প্রথমেই একটু আত্মস্বীকারোক্তি দিচ্ছি –
দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া
ঘর হইতে দুইপা ফেলিয়া ...
নিজ দেশটাকে ঘুরে ফিরে সেভাবে দেখা হয়নি কিনতু অনেকটা একক চেষ্টা ও জেদের কারনেই পড়াশুনা করার জন্য শেষ পর্যন্ত কুয়ালামপুর যাওয়ার সুযোগ করে ফেললাম । সেসময় সার্ক কর্মসূচী চলছিল দেশে। আমার যেদিন ফাইট ছিল সেদিন রাতে সার্ক উপলক্ষে সাজানো সকল আলোকসজ্জা সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয়েছিল। সেরাতে একজন আমাকে SMS করেছিল, ঢাকা নাকি শুধু আমার জন্যই সেজেছে ...। যাই হোক, জীবনে প্রথম প্লেনে চড়ার অভিজ্ঞতা হলো...অভ্যস্ত নই বলেই হয়ত প্লেন চলাকালীন বাতাসের চাপে দু'কান বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছিল ।
বিমানবন্দর থেকে বার হয়ে কুয়ালালামপুরের দিকে যাত্রা শুরু হলো। পথে ঝুম বৃষ্টি , জানলাম এটা ওখানে নিত্যদিনের ঘটনা। দুপাশে সারি সারি পাম গাছ আর পাহাড় নতুন দেশে স্বাগত জানাচ্ছিল। স্থাপত্যকলার অনন্য নিদর্শন পেট্রোনাস টুইন টাওয়ারকে দেখা গেল শহরে প্রবেশ করার অনেক আগেই। প্রাথমিক প্রয়োজনীয় কাজগুলো শেষ করে ফেললাম কুয়ালালামপুর পৌছে। আমার ইচ্ছে ছিল এরপর সরাসরি কলেজ হোস্টেলে উঠার। কিন্তু ওখানে এক বাঙ্গালী বলল আমপাং পয়েন্ট -এ কিছু বাঙালী থাকে তাদের সাথে থাকতেই ভাল লাগবে। আমি সেখানে দুদিন ছিলাম বোধহয়; পাঠকদের কাছে মা চেয়ে সত্যি বলছি ভাল লাগেনি এতটুকু। প্রথমদিন বাঙালীদের সাথে পরিচিত হয়ে তেমন ভাল লাগেনি বরং একটা মানসিক চাপ তৈরী হয়েছিল, মধ্যরাতে জানালায় দাঁড়িয়ে একটু কেঁদেছিলামও বোধহয়। টুইন টাওয়ারকে জানালা দিয়ে দেখা যেত; আমি জানালায় ঠাঁয় দাঁড়িয়ে মধ্যরাত পর্যন্ত টুইন টাওয়ারের একটা একটা করে বাতি নিভে যাওয়া দেখতাম। দ্বিতীয়দিন খাওয়াতে অরুচি ধরে গেল, আমি গোঁ ধরে থাকলাম আমি কলেজ হোস্টেলেই থাকব এবং শেষ পর্যন্ত আমাকে হোস্টেলে নিয়ে যাওয়া হলো।
আমার বাঙলো ধরনের বাড়ি খুব পছন্দ। তাই লাল টালি দেয়া ডুপ্লেক্স, বাঙলো ধরনের বিশাল বাড়িটি দেখা মাত্রই মনে ধরল। দোতালায় বিশাল এক রুম তখন খালি পাওয়া গেল, তবে দিনে দিনে রুমটিতে আমি সহ মোট ছয়জনের জায়গা হলো। আমরা রুমটিকে নিজেদের মত করে সাজিয়ে ফেললাম। আমার রুমমেটরা বেশ লক্ষী ও কাজের ছিল।
বাংলাদেশে আমার হোস্টেল জীবনের কোন অভিজ্ঞতা ছিল না; আমি নতুন জায়গায়, প্রায় ২০-২৫ জন সম্পূর্ণ অপরিচিত মেয়েদের মাঝে আমার প্রথম হোস্টেল জীবন বেশ আগ্রহ নিয়েই শুরু করলাম।
