somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

জুল ভার্ন
এপিটাফ এক নিঃশব্দ প্রচ্ছদে ঢাকা আছে আমার জীবনের উপন্যাস...খুঁজে নিও আমার অবর্তমানে...কোনো এক বর্তমানের মায়াবী রূপকথায়।আমার অদক্ষ কলমে...যদি পারো ভালোবেসো তাকে...ভালোবেসো সেই অদক্ষ প্রচেষ্টা কে,যে অকারণে লিখেছিল মানবশ্রাবণের ধারা....অঝোর

গঞ্জিকা সেবনকারীরাই পঞ্জিকা লিখে....

২২ শে জানুয়ারি, ২০২২ সকাল ৯:৪৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

গঞ্জিকা সেবনকারীরাই পঞ্জিকা লিখে....

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রত্যাহিক জীবনে পঞ্জিকা একটি অপরিহার্য বিষয়। তাদের পুজো, বার-তিথি-নক্ষত্র দেখা ছাড়াও পঞ্জিকার গুরুত্ব আছে বাংলা সাহিত্যে। আমার মতে, পঞ্জিকার মতো নির্মল হাস্যরসের ভাণ্ডার বাংলা সাহিত্যে দ্বিতীয় নেই বলেই মনে করি।



পঞ্জিকার আর এক নাম পাঁজি। ভাবছেন, পাঁজি আবার সাহিত্য হল কবে? যাঁরা এমনটা ভাবছেন, তাঁদের ভুল ভাঙানোর জন্যে বলি, অনুগ্রহ করে সময় নিয়ে এক দিন ভালো করে পুরো একটা পাঁজি পড়ে ফেলুন। সব পড়বেন, সূচনাপত্র থেকে শেষ পাতার বিজ্ঞাপন পর্যন্ত, সব! যদি একটু ধৈর্য ধরে পুরো পাঁজিখানা পড়তে পারেন, দেখবেন, বাংলায় অমন রসসাহিত্য আর দ্বিতীয়টা নেই!

পঞ্জিকাতে কী নেই? সূচিপত্রে ৭০ টা বিষয় আছে। যারমধ্যে কয়েকটি বিষয়ের নাম লিখছিঃ- ভূমিকা, হরপার্বতী, গংগাদিস্নানযোগ, মমজ্ঞকাদি গ্রহের রাশ্যাদি সঞ্চার, তারাশুদ্ধি, পতাকীচক্র, অন্তদর্শাকাল নিরুপণ, বিংশোত্তরী অন্ত্ররদশা, আশৌচ বিবেক, যমজাশৌচ, নিত্যদশা ফল, তর্পণ বিধি, শাগ্রামশিলায় পুজা, ঘটোৎসর্গ, ব্রাতকরণমীব্রত, স্তবকবচ প্রকরণ- ইত্যাদি ইত্যাদি।

একেবারে গোড়ার দিকে পঞ্জিকার গণক ও অনুমোদক পণ্ডিতদের তালিকায় চোখ বোলান। দেখবেন, কাব্যতীর্থ, কাব্যমধ্য, ব্যাকরণতীর্থ, জ্যোতিষতীর্থ, জ্যোতিষমধ্য, পুরাণরত্ন, বিদ্যাভূষণ, ন্যায়তীর্থের ছড়াছড়ি(১২ পৃষ্ঠা থেকে ৩৯ পৃষ্ঠা পর্যন্ত)। সারা জীবন ঘুরে বেড়ালেও অত তীর্থ দর্শন করতে পারবেন না, যা পারবেন একবার পাঁজির পাতায় চোখ বোলালে। গোটা দুই বাংলায় তো বটেই সারা ভারত জুড়েই ছড়িয়ে আছেন সেই সব ‘তীর্থ’রা এবং তারা সবাই গোল্ড মেডালিস্ট।

