somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

জুল ভার্ন
এপিটাফ এক নিঃশব্দ প্রচ্ছদে ঢাকা আছে আমার জীবনের উপন্যাস...খুঁজে নিও আমার অবর্তমানে...কোনো এক বর্তমানের মায়াবী রূপকথায়।আমার অদক্ষ কলমে...যদি পারো ভালোবেসো তাকে...ভালোবেসো সেই অদক্ষ প্রচেষ্টা কে,যে অকারণে লিখেছিল মানবশ্রাবণের ধারা....অঝোর

আইবেক্সঃ প্রাণী জগতের বিস্ময়!

১২ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৯:১৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



আইবেক্সঃ প্রাণী জগতের বিস্ময়!

আইবেক্স (Ibex) হলো পার্বত্য অঞ্চলের এক অনন্য ও রাজকীয় বন্য ছাগল, যা তার প্রকাণ্ড, বাঁকানো শিং এবং খাড়া পাহাড় বা দেয়াল বেয়ে ওঠার অবিশ্বাস্য অতিমানবিক ক্ষমতার জন্য বিশ্বজুড়ে সুপরিচিত। এরা বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে প্রকৃত ছাগল বা Capra গোত্রের অন্তর্ভুক্ত (যা মাউন্টেন গোটের চেয়ে আলাদা, কারণ মাউন্টেন গোট প্রকৃত ছাগল নয়)। নিচে আইবেক্সের জীবনচারিতা, প্রজাতি, বাসস্থান ও স্বভাবের বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া হলোঃ


(১) বাসস্থান ও প্রজাতিভেদআইবেক্স কোনো একক প্রাণী নয়, বরং ভৌগোলিক অবস্থানভেদে এদের বেশ কয়েকটি প্রজাতি রয়েছে। এরা সাধারণত সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৬,৫০০ থেকে ১৫,০০০ ফুট উচ্চতায় রুক্ষ, পাথুরে ও খাড়া পাহাড়ি অঞ্চলে বাস করে।

(২) শারীরিক বৈশিষ্ট্য ও রাজকীয় শিংপ্রকাণ্ড শিং: আইবেক্সের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য হলো পুরুষদের মাথার বিশাল, পেছনের দিকে বাঁকানো শিং। একটি পূর্ণবয়স্ক পুরুষ আলপাইন আইবেক্সের শিং প্রায় ৪০ ইঞ্চি (৩.৩ ফুট) পর্যন্ত লম্বা হতে পারে! শিংয়ের সামনের অংশে খাঁজকাটা বা গিঁটের মতো বলয় থাকে। স্ত্রী আইবেক্সদেরও শিং থাকে, তবে তা আকারে বেশ ছোট ও সোজা হয়।

আকার ও ওজন: প্রজাতিভেদে এদের ওজনের তারতম্য হয়। পুরুষ আইবেক্সের ওজন ৪০ থেকে ১২০ কেজি পর্যন্ত হতে পারে, আর স্ত্রী আইবেক্সরা সাধারণত পুরুষের ওজনের অর্ধেক হয়।পশমের রং: এদের গায়ের রঙ সাধারণত বাদামী বা ধূসর হয়, যা পাথুরে পাহাড়ের সাথে চমৎকার ছদ্মবেশ (Camouflage) তৈরি করে। শীতকালে এদের পশম বেশ ঘন ও গাঢ় রঙের হয় এবং গ্রীষ্মে তা হালকা হয়ে যায়।

(৩) খাড়া দেয়াল আরোহণের জাদুকরী কৌশলআইবেক্সরা মহাকর্ষ বলকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে প্রায় ৯০ ডিগ্রি খাড়া পাথুরে দেয়ালে চড়তে পারে।

স্পেশাল খুরঃ এদের খুর দুভাগে বিভক্ত এবং খুরের ভেতরের অংশটি অত্যন্ত নরম ও নমনীয়। এটি খাড়া পাহাড়ের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র খাঁজে জুতো বা টায়ার লাইক গ্রিপ তৈরি করে।

বাঁধের দেয়ালে আরোহণঃ উত্তর ইতালির চিলিনো বাঁধের (Cingino Dam) প্রায় সোজা দেয়াল বেয়ে এদের চড়ার দৃশ্য বিশ্ববিখ্যাত। মূলত পাথরের গায়ে জমে থাকা খনিজ লবণ চাটতে এরা এই অবিশ্বাস্য ঝুঁকি নেয়, যা তাদের শরীরের সোডিয়ামের অভাব পূরণ করে।

