
আজকে সকাল থেকেই সুমার মনটা খুব বিষিয়ে আছে। কলেজ থেকে আজকে সবাই পিকনিকে যাচ্ছে নুহাশ পল্লী তে । বন্ধু বান্ধবী সবাই মিলে অনেক পরিকল্পনা করে শেষ মুহূর্তে এসে সুমাকে সেটা বাতিল করতে হল। জায়গা টি তে অনেকদিন থেকেই খুব যাওয়ার ইচ্ছে কিন্তু যাওয়া হচ্ছিল না, শেষ পর্যন্ত যখন সুযোগ হল তাও আবার কলেজ থেকে পিকনিকে, সেটি কিনা বাতিল করতে হল ?
কিন্তু তাও কেন ? দেখতে আসবে তাকে আজকে। না সুমা অসুস্থ বলে কেউ তাকে দেখতে আসছেনা কিংবা গরুর মত সুমার দুইটা শিং ও গজায়নি যে সবাই তাকে দেখতে আসবে।
কিন্তু তারপরেও হাটে গরু ছাগল কেনার মত কিংবা বাজার থেকে কোন পণ্য কেনার মত যাচাই বাছাই করতে তাকে আজকে দেখতে আসবে ছেলেপক্ষ।
ছেলে আমেরিকাতে থাকে। খুব অল্প সময়ের জন্য দেশে এসেছে বিয়ে করতে। বিয়ে করে কিছুদিন পরেই চলে যাবে আবার। তারপর কাগজপত্র ঠিকঠাক করে বউ নিয়ে যাবে সেখানে।
সুমার এক চাচী প্রস্তাব টি এনেছে। ছেলে নাকি দেখতে রাজপুত্র আর লাখে একটা। চাচী যেভাবে ছেলের প্রশংসায় পঞ্চমুখ যেন এমন ছেলে দুনিয়াতে একটাই। আর সুমা যেন বন্যার পানিতে ভেসে এসেছে।
প্রথমে শুক্রবারে ডেট ঠিক করা হয়েছিল কিন্তু ওইদিন নাকি তাদের আরেক জায়গায় মেয়ে দেখতে যাওয়ার কথা। তাই আজ ই আসতে হল। ঘুরে ফিরে পিকনিক এর দিন টা তেই ?
সুমার মা গতকাল থেকে রান্নাঘরেই পরে আছে। পোলাও, রোষ্ট, গরুর মাংস, খাসীর মাংস, মাছ ভাজা, সবজি, পায়েশ, সেমাই এসব ভালো ভালো খাবারের গন্ধে ঘর ভরে গিয়েছে।
আর বাবার তো চেহারাই দেখতে পাচ্ছেনা ঠিকমত। বেচারা একবার এটার জন্য দোকানে যাচ্ছে আরেকবার ওটার জন্য। আর সুমার চাচা-চাচী ও ফুপা-ফুপি দের খোঁজ খবর নিচ্ছে কে কখন আসছে।
আর বেচারি ছোট বোন কাজের মেয়ে টা কে নিয়ে ঘরের কোথায় ধুলো বালি আছে তা ধংস করার অভিযানে নেমেছে।
সুমার মা রান্নার ফাঁকে ফাঁকে এসে সুমার খোঁজ খবর নিয়ে যাচ্ছে। সুমা শাওয়ার নিল কিনা, উপ্টান লাগাল কিনা। গতকাল ১৫০০ টাকা দিয়ে ফারজানা শাকিল পার্লার থেকে হোয়াইট নিং ফেসিয়াল করিয়ে এনেছে মেয়েকে। মেয়ের গায়ের রঙ টা একটু চাপা বলে আগে অনেকগুলো ভালো ভালো ছেলে হাতছাড়া হয়ে গিয়েছে। এবারের টা কোনমতেই হাতছাড়া হতে দেওয়া যাবেনা।
আমেরিকার ছেলে বলে কথা।
