আনোয়ার হোসেন লালন
এক.
ফুটপাথে দাঁড়িয়ে কিছু খাওয়ার অভ্যেস আমার বরাবরই ছিল না। কিন্তু এ মুহূর্তে কোজ ফ্রেন্ড সানীর অনুরোধে দ্বিমত করতে পারলাম না। হাত ধরে টেনে সে আমাকে বসালো অনাবৃত আকাশের নিচে, একটা চটপটির দোকানের কেদারায়, এমনভাবে ধরলো যে, না খেলেই নয়।
দোকানি চটপটির পেস্নটটা আমার হাতে তুলে দেয়ার পর আমি চামচ দিয়ে তা আরেকটু নেড়ে চেড়ে নিলাম। এক চামচ কেবল মুখে পুরতে যাবো, এমন সময় পেছন থেকে কে যেনো আমার পিঠে মৃদু স্পর্শ করলো। আমি একটা কচি হাতের কোমল ছোঁয়া অনুভব করলাম। ফিরে দেখলাম, জীর্ণ-ছেঁড়া একটা হাফপ্যান্ট পরনে, উদোম গা আর নগ্ন পায়ের এক কিশোর বিনয়ী ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে। হাত পেতে সে করম্নণ মিনতি করে আধো আধো মাথা ঝাঁকিয়ে বললো দ্যান না, ছার।
আমি ঈষৎ বিরক্তি বোধ করলাম_ যাতো! অন্যদিকে যাহ্। বলে আমি এক চামচ চটপটি গফ্ করে স্বীয় মুখে পুরে দিলাম। কিশোর আবার আমাকে স্পর্শ করে পুনরাবৃত্তি করলো- ছার খিদা, দ্যান না ছার এবার আমি কিছু বলার আগেই চটপটিঅলা একটা হাত তুলে তেড়ে উঠলো- আবে ওই পিচ্চি! যা না, যা যা। ...
ছেলেটা বড়ো বেহায়ার পরিচয় দিল। তবুও দাঁড়িয়ে রইলো সে। এবার ৰেপে উঠলো সানী। বসা ছেড়ে উঠে ছেলেটাকে মৃদু ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিতে চাইলো সে। কিন্তু পারলো না। বাধা দিলাম আমি। ছেলেটার দিকে তাকিয়ে দেখলাম, তার মুখোচ্ছবি ভারি মলিন। করম্নণ দৃষ্টিতে সেও তাকিয়ে রইলো আমার দিকে। তার এই মায়াবি অনিমেষ চাহনিতে সহসা আমার ভেতরে কেমন এক দরদের উদ্রেক হলো, আনমনে ভাবলাম, তার বয়সটা তো এখন লেখাপড়ার বয়স। তার সমবয়সী কিশোররা কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে স্কুলে যায়। খেলাধুলা করে বেড়ায়। কতোই না আনন্দ-ফুর্তিতে কাটে তাদের দিন। স্নেহ-মমতা, আদর-ভালোবাসায় ভরা তাদের জীবন।
অথচ এই ছেলেটা অনবরত ঘুরে বেড়ায় পথে পথে। চেয়ে-চিনত্দে কারোর দয়ায় কিছু পেলে খায় আর না পেলে হয়তো অভুক্তই থাকতে হয় তাকে।
কথাগুলো ভেবে নিজেতে বেশ আফসোস বোধ করলাম। হাতের চটপটির পেস্নটটা ধরিয়ে দিলাম তার হাতে_ নে, খেয়ে নে। খুশিতে ছেলেটার চোখ দু'টো মুক্তোর মতো চিকচিক করে উঠলো, মুহূর্তেই পেস্নট হাতে বসে পড়লো মাটিতে। আমি চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালাম। বিলটা নিজেই মিটিয়ে দিতে চাইলাম। বাধা দিয়ে সানীই দিয়ে দিল বিল।
সামনে পা ফেলার আগে ছেলেটার উদ্দেশ্যে আমি আরেকবার পেছন ফিরে তাকালাম। দেখলাম, শূন্য পেস্নটটা পড়ে আছে মাটিতে, ছেলেটা উধাও। এদিক-সেদিক দ্রম্নত চোখ ফেরিয়ে দেখলাম, কোথাও দেখা যাচ্ছে না তাকে। দোকানিকে জিজ্ঞেস করলাম- কোথায় গেলো ছেলেটা!
দোকানি এক প্রকার ইচ্ছের বিরম্নদ্ধে বললো_ ওগোর ঠিক আছে নি! টোকাই মানুষ, কইত্তে কই যায় ক্যাঠা কইবো।
_ ওঅ। আমার ভেতরে দীর্ঘশ্বাস পতনের আওয়াজ বাজে। কে যেনো আবার আমাকে উদাস করে দেয়। নিজের অজানত্দে বলে উঠি যাবে আর কোথায়, হয়তো আবার কারোর কাছে হাত পাততেই চলে গেছে সে।
সানী আমার খেই ফিরিয়ে দিয়ে বললো- এত ভাবলে কি চলবে! চল্ আমরা অন্যদিকে যাই।
_ হঁ্যা চল্। বলে দু'জনে একসঙ্গে পা বাড়ালাম। কিন্তু ছেলেটাকে মন থেকে মুছে ফেলতে পারলাম না কিছুতেই।
দুই.
আজ শুক্রবার। অফিস বন্ধ। সারাদিন কেমন আনমনা আনমনা ভাব ছিল আমার। বাসা থেকে বের হবো হবো ভেবে প্রায় পুরো দিনটাই মাটি করে দিলাম। শেষ পর্যনত্দ সন্ধ্যের খানিক আগ মুহূর্তে বের হলাম। একাই। একটা রিকশা চেপে চলে এলাম গুলিসত্দান। রিকশা থেকে নামতেই সহসা চোখ পড়লো সামনের রাসত্দার মধ্যভাগের আইল্যান্ডে। একটা পথকলি ছেলে আইল্যান্ডের মাথায় পা ছড়িয়ে বসে কি যেনো খাচ্ছে। রিকশা ভাড়া মিটিয়ে আমি আলতো পায়ে সেখানটায় এগুলাম। ছেলেটার সামনে দাঁড়াতেই সে একবার মাথা তুলে আমার দিকে তাকালো। সে আমাকে চিনতে না পারলেও আমি তাকে ঠিকই চিনে নিলাম। সেই ছেলেটা, চটপটি খেতে গিয়ে সেদিন যাকে দেখেছিলাম। এখন সে সারমেয়র মতো মজা করে জুটো কাঁটা খাচ্ছে। তেহারি বিরিয়ানির ফেলে দেয়া হাড়গুলো কোন হোটেলের সামনে থেকে কুড়িয়ে এনেছে যেনো। সেগুলো খেয়ে সেরে এবার সে হাতে নিলো দধির খালি পাত্র। ডান হাতের বৃদ্ধাঙ্গুল দিয়ে পাত্রটা কেছে কেছে সে আঙ্গুল জিভে লাগিয়ে পরম তৃপ্তিতে চাটতে লাগলো। আমি আরো খানিক নীরব দাঁড়িয়ে থাকার পর বললাম_ কিরে, ক্যামন আছিস?
