কিছুটা বিষাদ, কিছুটা অভিমান আর তীব্রভাবে প্রত্যাখানের পরেও বনবাতাসীকে দেখে ভাল লাগে। সে যা বলুক, ভাবুক তাকে তো ভালবাসি, সারাজীবন ভালবেসে যাব এমন একধরণের বোধ জন্ম হতে থাকে নিজের মধ্যে। দ্্বিতীয় কালের সে বোধ তৃতীয় কাল ছাপিয়ে এখন চতুর্থকালেও এমনভাবে ধ্রুব। বনবাতাসী ও আমি এখন আর মিলনের স্বপ্ন দেখিনা। যৌথ সন্তানের স্বপ্ন দেখি না। সে চাকুরী করে, বাসায় মা ও দুইভাই নিয়ে সুখের সংসার। বাবা কিছুদিন হলো মারা গিয়েছেন। মাও চাকুরী করে। গভীর রাত্রে তাহাজ্জুদের নামাজ পড়ে মেয়েকে বুঝান, কৌশিকের সাথে তোর মেলামেশা ঠিক হচ্ছে না! তার সংসার আছে, এটা ঠিক তুই ডাকলে সে চলে আসবে, কিন্তু ভেবে দ্যাখতো, সেটা কি ঠিক হচ্ছে!
বনবাতাসী মায়ের কোলে মুখ গুজে থাকে। তার চোখে বিন্দু বিন্দু অশ্রু জমে। মনে পড়ে হাসপাতালের ছোট্ট শিশুগুলোর কথা। কিউট, ছোট্ট বাচ্চাগুলোকে গতকাল যখন আদর করছিল তা আমাকে জানানোর জন্য কি ব্যকুল হয়ে ছিল। কি এক নেটওয়ার্ক গোলযোগে মোবাইলে সংযোগ হচ্ছিল না। মা মেয়ের চুলে বিলি কাটে। বনবাতাসী স্বপ্নরাজ্যে ঢুকে পড়ে। সদ্য স্বামী হারানো স্ত্রী একটা দোয়া পড়ে মেয়ের মাথায় ফু দিয়ে দেয়। সে ফু'য়ের শক্তিতে বনবাতাসীর দুঃখ ঘোচে। স্বপ্নে দেখে অদ্ভুত সুন্দর এক বাচ্চা রাজপুত্রকে, একটা গালিচাতে সওয়ার হয়ে উড়ে যাচ্ছে। যতদূরে যাক না কেন সে দৃষ্টিসীমায় থাকে। সে হাসছে খিলখিলিয়ে। ডান গালে বড় একটা টোল পড়ে। অনেকদূর ঘুরে এসে সে আবার বনবাতাসীর কোলে মা বলে ঝাপিয়ে পড়ে, তার বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় এ বাচ্চাটা তারই! ঘুমের মধ্যে হেসে ওঠে বনবাতাসী, পাশের রুমে তার মা তখনও ঘুমিয়ে পড়েনি, মেয়ের হাসি শুনে তার বুক চিড়ে একটা দীর্ঘনিশ্বাস বের হয়ে আসে, এই এক সমস্যা হয়েছে মেয়েটির, ইদানীং ঘুমের মধ্যে হাসে!
