ধারাপাতে বিন্যাস্ত অধোগতি দেখিনা আমরা, শৈশবে তার ঊধর্্বগতি দেখে এসেছি। সামনের দিকে এগিয়ে চলা। সামহোয়ার আয়োজিত বাংলাদেশে প্রথম ব্লগ নিয়ে সেমিনার হয়ে গেল গতকাল। সেখানেই মনে হচ্ছিল, আমরা এগুচ্ছি, নিদেনপক্ষে একটা যুগের অবসান হয়েছে সাড়ম্বরেই। যদিও কৌশিক নামে ভাগ বসিয়েছেন কেউ একজন সে সেমিনারে অংশ নেয়ার পর, তাতে নিজেকে খন্ডিত মনে হলেও আমোদ লাগছে সেমিনার কাজ করেছে দেখে। নতুন একজন ব্লগার মানে নতুন একটা দীগন্ত উন্মোচিত হওয়া। আমরা যারা ব্লগাতে ব্লগাতে একদম গন্ডিবদ্ধ হয়ে গেছি তাদের জন্য একটা ফ্রেস হাওয়া।
আমার বিপত্তি বাটার জুতো নিয়ে। ব্রাক ইনের সামনে সিএনজি থেকে নেমেই দেখলাম ডান পায়ের জুতোর সোল খুলে গেছে। দুইমাস আগে আড়াই হাজার টাকার জুতোর এ অবস্থা দেখে বাটার উপর থেকে ভক্তি শ্রদ্ধা উবে গেল। মুচির কাছে নিয়ে গেলে সে দেখালো সোলটা হার্ডবোর্ডের, কি জোচ্চুরী! রাজনীতিবিদদের হার মানিয়েছে বাটা! কোম্পানীটির কারণে আধঘন্টা পিছিয়ে পড়ে যখন রুফটপে পৌছুলাম তখন আরিল সবেমাত্র শুরু করেছেন তার প্রেজেন্টেশন। বাংলাকে ইন্টারনেটে ব্যবহার করা হলে এদেশে অফুরন্ত সম্ভাবনা তৈরী হবে। ব্লগের কনসেপ্ট অনেক বেশী ইন্টারএ্যাকটিভ, যাতে উৎসাহী হলেন মোস্তফা জামাল গালিব, ডিজিএম, গ্রামীন ফোন, বিদু্যত কুমার বসু, হেড অফ কাস্টমার ম্যানেজমেন্ট ডিভিশন, গ্রামীন ফোন, এ্যাডকমের নাজিম ফারহান চৌধুরী, রেডিও ফুর্তির শহিদ কবির, জাহাংগীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্কিওলজির প্রফেসর সুফী মোস্তাফিজুর রহমান যিনি উয়ারী-বটেশ্বরের প্রাচীন দুর্গ নগরী নিয়ে কাজ করছেন, বাংলা একাডেমীর ডেপুটি ডিরেকটর অপরেশ কুমার ব্যানাজর্ী ও এশিয়াটিকের আদিত্য কবির। ভোরের কাগজ, সংবাদ, পিসি ওয়ালর্ড, বিডিনিউজ, যায়যায়দিন, কম্পিউটার জগৎ এর প্রতিনিধিরা নিজেদের সম্পৃক্ততার ইচ্ছা পোষণ করলেন। প্রথম আলো থেকে এসেছিলেন আনিসুল হক।
প্রথম সেশনটি ছিল মিডিয়াকে নিয়ে। ব্লগের মাধ্যমে কিভাবে পলিটিক্স, বিজনেস, লেখালেখি, সংবাদ মিডিয়ার সাথে জড়িতরা উপকৃত হতে পারেন তার একটা মনোগ্রাহী প্রেজেন্টেশন করলেন আরিল। সাথে ছিলেন বাংলাব্লগটির প্রধান রচয়িতা হাসিন, পেজফ্লেকের নির্ঝর। আর ফারিহা ও জনা। ফারিহার প্রসংগে পরে আসছি। পুরো আয়োজনটিতে আরিল বাংলায় চমৎকার তথ্যাদি উপস্থাপন করলেন, যেমন তার কয়েকটি হচ্ছে এমন, ব্লগটি এতদিন যে পরিমাণ পেইজ ধারণ করেছে তা ছাপার অক্ষরে হলে বিশ হাজার গাছ কেটে কাগজ বানাতে হতো। এবং তা রাখার জন্য তিনকিলোমিটার ব্যাপী শেলফ দরকার হতো! 2007 এর মধ্যে এর একটিভ ব্লগারের সংখ্যা দশ হাজার করার একটা কনটিনজেনসী প্রোগাম হাতে নেয়া হয়েছে। যার লক্ষ্য থাকবে এক লাখ ভিজিটর। এতে ব্লগের মাধ্যমে আঞ্চলিক পর্যায়ে বিভিন্ন তথ্য বিনিময় করা সম্ভব হবে। এছাড়া বিভিন্ন সংস্থা তাদের নিজস্ব ইউজার গ্রুপ করে ইন্টারন্যাল ও এক্সটারনাল কমিউনিকেশন করতে পারবে। একটা ক্লাসের স্টুডেন্টরা একটা গ্রুপ করে নিতে পারে, যেখানে ফ্যাকালটি সাজেশন, রেফারেনসগুলো দিতে পারবেন, শিক্ষার্থীরা তাদের মতামত জানাতে পারবেন। এটা এখন অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে ইয়াহু বা গুগল গ্রুপের মাধ্যমে করা হচ্ছে। ব্লগ এ ধারণাটাতে একটা অভিনব সংযোজন হতে পারে।
