কস্তুরি কাহিনী.......
একটি বিশেষ ধরনের প্রাণিজ সুগন্ধির নাম কস্তুরী।ছেলে বেলায় আমাদের বৃহত্তর যৌথ পরিবারে আমাদের বড়ো চাচার কাছে প্রথম কস্তুরী দেখি। ছোকলা সহ একটা আস্ত সুপারির সাইজ বাহির দিকে লোমশ, ভিতরে ডিপ ব্রাউন কালার কস্তুরীটি ছোট্ট একটি কৌটায় রাখা থাকতো সেই দুস্পাপ্য মহামূল্য সুগন্ধি। পারিবারিক কোনো অনুষ্ঠানে, মিলাদ মাহফিলের সময় বড়ো চাচা সেই কৌটা খুলে হাতপাখা দিয়ে হালকা বাতাস করতে করতে সবার সামনে দিয়ে হেটে যেতেন, আর পুরো ঘরময় কস্তুরীর তীব্র ঘ্রাণে মাতোয়ারা হয়ে যেতো। আমাদের সেই ঐতিহ্যবাহী যৌথ পরিবার ভেংগে অসংখ্য পরিবার হয়েছে। কালের বিবর্তনে কস্তুরীটি কার হাতে আছে আমার জানা নাই।
কস্তুরীর প্রতি আমার একটা লোভ আছে... ২০০৬ সালে নিজেই একটা কস্তুরীর মালিক হতে গিয়ে বড়ো অংকের টাকা ধরা খেয়েছিলাম- সেই বোকামির কথা আর না বলি।
আমি একাধিক বার কস্তুরী হাতে নিয়ে নেড়েচেড়ে দেখেছি। সে বহু বছর আগের কথা, মর্ডান হার্বালের মালিক মুক্তি যোদ্ধা ডাঃ আলমগীর মতি সাহেবের সংগ্রহে বেশ কয়েকটা কস্তুরী দেখেছি। ওনার সাথে ব্যক্তিগত সুসম্পর্ক থাকায় বহুবার ওনার চেম্বারে গিয়েছি, কস্তুরী সম্পর্কে অনেক কিছু জেনেছি ওনার কাছ থেকে। সম্প্রতি একজন প্রভাবশালী এমপি সাহেবের কাছে দুটি কস্তুরী দেখে এই লেখার পটভূমি।
কস্তুরী হচ্ছে হরিণের নাভি গ্রন্থি। এক বিশেষ প্রজাতির হরিণের বয়স দশ বছর অতিক্রান্ত হলেই নাভির গ্রন্থি পরিপক্ব হয়। এ সময় হরিণটিকে হত্যা করে নাভি থেকে তুলে নেওয়া হয় পুরো গ্রন্থিটি। তারপর রোদে শুকানো হয়। একটা পূর্ণাঙ্গ কস্তুরী গ্রন্থির ওজন প্রায় ৩০-৪০ গ্রাম।
'কস্তুরী সুগন্ধি সুবিখ্যাত ঘ্রাণের জন্যই নয়, বহু ভেষজ গুণসম্পন্নও বটে' - বলেছিলেন ডাঃ আলমগীর মতি। এর ঘ্রাণ প্রকৃত যোজনগন্ধা বললে কম বলা হয়। কথিত আছে কস্তুরীর একটি দানা কোন বাড়িতে উন্মুক্ত করে রাখলে কয়েক মাস সেখানে এর ঘ্রাণ থাকে। হাজার ভাগ নির্গন্ধ পদার্থের সঙ্গে এর এক ভাগ মেশালে সমস্ত পদার্থই সুবাসিত হয় কস্তুরীর ঘ্রাণে।
কস্তুরী সংগ্রহকারীরা এই সুগন্ধিকে প্রায় প্রকৃত অবস্থায় রাখেন না; সচরাচর অন্য পদার্থের সঙ্গে মিশিয়ে বিক্রি করেন। কস্তুরীর অন্যসব রাসায়নিক পদার্থের মধ্যে রক্ত বিশেষ একটি উপাদান। শুকিয়ে যাওয়া রক্তের সঙ্গে কস্তুরীর বিশেষ সাদৃশ্য আছে । কস্তুরীর সুবাসেও আছে বৈচিত্র্য।