এবার আসা যাক গণনায়ঃ
পঞ্জিকা সব বিষয়েই গণনা করে আগাম ফল বলে দিতে পারে! পঞ্জিকাওয়ালাদের দাবি সেই রকমই। বৃষ্টি গণনা, বার্ষিক রাষ্ট্রফল, ব্যক্তির বার্ষিক লগ্নফল, রাশিফল..... মোদ্দা কথা ফলের ছড়াছড়ি! আবহাওয়ার হাল-হদিশ দিতে যেখানে আধুনিক বিজ্ঞান আর আবহাওয়াবিদেরা হিমশিম খেয়ে যান, সেখানে উচ্চতর কোনও গাণিতিক পদ্ধতির সাহায্য ছাড়াই শুধু যোগ-বিয়োগ-গুণ-ভাগ করে সারা দেশের বৃষ্টি ও আবহাওয়ার খবর দেওয়া কম কৃতিত্বের নয়! বিশ্বাস হল না নিশ্চই? এই ১৪২৭ বঙ্গাব্দের পঞ্জিকা খুলুন, দেখবেন- আষাঢ়-শ্রাবণ-ভাদ্র-আশ্বিন মাসের বৃষ্টি গণনা করতে গিয়ে পঞ্জিকা জানাচ্ছে, "এই মাসে যেখানেই মেঘের সঞ্চার ঘটিবে সেইখানেই বারিপাত হইবে।"- মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন!

চলে আসুন, বার্ষিক রাষ্ট্রফল বিভাগে:
এই বিভাগে বিস্তৃত ভাবে বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, চিন, রাশিয়া, জাপান, ইজরায়েল, আমেরিকা মহাদেশ ও ব্রিটেনের এবং অল্প কথায় পৃথিবীর আরও অনেক রাষ্ট্রের বার্ষিক রাষ্ট্রফল বলা আছে। হাতে সময় কম থাকলে যে কোনও একটা বা দুটো রাষ্ট্রের বর্ষফল পড়লেই চলবে। ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে প্রায় একই কথা লেখা আছে সবগুলোর ক্ষেত্রে।

পঞ্জিকার সব থেকে আকর্ষণীয় অংশ হল ‘জ্যোতিষ বচনার্থ’!
কী নেই সেখানে? প্রথমেই রয়েছে ‘বারবেলা’ ও ‘কালবেলা’। রবিবার থেকে শনিবার— সপ্তাহের প্রতিটা দিনেরই কোনও না কোনও সময় ‘বারবেলা’ বা ‘কালবেলা’ পড়বে। আর আছে ‘কালরাত্রি’। এই ‘বারবেলা’, ‘কালবেলা’ ও ‘কালরাত্রি’ সময়কালে কোনও কাজ করা যাবে না। করলে নানা বাধা-বিঘ্ন, এমনকী প্রাণ সংশয় পর্যন্ত!

সন্তানের অন্নপ্রাশন, উপনয়ন, বিবাহ যে কোনও শুভ কাজেই হোক, পঞ্জিকার জ্যোতিষ বচনের নির্দেশ না মানলে সমূহ সর্বনাশ! পঞ্জিকা মতে, যে কোন কাজেই জ্যোতিষরা আপনার সহায়। ধরা যাক, কোথাও বেড়াতে যাচ্ছেন জলযানে- খবরদার! পাঁজি না দেখে জলযানে চড়তে যাবেন না ভুলেও। ‘জ্যোতিষ বচনার্থ’-এর ‘নৌযাত্রা’য় বলা আছে— ‘অশ্বিনী হস্তাপুষ্যা মৃগশিরা পূর্বফাল্গুনী পূর্বাষাড়া পূর্বভাদ্রপদ অনুরাধা ধনিষ্ঠা ও শ্রবণা নক্ষত্রে, শুভ তারাচন্দ্রে, যাত্রোক্ত দিবসে, শুভ বারতিথিযোগকরণে নৌযাত্রা প্রশস্ত।’ বোঝা গেল কিছু?
এর পরে আসা যাক পঞ্জিকার মূল অংশে, যেখানে মাস অনুযায়ী প্রত্যেক দিনের বর্ণনা রয়েছে। এই অংশটাও কম রসাসিক্ত নয়! বার, তারিখ, তিথি, নক্ষত্র, বারবেলা-কালবেলা ছাড়াও এখানে প্রতি দিন কী কী খাওয়া যাবে, কি খাওয়া যাবে না তার তালিকাও দেওয়া আছে। বিশ্বাস না হয়, একটা পঞ্জিকা নিয়ে কোনও একটা দিনের পাতা খুলুন। হয়তো দেখবেন, লেখা আছে, "ঘ ৮।৩৮।৩৭ মধ্যে নারিকেল ভক্ষণ তৈল মৎস মাংসাদি সম্ভোগ ও প্রায়শ্চিত্ত নিষেধ ও পরে অলাবু ভক্ষণ নিষেধ।" অতিরিক্ত ওজন-সমস্যায় যাঁরা ভুগছেন, তাঁরা আর কোনও কারণে না হোক, এই ‘ডায়েট-চার্ট’-এর জন্যেই একটা করে পঞ্জিকা কিনতে পারেন।

