আহসান হাবীব ইমরোজ
শুভ্র সবুজ দাওয়াত
মধুমাসের মাঝামাঝি সোনালি এক সকাল। সকালের সূর্যের মতোই যথারীতি মিষ্টি হাসি নিয়ে হাজির হলো কন্টিনেন্টাল কুরিয়ারের করটিয়া ব্রাঞ্চের মালিক সুইট। হাতে একটি হালকা সবুজ শুভ্র মিশেল খাম, খুলতেই বের হলো গাঢ় সবুজ আর সোনালি রঙের সুন্দর একটি কার্ড। শিরোনাম পড়তেই... মুহূর্তের জন্য আনন্দে হার্ট বিট যেন বন্ধ হয়ে গেল। সবটুকু রক্ত যেন খুশির হরমোন নিয়ে বিদু্যৎ গতিতে পায়ের নখ থেকে চুলের গোড়া পর্যনত্দ ছলকে পড়লো। কারণ তাতে লেখা কিশোরকণ্ঠ লেখক সম্মেলন ও সাহিত্য পুরস্কার 2006। কিশোরকণ্ঠ আমার এক জন্মদাতা। আব্বা-আম্মা জন্ম দিয়েছেন, শিৰকরা মানুষ করার চেষ্টা করেছেন। আর লিখতে কলমভাঙা আর তা পড়তে দাঁতভাঙা লেখক হলেও এর প্রধান অবদান কিশোরকণ্ঠের। সুতরাং সুনামির মতো আনন্দের জোয়ার তো বইবেই। দিন যতই ঘনিয়ে এলো রক্তচাপ ততই তুঙ্গে উঠতে থাকলো। ওদিকে কিশোরকণ্ঠের ধারাবাহিক উপন্যাস লাইটহাউস সিরিজও সেদিনই জমা দেয়ার শেষ তারিখ। অথচ বিন্দুবিসর্গও লিখতে পারিনি। কিন্তু ঘাড়ের ওপর গিলোটিনের মতো হুঁশিয়ারি আছে লেখা নিয়েই যেতে হবে। তাই ভাবছি অবশেষে লেখার জন্য থেকেই যাব কি না? প্রমাণ করবো সেই মহাসত্য বড় প্রেম শুধু কাছেই টানে না দূরেও ঠেলে দেয়। এই নয়-ছয়, সাত-সতের ভাবতে ভাবতে শেষমেশ দিনটি প্রায় এসেই গেল। হঠাৎ চমকে দিয়ে আগের দিন সকালে সম্মেলনের আহবায়ক মোবাইল করে বসলেন কোন উনিশ-বিশ করা চলবে না, সরাসরি চলে আসতে হবে, সোজা বায়ান্ন বাজার তিপান্ন গলির ঢাকা শহরের ডিপেস্নামা ইঞ্জিনিয়ার্স মিলনায়তন। সুতরাং তার নির্দেশ শিরোধার্য করে এক লক্কর ঝক্কর পঙ্ীরাজে রওনা হলাম। সাথে সঙ্গী দুই তুখোর ছাত্রনেতা জিয়াউর রহমান রতন ও রম্নহুল আমীন। আর আছে কিশোরকণ্ঠের দুই কঠিন ভক্ত আমার প্রায় পাঁচ বছরের ছেলে ওসামা এবং তার আম্মু ফারজানা।
ফুলেল সম্ভাষণ
8 জুন, 25 জ্যৈষ্ঠ রোজ বৃহস্পতিবার 11টার ঝকঝকে দিন। ডিপেস্নামা ইঞ্জিনিয়ার্স মিলনায়তন যেন তখন বিয়ে বাড়ির সাজে সজ্জিত। লাল, সবুজ, হলুদ বাহারি রঙের পতাকার সাজে সে এক কথায় অপরূপা। এই অপরূপার রূপে যখন চু ছানাবড়া, ঠিক তখনই আরেক পর্ব। বুকটা দুরম্নদুরম্ন একটু দেরিতেই যেন পেঁৗছলাম, কম্পিত ভাবনা, না জানি কি হারিয়ে ফেললাম। তবু মনটা উডুউড়ু শিরায় আনন্দের বন্যা হাসি মুখেই গাড়ি থেকে নামলাম। কিন্তু একি! গাড়ি থেকে নামতেই দেখি কিশোরকণ্ঠে নকিবরা সব সারি সারি দাঁড়িয়ে আছে। হৃদয়ে সূর্যের উষ্ণতা, মুখে