সুগন্ধি ফুলের মতোই যুগ যুগ ধরে মানুষের দৃষ্টি কেড়েছে কস্তুরী মৃগ। এই মৃগ অর্থাৎ হরিণ এক প্রজাতির পুরুষ হরিণ। ইংরেজি নাম ‘মাস্ক ডিয়ার’। এরা লাজুক স্বভাবেরপ্রাণী, তাই নিরিবিলিতে বাস করে। বিচরণ করে একান্ত নির্জনে।
হিমালয় পর্বতমালা অঞ্চলে উৎকৃষ্ট কস্তুরীমৃগ পাওয়া যায়। ওই অঞ্চলে একপ্রকার ছোট আকারের হরিণ আছে, ছাগলের চেয়ে বড় নয় কিন্তু দেখতে অত্যন্ত সুন্দর। এদের পা অতি সরু, মাথা সুন্দর এবং চোখ চমৎকার উজ্জ্বল। এই হরিণ অন্য হরিণ থেকে আলাদা নয়। শীতল পার্বত্য পরিবেশে বাস করায় এদের লোম সরু না হয়ে অত্যন্ত মোটা ও পালকের মতো হয়। এ ছাড়া পামির মালভূমির গ্রন্থি পর্বতমালায় তৃণভূমি সমৃদ্ধ উপত্যকায় এই হরিণ বেশী পাওয়া যায়। কথিত আছে, বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামের কিছু এলাকায়ও এই হরিণ পাওয়া যায়।
কস্তুরী মৃগের ওপরের মাড়ি থেকে গজদন্তের মতো দুটি ছোট দাঁত বের হয়। এ ধরনের দাঁত সব প্রজাতির হরিণের ক্ষেত্রে দেখা যায় না। এই দেখেই কস্তুরী মৃগ সনাক্ত করা হয়। এই প্রজাতির হরিণ আত্মরক্ষায় পটু। কিন্তু তারা নিজেদের লুকিয়ে রাখতে পারে না। কারণ, অভিজ্ঞ শিকারীরা এদের দেহের তীব্র ঘ্রাণ অনুসরণ করে এদের সন্ধান পেয়ে যায়।
পুরুষ হরিণের নাভি মুখের গ্রন্থিতে এক বিশেষ ধরনের কোষের জন্ম হয়। এই কোষ যখন পূর্ণতা লাভ করে তখন এ থেকেই সুঘ্রাণ বের হতে থাকে। তবে মজার ব্যাপার হলো, যে হরিণটির নাভিতে এই কোষের জন্ম, সে নিজে প্রাথমিকভাবে কিছুই বুঝতে পারে না। তার নাকে যখন এই সুগন্ধ এসে লাগে তখন সে ছুটতে থাকে এই সুঘ্রাণের উৎসের সন্ধানে। অথচ সে বুঝতে পারে না যে, সুঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়ছে তার নিজের দেহ থেকেই।
কস্তুরী শিকারীরা এ সময় হরিণটিকে হত্যা করে নাভি থেকে তুলে নেওয়া হয় পুরো গ্রন্থিটি। তারপর রোদে শুকানো হয়।
বেশীরভাগ কস্তুরী কোষের বাইরের দিকটা লোমশ ভিতরে এলাচির ভিতর দানার মতো অসংখ্য দানা, যা আংগুলের মৃদু চাপেই গুড়ো হয়ে যায়। আবার অনেক কস্তুরীর লোমশ হয়না, বরং ছোট ছোট দানাদার চা/কফির গুড়োর এবং রঙের হয়- যেহেতু এগুলো রক্তবর্ণ নিষিক্ত নির্যাষ।
সকল হরিণের নাভিতে একই পরিমাণে কস্তুরী উৎপন্ন হয় না; হরিণের বয়স এবং পরিবেশভেদে কস্তুরীর পরিমাণের তারতম্য হয়। এক কিলোগ্রাম কস্তুরী পাওয়ার জন্য দুই হাজারের বেশী হরিণ শিকার করতে হয়। আসলে মানুষের খাদ্য, শখ, বিলাসিতার জন্যই প্রাণিকুল বিপন্ন।
সর্বশেষ এডিট : ২২ শে অক্টোবর, ২০২৪ রাত ৯:০৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




