somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

হারিয়ে যাচ্ছে আবহমান বাংলার সিঁধেল চুরি!

২৩ শে মে, ২০০৭ সকাল ১০:৩৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ছোট্টবেলা আশ্চর্যরকমের অবাক হয়েছিলাম যে জিনিসটা দেখে সেটা হচ্ছে সিঁধেল চুরি। অভিনব, আয়োজনে ব্যতিক্রমী, অনন্য প্রতিভাধর মানুষটিকে চোর অভিধাতে তখন যারপরনাই অবাক হতাম। ভাবতে শুরু করলাম চোর বোধহয় আসলে খারাপ কিছু নয়, প্রচন্ড সৃজনশীল, কিন্তু সবাই তাকে কেন মারে এ নিয়ে আমার বিষ্ময়ের সীমাপরিসীমা থাকলো না। এরও আগে আমার ধারণা জন্মেছিল চোর মানে হচ্ছে এক ভিন্ন প্রানীর নাম। যার মাথায় দুটো শিং থাকে। সেই শিং দিয়ে সে মাটির ঘরে গর্ত খুঁড়ে ভেতর ঢোকে এবং সব জিনিস নিয়ে যায়। পরে একবার এক চোর দেখে আমার ভুল ভেঙে গেল। সেটা ছিল ছিঁছকে চোর। সে গর্তখুড়েও ঢোকেনি। কিন্তু রাতের বেলা পাড়াপড়শী যখন তাকে ধরে মেরে গাছের সাথে বেঁধে রাখলো, তখন আমি অবাক হয়ে বাবাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, চোরটার শিংগুলো কই? বাবা আমাকে কোলে নিয়ে ভুল ভাঙান, চোরের আসলে শিং থাকে না। তারা আমাদের মতই মানুষ।

তারপরে একদিন সিঁধেল চুরি দেখলাম। নানাবাড়ী গেছি শীতের বাৎসরিক ভ্রমনে। ফাইভে পড়ি। মামাতা, খালাতো ভাইবোনে পুরো বাড়ী তখন সরগরম। সবাই ঐসময়ে নানাবাড়ী বেড়াতে যেত। সব বাড়ীতেই শহুরে অতিথিদের ভিড়। সিঁধেল চুরিও তখন বেড়ে যেত। একদিন সুবহেসাদিকের মোরগডাকার আগে লোকজনের হৈচৈ রৈরৈতে ঘুম ভেঙে গেল। শীতের লেপের মধ্যে নানীর বুকের ওম গেল চলে। জানা গেল চোর ধরা পড়েছে। পাশেই মামার বাড়ী সিঁধ কেটেছে। একদংগল মামাতো-খালাতো ভাইবোন বিছানা ছেড়ে দৌড়ে নামি উঠনে। মামার ঘরের পেছনের দিকের মাটির ফ্লোরে একটা বড়সড় সিঁধ। সেটা গিয়ে উঠেছে ঘরের ভেতরে। চোর সেই গর্ত দিয়ে ভেতরে ঢুকে আলমারীর তালা ভেঙে জামাকাপড়, টাকাপয়সা, স্বর্নালংকার নিয়েছে। কিন্তু ঘরের কেউ টের পায়নি। তবে হতভাগ্য চোর এ তাবৎ কর্মযজ্ঞ চালাতে বোধহয় বেশী দেরী করে ফেলেছিল। ফলশ্রুতিতে ভোররাত্রির লঞ্চ ফেরত নতুন অতিথিদের সামনে পড়ে যায়। সহযোগীবিহীন একাকী চোরকে হাতেনাতে পাকড়াও করা হয়।

আমরা সেই সিঁধ দেখে মহানন্দে নেচে উঠলাম। আমার শখ হলো ঐ সিঁধ বেয়ে ঘরের মধ্যে ঢোকা। চোরের তুলনায় সাইজে অনেক ছোট হয়েও সে গর্ত বেয়ে ঘরের গভীরে প্রবেশ করা এক রোমাঞ্চকার এডভেঞ্চারের মত মনে হলো। আমি ঘরের ভেতরে ঢুকে মামাত বোনদের সামনে পড়লাম। বড় মামাত বোন আমাকে ধরে মজা করে চোর চোর বলে চ্যাচাতে শুরু করলো। মামী এসে মহাধমক, চোরে জান নিয়ে গেল, আর তোরা মজা করছিস! মামীর ধমকে আমরা দৌড়ে পালাই। চোর দেখতে যাই বৈঠকখানায়। নাদুশনুদুশ চোর লুংগি কাঁছা দেয়া। হাত পেছনে মুড়ে বৈঠকখানার মাঝের একটা থামের সাথে বাঁধা। সমস্ত শরীরে তার মাটি লেগে থাকলেও হাত, পা আর চেহারা তেলচকচকে। পরে জেনেছিলাম, সিঁধ কেঁটে ঘরে ঢোকার আগে সিঁধেল চোরেরা নাকি সমস্ত শরীরে তেল মেখে নেয়।