চাঁদের হাসি আর হাতে যেন পাপড়ির পরশ। ভালোবাসার এ পাহাড় টপকে যখন মিলনায়তনে ঢুকলাম দেখলাম এক এলাহি কাণ্ড! বিশাল মিলনায়তন টইটম্বুর যেন তিল ঠাঁই আর নাহিরে অথচ কি আশ্চর্য! পিনপতন নিসত্দব্ধতা। চু ছানাবড়া থেকে ধাক্কা সামলে ধাতসত্দ হয়ে কিছু বুঝে উঠার আগেই অভ্যর্থনার অভিযাত্রীরা আমাকে সামনের সারিতে বসিয়ে দিল। ওদিকে ওসামা আর তার আম্মু মহিলাদের সারিতে গিয়ে বসেছে। আর আমার ঠিক পেছনের সারিতেই আছে দুই নেতা রতন ও রম্নহুল।
আলোকিত আঙিনা
কিশোরকণ্ঠ সম্পাদক মতিউর রহমান আকন্দ ভাইয়ের সুলিখিত প্রতিবেদনের ঢঙে আলোচনা চলছিল। মিলনায়তনের দৰিণ প্রানত্দে মেঝে থেকে প্রায় ফুট উঁচু টাইলসে মোড়া স্থায়ী স্টেজ। সেখানে সুদৃশ্য ডিজিটাল ব্যানারের সামনে ভুবন আলোকিত করে বসে আছেন অতিথিবৃন্দ। সভাপতি হিসেবে বাংলাদেশের প্রধান কবি আল মাহমুদ, বিশেষ অতিথি অধ্যাপক ড. এম আসাদুজ্জামান, চেয়ারম্যান বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন। সম্মানিত অতিথি হিসেবে আছেন বাংলাদেশের প্রাজ্ঞ চিনত্দাবিদ ড. কাজী দীন মুহম্মদ, বিশিষ্ট লোকবিজ্ঞানী ড. আশরাফ সিদ্দিকী, অধ্যাপক ড. আবুল কালাম মনজুর মোরশেদ, মহাপরিচালক, বাংলা একাডেমী, আহমদ নজীর, মহাপরিচালক, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী, জুবাইদা গুলশান আরা, চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ শিশু একাডেমী, বহুমুখী ব্যক্তিত্ব মীর কাসেম আলী, চেয়ারম্যান, ম্যানেজমেন্ট কমিটি, দৈনিক নয়া দিগনত্দ, জনাব সাইফুল আলম খান মিলন, আবু জাফর মো: ওয়াবয়েদুলস্নাহ, নূরম্নল ইসলাম বুলবুলসহ আরো অনেকে। পেছনে এবং ঘোষণা মঞ্চে চুপটি করে বসে থেকে সস্নিপ এবং মোবাইলে সকল কারিশমা পরিচালনা করছেন সম্মেলন আহ্বায়ক মু. শফিকুল ইসলাম মাসুদ, ব্যবস্থাপনা সম্পাদক মুহাম্মদ জাহিদুর রহমান, নির্বাহী সম্পাদক মুহাম্মদ জিলস্নুর রহমানসহ প্রত্যয়দীপ্ত নেতৃবৃন্দ।
সুললিত ঘোষণা শেষে একে একে বৃক্ততা মঞ্চে আসছেন আলোয় দীপ্ত ব্যক্তিবর্গ। এ পর্বে আবু জাফর মো: ওবায়েদুলস্নাহ কিশোরকণ্ঠের বেড়ে উঠা, অনন্য লেখক সম্মেলনের ব্যবস্থাপনা এবং ভবিষ্যৎ করণীয় বিষয়ে আলোকপাত করলেন। জনাব সাইফুল আলম খান মিলন আবেগঘন কণ্ঠে বললেন, কিশোরকণ্ঠের আকর্ষণের কথা, তার বাসায় কিশোকরণ্ঠ নিয়ে কাড়াকাড়ির কথা। জনাব মীর কাসেম আলী বাষ্পরম্নদ্ধকণ্ঠে বললেন, বাংলাদেশের বিরম্নদ্ধে ষড়যন্ত্র ও তার জেগে উঠার কথা। বাংলাদেশ শিশু একাডেমীর চেয়ারম্যান জবাইদা গুলশান আরা শিশুদের নিয়েই যার ভুবন, তিনি কিশোরকণ্ঠের বিষয়ে তার আকাশসম প্রত্যাশার কথা তুলে ধরেন। