somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

খোরশেদ খোকন
আমার জন্ম টাঙ্গাইলের হামজানি গ্রামে। শৈশব, কৈশোরে দেশের বিভিন্ন জেলা শহরে ছিলাম; বাবার সরকারী চাকুরীর জন্যে। কলেজ ছিল টাঙ্গাইল জেলায়। তারপর পড়াশুনা ঢাবি'র ফিন্যান্স বিভাগ। গত নয় বছর যাবত প্রাইভেট ব্যাংকে কর্মজীবন চলছে। www.facebook.com/khokonz

আত্মকথা-৮: আমার বন্ধু মাসুদ এবং তার সম্পর্কিত স্মৃতি...

০৭ ই ডিসেম্বর, ২০১৪ রাত ১১:১১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

১৯৯৭ সালের গ্রীষ্মকালের কথা, আমি আর মিঠু (Mohammad Anisur Rahman) লায়ন কলেজ, টাঙ্গাইল থেকে সবেমাত্র এইচ.এস.সি. পরীক্ষা শেষ করেছি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি ও পড়াশুনা নিয়ে একত্রে পরিকল্পনা করছি। সেই সময় গ্রামে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন নিয়ে মাতামাতি চলছিল। এমন সময় মিঠু একদিন আমাকে পরিচয় করিয়ে দিল মাসুদের সাথে। মাসুদ ঢাকা কমার্স কলেজ থেকে এইচ.এস.সি. পরীক্ষা দিয়েছিল। সেইদিন থেকে মাসুদের সাথে আমার পরিচয়। আমার গ্রামের বাড়ি থেকে ওর গ্রামের বাড়ি ছিল প্রায় ১০ কিলোমিটার দুরে ভুয়াপুর থানার নারিন্দায়।

তারপর, মিঠু রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হল। এদিকে, আমি আর মাসুদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলাম। ১৯৯৮ সালের জুলাই মাসে দুইজন ফিন্যান্স বিভাগে ক্লাস শুরু করলাম। মাসুদ ছিল বঙ্গবন্ধু হলে আর আমি সূর্যসেন হলে। আমরা একসাথে ঘুরে বেড়াতাম, আড্ডা দিতাম। এক সময় মাসুদের প্রিয় বন্ধু ছিল নবী, মুক্তা, পিনটু, সানি, রানা, ফাহিম, রনি, মুন্সি আর মিলন।

আমি আর মাসুদ একসাথে দিনের পর দিন বঙ্গবন্ধু হলের পাঠাগার, ফ্যাকাল্টির সেমিনার আর কেন্দ্রীয় পাঠাগারে পড়াশুনা করতাম কিংবা আড্ডা দিতাম। ওর প্রায়ই আর্থিক সমস্যা হতো, পড়াশুনায় ও তেমন সচেতন ছিলনা। একদিকে টাকার সমস্যা অন্যদিকে পড়াশুনায় খারাপ ফলাফল নিয়ে মাসুদ ভীষণ বিরক্ত ছিল। আমার রুমমেট নাজমুল (Md. Nazmul Alam) মাসুদকে বলতো, “Frustrated Smoker”। মাসুদ খুব সিগারেট খেত বলে ওকে বন্ধুরা/সহপাঠীরা কেউ কেউ অপছন্দ করতো।

একদিন, মাসুদ শাহজাহান মিনা স্যারের রুমে এসাইনমেনট জমা দিতে গিয়েছিল, তখন স্যার তাকে বলেছিল, “এই তুই কি গাজা খাস”। সেদিন, মাসুদ খুব কষ্ট পেয়েছিল আর আমি খুব অবাক হয়েছিলাম স্যারের এই আচরণে। তারপর থেকে আমি শাহজাহান মিনা স্যারকে আর সম্মান করতে পারিনা।

মাসুদকে আমার সব সময়ই ভাল লাগতো, কেননা ও ছিল প্রথাবিরোধী মানুষ। মাসুদ সব সময় নিজের মতো করে চলতো। মাসুদ আমাকে খুব ভরসা করত কেননা আমি ওর আর্থিক সমস্যায়, পড়াশুনায় নিয়মিত পাশে থাকতাম।

যাই হোক, ২০০৩ সালের শীতে কালের কথা, আমি আর মাসুদ বি.বি.এ. পরীক্ষা শেষ করলাম। একদিন মাসুদ ফোন করে বলল, বন্ধু চল সি.পি.ডি. (Center for Policy Dialogue) যাই। আমি বললাম কেন? ও বলল, চল একটা ইন্টারভিউ আছে। তারপর সি.পি.ডি. আমাদের দুজনকে বিশ্বব্যাংক (World Bank) এর একটা প্রজেক্ট এ তিনমাসের জন্য কাজ দিল। আমি আর মাসুদ একত্রে জীবনের প্রথম চাকুরী নিয়ে ট্রেনে করে সিলেট রওনা হলাম। আমাদের কাজ ছিল তিন মাসের মধ্যে চারটা এন.জি.ও.(Non-Government Organization) এর ক্ষুদ্র-ঋণ কার্যক্রম পরিদর্শন করে তাদের আর্থিক সাহায্যের বিষয় নিয়ে প্রতিবেদন তৈরি করা।

মাসুদের সাথে সিলেট ভ্রমণ ছিল আমার জীবনে প্রথম সিলেট ভ্রমণ। এখনও প্রতিবছর যখন সিলেট যাই তখন মাসুদকে মনে পড়ে। দেখতে দেখতে একদিন তিনমাস শেষ হল। ২০০৩ সালের কথা, আমি এম.বি.এ. (Master of Business Administration) শুরু করলাম আর মাসুদ পড়াশুনা করতে সুইডেন চলে গেল।