মাথা তুলে অবাক নেত্রে তাকালো, বললো- আফনারে তো চিনলাম না, ছার।
সে যে আমাকে চিনবে না, তা আমি আগেও ভেবেছি। চিনবেও বা কি করে! দৈনন্দিন কত মানুষের সম্মুখীনই তো হতে হয় তাকে। এক নজরে কারইবা মুখোচ্ছবি চিনে রাখে সে। আমি স্বাভাবিক কণ্ঠেই বললাম- না চিনলে বুঝি কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করতে নেই?
_ কিন্তু ছার, আমগোরে আর ক্যাডা জিগায়!
ছেলেটার এমন কথায় আমার ভেতরে একটা ধাক্কা খেলাম। ভাবলাম, সত্যিই তো, ওদের মতো পথের ছেলেদের খবর আর কেইবা রাখতে চায়। আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম- তোর নাম কিরে?
সে এক কথায় জবাব দিলো- মালু।
_ বেশ নাম তো তোর। তা থাকিস কোথায়?
_ কই আবার, রাসত্দায় রাসত্দায়।
_ কেউ নেই বুঝি তোর?
_ কেউ থাকলে কী আর এ্যামনে থাকতাম!
_ আচ্ছা মালু, তোর কি স্কুলে যেতে মন চায় না রে?
_ মোনে তো কতো কিছুই চায়, ছার। স্কুলে যাইতে মোন চায়, ভালা ভালা খাইতে মোন চায়, নতুন নতুন পিনতে মোন চায়, কিন্তু ছার পারম্নম ক্যামনে! পামু কই?
মালুর শেষ প্রশ্নের জবাবটা আমার জানা নেই। এ মুহূর্তে দুঃখ প্রকাশ করা ছাড়া আর কিছুই করতে পারছি না আমি। পকেট থেকে একটা দশ টাকার নোট বের করে মালুর হাতে ধরিয়ে দিলাম_ এ দিয়ে কিছু একটা কিনে খাস।
মালু বললো_ আপনে ম্যালা ভালা মানুছ। আলস্নায় আফনার আরো ভালা করম্নক।
আমি বললাম- তুমিও খুব ভালো ছেলে। আলস্নাহ তোমারও ভালো করম্নন। আজ তবে আসি মালু, আলস্নাহ হাফিজ।
বলে আমি ইতসত্দত ঘোরাফেরার উদ্দেশ্যে সামনের দিকে পা ফেললাম।
গোলাপ শাহ মসজিদের কাছে এসে ঘুরতে আর ইচ্ছে হলো না। আরো খানিক দাঁড়িয়ে থাকায় পর অবশেষে একটা রিকশা চেপে বাসার উদ্দেশ্যে রওনা করলাম। তখনি আবার মালুর কথা মনে পড়ে গেলো। মালুকে ছেড়ে যেতে বুকের তলটা কী রকম হু হু করে উঠলো। ভাবলাম, মালু যদি আমারই অনুজ হতো, তবে তো তাকে এভাবে ফেলে আর যেতে পারতাম না। তাকে ছেড়ে যেতে বোধ হচ্ছে_ কোনো এক মায়ার বাঁধন ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। একবার ভাবলাম, রিকশা ঘুরিয়ে তাকে সঙ্গে করে নিয়ে যাই। আবার ভাবলাম, না থাক। এমন কত ছেলেই তো পথে পথে ঘুরে বেড়ায়। কেঁদে ফিরে দ্বারে দ্বারে। অভুক্ত যন্ত্রণায় ছটফট করে, কিন্তু কে রাখে কার খবর!
তিন.
একটা দৈনিক পত্রিকা হাতে নিয়ে বেলকনিতে বসে আছি। পত্রিকার পাতায় চোখ বুলাতে বুলাতে হঠাৎ নজরে পড়লো, রফিকুন্নবীর অঙ্কিত একটা টৌকাইর কাটর্ুনে। কাটর্ুনটা দেখেই আমার ভেতরে আচমকা একটা ধাক্কা খেলে গেলো। মনে পড়ে গেলো ফুটপাথের সেই অনিকেত ছেলেটাকে। তবে তাকে টোকাই নামে অভিহিত করতে আমার বিবেক সায় দিল না। ওরা টোকাই নয়, ওরা হলো পথেরকলি, পথের ফুল। ওদেরকে টোকাই নামে ডেকে কেবল মানবতারই অপমান করা হয় না, পাশাপাশি ওইসব পথের ফুলদের রীতিমতো অমানুষের কাতারেও দাঁড় করানো হয়। কিন্তু, মালুকে আমি অমানুষের কাতারে দাঁড় করাতে পারবো না। সেও মানুষ, সে আমার ভাই।
মালুকে স্মরণে এনে আমার বুকের মাঝে নীরব ব্যথার এক ঝড় বয়ে চললো। মালু বলেছিল, তার কেউ নেই। আসলেই কি তার কেউ নেই! নেই কি তার কায়-কেশ বোঝার মতো কোনো জন! তার যদি কেউ নাইবা থাকে, তবে তার অসুখ-বিসুখ করলে কে তাকে দেখা-শুনা করে। কেইবা তাকে খেতে দেয়।
এসব কথা ভাবতে ভাবতে আমার বুক চিরে ছোট্ট একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো। আৰেপ-আফসোসে নিজের প্রতি নিজের কিছুটা রাগ হলো- উহ:! সেদিন যদি ছেলেটাকে সঙ্গে করে নিয়ে আসতাম। তবে একটা কাজ-কর্মেও তো লাগিয়ে দিতে পারতাম।
মালুকে সেদিন অমনভাবে ফেলে আসাতে, এখন নিজেকে বেশ অপরাধী মনে হচ্ছে। আমি কী দরদহীন! আমি কী পাথরের তৈরি কোনো এক পাষাণ মনের মানুষ! আমার ভেতরে কী স্নেহ-মমতা ভালোবাসার এতটুকু চিহ্নও নেই! নেই কী মানুষ হয়ে মানুষেরই জন্য এতটুকু আনত্দরিকতা, এতটুকু সহানুভূতি, সহমর্মিতা! তবে কী আমি এক নরপশু! এক অমানুষ! স্বীয় বুকে এমন কতগুলো প্রশ্ন ঘোরপাক খেলো অনিবার, নিজেরই প্রতি ৰোভটা আরো বেড়ে গেলো, হাতের পত্রিকাটা চেয়ারে রেখে বসা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালাম। এমনি ৰণে ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো নীলা আপু। আমার মুখচ্ছবিতে অস্বাভাবিকতার ছাপ দেখে আপু বলে উঠলো_ কিরে আনোয়ার! তোকে এমন দেখাচ্ছে ক্যানো! কিছু হারিয়েছিস না কি?
