নিজেকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি............
"থটস আর অনলি থটস নট ফ্যাক্টস”- এটা সাইকোলজির কথা। এর মানে হল, চিন্তা বিষয়টা মস্তিষ্কের নিউরোনগুলোর তড়িৎরাসায়নিক সংকেতগুলো ছাড়া আসলে আর কিছু না। চিন্তা মানেই বিষয়টা সত্যি এমন না, আর এই চিন্তা নিয়ন্ত্রিত হয় বলে আমরা যা দেখি তা আসলে সত্যি না।
মিডিয়া ম্যানুপুলেশন এর সাথে আমরা অনেকেই পরিচিত, সহজ করে বললে এর মানে- আমাদের চিন্তা এবং মন এই মিডিয়া দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় কিংবা নিয়ন্ত্রণ করা হয়। উদাহরণঃ যেমন ধরুন, মেয়েদের শরীরের শেপ ৩৬-২৪-৩৬ হলে সেটা পারফেক্ট! এই কনসেপ্ট আপনি অবশ্যই জানেন, কিন্তু আপনি কিভাবে জানেন? আপনার মাথায় কি করে এল, কে এই মেজারমেন্ট করল আর কেন করল সেটা ভেবেছেন?এটাই হলো মিডিয়া ম্যানুপুলেশন। অর্থাৎ এর সাথে মিডিয়া ম্যানুপুলেশন জড়িত।
একটু ইতিহাস এর দিকে তাকাই, এই নারী শরীর নিয়ন্ত্রণের কনসেপ্ট নতুন না। চীনে মেয়েদের পা এর আঁকার ছোট করা, মিশরে মাথার সমস্ত চুল কেঁটে ফেলে দিয়ে পরচুল ব্যবহার, গলার উচ্চতা বাড়ানোর জন্য করেন উপজাতিদের রিং এর ব্যবহার, আফ্রিকার অনেক দেশেই ঠোঁটে সাইজ বড়ো করা- সবই নারী শরীর নিয়ন্ত্রেনের উদাহরণ। কেউ ধর্ম, কেউ রীতি কিংবা কেউ সৌন্দর্যের নামে নারী শরীরের এই পরিবর্তনকে জায়েজ করেছে।
ব্রিটিশ ও ইউরোপিয়ান সম্ভ্রান্ত নারীরা লম্বা গাউনের নিচে এক ধরনের শক্ত অন্তর্বাস এবং বডি শেইপার ব্যবহার করতেন যাতে তাদের স্তন্, কোমর এবং নিতম্বের আঁকার পরিবর্তিত হত। যেহেতু ক্ষমতাধর এলিট সোসাইটি ঘাস খেলেও সেটাই হয় স্ট্যান্ডার্ড তাই পরবর্তীতে সাধারণ নারীরা ঐ সব নারীদের কে অনুকরণ করতে বডি শেইপিং শুরু করে।
আর বর্তমানে বডি অপ্সেশনের কনসেপ্ট লুফে নিয়েছে ক্যাপিটালিজম। ৩৬-২৪-৩৬ কনসেপ্ট এই বডি অপ্সেশন কে কাজে লাগিয়ে ক্যাপিটালিজম প্রসারের ঠিকাদার মিডিয়ার উগড়ে দেয়া ভিমরতি। ভিমরতি বলার কারন, ২৪ কোমর মানে অস্বাভাবিক রকম সরু কোমর, চিকিৎসা বিজ্ঞানের এর ভাষ্য অনুযায়ী এই কোমর শরীরের উপরের ভাগের সমস্ত ভার বহন করার জন্য মোটেও সঠিক না।
কিন্তু প্লেবয় ম্যাগাজিন এই কনসেপ্ট সারা পৃথিবীতে এমন ভাবে ছড়িয়েছে যে, নারী শরীর এর জন্য এটাই স্ট্যান্ডার্ড যৌনাবেদনাময়ী শরীর কিংবা পারফেক্ট শরীর। আর এই শরীর পাবার জন্য সারা পৃথিবীটিতে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের প্রডাক্ট বিক্রি হচ্ছে। প্লেবয়ের বদৌলতে পাড়ার সদ্য গোঁফ গজানো ছেলেটা জানে নারী শরীর এর পারফেক্ট সাইজ হল ৩৬-২৪-৩৬! আর সদ্য বেণি দুলিয়ে হাই স্কুল পেরোন মেয়েটা জানে ফোমের অন্তবাস না পরলে তার শরীর কুৎসিত লাগবে!
আপনি আয়নায় নিজের কি দেখেন? আপনি আসলে আয়নায় নিজেকে দেখেন না, দেখেন আপনার মাথায় বহুদিন ধরে যে কনসেপ্টগুলো ঢোকানো হয়েছে সেই স্ট্যান্ডার্ড এর সাথে মেলে এমন মানুষটাকে, যখন মেলে না তখন নিজেকে কুৎসিত ভাবতে শুরু করেন। অর্থাৎ চিন্তা তথা নিজেকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি, যা আপনার মাথায় ঢুকানো হয়েছে।
আপনি জেনেছেন কালো দাগ মানে কুৎসিত। তাহলে কালো টিপ কেন পরেন? ওটাও তো দাগ তাই না? কালো রঙ মানে কুৎসিত তাহলে কালো কাজল কেন পরেন? শরীরে প্রচুর পশম মানে কুৎসিত তাহলে মাথায় সেই পশম মানে চুল না থাকলে সেটা কুৎসিত কেন? এই যে শরীরে মেদ জমা কুৎসিত কিন্তু স্তনে কিংবা নিতম্বে মেদ কেন সুন্দর? কিংবা ভ্রু প্লাক অথবা বর্তমানে প্লাক করা ভ্রু একে মোটা করা কেন?
কারন, আপনি নিজেকে যখন আয়নায় দেখেন তখন চারপশের মাধ্যমগুলো থেকে শেখা সৌন্দর্যের মাপকাঠিগুলো দিয়ে নিজেকে বিচার করতে বসেন। দীপিকা সুন্দর কিন্তু তার স্তন ৩৬ না অথচ আপনার হয়ত স্তন ভরাট কিন্তু আপনি সুন্দর না। বিষয়টা খুব উদ্ভট না? প্লেবয় এর মডেলরা শুকনো পাটকাঠি অথচ আপনি মোটা বলে রীতিমত কুৎসিত ভাবেন নিজেকে! কিন্তু কেন?
প্রত্যেকটা মানুষ এর শরীর আলাদা, কেউ শারীরিক ভাবে সুস্থ থাকার জন্য শরীর চর্চা করে সেটা আলদা বিষয়। কিন্তু এর সাথে রঙ, শরীরের গঠন, আঁকার, সাইজ এর কোন সম্পর্ক নেই পুরোটাই দেখার দৃষ্টিভঙ্গি।
এই কারনে সন্তানের কোন খুঁৎ মায়ের চোখে পড়ে না। এই কথা নিজের জন্য প্রযোজ্য। নিজেকে ভালবাসলে আয়নার সামনের মানুষটিকে মনে হবে সব চেয়ে সুন্দর মানুষ, যার চোখে প্রচণ্ড মায়া আর হাসলে গালে আনন্দ ভাঁজ হয়ে লেগে থাকে। জাস্ট নিজেকে সুন্দর ভাবতে শুরু করুন, তারপর মাথা থেকে ঐ সুন্দরের ফালতু কনসেপ্টগুলো ফেলে দিন এবং আয়নায় দাঁড়ান। দেখবেন আপনি নিজে আপনার প্রেমে পড়েছেন।
(চার বছরের পুরনো লেখা, সংকলিত)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


