খালেদ আহমদ শিমুল
ক্রমেই ঘনিয়ে আসছে চূড়ানত্দ চমকের কাল। বিশ্বের সবচেয়ে জমকালো ব্যয়বহুল ও জনপ্রিয় ফুটবল আসর বিশ্বকাপ ফুটবল 2006 খেলা এখনও চলছে। ফুটবল শক্তিধর জার্মানিতে অনুষ্ঠিত এই আসরে বিশ্বের নামিদামী ফুটবলাররা তাদের ছন্দময় ক্রীড়ানৈপুণ্যে মাতিয়ে তুলছে সারা বিশ্ব। নামীদামি খেলোয়াড়দের পাশাপাশি অন্য আসরের মত আলোচনায় উঠে আসছে নতুন নতুন প্রতিভা। এটি বিশ্বকাপের অষ্টাদশ আসর। এর আগে 17টি বিশ্বকাপ আসরে ঘটে যাওয়া নানা চমকপ্রদ ঘটনাবলি নিয়ে কিশোরকণ্ঠের বন্ধুদের জন্য আজকের আয়োজনটি সাজানো হলো।
বিশ্বকাপের যতো প্রথম
বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচ
ঙ্ 1930 সালে দণি আমেরিকার উরম্নগুয়েতে বসে বিশ্বকাপ ফুটবলের উদ্বোধনী আসর। এ আসরের প্রথম ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয় ফ্রান্স-মেঙ্েিকার মধ্যে। ইতিহাসের প্রথম এই ম্যাচে ফ্রান্স বিজয়ী হয়। তারা মেঙ্েিকাকে হারায় 4-1 গোলের বড় ব্যবধানে।
ঙ্ প্রথম হ্যাটট্রিক : আর্জেন্টাইন ফুটবলার গিলারাম স্ট্যাবিল মেঙ্েিকার বিরম্নদ্ধে প্রথম হ্যাটট্রিক করার কৃতিত্বের অধিকারী। 1930 সালে অনুষ্ঠিত প্রথম বিশ্বকাপেই তিনি এই হ্যাটট্রিকের মাধ্যমে রেকর্ড বুকে স্থান করে নেন।
ঙ্ প্রথম পেনাল্টি গোল : 1934 সালের দ্বিতীয় আসরে ইতালিয়ান খেলোয়াড় ইয়ারা গৌরী ইতিহাসের প্রথম পেনাল্টি গোলটি করেন।
ঙ্ প্রথম পেনাল্টি মিস : 1934 সালে যে আসরে প্রথম পেনাল্টি গোলটি হয় ঐ একই আসরে ব্রাজিলের বিট্রো স্পেনের বিপৰে পেনাল্টি মিসের মাধ্যমে পেলান্টি মিসের প্রথম কাণ্ডের জন্ম দেন।
ঙ্ প্রথম এশীয় প্রতিনিধি : বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথম এশীয় দল হিসেবে উত্তর কোরিয়া 1966 সালের বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ করে।
ঙ্ ফাইনালে প্রথম পেনাল্টি গোল : 1974 সালে হল্যান্ডের নিসকেন্স জার্মানির বিপৰে বিশ্বকাপের ফাইনালে প্রথম পেনাল্টি গোল করেন।
ঙ্ ফাইনালে প্রথম পেনাল্টি মিস : 1982 সালে অনুষ্ঠিত আসরে ইতালিয়ান ফুটবলার কারিনী জার্মানির বিপৰে ফাইনালে প্রথমবারের মতো পেনাল্টি মিস করেন।
ঙ্ ট্রাইব্রেকারে নিষ্পত্তি : 1994 সালে যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপ আসরের ফাইনালে ব্রাজিল ইতালিকে প্রথমবারের মতো ট্রাইব্রেকারে 4-2 গোলে পরাজিত করে।
ঙ্ প্রথম নাম প্রত্যাহার : 1950 সালের বিশ্বকাপে ভারত এক অদ্ভুত কাণ্ড ঘটায়। তারা খালি পায়ে খেলার দাবিতে চূড়ানত্দ পর্ব থেকে নাম প্রত্যাহার করে নেয়।