বাসার এই দৃশ্য আজকেই প্রথম না। কলেজে উঠার পর থেকেই দু এক মাস পর পরই এমন হচ্ছে। প্রথম প্রথম খুব ই বিরক্ত লাগত সুমার। বিয়ে হবে কি হবেনা তার কোন ঠিক ঠিকানা নেই অথচ ছেলেপক্ষ দেখতে আসবে এই উপলক্ষে বাবা মা আর বোনটা খেঁটে মরে আর এত শাহী খানাপিনার আয়োজন করতে গিয়ে বাবা মা এর এতগুলো টাকা খরচ করতে হয়।
সবচেয়ে বড় কথা সুমার নিজেকে তখন কোরবানির হাটের গরু ছাগল মনে হয়। কোরবানির গরুগুলো কে ও যেমন কোরবানির আগে খাইয়ে দাইয়ে মোটা তাজা করে, চকচকে করে বিক্রির জন্য হাটে নিয়ে আসা হয় তেমনি এই বিয়ে এবং পাত্রপক্ষ দেখতে আসার হলে সুমার ও এক ই অবস্থা হয়।
খাওয়া দাওয়া কর, মোটা তাজা হও, তারপর সাজগোজ করে পাত্রপক্ষের সামনে হাজির হও।
যে ক্রেতা বেশী দাম বলবে বিক্রেতা যেমন তার কাছে গরু বিক্রি করে বাবা মা ও তেমনি যে ছেলের আয় রোজগার বেশী এমন ছেলের কাছে মেয়ে বিয়ে দিতে চায়।
আর ছেলেপক্ষ, মানে ক্রেতা, যে মেয়ে দেখতে বেশী সুন্দর আর মোটা তাজা তাকেই নির্বাচন করে বিয়ের জন্য।
গরু আর সুমার মধ্যে পার্থক্য শুধু একটাই, গরু মাথায় ঘোমটা দেয়না আর সুমা মাথায় ঘোমটা দেয়।
একটা বিষয় সুমা বোঝে না। বিয়ের বয়স হওয়ার পর থেকেই চাচী আর পাশের বাড়ির আন্টি গুলো দেখলেই বলে "এত শুকনা কেন? খাওয়া দাওয়া করোনা? শাশুড়ি তো পছন্দ করবেনা, জামাই ছেড়ে দিবে" আরও কত কি।
কোথায় বলবে, স্বভাব চরিত্র ভালো কর, গুণবতী হও, আচার আচরন ভালো কর তা না, দেখা হলেই এত শুকনা কেন? আরে বাবা, বিয়ে করবে নাকি গরু ছাগল কিনবে যে মোটা তাজা হতে হবে।
সুমার চাচী আসলো বিকেল ৩ টার পর। এসেই প্রথমে ঢুকল সুমার ঘরে। মা এর মত সে ও সুমার রূপচর্চার খোঁজ খবর নিতে লাগলো। সুমা একটা সবুজ রঙ এর জামা পরবে বলে বের করে রেখেছিল। সেটি দেখেই তো চাচীর চোখ বড় বড়।
"ও মা! তুমি সালোয়ার কামিজ পরবে? তা ও আবার সবুজ রঙ এর। তোমার গায়ের রঙ এর সাথে তো এই রঙ টি ঠিক যাচ্ছেনা। আর ও কালো দেখাবে তোমাকে। ভালো কোন শাড়ি নেই তোমার? "
সুমা বলল "চাচী, আমার তো শাড়ি পরার অভ্যাস নেই। আর তেমন কোন শাড়ি ও নেই আমার"
চাচী বলল "শাড়ি আমি এনে দিচ্ছি। কিন্তু সালোয়ার কামিজ পরা চলবে না। ছেলের মা পুরনো আমলের মানুষ। শাড়ি ই পরতে হবে"
চাচীর কথায় অনিচ্ছা সত্ত্বেও সুমা কে শাড়ি পরতে হল।