(৪) খাদ্য ও পুষ্টি (Diet)আইবেক্সরা অত্যন্ত শক্তপোক্ত তৃণভোজী প্রাণী। পাহাড়ি অঞ্চলের রুক্ষ পরিবেশের যেকোনো উদ্ভিদ খেয়ে এরা হজম করতে পারে।এরা মূলত আলপাইন ঘাস, বিভিন্ন গুল্মজাতীয় উদ্ভিদ ও শ্যাওলা খায়।শীতকালে যখন পুরো পাহাড় বরফে ঢেকে যায়, তখন এরা খুর দিয়ে বরফ সরিয়ে শক্ত ঘাস বা গাছের ছাল ও শুকনো ডালপালা খেয়ে বেঁচে থাকে।পানির অভাব মেটাতে এরা বরফ চাটতেও অভ্যস্ত।

(৫) সামাজিক আচরণ ও প্রজননকালআলাদা দলঃ বছরের বেশিরভাগ সময় স্ত্রী আইবেক্স এবং তাদের বাচ্চারা ১০ থেকে ২০টির বড় দলে একসাথে থাকে। অন্যদিকে, প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষরা আলাদাভাবে ব্যাচেলর গ্রুপ তৈরি করে বা একাকী ঘোরে।

সিংহাসনের লড়াইঃ ডিসেম্বর-জানুয়ারি মাসের প্রজনন ঋতুতে পুরুষরা স্ত্রীদের মনোযোগ আকর্ষণের জন্য দলনেতা হওয়ার লড়াইয়ে নামে। তারা পেছনের দুই পায়ে ভর দিয়ে সোজা দাঁড়িয়ে যায় এবং প্রবল শক্তিতে একে অপরের শিংয়ে আঘাত করে। এই শিংয়ের ঠোকাঠুকির বিকট শব্দ মাইলের পর মাইল দূর থেকেও শোনা যায়।

(৬) জীবনচক্র ও আত্মরক্ষাঃ গর্ভধারণের ৫ থেকে ৬ মাস পর (সাধারণত মে-জুন মাসে) স্ত্রী আইবেক্স একটি বাচ্চার জন্ম দেয়। বাচ্চা আইবেক্স জন্মের মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই লাফাতে শুরু করে এবং মায়ের সাথে খাড়া পাহাড়ে চড়া শিখে যায়। পাহাড়ের একদম উঁচুতে থাকা এদের সবচেয়ে বড় প্রতিরক্ষা কৌশল, কারণ সেখানে কোনো সাধারণ শিকারী পৌঁছাতে পারে না। তবে নিচে নামলে তুষারচিতা বা নেকড়ের আক্রমণের শিকার হতে হয়। এছাড়া ছোট বাচ্চাদের ওপর বড় শিকারী ঈগল পাখি ছোঁ মারে।



মাউন্টেন গোট বনাম আইবেক্স মূল পার্থক্য বৈশিষ্ট্যঃ মাউন্টেন গোট (Mountain Goat) প্রজাতি ও গোত্রঃ এরা প্রকৃত ছাগল নয়। হরিণ ও অ্যান্টিলোপের সাথে সম্পর্কিত "গোট-অ্যান্টিলোপ" (Oreamnos americanus)।
প্রধানত উত্তর আমেরিকা (আলাস্কা, কানাডা এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রকি পর্বতমালা)।
মাউন্টেন গোট এর গায়ের রঙ ও পশম ধবধবে সাদা বা হালকা ক্রিম রঙের হয়। পশম অনেক ঘন ও তুলতুলে।
মাউন্টেন গোটদের কুঁজ থাকে; শরীর বেশ টানটান ও পেশীবহুল।

