় একা আছি বেশ ক'দিন ধরে। চা খেতে ইচ্ছে হলো চা বানালাম। চা হয়ে গেল বেশি ০১ মগ। এক কাপ খেয়ে ভাবলাম বাকিটা ফেলে না দিয়ে কাজে লাগানো যায় কিনা।... ...বাকিটুকু পড়ুন

হেমেন্দ্রনাথ মজুমদারের আঁকা পূর্ণ ১৮+ চিত্রকর্ম

লিখেছেন মরুভূমির জলদস্যু, ২৭ শে নভেম্বর, ২০২১ সন্ধ্যা ৭:৩৬

০০



হেমেন্দ্রনাথ মজুমদার ১৮৯৪ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর বর্তমান বাংলাদেশের কিশোরগঞ্জ জেলার গচিহাটা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তিনি একজন বাঙালি চিত্রশিল্পী। তিনি হেমেন মজুমদার বা এইচ. মজুমদার নামেও পরিচিত ছিলেন। পাশ্চাত্য রীতির ছবি... ...বাকিটুকু পড়ুন

আবরার হত্যা মামলার রায় আগামীকাল

লিখেছেন এম টি উল্লাহ, ২৭ শে নভেম্বর, ২০২১ রাত ৮:০৯


বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যা মামলার রায় ঘোষণার জন্য আগামীকাল ধার্য্য তারিখ।
গত ১৪ নভেম্বর ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১ এর বিচারক আবু জাফর মো. কামরুজ্জামান রাষ্ট্র... ...বাকিটুকু পড়ুন

যদি বিখ্যাত মুভি গুলোর নাম বাংলাতে হত, তাহলে কেমন হত :D

লিখেছেন অপু তানভীর, ২৭ শে নভেম্বর, ২০২১ রাত ৯:৩৩

মফস্বল শহরে যারা বড় হয়েছেন তাদের স্থায়ীয় সিনেমা হলের পোস্টারের দিকে চোখ পড়ার কথা । আমাদের এলাকায় দুইটা সিনেমা হল আছে । একটা সম্ভবত এখন বন্ধ হয়ে গেছে । সেই... ...বাকিটুকু পড়ুন

×