- কী হারাবো! তুমি নীলা আপু ছাড়া আমার আর এমন কিইবা আছে, কে-বা আছে।
_ তাহলে বল্ তোর কি হয়েছে?
_ কিছুই হয়নি তো, বলে আমি হুট করে ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়লাম, তড়িঘড়ি পরনের কাপড় পাল্টে নিলাম, এখনি মালুর সন্ধানে বেরোতে না পারলে নিজেতে আর স্বসত্দি ফিরবে না।
অবলেখনী হাতে মাথা অাঁচড়াতে অাঁচড়াতে ঘর ছেড়ে দ্রম্নত বেরিয়ে যেতে দেখে নীলা আপু পেছন থেকে আমাকে ডাকলো_ কিরে আনু! এই অবেলায় এভাবে কোথায় চললি?
আপুর কথাটা শুনেও আমি না শোনার ভান করলাম। আসলে নীলা আপু আমাকে প্রচণ্ড রকম ভালোবাসে। আমি আবার কখনো কখনো তাকে পাগলি আপু বলেও ৰেপিয়ে তুলি। তবুও আমি তার অতি প্রিয়। আপু যখন অবিবাহিতা ছিল, তখন সে আমাকে ছাড়া একবেলাও খেতে বসতো না। বিয়ের পরও সে আমাকে একটানা কয়েকদিন না দেখলেই আমার জন্য যেনো উন্মাদপ্রায় হয়ে উঠতো। হয়তো সব বোনেরাই তার ভাইদের জন্য হৃদয়ে এমন একটা ভালোবাসার পাহাড় গড়ে বেঁচে থাকে।
ফুটপাথে যদি মালুর দেখা মেলে, এই ভেবেই পায়ে হেঁটে পথ চলছি আমি। খুঁজে ফিরছি মালুকে। মালু ভেবে পেছন থেকে কয়েকটা ছেলের হাত ধরেছি। নিজের দিকে তাদের মুখ ফিরিয়ে দেখেছি- না, মালু নয়, মালুর মতোই অন্য কেউ।
এরপর হাঁটতে হাঁটতে চলে এলাম গুলিসত্দান। উদ্দেশ্যও ছিল এখানে আসার। ভেবেছি, গুলিসত্দান এলেই বুঝি মালুর দেখা মেলবে। কিন্তু না! অনেক খোঁজাখুঁজির পরও সেই দুরদৃষ্টশীল হতভাগা মালু বাছার দেখা আর পেলাম না।
দুপুরের আগেই বাসা ছেড়ে বেরিয়েছি। ঘরির কাঁটা এখন চারটের ঘর ছাড়িয়েছে। অথচ, মধ্যাহ্ন ভোজ এখনো সারা হয়নি। প্রচণ্ড ুধায় পেটের নাড়ি-ভুড়ি ছিঁড়ে পড়তে চাইছে। ওদিকে আপুরও বোধ হয় একই অবস্থা। হোটেলে ঢুকে যে একপেট খেয়ে নেবো, তাও পারছি না। কারণ, আপু আমার জন্য না খেয়ে বসে থাকবে। আপুর কথা ভেবেই অগত্যা বাসায় ফিরে এলাম আমি।
চার.
আজ ক'দিন ধরে আমার শরীরটা তেমন ভালো যাচ্ছে না। মানসিক যন্ত্রণায় ভুগে ভুগে শরীরটাও কেমন ম্যাজম্যাজে হয়ে গেছে। অবশ্য নীলা আপুর কাছে সেটা ধরা পড়ে গেলো- কিরে আনু! দিন দিন এভাবে তুই শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাচ্ছিস ক্যানো। তোকে কি ভাত খেতে দেই না?
আপুর এমন কথায় তাকে সান্ত্বনা দেয়ার চেষ্টা করে বললাম- শুধু তোমার চোখেই আমি শুকিয়ে যাচ্ছি। কই! আর কেউতো বলেনি।
আপু বললো_ কে আর বলতে আসবে! বলি, সবাই কি তোকে আমার মতো ভালোবাসে?
