(ব্যক্তিগত গল্প শিরোনামে যা কিছু লিখব তার সবটুকু হয়তো সত্যি ঘটনা হবে না, তবে মূল ভাব/কথা সত্যি থাকবে, এ নিশ্চয়তাটাটুকু থাকল। গল্প লেখকেরা সবসময় সত্যি কথা লিখতে পারে না। )
বোধ হবার পর আমার পরিচিতদের মধ্যে প্রথম প্রবাসী আমার কাজিন ফারুক ভাই। তিনি তখন সৌদি আরবে থাকতেন। আমাদের সাথে তার যোগাযোগ হত চিঠিতে। মাস-দুমাস পর তার চিঠি পেলে জানতাম, তিনি আছেন, বেঁচে আছেন, ভালই আছেন। আম্মার কাছে লেখা তার সেসব চিঠিতে থাকতো তারা পরিবার নিয়ে, তার মা-বাবা নিয়ে তার দুশ্চিন্তার কথা। তিনি মনে করতেন তার মা হয়তো তাকে বাসার সব খবর, বিশেষ করে খারাপ কোন খবর থাকলে সেটা জানাবেন না। তাই তিনি আম্মাকে অনুরোধ করতেন তার পরিবারের সব কথা যেন আম্মা তাকে জানান। চিঠিতে আরো থাকতো- তার দেশে ফেরার আকুতি, আম্মার হাতে ভাত খাবার ইচ্ছে, নিজের ভাইবোনদের সাথে বসে মজা করে আড্ডা দেয়ার তীব্র আকাংখা। ফারুক ভাইয়ের সেইসব চিঠি আম্মা আমাদের পড়তে দিতেন। চিঠিগুলো পড়ে আমি আর আমার ছোটবোন মনির মধ্যে প্রবাস জীবনের প্রতি তীব্র একটা ভয় এবং ঘৃণার সৃষ্টি হয়। আমরা দুজনই মনে মনে সিদ্ধান্ত নেই মরে গেলেও কখনো বিদেশ যাবো না। কখনো না। আব্বা-আম্মার সংস্পর্শ থেকে, পরিবারের একান্ত সব মানুষদের থেকে কখনো দূরে যাব না।
ভাগ্য সবসময় মানুষকে নিয়ে, মানুষের ইচ্ছে নিয়ে নির্মম খেলা করে। একসময় ভাগ্যের সাথে সেই খেলায় আমি জিতে গেলাম, আমার বোন হেরে গেল। বোনের বিয়ে হল এক অস্ট্রেলিয়া প্রবাসীর সাথে। সে আমাদের সবাইকে ছেড়ে চলে গেল অস্ট্রেলিয়া। অন্যদিকে পৃথিবীর অন্যতম এক ভাগ্যবান হয়ে আমি থেকে যেতে পারলাম আব্বা, আম্মা আর ছোটবোন সুহার সাথে। চাকরিও হয়ে গেল জন্মস্থানেই। কিন্তু একসময় লক্ষ্য করলাম, আসলে ফারুক ভাইয়ের ওই সময়ের সাথে এই সময়ের কোনই মিল নাই। ফারুক ভাইদের হাতে তখন প্রযুক্তিগত কোন সুবিধা ছিল না। আমাদের রয়েছে কম্পিউটার, মোবাইল, ইন্টারনেট, ওয়েব ক্যাম, সেই সাথে আছে স্কাইপ। আমরা সকালে ঘুম থেকে জাগলেই দেখি সেই অস্ট্রেলিয়া থেকে আমার বোন স্কাইপ খুলে বসে আছে আমাদের অপেক্ষায়। আব্বা-আম্মা ঘুম থেকে উঠেই বসে যান তার সাথে গল্প করতে। আর আমি তড়িঘড়ি করে তৈরি হয়ে অফিস রওনা দেই। ফিরি রাত হয়ে গেলে যখন আর বসে সবার সাথে আড্ডা দেবার মতো শক্তি থাকে না। দেখি তখনও বোন বাসার সবার সাথে আড্ডা দিচ্ছে।
তখন বুঝতে পারি ভাগ্যের সাথে খেলায় জিতে গিয়েও আমি হেরে গেছি। বোন হেরে গিয়েও জিতেছে। জয়তু স্কাইপ!

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

