somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

হাওরের অন্ধকারে

১৭ ই মে, ২০২৬ দুপুর ১২:৪২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

মেঘলা আকাশ। কুয়াশা আর বৃষ্টির চাদরে ঢাকা কিশোরগঞ্জের ইটনার কালিবাড়ি চর। চারিদিকে শুধু থৈ থৈ জল আর নির্জন হাঁটু সমান কাদা। এসআই রাকিব একটা বড় ছাতা ধরে দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর পাশে হাঁটু গেড়ে কাদার মধ্যে বসে আছেন পিবিআই-এর ইনভেস্টিগেটর আরিয়ান।

তাঁর পুরো মনোযোগ কাদার ওপর শুইয়ে রাখা বারো বছরের আরিফের নিথর দেহটার দিকে। ছেলেটার কোমরে বাঁধা একটা আধভর্তি বালুর বস্তা, আর গলায় পাটের দড়ি দিয়ে ঝুলানো দুটো ভাঙা ইট।

রাকিব নিচু স্বরে বললেন, “স্যার, নেত্রকোনার খালিয়াজুড়ি থেকে গত সোমবার রাত একটা নাগাদ নিখোঁজ হয়েছিল। আজ চরের যুবকেরা ঘাস কাটতে এসে এই ডোবায় লাশটা পায়। প্রাথমিক ধারণা, পুরোনো জমিজমার জেরে...

না, রাকিব,” আরিয়ান আলতো করে আরিফের ডান হাতটা তুললেন। তালুর ঠিক নিচে চামড়ায় একটা কালচে সমান্তরাল দাগ বসে গেছে। “জমিজমার বিরোধে বারো বছরের শান্ত ছেলেকে গভীর রাতে কেউ বাড়ি থেকে তুলে এনে এতো দূর চরে মারবে না। জোরজবরদস্তির কোনো চিহ্নও ঘরে ছিল না। তার মানে, ছেলেটি স্বেচ্ছায় পরিচিত কারও সাথে মাঝরাতে বেরিয়েছিল।

আরিয়ান উঠে দাঁড়ালেন। কোটের কাদা ঝেড়ে বললেন, “খুনি খুব মরিয়া ছিল, কিন্তু পেশাদার না। লাশ গুম করার জন্য সে কোনো ভারী লোহা বা বড় পাথর ব্যবহার করেনি। তাড়াহুড়ো করে ঘাটের কাছে যা পেয়েছে—ভাঙা ইট আর আধভর্তি বালুর বস্তা—তাই বেঁধে দিয়েছে। খুনি স্থানীয় এবং এই চরের পথ তার মুখস্থ। আরিফের কোনো ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিল?

সিয়াম নামে একটা ছেলে আছে স্যার, বয়স তেরো। তবে ও বলেছে রাতে ওদের কথা হয়নি।

আরিয়ান চরের ঘাটে বাঁধা একঝাঁক নৌকার দিকে তাকালেন। বাতাসে জেলের জালের আঁশটে গন্ধ ভেসে আসছে। তিনি হঠাৎ সটান হেঁটে একটা ছোট নৌকার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। নৌকার ভেতরে মাছ ধরার জাল দলা পাকিয়ে রাখা।

আরিয়ান জালের সুতাটা হাত দিয়ে ছুঁয়ে বললেন, “আরিফের ডান হাতের কবজিতে যে কালচে দাগটা দেখছ, ওটা জালের সুতা টানাটানির দাগ। আরিফ কি জেলে ছিল?

না স্যার, ও তো স্কুলে পড়ত।

তাহলে দাগটা এই নৌকার জালের। সিয়ামের বাবা কি করেন, রাকিব?

রাকিবের চোখ দুটো চট করে বড় হয়ে গেল। “মাছ ধরেন, স্যার! এই নৌকাটা ওনাদেরই।

আরিয়ানের চোখ দুটো তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল। “চলুন, সিয়ামের বাড়ি যাব। তবে সিয়ামের বাবাকে নয়, আমি আগে সিয়ামের সাথে কথা বলব।

দশ মিনিট পর। সিয়ামের ছোট ঘরের দাওয়ায় বসে আছেন আরিয়ান। তেরো বছরের সিয়াম এক কোণে গুটিসুটি মেরে বসে কাঁপছে। তার বাবা বাইরে দাঁড়িয়ে সন্দিগ্ধ চোখে তাকাচ্ছেন।

আরিয়ান কোনো জেরা করলেন না। সিয়ামের সামনে গিয়ে খুব শান্ত গলায় বললেন, “সিয়াম, সোমবার রাতে আরিফ যখন তোমার নৌকায় উঠেছিল, তখন আকাশটা এমন মেঘলা ছিল, তাই না?

সিয়াম চমকে উঠে আরিয়ানের দিকে তাকাল। তার ঠোঁট কাঁপছে।

আরিফ তোমাকে খুব বিশ্বাস করত,” আরিয়ান সিয়ামের চোখের দিকে তাকিয়ে বললেন। “সে কয়েকদিন আগে এমন কিছু দেখে ফেলেছিল যা তার দেখার কথা ছিল না। তোমাদের মাছ চুরির ঘটনা, তাই তো? সে সেটা তোমাকেই এসে বলেছিল। কিন্তু তুমি ভয় পেয়ে বাবাকে বলে দিলে। তোমার বাবা ভাবল, আরিফ সবাইকে বলে দিলে তোমাদের ব্যবসা শেষ।

আমি... আমি কিছু জানি না স্যার!” সিয়াম কেঁদে ফেলল।

আরিয়ানের কণ্ঠস্বর এবার আরও গম্ভীর ও ভারী শোনাল, “তুমি জানতে সিয়াম। সোমবার রাতে তুমিই আরিফকে ডেকে বের করেছিলে। ও তোমার সাথে নৌকায় উঠেছিল। কিন্তু চরে আসার পর যখন ও তোমার বাবার হাতে রড দেখল, ও পালাতে চেয়েছিল। ও জালের সুতাটা খামচে ধরেছিল জোরে, তাই ওর হাতে দাগ বসে গেছে। মাথায় আঘাতের পর যখন ও ছটফট করছিল, তোমরা ভয় পেয়ে ওর গলা চেপে ধরলে। সিয়াম, নিজের বন্ধুর শেষ চিৎকারটা তোমরা কীভাবে সহ্য করলে?