আমি কোনো কথা বলি না। মাথা নিচু করে বসে থাকি চুপচাপ। আসলে এটাই বাসত্দব যে, ভাইটি যদি দিব্যি স্বাস্থ্যবানও থাকে, তবুও বোন ভাবে, আরেকটু স্বাস্থ্য যদি ভাইটির হোতো আরেকটু প্রাণবনত্দ যদি থাকতো সে।
আপুকে আমি বুঝ মানাতে পারলাম না, সে এমনভাবে ধরলো যে, আমাকে ডাক্তার না দেখালেই নয়। কিন্তু, আমাকে ডাক্তার দেখিয়ে কি হবে। প্রাচীন কথায়ই তো আছে_ সব রোগের ওষুধ আছে, চিনত্দা রোগের ওষুধ নেই। আমি তো অনবরত চিনত্দাযুক্ত। আর এই চিনত্দা শুধুই সেই পথের ছেলেটাকে নিয়ে। সে এখন কোথায় আছে, কেমন আছে, কি খাচ্ছে না খাচ্ছে।
সেই দিনের সেই অনিকেত ছেলেটার অসহায়ত্ব আমাকে এতটাই ভাবিয়ে তুলবে, তা আমি কখনো বুঝিনি, ভাবিনি। তাকে এত করে ভুলতে চেষ্টা করি, কিন্তু পারি না, এ ভেবেও ভুলতে চাই যে, একজন ফুটপাথের ছেলেকে ভেবে কি লাভ! আমার মতো এমনি করে আর ক'জন ভাবে ওই পথকলিদের নিয়ে! অন্য কেউ কি তাদের নিয়ে এতটা ভাবে? জানি ভাবে না। যদি ভাববেই তবে হয়তো ফুটপাথে, রাসত্দার আনাচে-কানাচে আর ডাস্টবিন বা আসত্দকুঁড়ে পড়ে থাকা ওই ছেলেগুলোর জীবনে এতদিনে উন্নয়নের ধারা পরিলৰিত হতো।
দৈনন্দিন কতো-শতো কচিকাঁচা নেমে পড়ছে পথকলি বৃত্তিতে। কে করবে এর সঠিক প্রতিকার? কে দেবে তাদের বেঁচে থাকার আশ্বাস? ধনাগরবে পাঁচতলার মানুষেরা কি আর গাছতলার দীনহীন মানুষকে নিয়ে ভাবতে পারেন! তবে যে তাদের সম্মানের হানি ঘটবে। তা ছাড়া ভাববার মতো তাদের হাতে সময়ও বা কই! তারা তো প্রতিনিয়ত প্রচণ্ড ব্যতিব্যসত্দ। কিভাবে আরো টাকার মালিক হবেন, কিভাবে নেতা হবেন, ইলেকশনে জয়ী হবেন কিভাবে। এই প্রত্যয়ে তারা রাজপথে, মাঠে ময়দানে মিটিং মিছিলে বড় বড় বুলি ছাড়েন, অবশ্যি সমাজের জন্য তারা করেনও কিছুটা, কিন্তু করেন না শুধু ওই সমসত্দ মালুদের মতো পথকলির জন্য কিছুই। ভাবেন না পথকলিরা কি খায় না খায়। নিতানত্দ অবহেলায় পথে ঝরে যায় কতো মায়াঘন পথের ফুল। এমনও বুর্জোয়া আছেন, যারা এতটুকু চিত্ত বিনোদনের জন্য লাখ লাখ টাকা নষ্ট করতেও কুণ্ঠাবোধ করেন না। অথচ সেই সব আমলাদের কাছে যদি কোনো এক অভুক্ত পথকলি বা অসহায় ভিুক ুধার্ত যন্ত্রণায় ছটফট করে হাত বাড়ায় একটি মাত্র টাকার জন্য, তবে তার সে হাত উগ্রকণ্ঠে ফিরিয়ে দেন তারা। ফিরেও তাকান না, শুনতেও চান না যে, ছেলেটা কি বলতে চায়।
এসব কথা ভেবে ভেবে আমার চোখের সামনে বার বার ভেসে ওঠে মালুর সেই করম্নণ মুখচ্ছবি। হয়তো মালুও তেমনি কোনো এক অমানসিকতার পৈশাচিক আচরণের শিকার হয়েছে। আর তাই হয়তো সে মনের দুঃখে চলে গেছে দূর থেকেও বহুদূরে। তা না হলে এত খোঁজাখুঁজির পরও তাকে আর পেলাম না কেন। না কি মালু কোনো গাড়ির নিচে চাপা পড়ে কিংবা অন্য কোনো এ্যাকসিডেন্ট করে মারা গেলো! এমন কথা ভাবতেই আমার ভেতরটায় একটা ধাক্কা লাগলো_ না! না! মালু মরতে পারে না। আমার অনত্দর বলছে, সে বেঁচে আছে। হয়তো তার অসুখ-বিসুখ করেছে। তাই হয়তো সে পড়ে আছে কোনো পথের ধারে, গলির ধারে, নয় তো কোনো ডাস্টবিনের কাছে।
কিন্তু, মালুকে কোথায় খুঁজবো! এত বড়ো একটা শহরে তার মতো একজন কিশোরকে খুঁজে পাওয়া, সেটাতো খুবই অস্বাভাবিক ব্যাপার। তবুও তাকে আমি খুঁজে ফিরি, যদি দেখা পেয়ে যাই।
পাঁচ.
বই পড়া, কবিতা লেখা, কম্পিউটার প্রোগ্রাম আমার প্রিয় শখ বা নেশা। এতটুকু ফুরসৎ পেলেই এর কোনো না কোনো একটা নিয়ে বসে পড়ি। কিন্তু, আজ ক'দিন ধরে এসবের কোনোটাই মোটে ভালো লাগে না আমার।
বেলকনিতে বসে প্রায় দু'ঘণ্টা ধরে একটা কবিতা লেখার চেষ্টা করছি। কিন্তু, ইচ্ছের বিরম্নদ্ধে কোনো কাজে মানুষ জয়ী হতে পারে না। কাগজের পাতায় কেবল কিছু অাঁকিবুঁকিই এঁকেছি। কবিতার 'ক'-টাও আর লিখতে পারিনি। যেনো কোনো ভাষাই খুঁজে পাচ্ছি না। সব ভাষা হারিয়ে গেছে সেই ছেলেটার কাছে।
মালুকে স্মরণে এনে আরেকটু উদাস হতে যাবো, তখনি বাড়ির বাইরে থেকে আমার নামের ডাক ভেসে এলো- আনোয়ার বাসায় আছিস?
কণ্ঠ শুনে আমি নিঃসন্দেহে বুঝতে পারলাম, সানী এসেছে, সাড়া দিয়ে ছুটে এলাম দরোজায়, ভেতরে এসে বসার আহ্বান জানালাম তাকে। কিন্তু বসতে সে চাইলো না, বললো- নারে দোশ্ত বোসবো না। একটা প্রোগ্রাম আছে। তোকেও যেতে হবে সেখানে।
_ কিসের প্রোগ্রাম?
_ ছোটদের একটা অনুষ্ঠান।
_ কোথায়?
_ পাবলিক লাইব্রেরি মিলনায়তনে।
_ কিন্তু, আমি তো যেতে পারবো না, সানী।
_ তোকে যে যেতেই হবে। কবিতা পাঠে আমি যে তোর নাম দিয়েছি।
_ তা আমাকে আসা একবার বললেই তো পারতিস।
_ স্যরি দোসত্দ, তবে আমি চেষ্টা করেছি। তোর মোবাইল ফোন বিজি পেয়েছি। এখন চল, পিস্নজ!
