somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

জুল ভার্ন
এপিটাফ এক নিঃশব্দ প্রচ্ছদে ঢাকা আছে আমার জীবনের উপন্যাস...খুঁজে নিও আমার অবর্তমানে...কোনো এক বর্তমানের মায়াবী রূপকথায়।আমার অদক্ষ কলমে...যদি পারো ভালোবেসো তাকে...ভালোবেসো সেই অদক্ষ প্রচেষ্টা কে,যে অকারণে লিখেছিল মানবশ্রাবণের ধারা....অঝোর

''আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে”....

২৫ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৫:৫৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

“আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে”- অন্নদামঙ্গল কাব্যে কবি ভারতচন্দ্র রায়ের এই বিখ্যাত পঙক্তিটি যেন যুগ যুগ ধরে প্রতিটি মা-বাবার মনের প্রার্থনা।

কিন্তু কখনো কি আমরা ভেবেছি-
সন্তানকে দুধে-ভাতে রাখার অর্থ আসলে কী?
কয়েক বস্তা চাল ঘরে তুলে দিলেই কি সন্তান ভালো থাকবে? গরু কিনে দুধের ব্যবস্থা করলেই কি তার ভবিষ্যৎ নিরাপদ হবে? নাকি সন্তানের পছন্দের সবকিছু কিনে দিয়ে, তার প্রতিটি আবদার পূরণ করে মনে করবেন-
“আমি আমার সন্তানের জন্য যথেষ্ট করছি”?

সমস্যাটা সেখানেই।
সন্তানকে ভালোবাসা মানে তার সব চাহিদা পূরণ করা নয়। ভালোবাসা মানে কখনও কখনও তার চাহিদাকে বলা-
“না, এটা তোমার জন্য ভালো নয়।”
শৈশবের চকোলেটের আবদার পূরণ করতে করতে একদিন সেই আবদার বাইকে চড়ে বসে। তারপর আরও বড় চাহিদা আসে, আরও বড় প্রত্যাশা আসে।
সন্তান যখন বুঝে- “আমি যা চাই, তা আমার পাওয়ার অধিকার”- তখন জীবনের সঙ্গে তার প্রথম সংঘাত শুরু হয়।
কারণ পৃথিবী তার সব চাওয়া পূরণ করার জন্য বসে নেই।
একদিন প্রতিযোগিতার নির্মম পৃথিবীতে গিয়ে সে আবিষ্কার করে-
সাধ আর সাধ্যের মধ্যে বিশাল ফারাক আছে।
আর সেই ফারাকটা পূরণ করতে না পারলে জন্ম নেয় হতাশা, ক্ষোভ, হীনমন্যতা।
আমরা তখন সন্তানের হতাশার জন্য সমাজ, সরকার, রাষ্ট্রকে দায়ী করি।
কিন্তু কখনো আত্ম-জিজ্ঞাসা করি না-
“আমরা কি তাকে জীবনের জন্য প্রস্তুত করেছিলাম, নাকি শুধু চাওয়াগুলো পূরণ করেছিলাম?”

প্রতিটি সন্তান আসলে একটি স্বপ্ন।
একটি বীজ।
একটি ছোট্ট চারাগাছ।
একতাল নরম কাদামাটি- যার ভেতরে লুকিয়ে থাকতে পারে অসীম সম্ভাবনা। হয়তো তার ভেতরে ঘুমিয়ে আছে কোনো আইনস্টাইন, কোনো হেলেন কেলার, কোনো মার্টিন লুথার কিং, কিংবা কোনো চে গুয়েভারা, কবি নজরুল।
আবার হয়তো সে পৃথিবীর বিখ্যাত কেউ হবে না।

হয়তো সে একজন সৎ, দায়িত্বশীল, বিবেকবান এবং ভালো মানুষ হবে- একটাও কোনো ছোট স্বপ্ন নয়।
একটি শিশু জন্ম নেওয়া মানেই পৃথিবীতে একটি নতুন সম্ভাবনার জন্ম। আর সেই সম্ভাবনাকে বিকশিত করার দায়িত্ব প্রথমত তিনজন মানুষের-
মা, বাবা এবং শিক্ষক।

কিন্তু দুঃখের বিষয়, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই তিনটি শব্দের গভীরতাও যেন আমরা হারিয়ে ফেলছি।
জন্ম দিলেই মা হওয়া যায়,
খরচ চালালেই বাবা হওয়া যায়,
ক্লাস নিলেই শিক্ষক হওয়া যায়।
কিন্তু সন্তানের হৃদয় পড়তে পারা, তাকে মূল্যবোধ শেখানো, ভুলের সময় থামিয়ে দেওয়া, আর সঠিক সময়ে হাত ধরে এগিয়ে দেওয়া- এসবের জন্য শুধু পরিচয় যথেষ্ট নয়।
সন্তানকে মানুষ করতে হয়।
শুধু বড় হতে দিতে হয় না।