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীর মহাপরিচালক আহমদ নজীর এমন একটি আয়োজনের জন্য কিশোরকণ্ঠকে ধন্যবাদ জানান। বাংলা একাডেমীর মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. আবুল কালাম মনজুর মোরশেদ, তার সময় কিশোর পত্রিকার কথা তুলে ধরে কিশোরকণ্ঠের অবিস্মরণীয় ভূমিকার প্রশংসা করেন এবং বিজ্ঞানভিত্তিক ফিচারসমূহ বেশি বেশি তুলে ধরার অনুরোধ করেন। বাংলাদেশের অহঙ্কার বিশিষ্ট লোকবিজ্ঞানী ড. আশরাফ সিদ্দিকী তার স্বভাবসুলভ বক্তৃতায় সেই শুরম্ন হতেই কিশোরকণ্ঠের সাথে তার সখ্যতার কথা এবং নারীদের অগ্রসরতার কথা বলেন। বাংলাদেশের প্রাজ্ঞ চিনত্দাবিদ ড. কাজী দীন মুহম্মদ কর্তৃপৰকে তার মুগ্ধতার বিবরণ দিতে গিয়ে আবেগ ভরে আবেদন করেন শিশুকণ্ঠ, যুবককণ্ঠ, বৃদ্ধকণ্ঠ বের করতে।
বিশেষ অতিথি বিশ্ববিদ্যালয় মুঞ্জরি কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এম আসাদুজ্জামান, মীর কাসেম আলীর কথার রেশ ধরে বাংলাদেশের উন্নয়ন ভাবনা এ ৰেত্রে কিশোরকণ্ঠের করণীয় বিষয়ে আলোকপাত করেন। অবশেষে ডাক পড়লো কবি আল মাহমুদের। জীবনের পশ্চিম দিগনত্দে এসে তিনি জাতির উন্নয়নের জন্য মৌলিক কথা বললেন। অবশেষে এলো সেই মধুর আর আকর্ষণীয় ৰণটি, সাহিত্য পুরস্কার ঘোষণা। প্রথম ঘোষণা হলো প্রফেসর চেমন আরার নাম। তিনি তার স্বজনদের হাত ধরে মঞ্চে উঠে ধরতেই প্রায় ডজন খানেক ফাশলাইট জ্বলে উঠলো, দশের অধিক টিভিক্যামেরা নিখুঁতভাবে তাক করলো তাকে। তার জীবনবৃত্তানত্দ আলোড়িত করলো সমগ্র মিলনায়তনকে। অতঃপর একে একে ঘোষিত হলো সবুজ স্বদেশের কবি আবদুল হাই শিকদার এবং লেখক চিনত্দাবিদ মাহবুবুল হকের নাম। তারা সবাই বিপুলভাবে সংবর্ধিত হলেন। এই অবসরে তারা তাদের অনুভূতি ব্যক্ত করলেন। প্রফেসর চেমন আরা আবেগাপস্নুত হয়ে ধন্যবাদ জানালেন। কবি আবদুল হাই শিকদার কথার জাদুকরের মতো বললেন, কিশোরকন্ঠে তার লেখার মধ্য দিয়ে কিশোর লেখক হিসেবে তার বিকাশের কথা। হেসে বললেন আর অনুভূতি এ যেন মায়ের কাছে সনত্দানের সংবর্ধনা। এই অবস্থায় সনত্দান এ ছাড়া আর কি বলবে... মাগো....। মাহবুব সাহেব অনেক স্মৃতিচারণ করলেন। এভাবে শেষ হলো আলোচনার এ পর্ব।
হ্যামিলনের বংশীবাদক