_ ঠিক আছে চল্ তবে।
অগত্যা বন্ধুর কথায় রায় দিলাম। তড়িঘড়ি তৈরি হয়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়লাম তার সঙ্গে।
সানী বেশ জোরেশোরেই হাঁকিয়েছে মোটরসাইকেল। বোধ হয় একশো' মিটারের ওপরে। আমি সানীকে আরো জোরে জাপটে ধরে বার বার রাসত্দার এপাশ-ওপাশ ফিরে তাকাচ্ছি। যদি সেই ছেলেটার দেখা পেয়েই যাই। চলতে চলতে এক সময় শিশু পার্কের সামনে থেকে চলে যাচ্ছি আমরা। হঠাৎ আমার নজরে পড়লো, বেশ কিছু লোকের একটা জটলা। কানে ভেসে এলো, এক কিশোর কণ্ঠের মর্মভেদী আর্তনাদ- মাগো! গেলাম গো, গেলাম গো... আমি সানীকে দাঁড়াতে বললাম। সানী সাইকেলটা সাইড করে স্টার্ট বন্ধ করলো। আমি নেমে পড়লাম। দ্রম্নত ছুটে এলাম লোকগুলোর মাঝে। সানী যেনো কিছুই বুঝতে পারলো না। আমি ভিড় ঠেলে সামনে এগিয়ে এলাম। দেখলাম, এক কিশোরকে চোর! চোর! বলে ইচ্ছে মতো সবাই চড়-থাপ্পড়, কিল-ঘুষি আর এলোপাতাড়ি লাথি মারছে। ছেলেটার নাক-মুখ থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত ঝরছে। মুহূর্তেই তার কণ্ঠটা আরো ৰীণ হয়ে এলো। আলতো আলতো কণ্ঠে কি যেনো বার বার বলছে সে, ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। এমন দৃশ্য দেখে আমি নিজেকে আর সামলাতে পারলাম না। লোকগুলোকে বাধা দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে ছেলেটাকে রৰা করতে চাইলাম। মনুষত্ববোধহীন মানুষগুলোর হাত থেকে আমার শরীরটাও রৰা পেলো না। ঝুকে পড়লো সবাই আমার দিকে। ধুরম্নম-ধারম্নম শব্দে যেনো তাল পড়তে লাগলো আমার পিঠ বরাবর। লোকগুলো ভেবেছে, ছেলেটা হয়তো আমারই কমর্ী। তাকে দিয়ে আমি চুরি ছিনতাই করাই। তাকে আমি নির্ধারিত একটা বেতন দেই। তার খাওন খোরাক চালাই।
ছেলেটাকে বাঁচাতে গিয়ে আমি মার খাচ্ছি দেখে, সানী আর স্থির থাকতে পারলো না। বন্ধুর জন্য বন্ধুর যতটুকু করণীয় তাতে বিন্দুমাত্রও ভুল করল না সে। সানী যখন দেখলো, আপোষে আমাকে রৰা করতে পারছে না, তখন সে তার কৌশল চালাতে বাধ্য হলো। ছাড়লো না কাউকেই, সবার শরীরেই একটু না একটু আঘাত করে দিলো, তার ভয়ে অনেকে মুহূর্তেই এখানটা ছেড়ে পালিয়ে গেলো।
সানী মার্শাল আর্টের এক পারদর্শী ছাত্র। গত বছর জুডো ক্যারাটে এসোসিয়েশন থেকে বস্নাকবেল্ট পেয়েছে।
হংকং, মায়ানমার ছাড়াও আরো কয়েকটা দেশে মার্শাল আর্টের প্রশিৰণ দিয়েছে সে।
লোকগুলোকে প্রতিরোধ করার পর আমাকে ধরে তুললো সানী। বললো- চল বন্ধু, সামনের একটা ফার্মেসি থেকে ওষুধ কিনে নেয়া যাবে।
আমি বললাম- এই আহত ছেলেটাকে এভাবে ফেলে রেখে আমাদের যাওয়াটা ঠিক হবে না। ওর চিকিৎসা করানো প্রয়োজন। সানী বললো- ঠিক আছে, ওকে নিয়েই চল।
- থ্যাংক ইউ ফ্রেন্ড। বলে আমি মালুকে ধরে তুলতে চাইলাম। বাধা দিয়ে সানীই মালুকে রিকশায় তুলে দিলো। সানী বসলো মোটর সাইকেল চেপে আর আমি উঠলাম মালুর রিকশায়। রিকশা এগিয়ে চললো শাহবাগের দিকে। আমি প্যান্টের পেছন পকেট থেকে রম্নমাল বের করে ছেলেটার রাতুল মুখচ্ছবি ধীরে ধীরে মুছে দিলাম। তার মুখোবয়ব পুরোপুরি পরিষ্কার হয়ে যেতেই আনন্দ বেদনার ঝলকানিতে আমার ভেতরটা কেমন কেঁপে উঠলো। আমার আর চিনতে বাকি রইলো না যে, এই ছেলেটাই সেই ছেলেটা।
ছয়.
চিকিৎসার পর মালু যখন জ্ঞান ফিরে পেলো, তখন আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম- এতদিন তুই কোথায় ছিলিস?
মালু বললো- হেইডা ছার, ম্যালা কতা।
_ বল না, শুনি।
_ পরে কমুনে ছার, অহনে বেশি ভালস্নাগে না।
_ আমাকে চিনতে পেরেছিস তো?
_ হ, চিনা চিনা লাগতাছে। কই জানি দেখছি।
_ আচ্ছা মালু, লোকগুলো তোকে মারছিল ক্যানোরে?
মালু কোনো কথা বলে না। আমি পুনরাবৃত্তি করি- বল না ক্যানো মেরেছিল?
এবার মালু মাথাটা আনত করে অপরাধীর ভঙিতে বললো- চুরি করছিলাম বইলা।
_ তুই চুরি করেছিস!
_ করম্নম না! খিদা পাইলে কি করম্নম। চাইলে তো কেউ কিছু দিতে চায় না। খালি মারতে চায়, বকা-ঝকা দ্যায়, তয় বকা ঝকা যহন খামুই, তহন.....
_ আর বলিসনে মালু, আর বলিসনে।
মালুকে থামিয়ে দিয়ে আমি বাজপড়া শবের মতো দাঁড়িয়ে রইলাম। তার এমন কথা মেনে নিতে বড়োই কষ্ট হচ্ছে আমার। বুকটা বিদ্রোহী হয়ে উঠতে চাইছে। এরমধ্যে সানী আমাকে তাড়া দিল
_ কিরে ফ্রেন্ড! সময় তো ফুরিয়ে যাচ্ছে, চল না।
আমি স্বাভাবিক কণ্ঠেই বললাম- স্যরি দোসত্দ! আমার আর যাওয়া হবে না।
_ ক্যানো! আবার কি হলো?
_ হয়নি কিছুই মালুকে নিয়ে এখনি বাসায় ফিরতে চাই।
_ তবে আমার উপায়! আমি যে তাদেরকে কথা দিয়ে এসেছি। পিস্নজ তোর দু'টি পায়ে পড়ি, দোশত।
_ এভাবে বলিসনে, কিন্তু, মালুকে নিয়ে....
