টিভির সামনে বসে এক চ্যানেলে স্থির থাকা অসম্ভব। খুব খেয়াল করে দেখলাম আমি ও ঘরকতর্ী দুজনাই অনবরত ফ্লিপ করতে থাকি চ্যানেল, তবে যেদিন তার হাতে রিমোটের কন্ট্রোল, সেদিন আমি স্রেফ দর্শক। তার পছন্দের চ্যানেলগুলোতে বিজ্ঞাপন বিরতী শুরু হলেই অন্য চ্যানেলে চলে যায়। বাংলাদেশী 8/10টা চ্যানেল প্রথম দিক থেকে সাজানো। এ চ্যানেলগুলো ঘুরে সে যদি নাটক, বিনোদন টকশো, বা পছন্দের কোন গান হতে না দেখে তবে তার পরবতর্ী পছন্দ সনি, স্টার প্লাস ও জি টিভি। সেখানে এ্যাড হলেও সে খুব মনযোগ দিয়ে সেগুলো দেখে। ফিলমের গান হলে তাও দেখে। এর পাশাপাশি চ্যানেলগুলো হলো ইনডিয়ান বাংলা। সেখানেও মাঝে মাঝে স্থির হয়। এর বাইরে জি ট্রেনডজ, জি ক্যাফে সাথে ভিডিও চ্যানেল ঘুরে আসে। আমি ঐ ভ্রমণকালিন সময়ে মূলত ব্যস্ত থাকি বই ও পেপার পড়া নিয়ে অথবা ফোনে। রিমোটটা ঘুরে আমার হাতে আসে কয়েকটা ঘটনা ঘটলে। এক, যদি ডালটা পুড়তে থাকে চুলায়, অথবা অন্য একটা ডিস রান্নার সময় হয়। দুই, কোন গেস্ট আসলে। তিন, তার কোন ফোন আসলে। এসময়ে আমার হাতে চ্যানেলগুলো যেভাবে খেলতে থাকে তার মধ্যে বাংলা নিউজ প্রধান হয়ে পড়ে। তারপরে আল জাজিরা, সিএনএন, বিবিসি, এইচবিও, স্টারমুভিজ। এর বাইরে আমার আর কিছু দেখার নেই। অবশ্য পুরো টিভিশোটা চলে একমাত্র রাত্রিতে। ইদানীং অবশ্য সকাল 7টার খবর দেখার জন্য ঠিক 7টাতে ঘুম থেকে উঠে আধঘন্টার মত টিভির সামনে থাকি। দিনযাপনে পালা বদলের জন্য আরো দুইঘন্টা আগে ওঠার চিন্তাও করছি। সেক্ষেত্রে 12টায় ঘুমাতে গেলে প্রয়োজনীয় 5ঘন্টার জন্য নিদ্রাদেবীর দর্শন হয়ে যাবে। যা এখন 2টায় দেখা শুরু করি।
কোনএকদিন এমন রাত্রে কিছু গেরস্থালী কাজ অত্যাবশকীয় হয়ে পড়ে। ইদানীং আটা, হলুদ, মরিচ কিনে কলে ভাঙিয়ে খাচ্ছি। রোকনউদ্দোলা ভেজাল বিরোধী অভিযান শুরু করার পরে প্যাকেটজাত খাবারে আস্থা পাচ্ছি না তেমন। অবশ্য বিভিন্ন খাদ্যসামগ্রী প্যাকেট হয়ে বাজারে আসার পদ্ধতিটা চালু হয়েছে চোখের সামনে। যতদূর মনে পড়ে বনবাতাসীর সাথে প্রথম কালে এমন পদ্ধতি দেখিনি। সামরিক শাষণের শেষ সময়। নতুন বাংলাদেশ গড়বো মোরা এমন শপথবিদ্ধ লাঙলখোচিত পোস্টার দেখি ওয়ালে ওয়ালে। একজন জেনারেল তার চমৎকার হাসিতে মুরে রেখেছে পুরো বাংলাদেশ। কিছুদিন আগে প্রলয়ংকারী বন্যা হয়েছে। সে বন্যায় আমরা যে বাসায় থাকি তার নিচতলা পর্যন্ত ডুবে গিয়েছিল। তার পরে সেই রাষ্ট্রপ্রধানের লেখা গান বাজতো পাড়ায় তার রাজনৈতিক অফিসে। এন্ডু কিশোরের গলায় চমৎকার সে গানের কালেও মুদি দোকানে প্যাকেট সমৃদ্ধ চাল, ডাল, আটা, হলুদ মরিচ আসা শুুরু করেনি। এগুলা গুড়া করার জন্য ছোট ছোট মিল তখন প্রতিটি বাজারে থাকতেই হতো। বাবার সাথে বাজারে গেলে একটা সময় কাটাতে হতো সে মিলে। হলুদ মরিচ, গম ভাঙাতে দিয়ে আমাকে বসিয়ে রেখে সে কাচাবাজারে যেত। ক্লাস টেনে পড়ি। চোখে প্রেমের রঙ। বনবাতাসী থাকে বাসার নীচতলাতে। আমার ছোট বোনের কাছে বনবাতাসীর কবিতার খাতা দেখে সেখান থেকে কয়েকটা কবিতা নিজে লিখে নিয়ে ছিলাম। সেটা পকেটে পকেটে ঘোরে। হলুদ ভাঙাতে এসে মিলের ভেতরে একটা চেয়ারে বসে সে কবিতা পকেট থেকে বের করে পড়ি।
আজকে অনেকদিন পড়ে চতুর্থকালে এসে নিজেই একটা সংসারের কাপ্তান। মাঝখানে অনেক প্যাকেটজাত পন্যের কেনাবেচা হয়েছে। জীবন অনেক সহজ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু রোকনউদ্দোলা সে জীবনে ব্যাঘাত ঘটিয়েছেন। চোখের সামনে ধরিয়ে দিয়েছেন কি ভয়ংকর সব বিষাক্ত কেমিকেল, দ্রবাদী মেশানো হচ্ছে আটা, হলুদ মরিচে। বাঁচার জন্য আস্ত হলুদ, মরিচ, গম কিনে ভাঙাতে যাই মিলে। আর মিলের সামনে বসে পকেট হাতরে বের করি ইনবক্স। সেখানে একটা কবিতা জমা পড়েছে সেই বনবাতাসীর। সেই মিল, সেই কবিতা - অথচ মাঝখানে ষোলো বছর নেই।
সর্বশেষ এডিট : ১২ ই এপ্রিল, ২০০৭ রাত ২:৪৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



