প্রতি বছর ঈদের ছুটি কাছে এলেই শহরের চেনা রাজপথগুলো এক অন্যরকম রূপ নেয়। চারদিকে এক অস্থির অথচ আনন্দময় ব্যস্ততা। আজ সকালে অফিসের উদ্দেশ্যে বের হয়েই চোখে পড়ল সেই চিরচেনা দৃশ্য—সারি সারি মোটরসাইকেল। পিঠে ভারী ব্যাগ, বাইকের দু-পাশে ঝোলানো বিশালাকার পোটলা, আর চালকের পেছনে পরম নির্ভরতায় বসে থাকা সঙ্গী। কোনো কোনো বাইকে বাবা-মায়ের মাঝে স্যান্ডউইচ হয়ে বসে আছে খুদে যাত্রীটি। এই দৃশ্যটি দেখলেই বোঝা যায়, ইট-কাঠের শহর আজ খালি হতে শুরু করেছে; নাড়ির টানে মানুষ ফিরছে শেকড়ে।
ব্যক্তিগত মোটরসাইকেলে বাড়ি ফেরার এই স্বাধীনতায় যেমন আনন্দ আছে, তেমনি আছে কিছু অঘোষিত ঝুঁকি। গণপরিবহনের ঝক্কি এড়াতে অনেকেই এখন নিজের প্রিয় বাইকটি বেছে নিচ্ছেন। কিন্তু হাইওয়ের উত্তাল ট্রাফিক, বিশালকার বাস আর ট্রাকের মাঝখান দিয়ে ছোট একটি বাইকে যখন দুজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের সাথে স্তূপীকৃত ব্যাগ থাকে, তখন ঝুঁকিটা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। বিশেষ করে বাইকের বাম পাশে শাড়ি-গার্ডের সাথে বড় বড় ব্যাগ বাঁধার ফলে বাইকের ভারসাম্য বা 'ব্যালেন্স' নষ্ট হওয়ার ভয় থাকে। এই ভারসাম্যহীনতা আর অন্য যানবাহনের সাথে সামান্য ধাক্কা লাগার সম্ভাবনা ঈদযাত্রার আনন্দকে বিষাদে রূপ দিতে পারে। একটু সচেতনতা আর নিয়ম মেনে ব্যাগ বাঁধলে এই জার্নিটা হতে পারে নিখাদ রোমাঞ্চের।
আজকের এই উৎসবমুখর পরিবেশ দেখে মনের এক কোণে কেমন যেন একটা অদ্ভুত বিষণ্ণতা এসে ভিড় করল। সবাই বাড়ি যাচ্ছে, সবার একটা গন্তব্য আছে। অথচ আমার কোথাও যাওয়ার তাড়া নেই। সরকারি ছুটি শুরু হয়েছে, শহরটা নিঝুম হতে শুরু করেছে, আর আমি যেন এক স্থবির দর্শকের মতো দাঁড়িয়ে দেখছি সবার ঘরমুখো আনন্দ।
স্মৃতি হাতড়ে ফিরে গেলাম ২০১৬ সালে। তখনো প্রমত্তা পদ্মার বুকে স্বপ্নের সেতু মাথা চাড়া দিয়ে ওঠেনি। স্ত্রীকে সাথে নিয়ে বাইক নিয়ে বেরিয়ে পড়েছিলাম খুলনার উদ্দেশ্যে। ফেরি পারাপারের সেই রোমাঞ্চ, নদীর শীতল বাতাস আর দু-চাকার গতির সাথে একাত্ম হয়ে যাওয়া—সেই ট্যুরটা ছিল আমার জীবনের অন্যতম সেরা স্মৃতি। এবার ঈদেও এক লম্বা ছুটি হাতছানি দিচ্ছে। এই অলস দুপুরের নির্জনতায় মনটা বারবার বলছে—আবার কি বের হওয়া যায় না? কোনো এক অজানা গন্তব্যের উদ্দেশ্যে গিয়ার পাল্টে গতির সাথে মিতালি করা কি খুব কঠিন? হয়তো শেষমেশ আমিও কোনো এক সকালে ব্যাগ গুছিয়ে বাইকটা স্টার্ট দিয়ে দেব। গন্তব্য জানা নেই, কিন্তু রাস্তার সেই আদিম ডাক উপেক্ষা করা কঠিন।
পরিশেষে, যারা নাড়ির টানে বাইক নিয়ে বাড়ি ফিরছেন, তাদের পথচলা নিরাপদ হোক। আপনাদের প্রিয়জনেরা পথ চেয়ে বসে আছে, তাই গতি আর সতর্কতার ভারসাম্য বজায় রাখুন। আর যারা আমার মতো এই জনমানবহীন শহরেই থেকে যাচ্ছেন, তাদের সবার জন্যই রইল ঈদের আগাম শুভেচ্ছা।
সবাইকে ঈদ মোবারক। হ্যাপী বাইকিং টু অল!
সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই মার্চ, ২০২৬ সকাল ৮:৪২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



