হেবা অক্ষুণ্ণ রেখেই মা-বাবার সুরক্ষা: সম্পত্তি হস্তান্তর আইন নিয়ে অহেতুক বিতর্ক !
বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে গত ৬ সেপ্টেম্বর ‘সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) বিল, ২০২৬’ পাস হওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক ও ধর্মীয় অঙ্গনে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। বিরোধী পক্ষের কেউ কেউ বিলটির বিধানকে প্রচলিত হেবা এবং শরিয়াহর সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে আপত্তি জানিয়েছেন এবং এ বিষয়ে আলেম ও শরিয়াহ বিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়ার দাবি তুলেছেন।
অন্যদিকে সরকারের বক্তব্য হলো, এই সংশোধনের উদ্দেশ্য প্রচলিত হেবা ব্যবস্থা পরিবর্তন বা বাতিল করা নয়; বরং সম্পত্তি হস্তান্তরের পর দাতার জীবদ্দশার ভোগ ও ব্যবহারের অধিকারকে একটি পৃথক আইনি কাঠামোর মাধ্যমে সুরক্ষা দেওয়া। ফলে বিষয়টি আবেগ বা রাজনৈতিক বিতর্কের জায়গা থেকে নয়, বরং আইনের প্রকৃত বিধান এবং আমাদের সামাজিক বাস্তবতার আলোকে দেখা প্রয়োজন।
যে বাস্তবতা থেকে আইনের প্রয়োজনঃ
আমাদের সমাজে এমন ঘটনা একেবারে বিরল নয় যে, মা-বাবা সারাজীবনের উপার্জন দিয়ে বাড়ি, জমি কিংবা অন্যান্য সম্পদ গড়ে তোলেন এবং জীবনের শেষ প্রান্তে ভালোবাসা ও বিশ্বাস থেকে সন্তানদের মধ্যে সেই সম্পত্তি দান করে দেন। কিন্তু সম্পত্তি পাওয়ার পর কোনো কোনো সন্তান মা-বাবার প্রতি দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়।
ভরণ-পোষণ না দেওয়া, অবহেলা করা, এমনকি নিজের হাতে গড়ে তোলা বাড়ি থেকেই বৃদ্ধ বাবা-মাকে বের করে দেওয়ার মতো ঘটনাও সমাজে দেখা যায়। কোথাও কোথাও সন্তানদের সম্পদ দিয়ে দেওয়ার পর শেষ বয়সে বাবা-মায়ের আশ্রয় হয় বৃদ্ধাশ্রম।
রাষ্ট্র ও আইনপ্রণেতাদের পক্ষে এই সামাজিক বাস্তবতাকে উপেক্ষা করা কঠিন। সেই বাস্তবতা থেকেই সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে দাতার আজীবন ভোগস্বত্ব সংরক্ষণের নতুন আইনি ব্যবস্থা আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংসদে পাস হওয়া সংশোধনের মাধ্যমে নির্দিষ্ট সম্পর্কের মধ্যে সম্পত্তি হস্তান্তর করলেও দাতা জীবিত থাকা পর্যন্ত সেই সম্পত্তি ব্যবহার ও ভোগ করার অধিকার সংরক্ষণ করতে পারবেন।
নতুন ব্যবস্থাটি আসলে কী?
সংশোধিত আইনে নতুন ১২২এ ও ১২২বি ধারা যুক্ত করে ‘lifetime usufruct’ বা আজীবন ভোগস্বত্ব সংরক্ষণ করে সম্পত্তি হস্তান্তরের একটি পৃথক কাঠামো তৈরি করা হয়েছে। অর্থাৎ, নির্দিষ্ট নিকটাত্মীয় বা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে দাতা চাইলে নিজের জীবদ্দশায় ওই সম্পত্তির ব্যবহার ও ভোগের অধিকার সংরক্ষণ করতে পারবেন।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- মালিকানা হস্তান্তর এবং ভোগস্বত্ব একই বিষয় নয়।
একজন দাতা সম্পত্তি অন্যের কাছে হস্তান্তর করতে পারেন, কিন্তু একই সঙ্গে আইনের অধীনে নিজের জীবদ্দশার ব্যবহার ও ভোগের অধিকার সংরক্ষণ করতে পারেন। ফলে বিষয়টিকে সরলভাবে ‘সম্পত্তি দিয়ে আবার সম্পত্তির মালিক থাকা’ হিসেবে দেখলে আইনি কাঠামোটির প্রকৃত বৈশিষ্ট্য বোঝা যাবে না।
তাহলে এটি কি প্রচলিত হেবা?
