এই লেখাটি একটি সম্পূর্ণ ফিকশনধর্মী লেখা। প্রধান অভিযুক্ত এবং বর্তমানে পলাতক ফোরকান মিয়ার মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা কল্পনা করে, তাঁরই দৃষ্টিকোণ থেকে ওই রাতের সম্ভাব্য ঘটনাগুলোর একটি কাল্পনিক চিত্র নিচে তুলে ধরা চেষ্টা করা হলো।
এটি শুধুমাত্র তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি একটি মনস্তাত্ত্বিক নাটকীয় রূপায়ণ (Dramatization):
(অন্ধকার ঘর। ফোরকানের ভারী শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ। তাঁর মনে প্রতিহিংসা, ক্রোধ এবং এক ধরণের বিকৃত বিজয়ের উন্মাদনা কাজ করছে।)
সব শেষ। সব শান্ত। ওরা কেউ আর চিৎকার করবে না। কেউ আর আমার দিকে আঙুল তুলবে না।
কত্ত পরিকল্পনা করতে হয়েছে এর জন্য! গত কয়েক মাস ধরে এই আগুন জ্বলছিল আমার ভেতরে। শারমিনকে আমি সুযোগ দিয়েছিলাম। ও বারবার আমার সাথে ঝগড়া করত ওই দ্বিতীয় বিয়ের কথা নিয়ে। আরে, আমার গাড়ি চালানোর রোজগারের ভাগীদার হবে আরেকজন, তাতে ওর কী? ও তো আমার স্ত্রী, আমার কথা মেনে চলাই ওর ধর্ম। কিন্তু না, ও বিদ্রোহ করত। মনঃক্ষুণ্ন হতো। ও বলত, ও কোথাও যাবে না, আমার সাথেই থাকবে। অথচ আমার কথা শুনবে না!
আজ বিকেলে যখন ওদের নিয়ে ঘুরতে বেরোলাম, তখন একবারের জন্যও মনে হয়নি ওরা আর এই ঘরে ফিরে শান্তিতে ঘুমাতে পারবে না। শারমিন ওই নতুন শাড়িটা পরেছিল। ওর খুব শখ ছিল ওই নতুন হার আর চুড়িগুলোর ওপর। আহা, কত্ত খুশি লাগছিল ওকে! আমার সাথে ঘুরতে বের হয়ে ও যেন ওর সব দুঃখ ভুলে গেছিল। ওর ওই মায়াভরা হাসি দেখে আমার আরও রাগ বাড়ছিল। ও ভাবছিল, সব ঠিক হয়ে যাবে। সব কিছু আমি ভুলে যাব। কিন্তু আমি তো ভোলার লোক না।
শারমিনকে আমি শেষবার সুযোগ দিতে চেয়েছিলাম। ঘুরতে যাওয়ার পথেও আমি ওকে বলেছি, ও যেন আমার কথা শুনে। ও যেন আমার ওই দ্বিতীয় বিয়ের প্রস্তাবে রাজি হয়। কিন্তু ও আবার সেই এক কথা বলতে শুরু করল। ও নাকি আমার সাথে এইভাবেই থাকতে চায়। এই কথা শুনে আমার ভেতরে যে পশুটা ঘুমিয়ে ছিল, ও জেগে উঠল। ও তখন সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল, এই রাতে কেউ আর রেহাই পাবে না।
ঘরে ফিরে এসে আমি দেখলাম রসুল মিয়া ঘুমিয়ে আছে। ওর গায়ে কারখানার ধুলো, সারাদিনের ক্লান্তি। ও আমার শ্যালক, শারমিনের ভাই। কিন্তু ও সবসময় শারমিনের পক্ষ নিত। আমার সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করত। রসুলকে আমি প্রথমে শেষ করার সিদ্ধান্ত নিলাম। ও সবচেয়ে শক্তপোক্ত ছিল। ও বেঁচে থাকলে আমাকে বাধা দিতে পারত।
(রসুল মিয়ার ঘরের কথা কল্পনা করে)
ওকে অতর্কিতভাবে আঘাত করতে হবে। ও যেন বোঝার আগেই সব শেষ হয়ে যায়। আমি ও বিছানার পাশে গেলাম। ও তখন ঘুমে বিভোর। আমি ওর গলায় বড় বড় দুটো কাটা দাগ দিয়ে দিলাম। ও একবার চিৎকারও করতে পারল না। সব শান্ত হয়ে গেল।
(শারমিন আর মেয়েদের ঘরের কথা কল্পনা করে)