বিকেলের দিকে আসলো ফুপি। তিনি রান্নাঘর আর ডাইনিং টা দেখে সুমার ঘরে ঢুকল। সুমার শাড়ি টা দেখে কেমন কেমন করতে লাগলো। শাড়িটা ঠিক পছন্দ হয়নি ফুপির। সুমা ভয় পাচ্ছিলো, এই বুঝি ফুপি বলে বসে যে এই শাড়ি চলবে না, অন্য শাড়ি পরতে হবে।
সন্ধ্যার আগে সব মুরব্বীরা হাজির। এবার অপেক্ষা সেই কাঙ্ক্ষিত পাত্রপক্ষের জন্য।
মাগরিব এর পর তারা আসলো। আধা ঘণ্টা পর সুমার ডাক পরল।
বিশাল এক ঘোমটা দিয়ে সুমা হাজির হল তাদের সামনে। তার পাশে পাশে ছোট বোন টা ও যাচ্ছিল। সুমার চাচী ওমনি বলে উঠল "তুমি কোথায় যাচ্ছ? বড় আপু কে দেখতে আসলে তুমি কখন ও সামনে যাবেনা"
কথা টা শুনে সুমা ও তার বোন দুজনের ই মন খারাপ হয়ে গেল।
সুমা সোফায় বসে আছে মাথা নিচু করে। সামনে থেকে একটার পর একটা প্রশ্নের তীর ছুটে আসছে।
"তোমার নাম কি? কোথায় পড়াশোনা কর? তোমরা কয় ভাই বোন? তোমার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কি? বিয়ের পর কি চাকরী করার ইচ্ছা আছে? "
সব ই সুমার পরিচিত প্রশ্ন। প্রতিবার ই এসব কমন প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয় সুমা কে, আর সুমাও রোবটের মত একটার পর একটা প্রশ্নের জবাব দিয়ে যায়।
কিছুক্ষণ পর ছেলের মা বলে উঠল "মামনি, তোমার ঘোমটার জন্য তো চুল দেখা যাচ্ছেনা ভালো মত। চুল কি ছোট নাকি বড়? "
সুমা ভয় পেয়ে গেল। ও মা! এখন কি আবার সবার সামনে চুল খুলে দেখাতে হবে নাকি।
ছেলের এক ভাতিজা এসেছে সাথে। সে তার ট্যাব দিয়ে এই বিচিত্র দৃশ্য ভিডিও করছে। সেটি দেখে সুমার আরও মেজাজ খারাপ হয়ে গেল।
এসবের মাঝেই সুমা চট করে ছেলের দিকে একবার তাকিয়ে নিল। ঠিক ওই সময়েই ছেলের চোখে চোখ পরে গেল সুমার। সুমা ও ছেলে দুজনেই লজ্জা পেয়ে চোখ নামিয়ে নিল।
আরও ১০-১৫ মিনিট ইন্টার্ভিউ চলার পর আসলো সবচেয়ে বিরক্তির আর লজ্জার সেই মুহূর্ত ।
কথাবার্তা শেষ করে সুমা উঠতে যাবে এমন সময়ে ছেলের মা সুমার হাতে ১ হাজার টাকার দুটি চকচকে নোট গুজে দিল। সুমা নিতে চাইল না কিন্তু বরাবর ই অনিচ্ছা সত্ত্বেও নিতে হয় আর তখন আরও বেশী লজ্জায় সুমার মাথা নিচু হয়ে আসে।
সুমা ভেবে পায়না ঠিক কোথা থেকে বিয়ের জন্য মেয়ে দেখতে আসলে মেয়ের হাতে টাকা দেয়ার এই প্রচলন টা শুরু হয়েছে। আর দেয় ই বা কেন? মেয়েরা কি চিড়িয়াখানার জন্তু জানোয়ার যে তাদের কে দেখতে হলে টাকা দিতে হবে টিকিট কাটার মত?