এখানেই বর্তমান বিতর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা।
মুসলিম আইনে প্রচলিত হেবা একটি স্বীকৃত সম্পত্তি হস্তান্তর পদ্ধতি। কিন্তু সংসদে পাস হওয়া নতুন বিধানটি হেবাকে বিলুপ্ত বা পরিবর্তন করে নতুন কোনো বাধ্যতামূলক পদ্ধতি তৈরি করেছে- এমনটি আইনের উদ্দেশ্য ও সরকারি ব্যাখ্যায় বলা হয়নি।
বরং সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, নতুন ব্যবস্থাটি সাধারণ gift, মুসলিম আইনের হেবা কিংবা আইনস্বীকৃত অন্য কোনো হস্তান্তর পদ্ধতির বৈধতাকে সীমিত বা ক্ষুণ্ণ করবে না। এটি একটি স্বতন্ত্র ও অতিরিক্ত আইনি ব্যবস্থা হিসেবে তৈরি করা হয়েছে এবং সব ধর্মের নাগরিকের জন্য প্রযোজ্য হবে।
অর্থাৎ কোনো মুসলমান যদি প্রচলিত ইসলামী বিধান অনুযায়ী হেবা করতে চান, এই সংশোধন তাকে তা করতে বাধা দিচ্ছে না। আবার কেউ যদি নতুন আইনি কাঠামোর অধীনে সম্পত্তি হস্তান্তর করে নিজের জীবদ্দশার ভোগস্বত্ব সংরক্ষণ করতে চান, তার জন্যও একটি আইনগত পথ তৈরি করা হয়েছে। এই পার্থক্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি নতুন আইনি বিকল্প তৈরি করা এবং বিদ্যমান হেবা ব্যবস্থা বাতিল বা নিষিদ্ধ করা এক বিষয় নয়।
উত্তরাধিকার আর জীবদ্দশায় সম্পত্তি হস্তান্তর এক নয়ঃ
বিতর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো উত্তরাধিকার।
ইসলামী উত্তরাধিকার আইনে নির্ধারিত অংশের বিষয়ে কুরআনে সুস্পষ্ট বিধান রয়েছে। কে কতটুকু উত্তরাধিকার পাবেন, তা উত্তরাধিকার আইন ও ইসলামী শরিয়াহর একটি স্বতন্ত্র বিষয়।
কিন্তু জীবিত ব্যক্তি নিজের সম্পত্তি জীবদ্দশায় কীভাবে হস্তান্তর করবেন, সেটি উত্তরাধিকার বণ্টনের সঙ্গে এক করে দেখা ঠিক নয়।
‘সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) বিল, ২০২৬’ উত্তরাধিকারীদের অংশ নির্ধারণের জন্য নতুন কোনো বণ্টনব্যবস্থা তৈরি করেনি। বরং এটি জীবিত দাতার সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট ধরনের ভোগস্বত্ব সংরক্ষণের আইনি কাঠামো তৈরি করেছে।
সুতরাং এই আইনের মূল্যায়নে প্রথম প্রশ্ন হওয়া উচিত- এটি কি ইসলামী উত্তরাধিকার বিধানের নির্ধারিত অংশ পরিবর্তন করছে? নাকি জীবিত ব্যক্তির সম্পত্তি হস্তান্তরের একটি পৃথক দেওয়ানি ব্যবস্থা তৈরি করছে?