ঙ্ প্রথম চ্যাম্পিয়ন রানার্সআপ : 1930 সালের প্রথম বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করে স্বাগতিক উরম্নগুয়ে। ফাইনালে তারা আর্জেন্টিনাকে 4-2 গোলে হারায়। অর্থাৎ রানার্সআপ হয় আর্জেন্টিনা।
ঙ্ প্রথম আত্মঘাতী গোল : বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথম আত্মঘাতী গোলটি আসে সুইজারল্যান্ডের লটস্কারই এর কাছ থেকে। 1938 সালের তৃতীয় বিশ্বকাপে তিনি গোলটি করেন। বিপৰ ছিল জার্মানি।
ঙ্ এক ম্যাচে দুই হ্যাটট্রিক : এক ম্যাচে দুই হ্যাটট্রিকের ঘটনাটি প্রথমবারের মতো ঘটে 1948 সালের আসরে। ব্রাজিল-পোল্যান্ডের মধ্যকার এ ম্যাচে ব্রাজিলের লিউনিদাস ও পোল্যান্ডের আরনেস্ট ভিলোমেঙ্ িহ্যাটট্রিক করেন। খেলায় ব্রাজিল 6-5 গোলের প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়লাভ করে।
ঙ্ প্রথম ফেয়ার পেস্ন : জার্মানি প্রথম ফেয়ার পেস্ন হবার গৌরব অর্জন করে। তারা 1974 সালে প্রথম বারের মতো ফেয়ার পেস্ন ট্রফি অর্জন করে নেয়।
ঙ্ প্রথম পরিবর্তিত খেলোয়াড় : 1970-এর আসরে সোভিয়েত ইউনিয়নের আনাতোলি পুসাতিস প্রথম বদলি খেলোয়াড় হিসেবে মেঙ্েিকার বিপৰে মাঠে নামেন। অবিশ্বাস্য হলো এর আগের সব বিশ্বকাপে সব ম্যাচে সকল খেলোয়াড়ই 90+ মিনিট খেলেছেন।
ঙ্ খেলোয়াড় ও কোচ : ব্রাজিলের মারিও জাগালো প্রথম ব্যক্তি যিনি খেলোয়াড় হিসেবে 1958 ও 1962 সালে এবং কোচ হিসেবে 1970 সালে বিশ্বকাপ জেতেন।
বিশ্বকাপের গৌরবময় ও সেরা যতো
ঙ্ সেরা গোল : বিশ্বকাপের ইতিহাসে সেরা গোলদাতা আর্জেন্টাইন ফুটবলশিল্পী, ফুটবলের কিংবদনত্দি ম্যারাডোনা। 1986 সালের বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের 6 জন খেলোয়াড়কে একাই পরাসত্দ করে তিনি সর্বকালের সেরা এ গোলটি করেন।
ঙ্ সর্বাধিক বিশ্বকাপ জয় : সর্বাধিকবার বিশ্বকাপ জয়ের রেকর্ডটি ফুটবলের দেশ ব্রাজিলের। তারা সর্বোচ্চসংখ্যক 4 বার বিশ্বকাপ জয় করে।
ঙ্ দলীয় সর্বাধিক গোল : এক আসরের সর্বাধিকসংখ্যক গোলদাতা দলটি হচ্ছে হাঙ্গেরি। 1954 সালের বিশ্বকাপে তারা মাত্র পাঁচটি ম্যাচ খেলে 27টি গোল বিপৰ দলের জালে পেঁৗছায়। এর পরের অবস্থানে 6টি করে ম্যাচ খেলে আছে- পশ্চিম জার্মানি 25টি, ফ্রান্স 23টি ও ব্রাজিল 22টি।
ঙ্ সর্বাধিক ম্যাচ খেলুড়ে : সবচেয়ে বেশিসংখ্যক ম্যাচ খেলার কৃতিত্বের অধিকারী জার্মান ফুটবলার ম্যাথিউস। বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বোচ্চসংখ্যক 25টি ম্যাচ তিনি খেলেন। এর পরের অবস্থানে যৌথভাবে রয়েছেন ম্যারোডানা (আর্জেন্টিনা), জুমদা (পোল্যান্ড), মিলার (জার্মানি)। তারা 21টি করে ম্যাচ খেলেছেন।