কথা বার্তা ও খাবারের পর্ব শেষ করার পর ছেলেপক্ষ বিদায় নিল।
সুমার ছেলে টা কে খারাপ লাগেনি। যদিও এই একবার এক ঝলক দেখে সারা টা জীবন এর জন্য একজন যোগ্য সঙ্গী খোঁজা ও পুরোপুরি অপরিচিত একজন মানুষের সাথে বিয়ের মত একটা সম্পর্কে জড়ানো সুমার কাছে কেমন অযৌক্তিক লাগে কিন্তু কি আর করার। আমাদের ঐতিহ্যটাই তো এমন।
দুইদিন চলে গেল। কিন্তু কোন খবর এখন ও সুমা জানতে পারলো না। রাতে যখন মা বাবা কথা বলে সুমা পাশের ঘর থেকে কান পেতে থাকে যদি কোন পজিটিভ খবর পায়। ছেলেটিকে সুমার ভালো লেগেছে। তাই সুমা মনে মনে চাইছে ওপাশ থেকে যেন কোন পজিটিভ খবর আসে।
৪-৫ দিন পর সুমার মা খুব মন খারাপ করে বলল, ছেলেপক্ষ সুমা কে পছন্দ করেছে কিন্তু দুইদিন আগেই সুমার চাচী জানতে পারে ছেলে আমেরিকা তে একটা বিয়ে করেছিল কিন্তু সেই বিয়ে ভেঙ্গে গিয়েছে। ছেলের নাকি স্বভাব ভালো না। কিন্তু আসলেই কি ধরনের ভালো না তা জানতে পারেনি।
এতদিন পর একটা ছেলে পক্ষ মেয়ে টা কে পছন্দ করল আর সেখানে কিনা ছেলেই ভালো না।
বিয়েটা হচ্ছেনা জেনে সুমার মনটা খারাপ হয়ে গেল। ছেলেটাকে তার কেন জানি ভালো মনে হয়েছিল। কিন্তু সে কিনা মিথ্যাবাদী? আর সাথে সাথেই সুমার মনে হল, তাহলে এইবার ই তো শেষ নয়, আবার ও না জানি কতবার সুমাকে ওইরকম সং মেখে আজব এক পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে। আর এই ছেলের মত অন্য ছেলে ও যদি এমন কিছু লুকায়? কাকে বিশ্বাস করবে সুমা?
সুমা অনার্স ২য় বর্ষে পড়ে। তার আসে পাশে কোন ছেলে যে তাকে পছন্দ করেনি তা নয়। কিন্তু সুমার আবেগ আর মায়া অনেক বেশী। যদি কোন ছেলে কে ভালবেসে ফেলে আর সেখানে বিয়ে নিয়ে পরিবার এর মধ্যে কোন সমস্যা হয় কিংবা ছেলে টা যদি তাকে ধোঁকা দেয় তখন সুমা যে কষ্ট পাবে তার চেয়ে পরিবার যেখানে বিয়ে দিবে সেটাই তো ভালো। কিন্তু সেখানে ও এই মিথ্যা?
সুমা বসে বসে ভাবতে থাকে, কোথায় আর কার কাছে গিয়ে পরবে সে। আর কাকেই বা বিশ্বাস করবে।
বিঃ দ্রঃ গল্প লেখার কোন অভ্যাস নেই। আমি লেখক নই। সামু তে এসে লেখা শিখছি
(গল্পের বিষয়বস্তু টা অনেক কমন। প্রতি টি মেয়ের জীবনেই এমন অভিজ্ঞতা থাকে। গল্প হলেও আমার এ লেখাটির মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে বিয়ের জন্য মেয়ে দেখা এবং এটিকে কেন্দ্র করে একটা মেয়ের মনের ভাবনা আর তাঁকে যে বিরক্তিকর একটি পরিস্থিতি তে পরতে হয় সেটি কে তুলে ধরা। তাই বিয়ের জন্য মেয়ে দেখা নিয়ে আমাদের সমাজ ও পরিবারের সব কমন বিষয়গুলোকেই আমি আমার লেখায় নিয়ে এসেছি)
সর্বশেষ এডিট : ২৫ শে নভেম্বর, ২০১৮ সকাল ১১:৩২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