মাসুদের বাবা-মা আমাকে চিনতো। কেননা, আমি টাঙ্গাইল গেলে ওদের গ্রামের বাড়ি যেতাম। আমাদের যোগাযোগ হতো ইমেইল আর ম্যাসেঞ্জারে। দেশে আসলে দেখা হতো। একদিন মাসুদের বোনের ভাল বিয়ে হলো। এক সময় মাসুদের গ্রামে ওদের সুন্দর বাড়ি হলো। তারপর ২০০৯ সালে মাসুদ বিয়ে করল টাঙ্গাইলে। তারপর ০২ ডিসেম্বর ২০০৯ সালের ঈদের ছুটিতে মাসুদ গ্রামের বাড়ি নারিন্দা থেকে স্কুটারে টাঙ্গাইল যাবার পথে এক্সিডেন্টে মারা গেল (ইন্না নিল্লাহি...রাজিয়ুন)। নবী, পিনটু, ফাহিম, রনি ওরা টাঙ্গাইল গিয়েছিল।

আমি ন্যাশনাল ব্যাংকের (বৈদেশিক বাণিজ্য বিভাগে) চাকুরী করার কারনে মাসুদের কবরে মাটি দেবার জন্য টাঙ্গাইল যেতে পারলাম না। এই দুঃখ আমার থাকবে, চিরদিন...।

মাসুদের মামা নজরুল (Mohammad Nazrul Islam) একদিন জানালো, মাসুদের মৃত্যুর পর ওর একটা ছেলের জন্ম হয়েছে। শুনে খুব ভাল লাগলো, কিন্তু মাসুদের সন্তান (ছেলে) তার বাবা মাসুদকে দেখতে পাবেনা ভেবে মনটা খুব খারাপ হলো।

মাসুদ আমার বিশ্ববিদ্যালয় আর চাকুরী জীবনের শুরু থেকে পাশে ছিল। আমরা দুর্দিনে-সুদিনে পাশাপাশি ছিলাম।

এখনও আমার বন্ধুরা যখন আমার সাথে তাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলে, আমার ভীষণ একা লাগে। যখন একা থাকি, মনে মনে ভাবি মাসুদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কি হবে (!?)

আমি, আমার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে ভাবি না, কেননা আমি জানি, এই পৃথিবীতে সবাই একা, ভীষণ একা।

মাসুদ, প্রিয় বন্ধু আমার, আমি জানি, ভেবে ভেবে কোন পথ পাবো না...।
আমি জানি, কোনদিন আর তোকে পাবনা। তবু বন্ধু আমার, যেখানেই থাকিস… তুই ভাল থাকিস…। এই কামনা…।
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মক্কা থেকে বদর: মুসলিম ভ্রাতৃত্বের ভূরাজনীতি

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২২ শে অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১২:৪৫


মুসলিম বিশ্বে ঐক্যের নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে। অন্তত চুক্তিগুলোর নাম শুনলে তেমনটাই মনে হয়। মক্কা ও বদর। মুসলিম ইতিহাসের দুটি পরিচিত নাম। নাম শুনে মনে হতে পারে, বহুদিনের বিভেদ... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধর্মোন্মাদদের কল্পিত বাস্তবতা: "দি ম্যাট্রিক্স" এবং নীল বড়ি

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ২২ শে অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ১:১৭


বাংলাদেশ ধর্মোন্মাদ ও জঙ্গিদের কবলে পড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধম্যের কল্যানে এই ধর্মোন্মাদনা দাবানলের মতো সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ছে।

ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে, কদিন আগে সাতক্ষীরায় একদল ধর্মোন্মাদ ও জঙ্গি ওয়াহিদুজ্জামান শামীম... ...বাকিটুকু পড়ুন

যারা ব্রয়লার মুরগী খায় তারা সমকামী

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২২ শে অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৪:৫৩


ওয়াজ শোনেন অথচ মুফতি কাজী ইব্রাহিম হুজুরকে চেনেন না, এমন মানুষ বাংলাদেশে খুব কমই আছেন। হুজুরের আরেকটি বড় পরিচয় হলো, তিনি করোনার ওষুধ স্বপ্নে পেয়েছেন বলে দাবি করেছিলেন। হুজুর... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেইপ শিফটার ৩ - মাছ কন্যা

লিখেছেন হুমায়রা হারুন, ২২ শে অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৫:১৯


২০১১ এর দিকে নর্থ –ইয়র্কে থাকাকালীন রুমার বাসার আশেপাশে তেমন কোন বাঙালি দোকান ছিল না ।সেই টরোন্টর নামকরা চাইনিজ সুপারমার্কেট –টা বেশ দূরে। পায়ে হেঁটে যাওয়ার পথ নয়।... ...বাকিটুকু পড়ুন

যে পথ ধরে রথো রাফি হেঁটে যেতেন: চলে গেলেন ব্লগার রাফি

লিখেছেন শরৎ চৌধুরী, ২২ শে অক্টোবর, ২০২৬ রাত ৯:০৩

কবি, ব্লগার ও অনুবাদক রথো রাফির স্মরণ
রথো রাফি ব্লগ
রথো রাফি আর নেই—সত্যটি মেনে নেওয়া ভীষণ কঠিন। একজন মানুষের চিরপ্রস্থানের পর আমরা কেবল তার শারীরিক অনুপস্থিতিই টের পাই না, বরং গভীরভাবে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×