
‘আমি শুনেছি সেদিন তুমি
সাগরের ঢেউয়ে চেপে
নীল জল দিগন্ত ছুঁয়ে এসেছো,
আমি শুনেছি সেদিন তুমি
নোনা বালি তীর ধরে
বহুদূর বহুদূর হেঁটে এসেছো।’
মৌসুমী ভৌমিকের এ গান আমার বড় প্রিয়। প্রায়শ:ই শুনি, আমার বাড়ীর বারান্দায় বসে বাইরের দিকে দৃষ্টি ছড়িয়ে দিয়ে। ঠিক কি আছে, গানটাতে আমি জানি না, কিন্তু শুনতে শুনতে চোখের দৃষ্টি উদাস হয়ে যায়, মনটা হু হু করে ওঠে, কেমন একটা বিষন্নতায় ছেয়ে যায় হৃদয়।
বিশেষত: মৌসুমী যখন গেয়ে ওঠেন,
‘আমি কখনো যাই নি জলে,
কখনো ভাসিনি নীলে,
কখনো রাখিনি চোখ ডানা মেলা গাঙচিলে,
আবার যেদিন তুমি সমুদ্র স্নানে যাবে,
আমাকেও সাথে নিও,
নেবো তো আমায়, বলো নেবে তো আমায়?’
এ আর্তি বাতাসকে চিরে চিরে প্রতিধ্বনিত হয়, চোখ ছাপিয়ে যায় জলে, মাথার মধ্যে ‘জলের মতো ঘুরে ঘুরে’ কে যেন কথা কয়, ‘নেবে তো আমায়? নেবে তো?’ যতবার গানটা শুনি, এ লাইন ক’টা এলেই কেমন যেন আনমনা হয়ে পড়ি, কত কথা মনে হয়, কতজনের কথা ভাবি - কিছু না দেখার কথা, কিছু তৃষিত আকাঙ্খার। সবই ঐ সমুদ্র বিষয়ে।

এই যে একজন বন্ধু লিখেছেন তার মা-বাবার কথা। বিদেশে ছেলের কাছে বেড়াতে এসেছেন এসেছেন তাঁরা। ছেলে, ছেলে-বৌ সযত্নে নিয়ে গেছে মা-বাবাকে সমুদ্রসৈকতে। সমুদ্র-দর্শনে দু’জনেই উত্তেজিত, উল্লসিত ও উদ্ভাসিত। ছেলে স্মিতমুখে বাবাকে মন্তব্য করেছে, ‘বঙ্গোপসাগর দেখেছেন, এবার আটলান্টিক দেখলেন’। ছেলেকে অবাক করে দিয়ে মা-বাবা জানালেন যে এর আগে দু’জনের কেউই সাগর দেখেন নি।
এ স্বীকারোক্তিতে পুত্রটি হতবাক। প্রতিষ্ঠিত পরিবার, মা- বাবা দু’জনেই ভালো চাকুরে ছিলেন, কিন্তু এর আগে কোনদিন সমুদ্র দেখেন নি! অথচ দেশে থাকতেই, ছেলেটি ভাবে, সে কতবার কক্সবাজার কুয়াকাটা গেছে বন্ধুদের সঙ্গে। আর তার মা-বাবা কিনা এর আগে সমুদ্র দেখেন নি! মা’কে প্রশ্ন করলে তিনি জবাব দিয়েছেন, ‘সময় হয় নি’।
বহু বছর আগে আমার বয়োজৈষ্ঠ্য এক অতি প্রিয়জন যখন ভীষন অসুস্হ, তখন তাঁর ছেলে মেয়ে দু’জন মা’কে জিজ্ঞেস করেছিল, কি তাঁর মন চায়। খুব নরম স্বরে তিনি বলেছিলেন যে জীবনে তিনি সমুদ্র দেখেন নি - তাঁর বড় সমুদ্র দেখা এবং সমুদ্র স্নানের সাধ। তাঁর সন্তানেরা তাঁকে কক্সবাজার নিয়ে গিয়েছিলো। তিনি হাঁটতে পারতেন না বলে তাঁকে একটি রিক্সা ভ্যানের পাটাতনের ওপরে বসিয়ে জলের ধারে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।
সমুদ্রের দিগন্ত রেখার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে থাকতে তাঁর দু’চোখ জলে ভরে গিয়েছিল। তিনি মৃদুস্বরে বলেছিলেন, ‘তিনি কল্পনায় যে সমুদ্র দেখেছেন, তার চেয়ে বাস্তবের সমুদ্র অনেক বেশী সুন্দর।’ সবাই মিলে রিক্সা ভ্যানটিকে জলে নামালে সমুদ্রের লোনাজল পরম আদরে তাঁকে সিক্ত করে দিয়েছিল। বহুকালের একটি লালিত আকাঙ্খা তাঁর পূরণ হয়েছিল। এ ঘটনার পরে তিনি আর বেশীদিন বাঁচেন নি।

