আসসালামু আলাইকুম,
বঙ্গদেশের প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর নিয়া এই দেশে এখন আলোচনার বাতাস বহিতেছে। এইটা ভালো ব্যাপার। অস্ত্রের গর্জনের চাহিতে আলোচনাটাই একটা সভ্য গণতান্ত্রিক দেশে প্রাধান্য পাইবার কথা। আমরা দেখিতেছি এই সফরের পর হইতেই এক পক্ষ আবেগিয় পথে অগ্রসর হইয়া 'সব পাইয়াছি', 'জিতিয়া আসিয়াছি' বলিয়া তুলকালাম করিতেছেন। আবার অপরদিকে আরেক পক্ষ 'কিছুই হয় নাই', 'কিছুই পাই নাই' বলিয়া বিরস বদনে সব কিছুকেই খারিজ করিয়া দিতে চাহিতেছেন। আমরা শুধু বলিতে চাহিতেছি : কি পাইলাম, কি হারাইলাম, কি পাইলাম না---এইসব হিসাব মিলাইবার জন্য আরো কিছু সময় প্রয়োজন। এতো তাড়াতাড়ি কোনো হিসাব মেলে না। আর এইটা তো দুইটা দেশের সম্পর্কের হিসাব। যাহা অনেক অনেক জটিল।
আমরা এখানে অতীত এবং সাম্প্রতিক অবস্থা বিচার করিয়া একটা ধারণায় উপনীত হইবার চেষ্টা করিতে পারি।
প্রথম কথা হইতেছে: ভারত তাহার প্রতিবেশীদের কাছ হইতে দুইটার যে-কোনো একট জিনিস চাহে। সেই দুই জিনিস হইতেছে : শত্রুতা আর বশ্যতা। ভারতের প্রতিবেশি দেশগুলির দিক তাকাইয়া দেখুন। আরেকটা জিনিস কখেনাই চাহে না, আশা করে কিনা তাহা নিয়াও যথেষ্ট সন্দেহ রহিয়াছে। সেইটা হইতেছে মিত্রতা।
ভারত নিজে ফ্রান্স হইতে মিরেজ জঙ্গি বিমান কিনিলে অপরাধ হয় না। কিন্তু প্রতিবেশি এফ-৯, এফ-১৬ কিনিলেই মহাভারত অশুদ্ধ হইয়া বসে। প্রতিবেশি দেশে রাজতন্ত্র থাকিলে তেমন সমস্যা নাই। কিন্তু একটা গণতান্ত্রিক সরকারের প্রধান চিন সফর করিলেই ব্যস,আর কথা নাই শত্রু হইয়া গেল।
আবার ভারতের মিত্রতার আরকেটা দিক দেখুন। সে মিত্রগণকে নিয়া স্বস্তি পায় না। শ্রলঙ্কার তামিল যোদ্ধাগণকে একসময় ভারত আশ্রয় দিয়াছে, অস্ত্র দিয়াছে, প্রশ্রয় দিয়াছে। তামিল জনগণের জন্য বিমান হইতে খাদ্য সাহায্য ফেলিয়াছে।আবার তামিলদের দমন করিবার জন্য সেই দেশে সৈন্যও পাঠাইয়াছে। রাজীব গান্ধী একজন তামিলের হাতে নিহত হইয়াছেন সত্য, কিন্তু তাহারও আগে ১৯৮৭ সালে একজন সিংহলিজ সৈন্যের রাইফেলের বাটের আঘাতের হাত হইতে বাচিয়াও গিয়াছিলেন। আবার সাম্প্রতিক সময়ে তামিলদের দুর্দশায় এই ভারত মানিবত সাহায্য নিয়া এক কদমও অগ্রসর হয় নাই।
এই রকম উদাহরণ আরো রহিয়াছে।
১৯৭১ সালে এই বঙ্গদেশের স্বাধীনতার যুদ্ধে ভারতের সাহায়ের কথা সারা দুনিয়ার মানুষ জানে। আমরা যাহারা বঙ্গবাসী, তাহারা আরো বেশি করিয়া জানি। অথচ দেশ স্বাধীনতার পরে কোথায় ভারত এই সদ্য স্বাধীনতা পাওয়া দেশটাকে স্থিতিশীল রাখিতে সহায়তা করিবে, তাহা না করিয়া জেনারেল উবানকে দিয়া (এবং 'র') দেশে 'জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল' গঠন করাইতে উস্কানীমূলক আচরণ করিল। এইখানে বলিয়া রাখি জাতিয়তাবাদীগণ কেমন করিয়া সমাজতান্ত্রিক হয়, আর সমাজতান্ত্রিকগণ কিভাবে জাতীয়তাবাদী হইয়া থাকে, এইরকম বিষয় ভাবিয়া কূল পাওয়া যাইবে না। তবে ইতিহাসের কিতাব হইতে আমরা দেখিতে পাই : জরমান দেশে হিটলার সাহাবের ফ্যাসিবাদি দলের নামও সেই জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের কাছাকাছি। ইহার পরের ইতিহাস এই দেশের সকলের জানা। আর সেই দল মানে জাসদের হালহকিকতও কাহারো অজানা নয়। আবার সারা দুনিয়া যখন মায়ানমারের সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে, তখন গণতান্ত্রিক ভারত সেই সরকারকে 'হেলিকপ্টার গানশিপ' হইতে আরম্ভ করিয়া আরো নানারকম অত্যাধুনিক অস্ত্র দিয়া সহায়তা করিতেছে। সেই অস্ত্র মাদক-ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে যতোটা ব্যবহার করা হয়, তাহার চাহিতে বেশি ব্যবহার হয় মায়ানমারের নিরীহ মানুষের হত্যাকাণ্ডে।