আজ আমাদের সন্তানরা শারীরিকভাবে বড় হচ্ছে, কিন্তু মানসিকভাবে বেড়ে উঠছে কি? আমরা তাদের হাতে দামি মোবাইল দিচ্ছি, কিন্তু বই দিচ্ছি তো? আমরা তাদের ভালো পোশাক দিচ্ছি, কিন্তু ভালো মূল্যবোধ দিচ্ছি তো? আমরা তাদের ক্যারিয়ার নিয়ে চিন্তা করছি, কিন্তু চরিত্র নিয়ে কতটা ভাবছি? আমরা তাদের ভবিষ্যতের জন্য টাকা জমাচ্ছি, কিন্তু তাদের বিবেকের জন্য কী জমাচ্ছি?

আর শিক্ষার কথা কী বলব!
শিক্ষকতা যখন শুধু একটি চাকরি হয়ে যায়, তখন শিক্ষা আর জীবন গড়ার ব্রত থাকে না। শিক্ষক তখন হয়তো পাঠ্যবই শেষ করেন, পরীক্ষা নেন, নম্বর দেন- কিন্তু সবসময় একজন শিশুর ভেতরের মানুষটিকে গড়ে তুলতে পারেন না।
তাই সন্তানের মানুষ হওয়ার দায়িত্ব কখনোই পুরোপুরি স্কুলের হাতে তুলে দেওয়া যায় না।
স্কুল শিক্ষা দিতে পারে; কিন্তু সন্তানকে মানুষ করার প্রথম বিদ্যালয় পরিবার।
আর পরিবার মানে শুধু খাবার, পোশাক, স্কুলের ফি আর পরীক্ষার ফলাফল নয়।
পরিবার মানে- শাসন, ভালোবাসা, মূল্যবোধ, দায়িত্ববোধ,
সহমর্মিতা, সততা এবং নিজের ভুল স্বীকার করার সাহস।

হ্যাঁ, সন্তানকে শাসন করতে হবে।
তবে শাসন মানে নির্যাতন নয়।
শাসন মানে ভয় দেখানো নয়।
শাসন মানে শিশুর আত্মমর্যাদা ভেঙে দেওয়া নয়।
শাসন মানে-
ভুল পথে গেলে তাকে থামিয়ে দেওয়া।
একজন চিকিৎসক যেমন অসুস্থকে সুস্থ করতে কখনো কঠিন চিকিৎসার আশ্রয় নেন, তেমনি সন্তান যখন বিপথে যেতে শুরু করে, তখন ভালোবাসার হাত দিয়েই তাকে ফিরিয়ে আনতে হয়।
ঘুড়িকে আকাশে উড়তে দিতে হয়, কিন্তু সুতোটা হাতে রাখতে হয়। কখনো সুতো একটু ঢিলে দিতে হয়, যাতে সে উড়তে পারে। আবার কখনো হঠাৎ টান দিতে হয়, যাতে সে সীমাহীন আকাশে হারিয়ে না যায়- এটাই ভালোবাসা।
শুধু ছেড়ে দেওয়া ভালোবাসা নয়।
কখনো কখনো আটকে রাখাও ভালোবাসা।

বাস-ট্রেনের গায়ে একটা কথা লেখা থাকে-
“Luggage at your own risk.”
সন্তান অবশ্য কোনো “লাগেজ” নয়।
সন্তান আমাদের জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান আমানত।
তাই তার দায়িত্বও আমাদেরই।
তার ভুলের দায় সমাজের নয়।
তার চরিত্র গঠনের দায় শুধু শিক্ষকের নয়।
তার ভবিষ্যৎ নির্মাণের দায়িত্ব সরকারেরও নয়।
প্রথম দায়িত্বটা আমাদের।
আমরা সন্তানকে কী রেখে যাব?
শুধু বাড়ি? জমি? ব্যাংক ব্যালান্স? গাড়ি? একটি ডিগ্রি?
নাকি এমন কিছু মূল্যবোধ রেখে যাব, যার ওপর দাঁড়িয়ে সে একদিন বলতে পারবে-
“আমি শুধু সফল নই, আমি একজন ভালো মানুষ।”