এক এক করে সবার সাথে পরিচিত হওয়া শুরু হলো হোস্টেলের সবার সাথে। আমিই তখন পর্যন্ত একমাত্র বাঙালী ও বিদেশী ছিলাম ওদের মাঝে। তবে পরে আরেক বাঙালী মেয়ে (ওর নাম ছিল জেনি) একমাস ছিল ওই হোস্টেলে। স্বভাবতই আমাকে নিয়ে আগ্রহ ছিল অনেক ওদের মাঝে। সবাই মুসলিম ছিল; 'আইরিন' নামটি তাদেরকে আমার ধর্ম নিয়ে প্রথমে দ্বিধায় ফেলে দিয়েছিল।
আমি একটুখানি গোছানো থাকতে ভীষন পছন্দ করি। আমার আলমারি (দুজন শেয়ার করতাম), পড়ার টেবিল থেকে শুরু করে রান্নাঘরের একটা কোণা আমার মত করে গুছিয়ে ফেলতে দেরী হয়নি। অনেকটা নতুন, ছোট্ট সংসার সাজানোর মত করে নিজের জন্য প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো কিনেও ফেললাম ।
ভাষাগত একটা সমস্যা কাজ করছিল; হোস্টেলের মালয় মেয়েদের অনেকেই ইংরেজী বলতে স্বাচ্ছন্দবোধ করতোনা। কিন্ত মানুষের অভিব্যক্তি, চোখ কিনবা হাতের ইশারা দিয়েও একটা চমৎকার ভাষা তৈরী হয়।
বেশীরভাগ মেয়েরাই সাধারনত বাইরেই খেতো কিনবা ছুটির দিনে KFC, McDonalds -এ ফোন দিলেই খাবার হাজির। বাকীদের সাথে রান্নাঘরের সময়টুকু বেশ মজারই ছিল। ওরা আমার রান্নার প্রণালী আগ্রহ নিয়ে দেখতো , আমিও তাই ।
ডাইনিং থাকলেও, বসার ঘরে, কার্পেটের উপর বসে, টিভি দেখতে দেখতে খাওয়াতেই সবার আগ্রহ ছিল। সেময় একজন আরেকজনকে নিজের মেনু থেকে খানিকটা সাধতোও।
কোরবানীল ঈদ প্রথম নিজের পরিবার, বন্ধু-বান্ধব ছাড়া পালন করেছিলাম। হোস্টেলের প্রায় সব মেয়েরাই ঈদের ছুটিতে হোমটাউন চলে গেল; শুধু আমরা তিন-চার জন রয়ে গেলাম। ঈদেরদিন বিশাল বাড়ি অনেক বেশীই চুপচাপ লাগছিল যেন। কি মনে করে আমি রান্নাঘরে গিয়ে রান্নার আয়োজন শুরু করে দিলাম। সবসময় যাতে ছুটোছুটি না করতে হয় তাই একটু বেশী করেই বাজার করে রাখতাম। মাঝে একবার এক মেয়ে এসে হয়ত নাস্তা হিসেবে নুড্যুলস স্যুপ করতে চেয়েছিল; কিন্তু আমি যেভাবে সবকিছু দখল করেছিলাম (অনেকটা ইচ্ছাকৃতভাবেই) তা দেখে ও যথেষ্ট ভদ্রতার পরিচয় দিয়ে চলে গেল। পোলাউ, মাংস ভুনা, সালাদ আর পায়েস - এই ছিল আমার মেনু। আমি প্লেটে বেড়ে ওদেরকে খেতে দিয়েছিলাম; খুব আগ্রহ নিয়েই খেয়েছিল ওরা। সেদিন বাবা-মা-ভাইয়াকে ফোন করে আমার রান্না করার কাহিনী বলাতে তারা খুব মজা পেয়েছিল। আম্মা জানে আমি টুকটাক রান্না খুব আনন্দ নিয়েই করি। ভিনদেশীদের সাথে আমি একটু নিজের মত করে এভাবেই ঈদ পালনের চেষ্টা করেছিলাম আরকি।
সর্বশেষ এডিট : ১৬ ই মার্চ, ২০০৮ বিকাল ৫:০৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