আইবেক্সঃ এরা বিবর্তন ও জিনগতভাবে প্রকৃত বন্য ছাগল। Capra গোত্রের অন্তর্গত।
ভৌগোলিক বাসস্থানঃ প্রধানত ইউরোপ, এশিয়া এবং আফ্রিকা (আল্পস পর্বতমালা, সাইবেরিয়া ও মধ্যপ্রাচ্য)।
আইবেক্সদের গায়ের রঙ বাদামী, ধূসর বা তামাটে হয়, যা পাথুরে পাহাড়ের সাথে মিশে থাকে।
পুরুষ আইবেক্সের লম্বা ও স্পষ্ট ছাগুলে দাড়ি থাকে।
লড়াইয়ের কৌশলঃ প্রজনন ঋতুতে এরা মাথা নিচু করে শিং দিয়ে একে অপরের পেটে বা পায়ে খোঁচা মেরে মারাত্মক জখম করে। এরা পেছনের দুই পায়ে ভর দিয়ে সোজা দাঁড়িয়ে যায় এবং ওপর থেকে শিং ঠোকাঠুকি (Head-butt) করে।
সামাজিক স্বভাবঃ এদের সমাজে স্ত্রী ছাগলরা আধিপত্য বিস্তার করে (Matriarchal)। স্ত্রীরা বেশি আক্রমণাত্মক হয়। এদের সমাজে পুরুষরা নিজেদের শক্তি প্রদর্শন করে দলনেতা হয়। বছরের বড় সময় পুরুষ-স্ত্রী আলাদা দলে থাকে।

সংক্ষেপে মনে রাখার সহজ উপায়ঃ
মাউন্টেন গোটঃ সাদা পশম পরিহিত, ছোট কালো শিং বিশিষ্ট উত্তর আমেরিকার এক অনন্য পাহাড়ি বাসিন্দা।
আইবেক্সঃ বিশাল রাজকীয় বাঁকানো শিং বিশিষ্ট ইউরোপ ও এশিয়ার রুক্ষ পাথুরে অঞ্চলের বন্য ছাগল।

তথ্যসূত্রঃ
(১) Nature: Wild Mountains- Battle for Survival of the Deadly Heights:
(২) Forces of Nature (BBC)- "The Incredible Ibex Defies Gravity".
সর্বশেষ এডিট : ১২ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৯:১৯
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

৫ আগস্ট-পরবর্তী ৩ দিনের বাংলাদেশ-

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ১১ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৯:৩৯



৫ আগস্ট-পরবর্তী ৩ দিনের বাংলাদেশ-

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশত্যাগের পর বাংলাদেশ জুড়ে যে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে, তার ক্ষয়ক্ষতি ছিল ব্যাপক ও বহুমাত্রিক। সংবাদমাধ্যম ও তদন্তকারী সংস্থাগুলোর... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমি আত্মহত্যা করতে যাচ্ছি।

লিখেছেন সুম১৪৩২, ১১ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৪:৩৬




আমি আত্মহত্যা করতে যাচ্ছি।

সিদ্ধান্তটা গতকাল নিইনি। অনেক দিন ধরে একটু একটু করে নিয়েছি।

আজ শুধু বাস্তবায়ন করতে বের হয়েছি।

ঘর থেকে বের হওয়ার সময় বিদ্যুৎ ছিল না।

আমি এমন এক জায়গায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

অন্ধকারের আলোকবর্তিকা

লিখেছেন স্প্যানকড, ১১ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৪:৩৬




একটা দেশ যখন শিক্ষিত চাপাবাজ, ক্ষমতার দরবারে নতজানু বুদ্ধিজীবী এবং মুখোশধারী ডাকাতদের হাতে পড়ে, তখন সেই দেশ আর মানচিত্রে থাকা একটি ভূখণ্ড থাকে না, হয়ে যায় আলীবাবার চল্লিশ চোরের... ...বাকিটুকু পড়ুন

মৃত্যুর আগে কি মানুষ টের পায়, সে মারা যাচ্ছে!

লিখেছেন রাজীব নুর, ১১ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৫৭



মৃত্যুর কয়েক মুহুর্ত আগে, টের পাওয়া যায়- মরে যাচ্ছি।
সময় শেষ। তবে সবাই বুঝতে পারে না। কেউ কেউ বুঝতে পারে। আমার বাবা একদিন মাকে বলল, আমার দোষ ত্রুটি... ...বাকিটুকু পড়ুন

ব্লগ সাইটের জন্য ডোমেইন নাম সাজেস্ট করুন

লিখেছেন ইফতেখার ভূইয়া, ১২ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ভোর ৪:৫৫


বাংলায় ব্লগিং করার জন্য একটি ওয়েব সাইট তৈরী করতে চাচ্ছি। আপাতত মূল উদ্দেশ্য হলো সামুতে লিখা আমার সবগুলো পোস্ট ধীরে ধীরে সাইটটিতে আর্কাইভ করে রাখা। সামুতে অনেকে নিবেদিত প্রাণ ব্লগার... ...বাকিটুকু পড়ুন

×