_ নো প্রবলেম, মালুকে নিয়েই যাওয়া যাবে।
মালুকে নিয়ে যাওয়া যাবে শুনে আমার ভেতরের আনন্দ আর কে দেখে। উলস্নসিত কণ্ঠে মত দিলাম- চল তবে। সানী হুট করে মোটর সাইকেলে চেপে বসলো, আমিও দেরি করলাম না। মালুকে মধ্যখানে বসিয়ে আমি বসলাম পেছনে সানী স্টার্ট দিয়ে মোটর সাইকেল টেনে চললো পাবলিক লাইব্রেরির উদ্দেশে।
রাজপথের কিছু কিছু লোকজন আমাদের দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে ওঠে। আমার শরীরে ভালো পোশাক, তার চেয়েও সানীর। অথচ, মালু উদোম গায়ে। শরীরে তার ময়লা জমে জমে অতি কুৎসিত হয়ে উঠেছে। পরনের হাফপ্যান্টটা ময়লায় এমনই সয়লাব হয়েছে যে, তার প্রকৃত রঙটা যাচাই করা দুঃসাধ্য। মাথা ছাড়াও মালুর নাকে মুখে ব্যান্ডেজ। এমতাবস্থায় তাকে আমাদের সঙ্গে দেখে যে কারোর অবাক হওয়াটাই তো স্বাভাবিক।
কিছুৰণের মধ্যে আমরা গনত্দব্যে এসে পেঁৗছলাম। দ্রম্নত চলে এলাম হলরম্নমে। মালুকে আমাদের সঙ্গে দেখে হল রম্নমের সবাই যে বিস্মিত হলো, তা বুঝতে আমাদের আর বাকি রইলো না, হলের সামনের দিকের আসনে সানী আমাকে আর মালুকে বসিয়ে সেও আমাদের পাশে বসে পড়লো।
আমরা হলে পেঁৗছানোর খানিক আগেই অনুষ্ঠানের কাজ শরম্ন হয়ে গেছে। একের পর এক ছড়া-কবিতা আবৃত্তি চলছে, এক সময় আমার নামের ডাক পড়ে গেলো। মুহূর্তেই আমি পকেট থেকে কবিতার কাগজটা বের করে উঠে এলাম মানবতার জন্য ছন্দ প্রতিপাদ্যের বিশাল মঞ্চে। উপস্থিত সবার উদ্দেশ্যে কিশোর কবিতার 'পথের ফুল' শিরোনাম আগে একবার জানিয়ে শুরম্ন করলাম।
কবিতাটা আবৃত্তি শেষ হতেই অগনন শ্রোতা দর্শক পরিপূর্ণ অভিভূত হয়ে, মুহুর্মুহু করতালি বাজিয়ে আমার প্রতি শুভেচ্ছা ও আনত্দরিকতা জানালো, আমি ভাবলাম, প্রশংসা যতো তা সবই তো একমাত্র আলস্নাহর জন্য, মনে মনে আলহামদুলিলস্নাহ পড়ে সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে মঞ্চ ছেড়ে নামতে যাবো, তখনি সানী এগিয়ে এসে আমার গলায় একটা ফুলের মালা পরিয়ে দিলো।
অনুষ্ঠান শেষে সানী আমাকে বললো চল বন্ধু, তোদেরকে পেঁৗছে দেই।
আমি বললাম, এবার চল্।
সানী মোটর সাইকেল স্টার্ট করলো, আমি মালুকে নিয়ে পেছনে চেপে বসলাম। সানী টার্ন নিলো গ্রিনওয়ে রোডের উদ্দেশে।
সাত.
মগবাজার চৌরাসত্দার কাছে এসে মোটরসাইকেল ভীষণ জ্যামে আটকা পড়ে গেলো। সানীর বাসা মিরপুর দশ নম্বরে আর আমাদের বাসা মগবাজার গ্রিনওয়ে রোডে। জ্যামে কতৰণ আটকে থাকতে হয় তা কে জানে। সানীরও বড্ড দেরি হয়ে যেতে পারে বাসায় ফিরতে। এই ভেবে মালুকে নিয়ে মোটর সাইকেল ছেড়ে নেমে পড়লাম। সানীকে বললাম- তুই সাইকেল ঘুরিয়ে বাসায় চলে যা। আমরা যেতে পারবো।
সানী বললো- আরেকটু এগিয়ে দিতে পারলে ভালো লাগতো। আমি বললাম- কিন্তু উপায় নেই গোলাম হোসেন। এই জ্যাম ভেঙে কখন এগুনো যাবে তার তো কোনো নিশ্চয়তা নেই।
সানী ঈষৎ ৰোভ প্রকাশ করলো- কিন্তু দোশত, রাজধানীর এই দুরবস্থা আর কতো কাল চলবে! এই যে দেশে এতো বুদ্ধিজীবী। যানজট নিরসনে কোনো বুদ্ধিজীবীই তো এমন কোনো সুবুদ্ধি জাহির করতে পারলেন না।
আমি মৃদু হেসে বললাম- দেশ, জাতির জাতীয় সমস্যা নিরসনের লৰ্যে এসব বুদ্ধিজীবীদের কাছে কোনো বুদ্ধি নেই।
তাদের যত বুদ্ধি তা সবই হলো স্বীয় আখের গোছাবার জন্য। তো চলি দোশত, আলস্নাহ হাফিজ।
সানী বললো- আলস্নাহ হাফিজ।
আমি মালুকে নিয়ে পায়ে হেঁটে কিছুটা পথ এগিয়ে এসে একটা রিকশা চেপে বসলাম। বয়োবৃদ্ধ রিকশা আলা ঠুক ঠুক করে প্যাডেল মেরে এগিয়ে চললো গ্রিনওয়ে রোডের দিকে।
মালুর কাঁধের কাছে একটা হাত রেখে আমি আলতো গলায় বললাম- আচ্ছা মালু, তোর কি কখনো মা-বাবার কথা মনে পড়ে না?
মালুর চোখ দু'টো কেমন ছলছল করে উঠলো, টানা একটা দীর্ঘশ্বাস ছুড়ে মালু বললো- হেই কতা আর হুনতে চাইয়েন না, ছার।
_ ক্যানোরে! বল না শুনি।
_ কি আর হুনবেন ছার, মা, বাপ তো হগলই আমার আছিলো, কিন্তু অহনে নাই।
_ ক্যানো নেই মালু। কি ঘটেছিল তোদের সংসারে?