সেই চোরকে পরে কি করা হয়েছিল তা আর মনে পড়ছে না। কিন্তু তার রাত্রিভর পরিশ্রমের ফসল সিঁধ দেখে আমার তার উপরে মায়া জন্মেছিল। মাঝে মাঝে স্বপ্নও দেখতাম, বড় হলে একদিন সিঁধেল চোর হবো! কিন্তু আমার বৃদ্ধিকালীন সময়ে ক্রমশ বাড়ীঘর গুলো কংক্রীটের হতে থাকায় দিনদিন সিঁধেল চোরের পেশা কমতে থাকলো। এ বিপুল আয়োজনের অভিনব চুরির পদ্ধতি ক্রমশ বিস্মৃত হতে থাকলো গ্রামবাংলা থেকে। অথচ বাংলায় চুরিশিল্পে সিঁধেল চুরি অনেক রূপকথাকেও হার মানায়। লোককাহিনীতে এর নানা উপাখ্যান আছে, নববিবাহিত বধু চোরের সাথে ভেগেছে, সন্তানহীন পিতা চোরকে সন্তানের মত আগলে রেখেছে - এমন গল্পে আমাদের সাহিত্য সমৃদ্ধও হয়েছে।

লুপ্ত প্রায় সিঁধেল চুরি বাংলার আবহমানকালের ঐতিহ্য - এর ইতিহাস সংরক্ষন করা উচিত।
সর্বশেষ এডিট : ২৩ শে মে, ২০০৭ দুপুর ২:০৯
১৫টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

তারেক রহমানের চীন সফর, অশ্বডিম্ব।

লিখেছেন হাসান কালবৈশাখী, ২৭ শে জুন, ২০২৬ রাত ২:৪৭

বাংলাদেশী মিডিয়া সোসাল মিডিয়াতে তোলপার
তারেক রহমানের চীন সফরে ভারত উদ্বিগ্ন।
এখন তো দেখলাম অশ্বডিম্ব।
কোন অর্থায়ন চুক্তি নেই, নতুন কোন ঋন দিবে না
বহুল আলোচিত তিস্তা প্রকল্প নিয়ে কোন চুক্তি বা মামুলি সমঝোতা... ...বাকিটুকু পড়ুন

অপারেশন ইকারুস: জেনেভার ছায়া

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ২৭ শে জুন, ২০২৬ সকাল ৯:০০



বালি অপারেশন শেষ করে ঢাকায় পিবিআই সদর দপ্তরে যখন আরিয়ান, তানভীর ও বর্ষা ফিরে এলো, তখনো বাইরের আকাশ থমথমে। বালি থেকে উদ্ধার করা ৬০% ডেটায় একটি... ...বাকিটুকু পড়ুন

তুরাগের বুকে আমার ছোট ভাইদের লাশ ২০২৪-এর উপহার ‼️

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ২৭ শে জুন, ২০২৬ সকাল ৯:১৩



২০২৪ আমাদের নতুন করে শত্রু মিত্র চিনতে শিখিয়েছে। আমি কোনো করুনা, সান্ত্বনা কিংবা বিচারের দাবি নিয়ে আজকের এই ক্ষুদ্র পোস্ট লিখতে চাই না।শুধু সময়ের স্বাক্ষী হিসেবে একটু আচর কেটে... ...বাকিটুকু পড়ুন

আম গেল ছালাও গেল

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২৭ শে জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৪৩


আমিনুল ইসলাম বুলবুল বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের এমন এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, যার নাম মুছে ফেলা অসম্ভব। ১৯৯৯ সালে ইংল্যান্ডের মাটিতে শক্তিশালী পাকিস্তানকে হারিয়ে বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের মাথা উঁচু করেছিলেন এই... ...বাকিটুকু পড়ুন

সৌর বিদুৎ।

লিখেছেন নাহল তরকারি, ২৭ শে জুন, ২০২৬ রাত ৮:১৮


আমি বিটিভি দেখতে ভালোবাসি। একদিন বিটিভিতে একটি জনসচেতনতামূলক বিজ্ঞাপন দেখেছিলাম। এটি কোনো বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপন ছিল না। সেখানে তৎকালীন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী/মন্ত্রী সোলার বিদ্যুৎ সম্পর্কে সংক্ষেপে বলছিলেন।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×