শারমিন আর মেয়েরা একঘরে ঘুমিয়ে ছিল। ও তখনো ওই নতুন শাড়ি আর অলংকারগুলো পরেই ছিল। ঘুরতে যাওয়ার সময় শারমিন যে পোশাক পরেছিল, মৃত্যুর সময়ও তাঁর গায়ে একই পোশাক ছিল। এইটাই হয়তো ওর শেষ ইচ্ছা ছিল। নতুন কাপড় আর গয়না পরা অবস্থায় মরে যাওয়ার। এইজন্যই হয়তো ওর নিথর দেহের গলায় চকচকে হার, হাতে চুড়ি আর পরনে নতুন শাড়ি ছিল। এই সাজপোশাক রহস্যজনক মনে হচ্ছে সবার কাছে। কিন্তু এইটা তো পরিকল্পিত ছিল।
আমি শারমিনের গায়ে নতুন কাপড় আর অলংকার পরিয়ে দিলাম। ও যেন বুঝতে না পারে আমি কী করছি। ও যেন ভাবে আমি ওকে ভালোবাসছি। এই সাজপোশাক হয়তো লোকমুখে নানা কথা ছড়াচ্ছে। কিন্তু এইটা ছিল পরিকল্পিত নাটকের একটা অংশ। ফোরকানের সাজানো নাটক বলে মনে হয়েছে সবার কাছে। ঠিকই তো, হত্যার পর ঘটনা ভিন্ন খাতে নিতে কোনো নাটক সাজানোর চেষ্টা করা হয়েছে। এই জন্যই তো শারমিনের গায়ে নতুন কাপড় ও অলংকার পরানো হয়েছিল।
শারমিনের মৃত্যুর পর মেয়েদের পালা। দুই বছর বয়সী ছোট্ট মেয়েটিকে আমি শ্বাস রোধ করে হত্যা করলাম। ও খুব শান্তিতে ঘুমাচ্ছিল। ও কিছুই টের পেল না। ও ভাবছিল হয়তো ওর বাবা ওকে ঘুম পাড়াচ্ছে।
আট বছর বয়সী মেয়েটিকে আমি গলায় দুটি আঘাত করে হত্যা করলাম। ও একটু চিৎকার করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু ওর আওয়াজ বের হলো না।
বড় মেয়ে মীম খানম একটু বাধা দিতে চেয়েছিল। ও আমার সাথে লড়াই করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু ও পারল না। ওর গলায়, মুখে ও হাতে ধারাল অস্ত্রের আঘাত আছে। মীমের মৃত্যুর পর সব শান্ত হয়ে গেল।
(ফোরকান মিয়ার থানার অভিযোগের কথা কল্পনা করে)
ওদের পাকস্থলির নমুনা পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। ওদের নেশা জাতীয় দ্রব্য খাওয়ানো হয়েছিল কি–না তা রিপোর্ট পেলে বলা যাবে। এই রিপোর্টের পর আমি ফেঁসে যেতে পারি। তাই আমি থানার অভিযোগের একটা কপি ওদের মারদেহের পাশে রেখে গেলাম। সেখানে লেখা আছে, শ্বশুর তাঁর স্ত্রীর মাধ্যমে কয়েক দফায় আমার কাছ থেকে ১০ লাখ টাকা নিয়েছেন। এ ছাড়া স্ত্রী তাঁর এক স্বজনের সঙ্গে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কে জড়িয়েছেন। এসব বিষয়ে প্রতিবাদ করায় শ্বশুর ও অন্যরা মিলে আমাকে হাত-পা বেঁধে নির্যাতন করেছেন। এই অভিযোগ দিয়ে আমি নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা করছি।
সব শেষ। সব শান্ত। এখন আমি পালিয়ে গেছি। পুলিশ আমার কোনো খোঁজ পাবে না। তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় গ্রেপ্তারের অভিযান অব্যাহত রাখা হয়েছে। কিন্তু আমি জানি আমাকে ধরা যাবে না। ফোরকান মিয়া আর কেউ পাবে না। আমি তো ওর ভাই মিশকাতকে কল দিয়ে বলেছি, ‘আমার সব শেষ হয়ে গেছে। সবাইকে মাইরা ফেলছি। আমারে আর তোরা পাবি না।’
তথ্য সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো
সংবাদ শিরোনাম: কাপাসিয়ায় ৫ খুন
স্ত্রীর মরদেহের গলায় অলংকার, হাতে চুড়ি, পরনের শাড়ি নিয়ে রহস্য

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