_ হেইডা ছার ম্যালা কতা।
_ আহ! কথা বাড়াসনে, বলতো শুনি।
_ হুনেন তাইলে আমার বাপে আমার মায়রে খাওন পরন দিতো না, আমাগোর ভালো মন্দ কোনো খোঁজ খবর লইতো না। আমাগোর ফালাইয়া হ্যায়, আরেকটা বিয়া কইরা হেই বউরে লইয়া সংসার করতো। আমরা যহন হের ধারে খাওন খরচ চাইতাম, তনে হ্যায় আমাগোরে খালি মারতো। মায়েরে কতো মারছে। মায় খালি আমারে আর আমার ছোডো বইনডারে বুকে জড়াইয়া ধইরা কানতো আর আলস্নাহকে ডাকতো।
মালু কথাগুলো বলতে বলতে হাউমাউ করে কেঁদে ফেললো। আমি সহানুভূতি যুগিয়ে বললাম_ কাঁদিসনে মালু, বল তারপর কি হলো? মালু চোখ দুটো কচলাতে কচলাতে ফের বলতে লাগলো- আমার বাপের হাতে মায় হগল দিনই মাইর খাইতো। হের পরও মায় কিছু কইতো না, সবই মুখ বুইজা সইতো। একদিন মায়েরে আমার এমন মাইর মারলো বাপে, মায়ে আমার আর সইতে পারলো না তয় হেইদিন মায়ের বুকটা যেনো ফাইট্যা যাইতে চাইছলো।
মালু আর বলতে পারছে না, মাকে স্মরণে এনে মালুর বুকটাও বুঝি ফেটে যেতে চায়। কিন্তু, আমাকে যে মালুর পুরো কাহিনী শুনতেই হবে। না শুনলে কিছুতেই আর নিজেতে স্বস্থি ফিরবে না, হঁ্যা মালু, চুপ করে থাকিস না, বল তারপর কি হলো?
মালু ফোঁপাতে ফোঁপাতে আবার বলতে শুরম্ন করলো- একরাইতে আমরা হগলে ঘুমাইয়া আছিলাম। এমন সময় মায় হেই আন্ধার রাইতে উইঠা চইলা গ্যালো বাড়ির ধারের গাঙের পাড়। যাইয়া বড়ো গাঙে ঝাঁপাইয়া পড়ছে। হেরপর মইরা গ্যাছে না বাঁইচা আছে হেই কতা আর কেউ কইতে পারে নাই।
_ থামিস না মালু, বলতে থাক...
_ কি আর কমু ছার, মায়ও গ্যালো আর আমরাও পথে নামলাম।
_ কিন্তু ক্যানো পথে নামলি! বাড়িতেই তো থাকতে পারতিস।
_ থাকতে তো চাইছিলাম, কিন্তু থাকতে তো দিলো না।
_ কে দিলো না।
_ ক্যাডা আবার। বাপে আর সৎ মায়ে মিল্যা আমারে আর আমার ছোডো বইনডারে মাইরা ধইরা বাড়ি থাকইকা খ্যাদাইয়া দিলো। তহন আমি কি করি। কোনো উপায় না পাইয়া লঞ্চে উইঠা বইনডারে লইয়া ঢাহার শহর চইলা আইলাম। খিদা, যা খিদা লাগছিল হেইদিন। কিন্তু, তহনে খাওন পামু কই! ক্যাডায় দিবো! কাউরে চিনি না, জানি না, কই যাই, কি করি! খিদার জ্বালা নিজেরডা সামাল দিবার পারলেও বইনডার আর পারলাম না। বইনডা কান্দন শুরম্ন করলো। আমি বইনডার হাত ধইরা আসত্দে আসত্দে হাঁইটা হাঁইটা চইলা আইলাম গুলিসত্দান। গোলাপ শাহ মাজারের ধারে বইনডারে বওয়াইয়া থুইয়া আমি কিছু খাওন যোগাড় করার লাইগা ছুইটা গ্যালাম, মাইনষের ধারে হাত পাতন ছাড়া তহন আমার কোনো উপায় আছিলো না। ম্যালা সোময় ধইরা মাইনষের ধারে চাইতে চাইতে কয়ডা পয়সা পাইলাম, হগল মাইনষেরা তো আর দেয় না। দশজনের ধারে চাইলে একজনে পয়সা দেয়। পয়সা গুলান দিয়া একটা রম্নডি কিইনা বইনডার ধারে ফিইরা আইলাম। কিন্তু, আইয়া দেহি বইন আমার হেইহানে নাই। তহন আমি হেইহানে বইয়া বইয়া বইনডার লাইগা খুব কানলাম। পরে হেইহানের কিছু মাইনষেরা আমারে কানতে মানা করলো। আর কইলো আমার বইনেরে বোলে হলারের গাড়িতে উঠাইয়া লইয়া গ্যাছে কিন্তু, কই লইয়া গ্যাছে, কারা লইয়া গ্যাছে হেইসব কিছুই আমি জানি না। আর হেই মাইনষেরাও হেই কতা কইতে পারে নাই, পরে কতো খোঁজা খোঁজলাম, কিন্তু বইনডার দেহা আইজও আমি পাইলাম না।
মালু আবার সজোরে কাঁদতে শুরম্ন করলো। মালুর এই করম্নণ কান্নায় আমার বুক ফেটে কান্না পাচ্ছে। নিজেকে সামলে নেয়ার চেষ্টা করে মালুর মাথায় আদরের হাত বুলিয়ে বললাম- কেঁদে আর কি হবে ভাই, যা হওয়ার তাতো হয়ে গেছে।
মালুর কান্না আরো বেড়ে গেলো, আমি তাকে বুঝ দিলাম- কাঁদিসনে মালু, আমি তোর সেই হারানো বোনকে খুঁজে বের করবো ইনশাআলস্নাহ।
এমন কথা শুনতেই মালু দু'হাতের চেটোর দিয়ে চোখ দুটো মুছে কান্না থামাতে চেয়ে বললো- ছার, আফনে মানুছ না ফেরেশতা, আমি বললাম- মানুষ, মানুষই। মানুষ কখনো ফেরেশতা হতে পারে না।
ইতিমধ্যে রিকশাঅলা আমাদেরকে নিয়ে গনত্দব্যে এসে পেঁৗছেছে। ভাড়া মিটিয়ে মালুকে নিয়ে রিকশা ছেড়ে নেমে পড়লাম আমি।
আট.
