বিপ্লবী স্কুল শিক্ষকের সহধর্মীনি পোলাও, কোরমা সহযোগে ভুরিভোজের জন্য যখন নিমন্ত্রণ করলো তখন বনবাতাসী নিজেকে ফিরে পেয়েছে। আড্ডায় শরৎ, বাকীবিল্লাহ, চন্দন, জলি, ঝুমা দেশের জঙ্গীবাদের প্রসারে বিএনপি-জামাত সরকারের মুন্ডুপাত করে চলছে। বিকেল পাঁচটাতে রাজনীতির চেয়ে ক্ষুধা নিরাময় অনেক বেশী ফ্যাশনেবল মনে হলো আমার। প্রথম আহবানে আর দেরী না করে খেতে বসে যাই। বাকী ফোড়ন কাটে, খাবারের প্রথমে দেখছি আপনাকে। মারামারির কি শেষে?
মুরগীর ঝোল মাথায় উঠে। হাসতে হাসতে বিষম খেয়ে ফেলি। বনবাতাসীর প্রিয় অনেক কিছুই আমার জানা হয়নি। একজন মানুষের কত কিছু প্রিয়, প্রিয় নির্বাচনের কত ক্ষেত্র, সব জানা হয়ে ওঠে না ঘটা করে। কখনও পথ চলতে জানা হয়, কে মিষ্টি খায় বেশী, কে পছন্দ করে টক, কার লেবু চাই, আর কে খায় না লবণ!
আমাদের সবচেয়ে কাছের মানুষগুলোর এসব জানার জন্য তেমন আয়োজন নেই। একবার অফিসের একটা অনুষ্ঠানে আয়োজন হয়েছিল এমন যে প্রিয় মানুষটির পছন্দের জিনিসগুলো জিজ্ঞেস করা হবে। আমার তখন সবচেয়ে পছন্দের নারী ছিল ছোট বোন ময়নাপাখী। কোথাও পিকনিক, অনুষ্ঠান হলে তাকে নিয়ে যেতাম। আয়োজকরা তাকে জিজ্ঞেস করে জেনে নিয়েছিল তার প্রিয় কয়েকটা জিনিসের নাম। যেমন প্রিয় গান, প্রিয় কবিতা, প্রিয় ফুল এইসব।
তারপরে আমাকে জিজ্ঞেস করলো, আপনার ছোটবোনের প্রিয় গান কি?
আমি হতাশ। ময়নাপাখী ভাল গান গায়। আমার প্রিয় গানগুলো তার কণ্ঠে সবচেয়ে বেশী শুনি। মাঝেমাঝে সে ছাড়া ঐগানগুলি অন্য কারো কণ্ঠে আমার অসহ্য মনে হয়। কারণটা অবশ্য সরল। আমার প্রিয় গানগুলি সে আমাকে শুনাবার জন্য গলায় উঠিয়েছে। একটা আবেগীয় ছোঁয়া থেকেই যায়। কিন্তু তার প্রিয় গান আমার জানা নেই। তাকে গাইতে শুনতাম সবগানই, কিন্তু প্রিয় গানটা তো জেনেছে নিশ্চয়ই তার প্রিয়তম। আমার মাথায় এটা ঢোকে নি। অগত্যা সসম্মানে জিরো স্কোর নিয়ে আমি প্রত্যাবর্তন করলাম। আশ্চর্যজনকভাবে আমার বোন আমার পছন্দের বিষয়ে হান্ড্রেড পার্সেন্ট স্কোর করে প্রথম পুরষ্কারটি নিয়েছিল।
ভোজনপর্বের পরে শাল-গজারী বন ভ্রমণের প্রোগ্রাম। আমার মাথায় ঘুরছে বনবাতাসীর প্রিয় খুঁজে বেড়ানো। জিজ্ঞেস করলাম, তোমার প্রিয় ফুল কি?
কৃষ্ণচুড়া। তোমাকে আগেও বলেছি।
তাইতো! সরি, প্রিয় ফল কি?
সেটাও আগেই বলেছি। আম।
আবারও সরি। আচ্ছা তোমার প্রিয় গান কি?
আমায় প্রশ্ন করে নীল ধুবতারা, আর কতকাল আমি রব দিশেহারা!
কার গানটি?
হেমন্তের! কি আশ্চর্য তুমি গানটা শোননি! তবে আমার প্রিয় শ্রীকান্তের গাওয়া গানটি।
আবারও সরি। ওকে, এখন থেকে গানটির দেখবে সব ইতিহাস খুঁজে বের করবো। কে লিখেছে, কে সুর করেছে, কোন ছবির।
হা হা হা। বনবাতাসী গুনগুনিয়ে গানটি গায়।
শাল গজারী গাছগুলি একই উচ্চতায়, একই দূরত্বে। ছায়াগুলি কৌনিক হয়ে দীগন্তের ফাকফোকড়ে রঙিলা আয়োজনে ব্যস্ত। জংগলের মধ্যে পায়ে চলা পথ, মানুষের পদতলে একটা রেখা তৈরী হয়েছে। আমার মাথায় ঘোরে কেন এই গানটা বনবাতাসীর প্রিয়! কি এমন কারণ! শরৎ তার এনসিরিজে ছবি তোলে। আমাদের হাতের মধ্যে ঘোরে আঙুলের রক্ষাকবচ। একটা জায়গায় এসে হঠাৎ খাড়া একটা ঢাল। বনবাতাসীকে কোলে নিয়ে নেমে যাই জংগলের মাঝে সমতল জমিতে। ধান কাটা হয়েছে শীঘ্রই। জমিতে প্যাচপ্যাচে কাদা মাঝেসাঝে, গতকালই বৃষ্টি হয়েছে। বনবাতাসী স্যান্ডেল খুলে জমির ঘাসে হাঁটে। আমাকেও হাঁটতে বলে। চটি খুলে হাতে নেই। মাটির জমিনের স্পর্শ পেলাম বহুদিন পরে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