আল মাহমুদ আর প্রফেসর চেমন আরা এবং তার পরিবারসহ চা চানাচুর ফল পর্ব চললো। এই সাথে জোহরের নামাজ এবং দুপুরের খাবারের বিরতি। নামাজ শেষেই সবার জন্য বিরিয়ানির প্যাকেট বিতরণী। চমৎকার শৃঙ্খলার ভেতর সব কিছু চলছিল। অতঃপর বিকেল তিনটায় শুরম্ন হলো কবিতা পাঠের আসর। একটা মোবাইল চাই, দাদা বাবুদের ধন্যবাদ ইত্যাদি কত শিরোনামে কবিতা, মাঝে মাঝে টকঝালের মতো বক্তৃতা। আর আহবায়কের পীড়াপীড়িতে এরকম একটি ঝাঁঝালো বক্তৃতা দেয়ার ডাক পড়লো আমার। হয়তো কবিতার খাতা শূন্য বলে এই বিশেষ ব্যবস্থা। আরো দু'একজন এ বিশেষ ব্যবস্থার শিকার হলেন। আমার বিৰিপ্ত বক্তৃতা শেল বর্ষণ শুনে 5 বছরের ওসামা দৌড়ে চলে এলো সামনে। আমার কাণ্ড শেষ হলে আমার কোলে সে পুষি বেড়ালের মতো জায়গা করে নিল (এমনিতে সে সহজে আমার কোলে আসে না)। আর বলে কি ওমা! বাবা আমি বক্তৃতা দেব! আমার মাথায় সমগ্র ভবনটি ভেঙে পড়ার জোগাড়। ভুলানোর জন্য বাইর দিয়ে ঘুরে এলাম। কিন্তু না, সে ভুলার পাত্র নয়। একেক জনের কবিতা আবৃতি শেষ হতেই সে চেঁচিয়ে উঠে বাবা এবার আমি বলবো। কিন্তু এই সেই বলে তাকে ভুলিয়ে রাখতে চাই কিন্তু সে নাছোরবান্দা। অবশেষে আবেগতাড়িত হয়ে সে তার অবুঝ বাবার গালে ঠাস করে এক বিরাশি সিক্কার চাপড় বসিয়ে দিল। পাশেই বসে ছিলেন জনাব আহবায়ক তিনি পরিস্থিতি আন্দাজ করতে পারলেন। সতরাং সস্নিপ দিয়ে ব্যবস্থা করলেন। ওমা! ঘোষণার আগেই সে দেখি বীরদর্পে স্টেজে চলে গেছে। মাইকম্যান ব্যসত্দ হয়ে গেল তার মাপে মাইক সেট করতে। অতঃপর পারলো। মুহূর্তের ওসামা ঝাঁঝালো কণ্ঠে বক্তৃতা নয় গান শুরম্ন করলো... আলস্নাহ তুমি অপরূপ... শেষ করতে না করতেই মুহুমর্ুহু হাততালি। আমি অবাক হয়ে গেলাম কিশোরকণ্ঠ কী হ্যামিলনের বংশীবাদকের মতো সবাইকে জাদুগ্রসত্দ করে দেবে।
এরপর শিশুদের নাটিকা মাস্টার মশাইয়ের পাঠাশালা। গ্রামের পাঠশালার সাথে অদ্ভুত মিল রেখে এ পাঠশালা হয়েছে। ছন্দে ছন্দে তারা নামতা পড়ছে আর যথারীতি দুষ্টুমি করছে। এমন সময় যেন আকাশ থেকে বিদু্যৎ চমকের মতোই মাস্টার মশাই এসে হাজির। বাপরে কি হম্বিতম্বি! একটু পরই বই পড়ার নাম করে বসে গেল এক টুলে। তার পর ঝিমুতে ঝিমুতে ঘুমে একেবারে অক্কা যাওয়ার অবস্থা। ছাত্রদের যে কত প্রকার দুষ্টুমি। তারপর বরিশালের দাদা আর নাতির খাওয়া নিয়ে গল্প। আঞ্চলিক ভাষায় এই অভিনয়সমূহ সবাইকে মজা দিল। এরপর একের পর এক মজাদার ছড়া আর সাংস্কৃতিক কার্যক্রম চলতে থাকলো। চমৎকার একটি আবহের ভেতর দিয়ে এগিয়ে চললো কিশোরকণ্ঠের কার্যক্রম। আকর্ষণীয় ব্যঞ্জনায় মধুর একটি পরিবেশ তৈরি হলো। যেন মোহগ্রসত্দ হয়ে বসে থাকলাম সবাই।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