আমি বনবাতাসীর মত নিজের সন্তানের স্বপ্ন দেখি না। সেটা অন্য একটা কারণে। সেখানে একটা হারানোর ব্যাথা আছে। প্রতিদিন দুই মানুষে কনভার্সন হওয়াটা একটা ভারসাম্যমূলক পরিস্থিতি। এই গুণটা আমার মধ্যে চমৎকারভাবে আছে বলে শরৎ বলেছিল বনবাতাসীকে। মধ্যবিত্তরা আসলে কোন বেরিয়ার ভাঙে না। আমি তার প্রতিনিধি। তারা দুজন একমত, আসলে মধ্যবিত্তরা কোন বেরিয়ার ভাঙতে জানে না। আমি ভিন্নমতে। ভারসাম্যমূলক পরিস্থিতি একটা মানুষের নিজস্বতা, কেউ আবেগে বন্দী থেকে লজিককে ছাড়িয়ে দেয়। যেমন বনবাতাসী বলে, তার লজিক বাড়ীর আলমারীর উপরের তাকটাতে বন্দী আছে। আপাতত তার সাথে নেই। তার লজিক সাথে থাকলে আমার সাথে মিশতো না। আমার আছে এর এন্টি লজিক। যাতে আমি তার সাথে এভাবেই বাস করার যুক্তি দেখাই। এটা আবেগতাড়িত লজিক। যেভাবে হোক এটা সংঘাতপূর্ণ হচ্ছে না আমার লাইফস্টাইলে। খাচ্ছি-দাচ্ছি, ঘুমাচ্ছি, সংসার যাপন করছি, সব তো একটা জিনিসের সরবরাহ ঠিক থাকায়। বনবাতাসী আছে - এর চেয়ে বড় প্রশান্তি আর কিছু নাই।
সংসার হচ্ছে একটা লাভজনক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মত। যেখানের প্রধান সেলিং প্রোডাক্ট হচ্ছে মানবসম্পদ। রেভিনিউ থাকবে, ব্যয় থাকবে। মাসিক বাজেট। সব কর্মকান্ড ঠিক মত চলছে কিনা সেজন্য পর্যবেক্ষণ, প্রতিটি কাজ সুচারুভাবে সম্পাদনের যোগ্যতা। সময়মত কাজ করা ও করিয়ে নেয়া। ভিজিটরসকে অভ্যার্থনা। তাদের সাথে সংসার প্রতিষ্ঠানটির ভালোদিকটা তুলে ধরা। যা এর প্রচারণা ও বিকিকিনির জন্য সহায়ক হবে। সামাজিক অবস্থানগত লাভলাভের বিষয়ে। থাকতে হবে সমস্ত স্টেকহোলডার যেমন বাবা, মা, আত্মীয়স্বজনদের সাথে সমন্বয়, উত্তম যোগাযোগব্যবস্থা। একটা আরএন্ডডি খাত থাকতে হবে। সেখানে হবে উন্নয়নের পরিকল্পনা। এখানে ঠিক আবেগ ও উচ্ছাসের বাঁধ ভাঙা জোয়ার কার্যকরী হবে না। আমি তেমন একটা সংসারে বসে সন্ধ্যা থেকে ক্রিকেট বিশ্বকাপের খেলা দেখি। কয়েকদিন যাবত বাসায় একজন পার্টটাইম এমপ্লয়ী কমে গেছে। কাজের বুয়া নেই। চারদিকে বিজ্ঞপ্তি দিয়েও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। গৃহকতর্ীর কাজের সাথে হাত মিলিয়ে এসিসটেন্টের অভাব দূর করতে হয়। প্রথম কাজ হচ্ছে কাপড়-চোপড় ধোয়া। প্রায় আটদশটা বিভিন্ন লেন্থের কাপড় বালতিতে গরম পানির মধ্যে হুইল পাউডার দিয়ে চুবিয়ে রেখে দিলাম। এটা আমার ইন্টানর্ীশিপ চলছে। কাজেই গৃহকতর্ী দেখিয়ে দিলেন কিভাবে পরিষ্কার করতে হয়। আধঘন্টা পরে কাপড় কাচতে হবে। এর জন্য দেখলাম বেশ শক্তির দরকার। ভাগ্যত আমার শরীর স্বাস্থ্য ভাল বলে তেমন পরিশ্রম হলো না। তারপরেও যথেস্ট কষ্টসাধ্য কাজ। কিন্তু বাসায় আগে যে বুয়াটা ছিল, তার কথা মনে পড়ে। ক্যাটক্যাটে শরীরে বিছানার চাদরের মত এত বড় একটা কাপড় কিভাবে সে পরিষ্কার করতো ভেবে হয়রান হই। প্রায়ই দেখতাম তার ধোয়া কাপড় ঠিকমত পরিষ্কার হয় না। সেজন্য অনুযোগও করতাম। নিজে কাজ করে মনে হলো, পঞ্চাশোর্ধ কাজের বুয়া যে স্বল্প রেমিনারেশনে কাজ করে তাতে তার নিজের খাদ্য, স্বাস্থ্য, চিকিৎসা সংস্থান করে বিছানার চাদর ফকফকা করা দুঃসাধ্য কাজ।
সর্বশেষ এডিট : ১২ ই এপ্রিল, ২০০৭ রাত ২:৪৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



