
মাঝে মাঝেই হাসান ভাইয়ের কবিতার লাইন মনে পডে- ‘ঝিনুক নীরবে সহো ঝিনুক নীরবে সহো, ঝিনুক নীরবে সহে যাও, ভিতরে বিষের বালি, মুখ বুজে মুক্তা ফলাও!’ কিংবা;
‘আমি আমার আলো হবার স্বীকৃতি চাই, অন্ধকারের স্বীকৃতি চাই’।
সবচেয়ে বেশী মনে পরে, ‘যত দূরে যাই, ফের দেখা হবে, কেন না মানুষ মূলত: বিরহকামী, কিন্তু তার মিলনই মৌলিক’।
স্বল্প জীবনকালের কবি আবুল হাসান ৬০ দশকের কবি। মাত্র ১০ বছর তাঁর কাব্য জীবন। ২৯ বছর তাঁর জীবনকাল। আবুল হাসানের কবিতায় উদ্দাম যৌবনের গান ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। আবুল হাসান তাঁর সৃষ্টিতে আজো স্বতন্ত্র। তার স্বর ভিন্ন। তিনি বেঁচে থাকলে হয়তো আরও ঋদ্ধ প্রকাশ ও নির্মাণ লক্ষ করতে পারতাম, তার অকাল মৃত্যুতে নিশ্চয়ই আমরা সে প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হয়েছি। এ কথার অর্থ এই নয় যে যৌবনের এই প্রকাশ তার কবিতায় শিল্প সংহতিতে বাঁধা হয়েছে। মূলত যৌবনই হলো সকল সৃষ্টির উৎকৃষ্ট সময়, যৌবনের উদ্দাম গতিধারা স্ব-স্বভাবে পৃথিবী বদলানোর স্বপ্ন দেখে, অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়, রক্ত দেয়, দুর্দমনীয় প্রকাশের মধ্যদিয়ে প্রতিবাদী হয়ে ওঠে, কি শিল্পে, কি সাহিত্যে, জীবন সংগ্রামে যৌবন হলো সংগ্রহের কাল, আর বার্ধক্য হচ্ছে বিবেচনা, অভিজ্ঞতার প্রয়োগ-বিশুদ্ধির।

কবি হাসানের কবিতার বাক্য ও স্বর ভিন্ন, ব্যাঞ্জনাময় শব্দ যা প্রায় স্বতঃস্ফূর্তভাবে তার কবিতায় জ্বলজ্বল করছে। তিনি স্বভাব কবিও নন, যদিও কবি হিসেবে যে মৌলিকত্ব প্রয়োজন বলে অনুভব করা হয়, তিনি তেমনই, তার শব্দ প্রয়োগের বল্লম কখনো কখনো বগ্লাহীন হয়েছে কিন্তু তারপরও তিনি অনেক বেশী মৌলিক এবং কাব্য নির্মাণে ৪০ ও ৫০-এর প্রতিষ্ঠিত গণ্ডির বাইরে নতুন স্বরের সংযোজক।
আবুল হাসানের প্রকাশিত কাব্যের সংখ্যা ৩টি। (১) রাজা যায় রাজা আসে, (২)যে তুমি হরণ করো, (৩) পৃথক পালঙ্ক। এ ছাড়া তার অগ্রন্থিত কবিতা রয়েছে অনেক যা পরবর্তীতে তার বন্ধুরা গ্রন্থ আকারে প্রকাশ করে বন্ধুর স্মৃতির প্রতি যথার্থ মর্যাদা দিয়েছেন। আবুল হাসান শব্দ ব্যাবহারে ছিলেন অতি সচেতন। শব্দকে প্রচলিত অর্থ থেকে মুক্ত করে নতুন অর্থে ঋদ্ধ করা ও নতুন ব্যঞ্জনায় অভিষিক্ত করা ছিলো তাঁর মৌলিকতা। তাঁর প্রায় প্রতিটি কবিতা সুখপাঠ্য হলেও কোনো কোনো পংক্তি বা কবিতাংশ সর্বাংশে অর্থময় বলে প্রতিভাত হয় না।
সম্পর্কে কবি আবুল হাসান আমার ফুফাতো ভাই। তাঁর সাথে আমার বয়সের ব্যবধান প্রায় পনেরো বছর। আমি তার স্নেহধন্য হয়েছিলাম- যা নিয়ে এই ব্লগেই বেশ কয়েকটি লেখা পোস্ট করেছিলাম বছর দশ আগে।
আবুল হাসান এর জন্ম ৪ আগস্ট ১৯৪৭ সনে গোপালগঞ্জের কোটালিপাড়া(বর্তমান টুংগীপাড়া) থানার বর্নি গ্রামে মামার বাড়িতে হলেও জীবনের নানান টানপোড়নে বেড়ে উঠেছিলেন বরিশাল(নাজিরপুর গ্রামের বাড়ি) আর ঢাকায়। ঢাকার আরমানিটোলা সরকারি বিদ্যালয় থেকে ১৯৬৩ সালে এস.এস.সি পাশ করেন। তারপর বরিশালের বিএম কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন। পরবর্তীকালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজিতে অনার্স শ্রেণিতে ভর্তি হন, কিন্তু পরীক্ষা শেষ না করেই ১৯৬৯ সালে দৈনিক ইত্তেফাকের বার্তাবিভাগে যোগদান করেন। পরে তিনি গণবাংলা (১৯৭২-১৯৭৩) এবং দৈনিক জনপদ-এ (১৯৭৩-৭৪) সহকারী সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। আবুল হাসান অল্প বয়সেই একজন সৃজনশীল কবি হিসাবে খ্যাতিলাভ করেন। মাত্র এক দশকের কাব্যসাধনায় তিনি আধুনিক বাংলার ইতিহাসে এক বিশিষ্ট স্থান অধিকার করেন। আত্মত্যাগ, দুঃখবোধ, মৃত্যুচেতনা, বিচ্ছিন্নতাবোধ, নিঃসঙ্গচেতনা, স্মৃতিমুগ্ধতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আবুল হাসানের কবিতায় সার্থকভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।

আবুল হাসানের মৃত্যুঃ ২৬ নভেম্বর ১৯৭৫, ঢাকা।
সর্বশেষ এডিট : ২২ শে অক্টোবর, ২০২৪ রাত ৯:০৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