দাওয়ার বাইরে সিয়ামের বাবা তখন দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করতেই রাকিবের কনস্টেবলরা তাঁকে জাপটে ধরল। আর ঘরের ভেতরে তেরো বছরের সিয়াম মেঝেতে বসে ডুকরে কেঁদে উঠে বলল, “আমি মারতে চাইনি স্যার! আব্বু বলল ও সবাইকে বলে দেবে! আমি শুধু ওকে ডেকে এনেছিলাম...

চর জুড়ে আবার ঝুম বৃষ্টি নামল। নরম কাদার ওপর বৃষ্টির ফোঁটা পড়ার শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই।

আরিয়ান চাদরটা গায়ে জড়িয়ে নৌকার ঘাটের দিকে হাঁটতে লাগলেন। তাঁর পেছনে পুলিশ সিয়াম আর তার বাবাকে গাড়িতে তুলছে।

রাকিব ছাতাটা আরিয়ানের মাথার ওপর ধরে বললেন, “ভয়ংকর স্যার! নিজের বন্ধুই ডেকে নিয়ে গেল মৃত্যুর মুখে?

আরিয়ান মেঘলা হাওরের দিগন্তের দিকে তাকিয়ে ধীর স্বরে বললেন, “মানুষ ভাবে শিশুদের পৃথিবী খুব সরল, রাকিব। আসলে বড়দের পাপের আর ভয়ের সবচেয়ে জঘন্য শিকার হয় এই অবুজ শিশুরাই। ভয় মানুষকে পৃথিবীতে সবচেয়ে নিষ্ঠুর বানিয়ে দেয়।

বৃষ্টির জল আর চরের কাদা মাড়িয়ে আরিয়ানের ছায়াটা দূর অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। চরের ডোবাটা পড়ে রইল এক বীভৎস সত্যের সাক্ষী হয়ে।
সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই মে, ২০২৬ দুপুর ১২:৪২
২টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

কথা বলার ইসলামী রীতি

লিখেছেন আবু সিদ, ১৭ ই মে, ২০২৬ সকাল ১১:৩৩

১. কথার গুরুত্ব ও প্রভাব

কথা নিরপেক্ষ নয়। প্রতিটি শব্দ মানুষের মনে আবেগ ও চিন্তার জন্ম দেয়। ভালো কথা মানুষকে অনুপ্রাণিত করে, সাহস যোগায় এবং মানসিক প্রশান্তি দেয়। অন্যদিকে খারাপ... ...বাকিটুকু পড়ুন

কারিনা কায়সারের মৃত্যু, সোশাল মিডিয়া ও কিছু কথা

লিখেছেন অর্ক, ১৭ ই মে, ২০২৬ দুপুর ১:০৬



কারিনা কায়সারের মৃত্যু দুঃখজনক। কষ্ট পেয়েছি। তার দাদি দাবার জীবন্ত কিংবদন্তি রানি হামিদ সকলের পরিচিত। বহুবার টুর্নামেন্ট খেলতে দেখেছি। অমায়িক মানুষ। কারিনার বাবা কায়সার হামিদও স্বনামধন্য ফুটবলার। মোহামেডান ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

এক টুকরা স্মৃতি!

লিখেছেন মোঃ খালিদ সাইফুল্লাহ্‌, ১৭ ই মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:২৪

চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন ওয়ার্ড। রাত ১১ টা। ইভিনিং এ ১২ বছর বয়সের মেয়ে ভর্তি হয়েছে। ইন্টেস্টিনাল টিবি’র কেস। বাচ্চাটা থেকে থেকেই চিৎকার করছে, আংকেল আমার ব্যাথাটা কমিয়ে দেন।... ...বাকিটুকু পড়ুন

হাতছানি

লিখেছেন আহমেদ রুহুল আমিন, ১৭ ই মে, ২০২৬ রাত ১০:২২

বাঁশবনের উপরে গোধুলীর আকাশে
কি'যে অপরুপ লাগে একফালি চাঁদ,
কাশবনের দুধারে মৃদুমন্দ বাতাসে
ঢেউ খেলে যায় সেথা জোৎস্নার ফাঁদ-
আহা..., কী অপরুপ সেই 'বাঁশফালি চাঁদ' ।

পাখিদের নীড়ে ফেরা কল-কাকলীতে
শিউলী-কামিনী যেথা ছড়ায় সুবাস,
আজানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

মগজহীন গোল্ডফিশ মেমোরি

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ১৮ ই মে, ২০২৬ রাত ১:০১



বাংলা ব্যাকরণ ও বাংলা অভিধান যারা পড়েছেন তাদের জানার কথা “মগজহীন” শব্দ নতুন কোনো শব্দ না। “মগজহীন” শব্দটি বাংলা ব্যাকরণ ও বাংলা অভিধানে কখন কোন সালে নথিভুক্ত হয়েছে? -... ...বাকিটুকু পড়ুন

×