ঙ্ সর্বোচ্চসংখ্যক দর্শক : 1950 সালের বিশ্বকাপ। ফাইনালে খেলছে স্বাগতিক ব্রাজিল ও উরম্নগুয়ে। তাই নিজ দেশের খেলা দেখতে সেদিন স্টেডিয়ামে উপস্থিত হয়েছিল বিশ্বকাপের ইতিহাসে রেকর্ডসংখ্যক সর্বাধিক 99 হাজার 854 জন দর্শক। তবে তাদের বেশিরভাগকেই হাড়িবদনে ফিরতে হয়েছিল সেদিন। উরম্নগুয়ে 2-1 গোলে স্বাগতিকদের হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়।
ঙ্ গোলের ল্যান্ডমার্ক : বিশ্বকাপের রেকর্ডবুকে প্রথম গোলদাতা হিসেবে ফরাসি ফুটবলার লুই লরেন্টের নামটি জ্বলজ্বল করছে। এর পরের ল্যান্ডমার্কে রয়েছেন অ্যাঞ্জেলো শিয়াকো (ইতালি) 100তম, রবার্ট কলিন্স (স্কটল্যান্ড) 500তম, রব রনসেনব্রিংক (হল্যান্ড) 1000তম এবং কাউডিও ক্যানেজিরা (আর্জেন্টিনা) 1500তম।
ঙ্ পেনাল্টি থেকে সর্বাধিক গোল : এক আসরে পেনাল্টি থেকে সর্বাধিক গোলদাতা পতর্ুগালের ইউসেবিও। 1966 সালের বিশ্বকাপে তিনি পেনাল্টি থেকে সর্বাধিক 3টি গোল করেন।
ঙ্ অপরাজিত তৃতীয় স্থান : কোন দল যদি কোন ম্যাচে না হারে তাহলে তার চ্যাম্পিয়ন হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। তবে মজার ব্যাপার হলো, 1978 সালের বিশ্বকাপে ব্রাজিল কোন ম্যাচ না হেরেও তৃতীয় স্থান লাভ করে।
ঙ্ সর্বোচ্চ গোলদাতা : এক আসরে সর্বোচ্চসংখ্যক গোলদাতাদের মধ্যে সবাইকে ছাড়িয়ে গেছেন ফরাসি ফুটবলার জাস্টফন্টেইন। 1958 সালের বিশ্বকাপে 6 ম্যাচ খেলে তিনি সর্বোচ্চসংখ্যক 13টি গোল করেন। এর পরের অবস্থানে আছেন স্যান্ডোর ককসিস (হাঙ্গেরি) 11টি এবং গার্ড মুলার (পশ্চিম জার্মানি) 10টি।
ঙ্ সর্বোচ্চ বার দলনেতা : বিশ্বকাপের রেকর্ডস-এ সর্বোচ্চ বার দলনেতা হিসেবে খেলেছেন 4 জন ফুটবলার। তারা হলেন_ বিলি রাইটস (ইংল্যান্ড), লেডি সস্নাভ নোভার (চেকোশস্নাভাকিয়া), বায়রন নর্ডকুইস্ট (সুইডেন) এবং ডিয়াগো ম্যারাডোনা (আর্জেন্টিনা)। এরা নিজ নিজ দলের পৰে 3 বার করে বিশ্বকাপ খেলেন।
বিশ্বকাপের অনুজ্জ্বল্যকর
ঙ্ কালোম্যাচ : খেলার মাঠে অখেলোয়াড়োচিত আচরণ কারো কাছেই কাম্য নয়। আর বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ফুটবল আসর বিশ্বকাপে তো নয়ই। কিন্তু মর্যাদপূর্ণ এই আসরও কলঙ্কিত হয়েছে এৰেত্রে। রেফারি সংগঠক এমনকি ফিফা কর্মকর্তাদের সামনে বিশ্বখ্যাত ফুটবলাররা জড়িয়ে পড়েন মারামারি, হাতাতাতি ও সংঘর্ষে। বিশ্বকাপ রেকর্ডের বস্ন্যাক ফাইলে এরকম কয়েকটি ম্যাচ হলো আর্জেন্টিনা বনাম যুক্তরাষ্ট্র (1930), ব্রাজিল-চেকোশস্নাভাকিয়া (1938), ব্রাজিল-হাঙ্গেরি, (1954) এবং ইতালি-চিলি (1962)। বিশ্বকাপ রেকর্ডস-এ এই ম্যাচগুলো 'ক্যালোম্যাচ' হিসেবে স্বীকৃত।
