সকাল বেলা মেয়ের সু পালিস করা আমার অন্যতম একটা প্রিয় কাজ। পালিশ করার আগে ছোট্ট দুটি কালো জুতো দেখে আমি বুঝতে পারি মেয়েটা আগের দিন স্কুলে কতটুকু খেলেছে। স্কুল গ্রাউন্ডের কোন অংশে গিয়েছে - কোন রাইডে চড়েছে, ইত্যাদি। জুতায় লেগে থাকা ময়লা অথবা কাদার পরিমাণ বলে দেয় তার স্কুল টাইম কতটুকু আনন্দে কেটেছে।
জুতা হাতে নিয়ে একটা তোয়ালা দিয়ে প্রথমে পরিস্কার করি। তারপরে টিউব-কালি দিয়ে জুতাটার চারপাশে সময় নিয়ে বেশ যত্ন করে কালি লাগাতে থাকি। শক্ত কালি লাগিয়ে ব্রাশ করার চেয়ে টিউব দিয়ে কালি লাগানো অনেক সহজ, ব্রাশ করতে হয় না। কিন্তু আমি ব্রাশিং-এও পটু ছিলাম। এখন কালো পলিশড সু পরি না বলে সু পলিশ করার আনন্দটা মিস করি।
আমার স্কুল বেলায় সুপলিশ করতে হতো নিজের জুতার এবং বাবার জুতারও। প্রথম অবশ্য বাবার জুতাই পলিশ করতে শুরু করেছিলাম নিজে পলিশড ব্লাক সু পরা শুরু করার আগে। কেউ সু পলিশ করতে বলে নি, কিন্তু বাবাকে পলিশ করতে দেখে আমার অদ্ভুত লাগতো। কাজটা মজার মনে হতো। বারান্দায় মড়ায় বসে তিনি অনেক সময় নিয়ে জুতা ব্রাশ করে চকচকে করে ফেলতেন। তার জুতা পলিশ করার অনেক বস্তু-সামগ্রীও ছিলো। একটা খুবই পরিচিত ব্রান্ডের চ্যাপ্টা কালির কৌটা দেখতাম যার ভেতরে শক্ত কালি থাকতো। ব্রাশের তুলির সামনের কোনা সেই কালির উপরে ঘসে নিয়ে জুতায় মাখতে হতো। তারপর ব্রাশ দিয়ে ব্রাশিং। বিভিন্ন স্টাইলে। প্রতিটা ডিটেইল আমার মনে আছে। সেসময় এটাকে দারুণ একটা ভিন্ন কাজ মনে হতো। বাবা জুতা পলিশ করছে আর আমি তার সামনে ফ্লোরে বসে সেই জুতা পলিশ করা দেখছি চোখে রাজ্যের বিষ্ময় নিয়ে। মনে মনে চাইতাম করতে। বাবাকে বলতাম। আমাকে করতে দাও, আমিও করতে পারবো এমন আবদার করে তার কান ঝালাপালা করে দিতাম। তারপর একদিন সুযোগ হলো। বাবা শেখালেন হাতেকলমে হাউ টু সু-পালিশ করা। অবশ্য সেদিন মা কিন্তু বাবাকে বিশাল এক ঝাড়ি দিয়েছিলেন। তোমার এত সাহস...আমার একমাত্র ছেলেকে তুমি জুতা পালিশার বানাচ্ছো!
আমি অবশ্য শেষে জুতা পালিশারই হলাম। এবং বিখ্যাত। বাবার জুতা পালিশ করতে করতে এতই দক্ষতা বাড়লো যে নিজের ও বোনের জুতা পলিশ করার সময় যখন হলো তখন চাকুরীটা আমার পার্মানেন্ট হয়ে গেলো। এমনকি তখন ভাবতাম প্রফেশনালি মুচির কাজ শুরু করবো। বাজারে একটা দোকান দিয়ে বসবো। পড়াশুনা আর করতে হবে না - পড়াশুনার মত জঘন্য কাজ যদি কেরিয়ারের জন্য হয়, তবে সে কেরিয়ার তো আমার এখনই জুতা পালিশ করে জুটিয়ে নেয়া যায়!
আমার মেয়ের জুতা পালিশ করতে করতে জুতার গায়ে লেগে থাকা ময়লা সরিয়ে আমি চকচকে করে তুলি। খুব বেশীদিন এই সুযোগ পাওয়া যাবে না। এই জুতাটা ছোট হয়ে যাচ্ছে, নতুন জুতা কিনে দিতে হবে। এরপরেরটাও বাটার কালো পলিশড সু-ই কিনতে বলেছে মেয়ে, তবে অন্য ডিজাইনের। সে জুতাটা একটু বড় হবে আর আমিও সেটা পলিশ করবো। তারপরে সেটাও পুরান হবে, ছোট হবে। তার আগ পর্যন্ত দক্ষ সু-পলিশারের মত জুতাটা সাইনিং করতে থাকবো স্কুলের সকালে। প্রত্যেকদিনের ময়লা জুতার গা থেকে সরাবো এবং সে সময়ে মেয়ের প্রতিদিনের খেলাধুলা, দৌড়ঝাপ, হাটাচলার চিত্র কল্পনা করার চেষ্টা করবো। এমন করে সে একদিন পলিশড কালো জুতো পরার সময় পেছনে ফেলে এগিয়ে যাবে। তার আগে বর্তমানের প্রতিটা মুহূর্ত - আমার ক্যারিয়ারের সুবর্ণ সময় - অপচয় করতে চাই না।
সর্বশেষ এডিট : ০২ রা আগস্ট, ২০১৫ সকাল ১১:০২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