দুই বিষয়কে এক করে দেখলে বিতর্কটি অপ্রয়োজনীয়ভাবে জটিল হয়ে যায়।
ধর্মীয় উদ্বেগকে সম্মান করেই আইনের পাঠ দেখতে হবেঃ
কোনো আইন শরিয়াহসম্মত কি না- এটি নিঃসন্দেহে আলেম, ফকিহ ও ইসলামী আইন বিশেষজ্ঞদের আলোচনার বিষয় হতে পারে। এ ধরনের ধর্মীয় উদ্বেগকে তুচ্ছ করারও কোনো কারণ নেই।
কিন্তু একই সঙ্গে আইনের প্রকৃত ভাষা ও উদ্দেশ্যও বিবেচনা করতে হবে।
কোনো বিধানকে ‘হেবা-বিরোধী’ বা ‘কোরআনবিরোধী’ বলার আগে দেখা দরকার, সেই বিধান আসলে কী পরিবর্তন করেছে, কোন অধিকার বাতিল করেছে এবং কোন অধিকারকে নতুন করে স্বীকৃতি দিয়েছে।
বর্তমান সংশোধনের ক্ষেত্রে সরকারি ব্যাখ্যা অনুযায়ী প্রচলিত হেবা বাতিল করা হয়নি, অন্যান্য বৈধ হস্তান্তর পদ্ধতির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়নি এবং নতুন ব্যবস্থাটি কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের নাগরিকের জন্য সীমাবদ্ধও রাখা হয়নি।
তাই ধর্মীয় ও আইনগত মূল্যায়নের ক্ষেত্রে আবেগের পাশাপাশি আইনের নির্দিষ্ট ধারা ও তার বাস্তব প্রয়োগও আলোচনায় থাকা প্রয়োজন।
মা-বাবার অধিকার রক্ষার প্রশ্নটি ভুলে গেলে চলবে নাঃ
ইসলামে মা-বাবার মর্যাদা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কুরআনে আল্লাহর ইবাদতের নির্দেশের পাশাপাশি মা-বাবার সঙ্গে সদাচরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং তাদের বৃদ্ধ বয়সে বিরক্তির সামান্য প্রকাশ থেকেও বিরত থাকতে বলা হয়েছে।
সেই ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার আলোকে একজন সন্তান যদি মা-বাবার কাছ থেকে সম্পত্তি গ্রহণ করার পর তাদের ভরণ-পোষণ বন্ধ করে দেয়, অবহেলা করে কিংবা তাদের নিজেদের বাড়ি থেকে বের করে দেয়, সেটি অন্তত ইসলামের নৈতিক আদর্শের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ আচরণ নয়।
অতএব রাষ্ট্র যদি এমন একটি আইনি ব্যবস্থা তৈরি করে যার মাধ্যমে একজন মা-বাবা সন্তানকে সম্পত্তি হস্তান্তর করেও জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সেই সম্পত্তি ব্যবহার ও ভোগের অধিকার সংরক্ষণ করতে পারেন, তাহলে সেই ব্যবস্থার সামাজিক উদ্দেশ্যটিও আলোচনায় আসা উচিত।
আইনটি এমন কোনো নিশ্চয়তা দেয় না যে ভবিষ্যতে কোনো সন্তান কখনো মা-বাবার প্রতি অবহেলা করবে না। কিন্তু এটি অন্তত দাতার একটি মৌলিক সম্পত্তিগত নিরাপত্তাকে আইনি স্বীকৃতি দেওয়ার চেষ্টা করে।
সম্পত্তি দেওয়া মানেই নিরাপত্তা হারানো নয়ঃ
এই সংশোধনের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক সম্ভবত এখানেই।
অনেক মা-বাবা জীবদ্দশায় সন্তানদের সম্পত্তি দিয়ে দিতে চান। কিন্তু একই সঙ্গে তারা চান, জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত নিজের বাড়িতে থাকতে এবং নিজের সম্পত্তি ব্যবহার করতে।