আমি তো মুগ্ধ। অবশ্য আরেকজনের প্রতিও, তবে সেকথা পরে বলছি। লাঞ্চের পরে ব্লগারদের নিয়ে সেমিনার। যারা এসেছিলেন তাদের মধ্যে কেবল একজনকেই পরিচয় করে দিতে হয় নতুন বলে, তিনি হচ্ছে স্যান্ডউইচ। বিকেলের নাস্তায় অবশ্য তাকে খাওয়া যায়নি, চিকেন সাচলিক ছিল বলে রক্ষা পেয়েছেন। ব্লগারদের সাথে বিভিন্ন আইডিয়া নিয়ে শেয়ার করা হলো, যার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল ব্লগকে জনপ্রিয় করার বিষয়টি। কেউ বললেন, সেলিব্রিটিদের নিয়ে আসার জন্য। ইউনিভর্ািসটি/কলেজ/স্কুল ক্যাম্পেইন থেকে শুরু করে টিভি, নিউজপেপার সর্বত্র প্রচারণা চালানোর জন্য প্রস্তাবনা এসেছে। এছাড়া শীঘ্রই একটা ব্লগ উইক হবার কথা আছে 21 থেকে 28শে ফেব্রুয়ারী। অবশ্য এসব শোনার দিকে আমার তেমন মনযোগ ছিল না, কারণ ঐ আগ্রহ অন্য যায়গাতে থাকায়। যাগ্গে, প্রতিমাসে একটা ব্লগার সমাবেশ করার জন্য রাফ সিদ্ধান্ত হলো। সম্ভবত প্রতিমাসের তৃতীয় শনিবার বিকেল পাঁচটাতে সামহোয়ারের অফিসে এই সভাটা হবে। কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত ফাইনাল করে পরে ব্লগারদের জানিয়ে দেবেন। যদিও ঐ দিন আরিল ও ফারিহার ছুটি। অবশ্য আমি শনিবারের মিটিং এ না যাবার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। কারণটা বলা যাবে না।
সেমিনার শেষে রাইসু, শরৎ আর আমি বইমেলাতে। রাইসুদা দূর্দান্ত আইডিয়াবাজ। যাদের সাথে দেখা হলো তাদেরকেই সামহোয়ারইনব্লগের এড্রেস লিখে দিলেন। বিখ্যাত কথা সাহিত্যিক আকমিনা রহমান, নাসরিন জাহানকে সামহোয়ারইনব্লগে আসার জন্য দাওয়াত দিলেন। 5/6জনকে তো চোখের সামনে বললেন, সামহোয়ারের কথা। আমি অবশ্য বাটার বদনাম করলাম। আমার একজন শিক্ষক বলেছিলেন, কোন পন্য যদি ভোক্তার ভাল লাগে তিনি সেটা নিজের পয়সা খরচ করে হলেও 7/8 জনকে বলে, আর যদি জিনিসটা ভাল না হয় তাহলে 17/18 জনকে সেটার বদনাম করে। আমি সে থিউরী এপ্লাই করলাম। লাইনে দাড়ানো ভদ্রলোক, ব্লগারদের সমাবেশের সবাইকে, অপরিচিত পথিক সবাইকে বললাম, বাটা একটা জঘন্য কোম্পানী, তাদের জুতো এখন তাদের মাথায় মারতে হবে! যার যেটাতে ভাললাগা ও ঘৃনালাগা, সে সেটার ক্যাম্পেইন করবে এইতো স্বাভাবিক। তবে আমার কাছে সামহোয়ার ভাললাগার চেয়ে বাটাকে ঘৃনালাগে বেশী গুরুত্ব পেয়েছে কেবল একজন ছাড়া।
পুরো সেমিনারে একটা জায়গায় খটকা লেগেছে। কিছু একটা মিসিং। সেটা কি! ভাবছিলাম আর ভাবছিলাম। সামহোয়ার কেন যেন ঠিকমত কমিউনিকেট করতে পারছে না। কেন পারছেনা সেটা একটু পরে খোলসা হলো, সামহোয়ারের মিডিয়া, এ্যাডফার্ম, লেখক, রাজনীতিবিদদের কাছে ভাল একসেস আছে, চমৎকারভাবে উপস্থাপন করতে পারে এমন একজন পরামর্শক/প্রেজেন্টার নেই। বারবার মনে হলো, এমন একজন ব্লগার ব্রাত্য রাইসু অবশ্য সম্পূর্ণ ভলান্টারিলি সামহোয়ারকে একটা ভিন্ন হাইটে নিয়ে গিয়েছেন। যদি সে সামহোয়ারের পরামর্শক হিসাবে কাজ করে নিঃসন্দেহে আরিলের 2007 এর লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা সম্ভব। আমার পুরো সেমিনার থেকে আর কোন প্রাপ্তি নেই, কেবল শনিবার বিকেল 5 টাতে কারো অনুপস্থিতির জন্য সামহোয়ারে না যেতে পারার দুঃখবোধ ছাড়া।
সর্বশেষ এডিট : ১৯ শে ফেব্রুয়ারি, ২০০৭ রাত ১২:৪৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