মনে রাখবেন-
আপনার সন্তান আপনার স্বপ্নের বাস্তব রূপ।
আপনি তাকে পৃথিবীতে এনেছেন-
এখন পৃথিবীর হাতে ছেড়ে দিয়ে দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না।
বীজ বপন করলেই গাছ হয় না।
পানি দিতে হয়। আগাছা পরিষ্কার করতে হয়। ঝড় থেকে রক্ষা করতে হয়। প্রয়োজনে চারপাশে বেড়া দিতে হয়।
তারপর একদিন সেই চারাগাছ নিজেই আকাশের দিকে মাথা তুলে দাঁড়ায়।

তখন হয়তো আপনি বুঝবেন-
সন্তানকে দুধে-ভাতে রাখা মানে শুধু তার পেট ভরানো নয়।
তার মনকে আলোয় ভরানো।
তার বিবেককে জাগিয়ে তোলা।
তার মেরুদণ্ড শক্ত করা।
তার ডানায় স্বপ্ন দেওয়া- আর পায়ে মাটির স্পর্শ রেখে দেওয়া।
কারণ, বাস্তবতা তাকে একদিন একা চলতে বলবে।
সেদিন মা-বাবা পাশে থাকবেন না।
তাই আজ থেকেই তাকে এমনভাবে গড়ে তুলুন, যেন আপনার অনুপস্থিতিতেও সে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
আপনার সন্তান শুধু আপনার ভবিষ্যৎ নয়- সে আগামী দিনের সমাজ।
আজ আপনি তাকে যেভাবে গড়ে তুলছেন,
আগামীকাল সেই সন্তানই ঠিক করবে-
এই পৃথিবীটা কেমন হবে।
তাই সন্তানের শুধু ক্যারিয়ার বানাবেন না।
মানুষ বানান।
কারণ ক্যারিয়ার হয়তো তাকে জীবিকা দেবে-
কিন্তু মানুষ হওয়া তাকে একটি জীবন দেবে।
সর্বশেষ এডিট : ২৫ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৫:৫৯
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

সাবধানের মার্ নেই

লিখেছেন ঢাকার লোক, ২৪ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ৮:৩১


নিউ ইয়র্ক থেকে ফিরার পথে নিউ আর্ক্ লিবার্টি ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে যখন এরোপ্লেনে উঠে নির্দিষ্ট সীটের কাছে পৌঁছলাম দেখলাম এক প্রৌঢ় ভদ্রলোক জানালার পাশের সিটটাতে অলরেডি বসে আছেন। আইল ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

হারানো বিজ্ঞপ্তি

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ২৪ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১০:৩১



অত্যন্ত দুঃখ ও ভারাক্রান্ত হৃদয়ে জানানো যাচ্ছে যে, গত প্রায় দুই বছর যাবৎ বিবেক, বুদ্ধি, জ্ঞান, বিচার ও বিবেচনা - এই পাঁচজনকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। একসময় তাঁরা... ...বাকিটুকু পড়ুন

মার্কিন মাটিতে ‘আত্মঘাতী ভুল’- নাকি বদলে যাচ্ছে হিসাব?

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ২৪ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১১:২৫


মার্কিন মাটিতে ‘আত্মঘাতী ভুল’- নাকি বদলে যাচ্ছে হিসাব?

শেখ হাসিনা কি ফিরবেন?
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কখনো কখনো একটি বৈঠকের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে- কোন বৈঠকটি হলো, কোনটি হলো না এবং কোন... ...বাকিটুকু পড়ুন

সংখ্যা গরিষ্ঠ মুসলিম হিসেবে গর্ব করার কিছু নেই......

লিখেছেন মুহাম্মদ মামুনূর রশীদ, ২৫ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৮:২৮

আমরা যারা আপাত দৃষ্টিতে হায়েনা নই কিন্তু নিরবে স্বচক্ষে হিন্দুদের সর্বনাশ দেখে যাচ্ছি তারা সবচেয়ে বেশি দায়ী। অথচ বাংলার হিন্দু, বাংলার খ্রীষ্টান, বাংলার বৌদ্ধ, বাংলার মুসলমান, আমরা সবাই বাঙ্গালী-এই বৈষম্যহীনতা... ...বাকিটুকু পড়ুন

অল্প একটু পাশে থেকো

লিখেছেন রানার ব্লগ, ২৫ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১০:১০



আমাকে খুব বেশি কিছু দিতে হবে না,
এক মুঠো আকাশও নয়,
আচেনা কোনো বিকেলও নয়।

শুধু কখনো কখনো
আমার নির্জন ঘরের দরজায়
টোকা দিয়ে দাঁড়িয়ো, যেন বুঝতে পারি
ফুরিয়ে যাবার বেলা এখনো আসেনি ।

আমাকে প্রতিদিন মনে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×