"মূলাক্করম"....
বাজেট ঘোষণার সাথে জড়িয়ে থাকে নানাবিধ শুল্ক আরোপ। সরকার শুল্ক আরোপ করে তা আদায়ও করে। কিন্তু সেই শুল্ক পরিশোধ করতে অনেক বিড়ম্বনারও অন্ত নেই। এই শুল্ক নিয়ে বহুল আলোচিত একটা ঐতিহাসিক ঘটনা শেয়ার করছিঃ-
আমরা নানাবিধ কর(ট্যাক্স) এর কথা জানি। যেমনঃ- ভ্যাল্যু এডেড ট্যাক্স(VAT) ইনকাম ট্যাক্স, সেল ট্যাক্স, এডভান্স ট্যাক্স, সম্পুরক কর, আমদানি /রপ্তানি শুল্ক ইত্যাদি ইত্যাদি নামের। কিন্তু নারীদের জন্য 'স্তন কর' বলেও একটা কর প্রচলিত ছিলো - যার নাম "মূলাক্করম"! সেই "মূলাক্করম" করের কথাই আজ আমরা মনে করবো।
২১৫ বছর আগে কেরালা'র রাজা ছিলেন ত্রিভাঙ্কুর।
তার আমলে নারীদের দিতে হতো স্তনকর। স্থানীয় ভাষায় যাকে বলা হত - "মূলাক্করম!"
আইনটি এরকমঃ-
ব্রাহ্মণ ব্যতীত হিন্দুধর্মের অন্য কোন নারী তার স্তন আবৃত রাখতে পারবে না। নারীদের স্তন রাখতে হবে অনাবৃত, উন্মুক্ত(যাতে রসু খা ব্রাম্মনকূল চোখের কামক্ষুধা মিটাতে পারে)। আবৃত করতে হলে বা স্তন ঢেকে রাখতে চাইলে দিতে হবে স্তনকর। আবার এই শুল্কের পরিমাণ নির্ভর করবে স্তনের আকারের উপর। যার স্তন যতবড় তার শুল্ক ততো বেশী-যা ছিলো নারীদের অসম্মান করার, নিগৃহীত করার একটা পৈশাচিক পন্থা। এই স্তনশুল্কের একটা অংশ জমা হতো পদ্মনাভ মন্দিরে(গিনেস বুকের তথ্য অনুযায়ী, এটি পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী মন্দির)- যা দিয়ে ব্রাম্মণ পূরহিতদের মাসোহারা পেতেন!
৩৫ বছর বয়সী কৃষ্ণ বর্নের এক নারী নাঙেলি, তাকে কাজের জন্য বাইরে যেতে হতো। তিনি সবসময় তার স্তন ঢেকে রাখতেন। একদিন তিনি শুল্ক সংগ্রাহকদের নজরে পড়লেন। শুল্ক সংগ্রাহকরা তার কাছে স্তনশুল্ক দাবী করলো। অস্বীকৃতি জানিয়ে মেয়েটি বললো, "স্তন আমার, তাকে আবৃত রাখব, নাকি অনাবৃত রাখব তা ঠিক করার তুমি কে? অামি শুল্ক দেবো না।"
প্রতিদিন শুল্ক সংগ্রাহকরা তার বাড়িতে এসে তাকে শুল্ক দেওয়ার জন্য চাপ দিতে লাগলো। দিনে দিনে বাড়তে থাকলো করের বোঝাও।
মুলাক্করম’ বা ‘স্তনকর এর একটা অংশ যেত ত্রিবাঙ্কুরের রাজাদের কুলদেবতা পদ্মনাভ মন্দিরে। দলিতদের আজীবন ঋণের নিগড়ে বেঁধে রাখার এই ব্রাহ্মণ্যবাদী প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন আলাপুঝার এঝাওয়া সম্প্রদায়ের সেই নারী নাঙ্গেলি। ১৮০৩ সালে এই সাহসিনী নারী রাজার ওই নিয়মকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে তার স্তনকে আবৃত করে রাখে।
অবশেষে শুল্ক আদায়কারীদের জোরাজোরিতে একদিন শুল্ক সংগ্রাহকদের ঘরের বাইরে অপেক্ষা করতে বলে দরজা বন্ধ করে ঘরের ভিতরে চলে যায়। ধারালো অস্ত্র দিয়ে কেটে ফেলে তার স্তন! তারপর শুল্ক সংগ্রাহকের হাতে শুল্কস্বরূপ তুলে দেয়... রক্ত মাখা স্তন! বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যায় শুল্ক সংগ্রাহকসহ পাড়াপ্রতিবেশী সবাই!
অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মেয়েটির মৃত্যু হয়। পুরো ভারতে ছড়িয়ে পড়ে এই ঘটনা। কয়েকদিন পর রাজা ত্রিভাঙ্গুর স্তনকর বাতিল করতে বাধ্য হন। নাঙেলির আত্মাহুতির সূত্র ধরেই ১৮৫৯ সালে ভারতে সংগঠিত হয়েছিল "কাপড়া আন্দোলন"।
আত্মত্যাগের বিনিময়ে পুরো কেরালার নারীদের অাব্রু রক্ষা করেছিলো বীরাঙ্গনা নাঙেলি! তিনিও পারতেন বাকী সব নারীদের মতো স্তনশুল্ক মেনে নিতে। শুল্ক দেওয়ার মতো আর্থিক সক্ষমতাও তার ছিলো। কিন্তু পৃথিবীতে কেউ কেউ বুকে অাগুন নিয়ে জন্মায়। কোনো অন্যায় তাদের সামনে অাসলেই তা তাদের বুকের অাগুনে ভস্মিভূত করে দেয়। তাইতো নিজের সুখ-শান্তি, চাওয়া-পাওয়া সর্বস্ব উজাড় করে দিয়ে নারীত্বের অপমানেত বিরুদ্ধে নারীদেরকে অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে শিখিয়েছিলো নাঙেলি!
কাহিনী এখানেই শেষ নয়...
নাঙ্গেলির শরীর তখনও চিতায় দাউদাউ করে জ্বলছে! হঠাৎ একটা লোক দৌড়ে এসে সেই চিতার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে! লোকটা নাঙ্গেলির স্বামী।
ভারতের ইতিহাসে, স্ত্রীর সঙ্গে সহমরণে যাওয়া কোনো পুরুষের এটাই প্রথম এবং শেষ ঘটনা। ইতিহাস এই প্রেমিক পুরুষের নাম খোদাই করার তাগিদ অনুভব করেনি।
কিন্তু প্রতিবাদের যে অাগুন নাঙেলি জ্বালিয়ে দিয়েছিলো ভারতীয় নারীদের মনে, তা অাজও জ্বলজল করছে!
ডিসক্লেইমারঃ একজন নাঙ্গেলি জীবন দিয়ে অন্যায় শুল্ক থেকে ভারতীয় নারীদের সম্মান বাঁচিয়ে ছিলেন। কিন্তু আজকের অন্যায্য শুল্কের প্রতিবাদে লক্ষ আমজনতা আত্মাহুতি দিলেও সরকার শুল্ক মাফ করবেনা।
(বহুল আলোচিত এবং প্রচলিত এই বিষয়ে দুই বছর আগে ফেসবুকে লিখেছিলাম, ফেসবুক মেমোরি ফিরিয়ে দিয়েছে। তথ্যসূত্রঃ মূলাক্করম উইকিপিডিয়া)
সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই অক্টোবর, ২০২৪ দুপুর ১২:০২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