কথায় বলে, দুঃখী ছাড়া দুঃখীজনের দুঃখ কেউ বোঝে না। আসলেই হয়তো তাই, আমার নিজের জীবনটাও দুঃখ দিয়ে গড়া বলেই এই দুঃখী ছেলে মালুকে আমি এতটা ভালোবেসে ফেলেছি। দুঃখ আমার তেমন কিছু না, তারপরও সেই দুঃখের কথা যখন মনে হয়, তখন নিদারম্নণ কষ্টে আমি ছটফট করি।
আমাদের বসত বাড়ি ছিল বিক্রমপুরে পদ্মার পাড়ে। ঘর গেরস্থালি, জায়গা-জমি কিছুতেই খাটো ছিলাম না আমরা, কিন্তু আলস্নাহ যাদেরকে খাটো করতে চান, বড়ো থাকার সাধ্যি তাদের তো আর কিছুতেই থাকে না। আমি ভূমিষ্ঠ হবার আগেই পিতা আমার এ পুরীর মায়া ত্যাগ করে চলে গেছেন চিরতরে। মা জননী আমাকে আর নীলা আপুকে নিয়ে এক প্রকার ভালোই দিনাতিপাত করে যাচ্ছিলেন। নীলা আপু ডিগ্রি পাস করার পর ঢাকায় এক ইঞ্জিনিয়ারের সঙ্গে তার বিয়ে হয়ে গেলো। আমি তখন সবে এসএসসি পাস করে বেরিয়েছি।
আপুকে দুলাভাইর বাড়ি তুলে দেয়ার পর আমি বিক্রমপুর সরকারি কলেজে ইন্টার ফার্স্ট ইয়ারে ভর্তি হলাম। এক বছর না ঘুরতেই আমাদের জীবনে নেমে এলো এক দুর্বিষহ নিকষকালো অন্ধকার। পদ্মা নদীর ভয়াবহ ভাঙনে হারিয়ে গেলো আমাদের ঘরবাড়ি, গরম্ন বাছুরসহ সবটুকু জায়গা জমি। মা তখন পাগলপ্রায় হয়ে গেলেন এবং তিন দিনের মাথায়ই মা বিদায় নিলেন দুদিনের এ দুনিয়া থেকে। একমাত্র আপু ছাড়া এ পৃথিবীতে আমার আর কেউ রইলো না। আপু তার বাড়িতেই আমাকে আশ্রয় দিলেন। দুলাভাই যদিও খুব কঠিন মনের মানুষ তবুও তার তত্ত্বাবধানে থেকে হবিবুলস্নাহ বাহার কলেজে ভর্তি হলাম। তবে পড়ালেখা, থাকা-খাওয়ার প্রশ্নে সার্বিক সুবিধা দুলাভাইয়ের কাছ থেকে আমি নিলাম না। কলেজ করার পাশাপাশি দু'তিনটা টিউশনি জুটিয়ে নিলাম। তাতে করে আপুর ওপর চাপ অনেক কমলো। এভাবেই ডিগ্রি কমপিস্নট করে সায়েন্স নিয়ে ভর্তি হলাম ঢাকা ভার্সিটিতে। এরপর কমপিউটার সায়েন্স নিয়ে চলে এলাম বুয়েটে। এখনও এই বুয়েটেই আছি। কমপিউটার সায়েন্সে ডিপেস্নামা করছি। সানীও আমার সঙ্গে পড়ে। সানীর সঙ্গে সম্পর্ক সেই ছেলেবেলা থেকেই। বিক্রমপুরেই তাদের বাড়ি, নীলা আপুও সানীকে বেশ চিনে জানে।
আমাকে দেখতেই নীলা আপু বলে উঠলো- এসেছিস। সেই কখন থেকে তোর জন্য অপেৰা করছি। বড্ড ুধা পেয়েছে, খাইনি আমি বললাম- এতটা শাসত্দি ভোগ করার কি মানে আছে আপু একদিন তো বলেছি, আমার ফিরতে দেরি হলে তুমি অবশ্যই খেয়ে নেবে। আপু বললো- বললেই তো আর হয় না। আমার জায়গায় যদি তুই হতিস তবে বুঝতিস, ছোটো ভাইটির জন্য কি এত জ্বালা।
_ তা হলেও আপু, সব বড় বোনেরা বোধ হয় তোমার মতো নয়।
_ আমি তো মনে করি সবাইই এমন। তারপরও ব্যতিক্রম তো কিছু থাকবেই। তা আমি অস্বীকার করছি না। খাবি আয়।
আপু খেতে ডাকতেই আমি মালুর কথা মনে করলাম। চোখ ফেলে দেখলাম, মালু পাশে নেই। তড়িৎ দরোজার দিকে চোখ ফেলে দেখি ওপাশে দাঁড়িয়ে আছে মালু। আমার কেমন খারাপ লাগলো, আপু হয়তো ভেবেছে, ছেলেটা আমার সঙ্গে আসেনি। হয়তো সে কে না কে, আমি ভেতর থেকেই তাকে ডাকলাম- মালু
মালু গলা ছেড়ে উত্তর দিলো- জ্বে
_ কিরে! তুই ভেতরে আসছিস না ক্যানো। আয়, আয়...
আসলে মালু একটু ভীতি বোধ করছো। তার মতো একজন পথকলির জন্য কেউ এতটুকু করবে বা এমন একটা বাড়িতে তার আশ্রয় জুটবে এ কথা ভেবেই সে কুল পাচ্ছে না। আলতো আলতো পায়ে মালু ভেতরের দিকে এগিয়ে এলো। আপু মালুকে একবার ভালো করে দেখে নিয়ে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন ছুড়লো- ছেলেটা কে রে আনোয়ার? আমি স্বাভাবিক গলায় জানালাম- ও আমাদেরই এক ভাই।
_ আমাদেরই ভাই!
আপু যেনো কিছুই বুঝতে পারলো না। কী রকম বিস্মিত দৃষ্টিতে একবার সে মালুর দিকে আরেকবার আমার দিকে তাকিয়ে যেতে লাগলো। আমি বললাম- হঁ্যা আপু। মালু আমাদের একভাই। এরপর খানিক থেমে কণ্ঠে আরো বিনয় মিশিয়ে আপুকে আমি বললাম- আপু, তোমাকে একটা অনুরোধ করবো, আমি জানি তুমি আমার সে অনুরোধের দ্বিমত অবশ্যই করবে না।
_ আহ: কি বলতে চাস ভনিতা না করে বলে ফেললেই তো পারিস।
_ আপু, ওর নাম মালু, ফুটপাথ ওর ঠিকানা। আমি চাচ্ছি, মালু আপাতত ক'দিন এ বাড়িতে থাকবে। পিস্নজ আপু....
বলে আমি আপুর হাত দুটো চেপে ধরলাম। আপু ইতসত্দত করলো- কিন্তু...
_ কোনো কিন্তু নয়, আপু।
_ না মানে, তোর দুলাভাইকে তো জ
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