এইটা হইতেছে প্রতিবেশী হিসাবে ভারতের আচরণের সামান্য নমুনা।
আমাদের এখানে কেহ-কেহ দুই কদম অগ্রসর হইয়া ভারতের বিদ্যুতের কথা বলিতেছেন। যাহারা ভারত হইতে বিদ্যুৎ আমদানীর খোয়াব দেখিতেছেন তাহাদের বলিতেছি : দয়া করিয়া আগে জানিবার চেষ্টা করুন এই খাতে ভারতের নিজের অবস্থা কতোটা শোচনীয়।
বাণিজ্য করিবার জন্য আমাদের বরং চিনকে বাছিয়া নেয়া উচিত। আফ্রিকার দেশগুলি এখন সেই পথে অগ্রসর হইতেছে। দক্ষণ আফ্রিকা হইতে আরম্ভ করিয়া আলেজিরিয়া, তিউনেসিয়া,নামিবিয়া, আ্যাঙ্গোলা, সুদানের উদাহরণ আমাদের কাজে আসিবে। তাহারও আগে লাতিন আমেরিকা এই পথে চলিয়া সুফল পাইয়াছে। আমাদের বেলায় তাহা আরও ফল দিবে। কারণ এমনিতেই অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে চিন দুনিয়াব্যাপি এখন ২য় অবস্থানে। তাহার পরেও পশ্চিমা দুনিয়ার সহিত তাহার সম্পর্ক মসৃণ নহে। মুসলিম দুনিয়ার বেলায়ও এই কথা বলা যায়।উইঘুরদের সমস্যা নিয়া সে এমনিতেই কিছুদিন ধরিয়া বেশ বিব্রত হইয়াছে। এখনও হইতেছে। তাহা ছাড়া চিন জানে আমাদের পাশেই ভারতের আবস্থান। ভারতের সহিত আমাদের প্রাচিন ইতিহাসও তাহার জানা। ১৯৭১-এ চিন যে ভুল করিয়াছিল এখন তাহার মাশুল দিতে চাহিবে। কাজেই সে সবসময় একটা চাপের ভিতর থাকিবে।
ব্যবসা করিবার জন্য ভারত অবশ্য আমাদের দেশের অসৎ ব্যবসায়ী আর রাজনীতিবিদগণের পছন্দের দেশ হিসেবে বিবেচিত হইবে। কারণ ভারত এমন একখানা দেশ, যেই দেশে দালাই লামার মতন ধর্মীয়, রাজনীইতিক গুরুও আশ্রয় পান, আবার সেখানে আমাদের দেশের কালা জাহাঙ্গীরদেরও আশ্রয় মেলে। আর চিন তাহার রাজনৈতিক, সামাজিক কারণেই এইসব মানুষগুলিকে আশ্রয় দিতে পারে না। পারিবে না। কাজেই চিনকে বাদ দিয়া ভারতকে বাছিয়া নিবার এমন অনেক কারণ রহিয়াছে। আবার ভারত এইটাও জানে বঙ্গদেশের সহিত সোজা পথে ব্যবসা করিবার সুযোগ না পাইলেও চোরা পথ বন্ধ করিবার সাধ্য এই দেশের যে-কোনো সরকারের পক্ষে খুউব কঠিন। এইটাও তাহার বেপরোয়া আচরণের একটা অন্যতম প্রধান কারণ। যে- আচরণের বহিপ্রকাশ সেহওয়াগের আচরণের মধ্যে দিয়া পাওয়া যায়। যদিও আমরা জানি ক্রিকেট ভদ্রমানুষের ক্রীড়া। দিল্লির সেহওয়াগও যে তাহা জানেন না, সেইটা নয়। কিন্তু প্রতিটি মানুষের যেমন আচরণের একটা প্রকাশ থাকে, জাতির বেলায়ও তাহা সত্যি। বঙ্গদেশের সহিত সম্পর্ক উন্নয়ন হইতে শুরু করিয়া ব্যবসা-বাণিজ্যের বেলায় নয়া দিল্লির আচরণ সেহওয়াগের আচরণের চাহিতে খুব বেশি পরিশীলিত হইবে---তাহা ভাবিতে পারা কঠিন। যদিও এই সবের বিপরীতটাই হইলে দুই দেশের জন্যই কতোই ভালো হইতো। বিশেষ করিয়া দুই দেশের মানুষ তাহার সুফল নগদ-নগদ পাইতে পারিতো।
পরম করুণাময় আমাদের সকলে ছহি-ছালামতে রাখুন।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