আগের আইনি কাঠামোতে এ ধরনের আজীবন ভোগস্বত্ব সংরক্ষণের জন্য নির্দিষ্ট ও স্বতন্ত্র বিধান না থাকায় বাস্তবে নানা জটিলতা তৈরি হতে পারত। সংশোধিত আইন সেই শূন্যতা পূরণের একটি চেষ্টা করেছে। আইনটি প্রণয়নের আগে সরকারের বক্তব্যেও বলা হয়েছিল যে, সম্পত্তি দানের পর দাতার নিজের বাড়ি বা সম্পত্তিতে প্রবেশ ও ব্যবহার নিয়ে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে, তা মোকাবিলাই উদ্যোগটির অন্যতম উদ্দেশ্য।
বিতর্ক হোক, কিন্তু তথ্যভিত্তিক হোক।
আইন নিয়ে বিতর্ক গণতান্ত্রিক সমাজে স্বাভাবিক এবং প্রয়োজনীয়। কোনো বিধানের ধর্মীয়, সামাজিক বা আইনি প্রভাব নিয়ে আলেম, আইনজীবী, গবেষক ও নাগরিক সমাজের আলোচনা হওয়াই স্বাভাবিক।
কিন্তু সেই আলোচনা যেন আইনের প্রকৃত বিধানকে বাদ দিয়ে না হয়।
একদিকে প্রচলিত হেবা ও ইসলামী উত্তরাধিকার বিধানের গুরুত্ব অস্বীকার করার সুযোগ নেই। অন্যদিকে নতুন আইনটি হেবা বাতিল করেছে- এমন দাবিও আইনের সরকারি ব্যাখ্যার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বরং সংসদে পাস হওয়া কাঠামোটি আজীবন ভোগস্বত্ব সংরক্ষণ করে সম্পত্তি হস্তান্তরের একটি পৃথক ব্যবস্থা হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে এবং তা সব ধর্মের নাগরিকের জন্য প্রযোজ্য।
তাই প্রয়োজন হলে আলেম ও শরিয়াহ বিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়া যেতে পারে। আইনের প্রয়োগে বাস্তব কোনো অস্পষ্টতা দেখা দিলে ভবিষ্যতে সংশোধনের পথও খোলা থাকতে পারে। কিন্তু আইনটির উদ্দেশ্য, কাঠামো ও বিদ্যমান হেবা ব্যবস্থার সঙ্গে এর সম্পর্ক না বুঝে একে সরাসরি ধর্মবিরোধী হিসেবে চিহ্নিত করা সমস্যাটিকে সমাধান করার বদলে আরও জটিল করতে পারে।
শেষ কথাঃ
আমাদের আলোচনার কেন্দ্রে থাকা উচিত সেই মা-বাবা, যারা সারাজীবনের শ্রম, ভালোবাসা ও সঞ্চয় দিয়ে সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে চান। সন্তানকে সম্পত্তি দেওয়া তাদের অধিকার। কিন্তু সেই সম্পত্তি দেওয়ার কারণে জীবনের শেষ সময়ে যেন তারা নিজের ঘরেই নিরাপত্তাহীন হয়ে না পড়েন- সেটিও একটি গুরুত্বপূর্ণ মানবিক ও সামাজিক প্রশ্ন।
‘সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) বিল, ২০২৬’ প্রচলিত হেবা বাতিল করার আইন হিসেবে নয়, বরং নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে আজীবন ভোগস্বত্ব সংরক্ষণ করে সম্পত্তি হস্তান্তরের একটি অতিরিক্ত আইনি ব্যবস্থা হিসেবে প্রণীত হয়েছে।
সুতরাং হেবা, উত্তরাধিকার ও নতুন এই দেওয়ানি ব্যবস্থাকে একই বিষয় হিসেবে না দেখে পৃথক আইনি কাঠামো হিসেবে দেখা প্রয়োজন। ধর্মীয় প্রশ্নে আলেমদের মতামত যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি আইনের প্রকৃত ভাষা, সামাজিক বাস্তবতা এবং মা-বাবার নিরাপত্তার প্রশ্নও সমানভাবে বিবেচনায় রাখা জরুরি।
সম্পত্তি সন্তানকে দেওয়া যেতে পারে, ভালোবাসাও উজাড় করে দেওয়া যেতে পারে- কিন্তু সেই ভালোবাসার মূল্য যেন কোনো মা-বাবাকে জীবনের শেষ প্রান্তে নিজের ঘর হারিয়ে দিতে না হয়।
সর্বশেষ এডিট : ২১ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:১৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