আমি প্রথম বহুদূর থেকে সমুদ্র দেখি- যখন আমি বারো বছরের বালক। ঢাকা থেকে রেলগাড়ীতে চট্টগ্রাম যাওয়ার পথে কুমীরার কাছাকাছি এলে যাত্রীদের মধ্যে সাড়া পড়ে যেত। কারন ঝাউবনের ফাঁক দিয়ে ক্ষণিকের জন্য বঙ্গোপসাগরের এক চিলতে রূপোলী জল দেখা যেত। একবার এ রকম এক ভ্রমনে আমার বাবা আমাকে দেখিয়েছিলেন। তেমন কিছু মনে হয় নি আমার, হতবাকও হই নি, সাড়া তোলেনি আমার বালক হৃদয়ে।
কিন্তু কলেজ জীবনে যখন বঙ্গোপসাগরের তীরে দাঁড়িয়েছি, তখন তার বিশালত্ব, অবিরাম গর্জন, ঢেউয়ের মাথা কুটে মরার চিত্রপটের সামনে হতচকিত মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম, একটা ঘোর লেগে গিয়েছিল, এবং কেন জানি চোখ ছাপিয়ে জল এসেছিল। তারপর এ দীর্ঘ চার দশকে কত সমুদ্র দেখেছি। আমার এ জীবনে পৃথিবীর সব মহাসাগর দেখেছি, অনেকগুলো সাগরের পাড়ে দাঁড়িয়েছি, বহু উপসাগরের জলে পা ভিজিয়েছি। তবু সমুদ্র এখনও আমাকে আবিষ্ট করে রাখে, তরঙ্গ এখনও আমায় টানে, সমুদ্র-তৃষা আমার আজও আকণ্ঠ।
আসলে সমুদ্রের প্রতি মানুষের আকর্ষণ দুর্নিবার। প্রেসিডেন্ট কেনেডী একবার এ আকর্ষণের একটা ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন। তাঁর মতে, "মানুষ জল থেকেই এসেছে, জলেই আবার ফিরে যাবে।"
হতে পারে। কিন্তু আমার মনে হয় ঐ আকর্ষনের কারনটা হয়তো অন্য জায়গায় -অন্তত: আমার ক্ষেত্রে। পাহাড় আর সমুদ্রের মধ্যে তুলনা করে বলা যাক।

আমি পাহাড় ও সমুদ্র দু’টোই ভালবাসি। দু’টোই বিশাল-যার সামনে মাথা নত হয়ে আসে। কিন্তু পাহাড় হচ্ছে স্হির, নিশ্চল ও মৌনী। অন্যদিকে সমুদ্র অস্হির, জীবন্ত এবং কথা কয়। পাহাড়ের মধ্যে একটা প্রশান্ত ভাব আছে, সমুদ্রের আছে গতিময়তা। পাহাড় বহু দূরের, সমুদ্র খুব কাছের। পাহাড়কে মনে হয় ধরা-ছোঁয়ার বাইরে, কিন্ত সমুদ্রকে স্পর্শ করা যায়। পাহাড়কে সন্মান করা যায়, সমুদ্রের সঙ্গে বন্ধুত্ব করা যায়।
কিন্তু সমুদ্র দেখতে হ’লে কি সবসময়ে জলের সমুদ্রের কাছে যেতে হয়? তা কিন্তু নয়। আমাদের আশে পাশে অনেক মানুষ আছেন যাঁদের হৃদয়ে মমতার সমুদ্র, কথায় মায়ার সমুদ্র, আর চোখে স্বপ্নের সমুদ্র। সূদূ্রের জলের সমুদ্রের আকাঙ্খায় আমরা যেন আমাদের চারপাশের মায়ার, মমতার আর স্বপ্নের সমুদ্রে ডুব দিতে ভুলে না যাই। তখন মৌসুমীর গানের শেষ চরনটি মনে পড়ে যায়, ‘ তাই স্বপ্ন দেখবো বলে আমি দু’চোখ পেতেছি’।
সর্বশেষ এডিট : ২২ শে অক্টোবর, ২০২৪ রাত ৯:০২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