বলাই বাহুল্য, পঞ্জিকার পাতায় যা ছাপা থাকে, সেগুলি সবই ‘গ্যারান্টেড’! আর কিছু লাভ না হোক, পড়ে আনন্দ পাবেন— এটা অন্তত ‘গ্যারান্টি’ দিয়ে বলা যেতে পারে। পঞ্জিকার মতো নির্মল হাস্যরসের ভাণ্ডার বাংলা সাহিত্যে আর দ্বিতীয়টা নেই।

পঞ্জিকার শুরুতেই ভূমিকা পর্বে গণনা সম্পর্কে শতভাগ গ্যারান্টি দিয়ে বলা হয়েছে, "এই পঞ্জিকার গণনা ফল কেহ মিথ্যা প্রমাণ করিতে পারিলে এক লক্ষ টাকা পুরস্কার দেওয়া হইবেক।" এবং সব শেষে সবিনয়ে নিবেদন জানিয়ে বলা হয়েছে, "সকল প্রকার ভুল ত্রুটি মার্জনীয়!"
সর্বশেষ এডিট : ২০ শে অক্টোবর, ২০২৪ সকাল ১১:৫৫
১৮টি মন্তব্য ১৮টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আপনি ধার্মিক না মানুষ?

লিখেছেন রাজীব নুর, ২৬ শে এপ্রিল, ২০২৬ বিকাল ৩:০৮



ধার্মিক হওয়া কোনো কাজের কথা নয়।
ধার্মিক হওয়া সহজ। বিজ্ঞানী হওয়া সহজ কথা নয়। পিএইচডি করা সহজ কথা নয়। সেই তুলনায় কোরআন মূখস্ত করা সহজ। জন্মগত ভাবে আমি বাপ... ...বাকিটুকু পড়ুন

ISD মোবাইল, TNT ফোন।

লিখেছেন নাহল তরকারি, ২৬ শে এপ্রিল, ২০২৬ রাত ৮:২৮

২০০১ সালে কম মানুষের হাতেই মোবাইল ছিলো। মোবাইল ছিলো বড়লোকী পরিচয়। সে সময় সকল মোবাইল থেকে ইন্টারনেশন্যাল ফোন ও টেলিফোন থেকে কল আসার সুবিধা ছিলো না। মুষ্টিমেয় সিমের বিদেশ থেকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

'মানুষ' হওয়া খুব সোজা, 'মুসলমান' হওয়া কঠিন

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ২৬ শে এপ্রিল, ২০২৬ রাত ৮:৩৪



একটু আগেই ভাবছিলাম, মানুষ হওয়াটা খুব সহজ। বাবা-মা জিংজিং করে আমাদের পৃথিবীতে এনেছেন, এতে আমাদের কৃতিত্ব কোথায়! কোন কৃতিত্ব নেই। আমরা অটো ভাবেই 'মানুষ' হিসেবে জন্মগ্রহণ করেছি। দুইজন মানব-মানবীর... ...বাকিটুকু পড়ুন

হযরত আলী (রা.) ও হযরত মুয়াবিয়ার (রা.) যুদ্ধের দায় হযরত আলীর (রা.) হলে আমরা হযরত মুয়াবিয়াকে (রা.) কেন দোষ দেব?

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ২৭ শে এপ্রিল, ২০২৬ রাত ২:৪৪



সূরাঃ ৯ তাওবা, ৬০ নং আয়াতের অনুবাদ-
৬০। সদকা বা যাকাত ফকির, মিসকিন, এর কর্মচারী, মোয়াল্লাফাতে কুলুব (অন্তর আকৃষ্ট),দাসমুক্তি, ঋণ পরিশোধ, আল্লাহর পথে ও মুসাফিরের জন্য। এটা আল্লাহর বিধান।... ...বাকিটুকু পড়ুন

তোমাকে ভালোবাসি I love you

লিখেছেন তানভীর রাতুল, ২৭ শে এপ্রিল, ২০২৬ রাত ৩:০২

তোমাকে ভালোবাসি বাতাসের মতো,
যেমন শিশুর কাছে বালি একটা খেলনা,
অথবা ঝড়ের মতো, যাকে কেউ বোঝে না।

I love you like the wind,
Playing like a child in the sands,
Or a storm that no... ...বাকিটুকু পড়ুন

×