
সেই ধূসর শৈশবের কথা। আমাদের বাড়ীর পাশেই থাকতেন মাজমের মা-নামক নব্বইউর্ধ্ব বিধবা বৃদ্ধা।তার ছিল সাত ছেলে।ছেলেরা সবাই মোটামুটি সচ্ছল ও বিবাহিত এবং স্ত্রী-পরিজন নিয়ে একপ্রকার সুখেই ছিল।কিন্তু ছেলেদের কেউই তার অতিশয় বৃদ্ধা-অসহায় মায়ের ভরণ-পোষণ করতো না।বুড়ি কুঁড়িয়ে-কাটিয়ে,চেয়ে-চিন্তে আর বাড়ীর গাছের বড়ই পেয়ারা সুপারি বেঁচে কোনরকম দিনাতিপাত করতেন।আমরা গাঁয়ের ছেলেপেলেরা ফল-ফলান্তি কেনার জন্য নিয়মিতই বুড়ির বাড়ীতে যেতাম-স্বচক্ষে বৃদ্ধার করুণ অবস্থা দেখে-তার ছেলেদের প্রতি অহরহ ক্ষোভ-ঘৃণা প্রকাশ করতাম। হঠাৎ একদিন মাজমের মায়ের মৃত্যু সংবাদ জেনে,বন্ধু বান্ধব সমবয়সীদের সাথে ছুটে গেলাম বুড়ির বাড়িতে। বাড়িতে পৌঁছে সেইসাথে বাড়ির পরিবেশ দেখেতো আমাদের সবার চোখ একেবারে-চরখ গাছের চূড়ায়।বুড়ির নাতী-নাতনী,ছেলের বউয়েরা মাটিতে গড়াগড়ি দিয়ে ভয়াবহ আহাজারি-মাতমের রীতিমতো প্রতিযোগিতা শুরু করেছে।পাড়া-প্রতিবেশীরা এই অভিনব প্রতিযোগিতা মোটামুটি উপভোগই করছে।আমরা যারা একটু ডানপিটে প্রকৃতির ছিলাম তারা সহসাই লক্ষ্য করলাম এই শোকের মাতম প্রতিযোগিতায় বাড়ির ছোট বউয়ের অনুপস্থিতি।তাই এদিক সেদিক ইতি-উতি দিয়ে তাকে খুঁজছিলাম।হঠাৎ লক্ষ্য করলাম,ছোটবউ ছাগলের রশি হাতে হন্ত-দন্ত হয়ে তার ঘরে প্রবেশ করলো।আমরা ছেলেপেলেরা এই দেখে তার ঘরের দিকে এগিয়ে গিয়ে তাকে বললাম,কি ব্যাপার ভাবী-বাড়ির সবাই কান্না-কাটি করছে-তুমি কাঁদছনা।পাড়ার লোকজনতো তোমাকে মন্দ ভাববে!!!আমাদের বলা শেষ হতে না হতেই-ভাবী সুর করে বিলাপের লয়ে আউরাতে শুরু করলেন," কান্দিমুগো কান্দিমু,ক্ষেতে থেইক্কা ছাগলডা আইন্যা কান্দিমু " ...!!!
এই হলো আমাদের দেশের রাজনীতির বাস্তব চিত্র।যে মানুষটা জাতিকে দেশ উপহার দিল,অথচ ইতিহাসের নিকৃষ্টতম বর্বতার শিকারের দিনে-একজন বঙ্গবন্ধু প্রেমিককে সেদিন জানের মায়া ত্যাগ করে রাষ্ট্রের স্থপতির জানাজা নামাজে উপস্থিত হওয়ার সদসাহস দেখাতে পাওয়া যায়নি।তাই আজ পিতা হত্যার ৪০ বছর পর সেইসব কাপুরুষ ভণ্ড বঙ্গবন্ধু প্রেমিকদের আগস্ট শোকের প্লাবন দেখে-বারবার শুধু চোখের সামনে ভেসে উঠে,ছেলেবেলার হতভাগিনী মাজমের মায়ের মৃত্যুশোকাতুর ছোটবউয়ের নির্মম আহাজারি-বীভৎস বিলাপের সুর - " কান্দিমুগো কান্দিমু,ক্ষেতে থেইক্কা ছাগলডা আইন্যা কান্দিমু " ...!!!
সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৫ সন্ধ্যা ৭:৫৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