ঙ্ সর্বাধিক কার্ডের উৎসব : এক আসরে সর্বাধিক কার্ড প্রদর্শনের খারাপ রেকর্ডটি সৃষ্টি হয় 1998 বিশ্বকাপে। উক্ত আসরে রেফারি সর্বাধিকসংখ্যক 279 বার কার্ড প্রদর্শন করেন। এর মধ্যে খেলোয়াড়দের জন্য চরম ভয়ঙ্কর লালকার্ড ছিল 22টি এবং হলুদকার্ড ছিল 257টি।
ঙ্ ড্রাগ কেলেঙ্কারি : বিশ্বকাপের ইতিহাসে ড্রাগ সেবনের দায়ে অভিযুক্ত হয়ে বিশ্বকাপ থেকে চিরতরে বহিষ্কৃত হন বিশ্বখ্যাত আর্জেন্টাইন ফুটবলার ম্যারাডোনাসহ আরো দু'জন। এরা হলেন- ইতালিয়ান জোসেফ ও স্কটিশ জনসন।
ঙ্ সর্বনিম্নসংখ্যক দর্শক : এক ম্যাচে সর্বনিম্নসংখ্যক দর্শক উপস্থিতির রেকর্ডটি সৃষ্টি হয় 1930 সালের প্রথম আসরে। প্রতিদ্বন্দ্বী দু'দল রম্নমানিয়া বনাম পেরম্ন। ঐ ম্যাচে স্টেডিয়ামে উপস্থিত হয়েছিল মাত্র 300 জন দর্শক।
অন্যান্য টুকিটাকি
ঙ্ এক ম্যাচে সর্বোচ্চ গোল : 1954 সালে অস্ট্রিয়া-সুইজ্যারল্যান্ডের মধ্যকার ম্যাচে এক ম্যাচে সর্বাধিক 12টি গোলের রেকর্ডটি সৃষ্টি হয়। ম্যাচে সুইসদেরকে অস্ট্রীয়রা 7-5 গোলে পরাজিত করে।
ঙ্ দু' দেশের পৰে খেলা : দুই দেশের হয়ে বিশ্বকাপ খেলেছেন পাঁচজন খেলোয়াড়। এদের মধ্যে লুইসমন্টি আর্জেন্টিনা ও ইতালি, পুসকাস হাঙ্গেরি ও স্পেন, সানত্দামারিয়া, উরম্নগুয়ে ও ইতালি এবং রবার্ট প্রোসিনেকি ও বরার্ট জার্নি যুগোসস্নস্নাভিয়া ও ক্রোয়েশিয়ার পৰে খেলেন।
ঙ্ সবচেয়ে কমবয়সী খেলোয়াড় : বিশ্বকাপ রেকর্ডস-এ সবচেয়ে কম বয়সী খেলোয়াড় আ্যয়ারল্যান্ডের নরম্যান হোয়াইট। 1982 সালে স্পেনে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে আইরিশ খেলোয়াড় হিসেবে তিনি মাঠে নামেন। তখন তার বয়স ছিল মাত্র 17 বছর 41 দিন।
ঙ্ সবচেয়ে বেশি বয়সী খেলোয়াড় : ক্যামেরম্ননের রজার মিলার সবচেয়ে বয়স্ক বিশ্বকাপ খেলোয়াড়। 1994 সালের যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বকাপে তিনি যখন মাঠে নামেন তখন তার বয়স ছিল 42 বছর 39 দিন।
ঙ্ দু'বার স্বাগতিক : বিশ্বকাপ ফুটবলের দু'বার করে আয়োজক তথা স্বাগতিক দেশ হবার গৌরব অর্জন করেছে তিনটি দেশ। ইতালি (1934 ও 1990), মেঙ্েিকা (1970 ও 1986) এবং ফ্রান্স (1938 ও 1998)।
ঙ্ স্বাগতিকদের শিরোপা জয় : স্বাগতিক দল যদি ফেভারিট হয় তাহলে তাদের শিরোপা জয়ের সম্ভাবনা থাকে আরো বেশি। এ সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়েছে উরম্নগুয়ে, ইতালি, ইংল্যান্ড, পশ্চিম জার্মানি, আর্জেন্টিনা এবং ফ্রান্স। তারা স্বাগতিক হিসেবে বিশ্বকাপ জয় করেছে। তবে দুঃখ ব্রাজিলের, ফেভারিট ও স্বাগতিক দুই গুণের সংমিশ্রণ পেয়েও তারা উরম্নগুয়ের কাছে শিরোপা হারায় নিজ মাঠে (1950)।
তথ্যসূত্র : বিদেশী জার্নাল
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



