ধানমন্ডির বিকেলগুলো সাধারণত মায়া মাখানো হয়। ২৮ নম্বর রোডের দুই পাশের কৃষ্ণচূড়া গাছগুলো যেন ক্লান্ত শহরকে ছায়া দিয়ে শান্ত করে রাখে। দূরের লেক থেকে ভেসে আসা হালকা বাতাসে দিনের উত্তাপ ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায়।
লোবেলিয়া হাউজের পঞ্চম তলার ফ্ল্যাটে বসে আফরোজা বেগম আলমারির ভেতরের শাড়িগুলো গুছিয়ে রাখছিলেন। বয়সের ভারে হাতের গতি কিছুটা ধীর হয়ে এসেছে, কিন্তু অভ্যাসের নিখুঁততা এখনও অটুট। তিনি জানতেন না—এই শান্ত বিকেলের আড়ালে নিঃশব্দে জমে উঠছে এক অশুভ অন্ধকার।
ঠিক চারটার কিছু আগে দরজায় মৃদু টোকা পড়লো।
— “খালা, আমি বাচ্চু… একটু দরকার ছিল।”
বাচ্চুর কণ্ঠস্বর আফরোজা বেগমের কাছে অপরিচিত নয়। দশ বছরেরও বেশি সময় ধরে এই ছেলেটি তাদের পরিবারের একজন হয়ে উঠেছিল। নিঃসন্দেহে দরজা খুলে দিলেন তিনি।
কিন্তু দরজা খুলতেই তার চোখ থমকে গেল।
বাচ্চুর মুখে আজ এক অদ্ভুত চাপা উত্তেজনা। চোখদুটো অস্থির, কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। যেন সে কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে, যেখান থেকে ফেরার আর কোনো পথ নেই।
— “কী হয়েছে বাচ্চু?”
— “খালা… আলমারির চাবিটা একটু লাগবে।”
আফরোজা বেগম বিস্মিত হলেন।
— “চাবি দিয়ে কী করবে? তোমার যা লাগবে আমাকে বলো।”
বাচ্চু আর কিছু বললো না। নিঃশব্দে ভেতরে ঢুকে দরজাটা ভেতর থেকে আটকে দিল।
তার ঠিক পেছন থেকেই বেরিয়ে এলো সুরভী।
মাসখানেক আগে কাজ শুরু করা মেয়েটিকে আফরোজা বেগম খুব বেশি চিনে ওঠার সুযোগ পাননি। শান্ত, সংযত স্বভাবের মেয়েটির মুখে আজ এক অদ্ভুত কঠোরতা।
ঘরের বাতাস হঠাৎ ভারী হয়ে উঠলো।
বছরের পর বছর গড়ে ওঠা বিশ্বাস যখন লোভের কাছে আত্মসমর্পণ করে, তখন সেই বিশ্বাসই সবচেয়ে বিপজ্জনক অস্ত্র হয়ে ওঠে।
আফরোজা বেগম পেছাতে চাইলেন। কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেলেন। পরিস্থিতির অস্বাভাবিকতা তিনি বুঝতে পারছিলেন, কিন্তু দেরি হয়ে গিয়েছিল। ঘরের নীরবতা হঠাৎ অস্বস্তিকর হয়ে উঠলো। সুরভীর হাত কাঁপছিল, কিন্তু চোখে ছিল এক অদ্ভুত দৃঢ়তা। বাচ্চুর শ্বাস দ্রুত হয়ে উঠছিল।
ঠিক সেই সময় দরজার কাছে দাঁড়িয়ে পড়েছিল আঠারো বছরের দিতি।
টিউশনি শেষে ফিরে এসে দরজা খানিকটা ভেজানো দেখে সে অবাক হয়েছিল। ভেতর থেকে আসা অস্বাভাবিক শব্দ তাকে কৌতূহলী করে তোলে। দরজার ফাঁক দিয়ে উঁকি দিতেই সে স্থির হয়ে যায়।
— “আপারা… কী হচ্ছে এসব?”
তার কণ্ঠে আতঙ্ক জমে উঠেছিল।
দিতির চোখে তখন ভয়, বিস্ময় আর অবিশ্বাস একসাথে মিশে ছিল। এই বাড়িতে সে প্রায় নিজের ঘরের মানুষ হয়ে উঠেছিল। আফরোজা বেগম তাকে নাতনির মতো স্নেহ করতেন। মুহূর্তের মধ্যে সেই পরিচিত নিরাপত্তা ভেঙে পড়লো।
বাচ্চু আর সুরভী একে অপরের দিকে তাকালো। সেই দৃষ্টিতে ছিল তাড়াহুড়ো, ভয় এবং মরিয়া সিদ্ধান্তের চাপ।
ঘরের ভেতরের বাতাস যেন জমে গেল। বাইরে তখনও গাড়ির শব্দ, মানুষের চলাফেরা স্বাভাবিক ছিল—কিন্তু চার দেয়ালের ভেতরে সময় যেন থমকে দাঁড়িয়েছিল।
সন্ধ্যা ছয়টা।
দিলরুবা সুলতানা কয়েকবার ফোন করে মাকে না পেয়ে অস্থির হয়ে উঠলেন। আফরোজা বেগম নিয়মিত সময়ে নামাজ পড়তেন। সময় পেরিয়ে যাওয়াটা অস্বাভাবিক লাগছিল।
এক অজানা আশঙ্কা থেকে তিনি বাড়ির কেয়ারটেকার রিয়াজকে ফোন করলেন।
— “রিয়াজ, একটু উপরে গিয়ে দেখে আসো তো। আম্মার ফোন ধরছে না।”
রিয়াজ যখন পঞ্চম তলার ফ্ল্যাটের সামনে পৌঁছালো, দরজাটা সামান্য খোলা দেখতে পেল। সে কয়েকবার ডাকলো—
— “খালাম্মা! খালাম্মা!”
কোনো সাড়া এলো না।
ভয় মিশ্রিত দ্বিধা নিয়ে দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই অস্বাভাবিক গুমোট এক পরিবেশ তাকে আঘাত করলো। ড্রইংরুমের আসবাবপত্র এলোমেলো। আলমারির দরজা খোলা। মেঝেতে ছড়িয়ে আছে কিছু কাপড়।
রিয়াজ আর ভেতরে এগোতে পারলো না। কাঁপতে কাঁপতে নিচে নেমে ফোন করলো দিলরুবাকে।
পুলিশ তদন্ত শুরু করলে ঘটনাটি দ্রুত জটিল রূপ নেয়। প্রথমে এটি লুণ্ঠনের ঘটনা মনে হলেও তদন্ত যত এগোতে থাকে, তত স্পষ্ট হতে থাকে—এটি বাইরের কারো কাজ নয়।
ফ্ল্যাটের ভেতরে জোর করে প্রবেশের কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়নি। সিসিটিভির ফুটেজে দেখা যায়, বিকেলের দিকে বাচ্চু এবং সুরভী একসাথে ভবনে প্রবেশ করেছিল। এরপর তারা আর বের হয়নি।
তদন্তকারীরা আলমারির পাশে পড়ে থাকা একটি ভাঙা চাবির রিং উদ্ধার করে। সেটিই ছিল প্রথম গুরুত্বপূর্ণ সূত্র। বাচ্চুর মোবাইল ফোনের লোকেশন বিশ্লেষণ করেও পুলিশ নিশ্চিত হয়—ঘটনার সময় সে ভবনের ভেতরেই ছিল।
জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে ভেঙে পড়ে সুরভী। জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে বাচ্চুর মধ্যে দ্রুত ধনী হওয়ার এক তীব্র আকাঙ্ক্ষা জন্ম নিয়েছিল। সে বিশ্বাস করেছিল, বহু বছরের বিশ্বস্ততার আড়ালে জমে থাকা সম্পদ হাতিয়ে নেওয়া সহজ হবে। সুরভী প্রথমে দ্বিধায় ছিল, কিন্তু নিজের দারিদ্র্য আর ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা তাকে এই পরিকল্পনায় জড়িয়ে ফেলে।
তারা ভেবেছিল সবকিছু দ্রুত শেষ করে অদৃশ্য হয়ে যাবে।
কিন্তু অপরাধ কখনো নিখুঁত হয় না।
কয়েক মাস পর আদালত কক্ষে রায় ঘোষণার দিন।
পুরো ঘরে পিনপতন নীরবতা।
সামনের সারিতে বসে ছিলেন দিলরুবা সুলতানা। তার চোখে আর অশ্রু নেই—শুধু গভীর শূন্যতা। তিনি তাকিয়ে ছিলেন কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা দুই মানুষের দিকে, যাদের একসময় তিনি নিজের পরিবারের অংশ মনে করেছিলেন।
বিচারক ধীর কণ্ঠে পর্যবেক্ষণ তুলে ধরলেন—বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে সংঘটিত অপরাধ সমাজের জন্য ভয়ংকর উদাহরণ।
হাতুড়ির শব্দে দণ্ডাদেশ ঘোষণা হলো।
সেই মুহূর্তে আদালত কক্ষের দেয়াল ঘড়ির টিকটিক শব্দ অস্বাভাবিকভাবে স্পষ্ট হয়ে উঠলো। সময় এগিয়ে যাচ্ছিল, কিন্তু কিছু ক্ষতি আর কোনোদিন পূরণ হওয়ার নয়।
এই গল্পটি শুধু একটি অপরাধের নয়। এটি বিশ্বাসের ভঙ্গুরতার গল্প।
লোভ যখন মানুষের বিবেককে গ্রাস করে, তখন সে ভুলে যায়—সম্পর্কের কোনো নিরাপত্তা নেই, কোনো বিমা নেই। বন্ধ দরজার আড়ালে কখন যে নিরাপত্তা ভেঙে পড়ে, তা কেউ আগে থেকে বুঝতে পারে না।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


