somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বন্ধ দরজার ওপারে

১৮ ই মে, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

মাদারীপুর সদর থানার ইন্টারোগেশন রুমের ভেতরটা নিরেট অন্ধকারের মতো কালো। শুধু টেবিলের ঠিক ওপর থেকে ঝুলতে থাকা একটা তীব্র হ্যালোজেন বাতি মিষ্টি বাড়ৈয়ের ফ্যাকাশে মুখের ওপর এসে পড়েছে। তীব্র আলোয় তাঁর চোখের নিচের কালি আর চামড়ার সূক্ষ্ম ভাঁজগুলো যেন আরও নগ্ন হয়ে উঠেছে। মিষ্টির ঠোঁট দুটো কাঁপছিল, দুই হাত দিয়ে টেবিলের কাঠটা খামচে ধরেছিলেন তিনি।

টেবিলের ওপাশে সম্পূর্ণ শান্ত, পাথরের মতো স্থির হয়ে বসে আছেন পিবিআই-এর ইনভেস্টিগেটর আরিয়ান। তাঁর পরনের ধূসর কোটের হাতা দুটো সামান্য গোটানো। সামনে রাখা এক কাপ ঠাণ্ডা হয়ে যাওয়া ব্ল্যাক কফি, আর একটা প্লাস্টিকের জিপলক ব্যাগ—যার ভেতরে নীল সিল্কের এক টুকরো ছেঁড়া কাপড়।

রুমের একদম কোণে, অন্ধকারের ভেতর ডায়েরি হাতে দাঁড়িয়ে আছেন এসআই নাঈম। ঘরের ভেতরের ভারী বাতাসটা যেন সুঁইয়ের মতো বিঁধছিল।

মিষ্টি বাড়ৈ হঠাৎ তীব্র আলোটার দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে উঠলেন, “স্যার, আমি আপনাদের সব বলেছি! মাঝরাতে ওদের ঘরে হট্টগোল হলো, রাত তিনটায় আমি চিৎকার শুনে পুলিশ ডাকলাম। চিন্ময় নিজের বউ-বাচ্চাকে মেরে নিজে ফ্যানে ঝুলে গেল... এতে আমার কী দোষ? আমি একা মানুষ পাশের ঘরে ঘুমাচ্ছিলাম!

আরিয়ান কফির কাপটা আঙুল দিয়ে সামান্য সরালেন। কাঁচ আর কাঠের ঘর্ষণে একটা মৃদু শব্দ হলো, যা এই নিস্তব্ধ ঘরে তীরের মতো শোনাল। তিনি খুব নিচু, প্রায় ফিসফিসানি স্বরে বললেন, “মিষ্টি দেবী, মানুষ যখন আত্মহত্যা করতে যায়, তখন তার মনের ভেতরের ঝড়টা ঘরের চারপাশের জিনিসে আছড়ে পড়ে। সে সব ওলটপালট করে দেয়। কিন্তু সেই রাতে ওই বন্ধ ঘরের ভেতরে বিছানার বালিশগুলো সুন্দর করে গোছানো ছিল। টেবিলের ওপর আট মাসের শিশুটার জন্য দুধের বোতল গরম করে তৈরি রাখা হয়েছিল।

মিষ্টি চট করে চোখ নামিয়ে নিলেন।

যে মা আর বাবা কয়েক মিনিট পর নিজেদের এবং সন্তানের জীবন শেষ করে দেবেন,” আরিয়ান বলতে লাগলেন, “তাঁরা ভবিষ্যতের জন্য শিশুর দুধ গুছিয়ে রাখবেন না। এটাকে অপরাধ বিজ্ঞানের ভাষায় বলে ‘ফিউচার-অরিয়েন্টেড বিহেভিয়ার’। অর্থাৎ, ইশা দাস জানতেনই না যে তিনি আর কয়েক মিনিট পর বাঁচবেন না। তাঁকে খাবারে ঘুমের ওষুধ দেওয়া হয়েছিল। পোস্টমর্টেমে তাঁর নখে কোনো আঁচড় পাওয়া যায়নি। অথচ একজন সুস্থ মানুষ শ্বাসরোধ হওয়ার সময় নখ দিয়ে খুনিকে ছিঁড়ে ফেলতে চায়। ইশা করেননি, কারণ তিনি মরণঘুমে অচেতন ছিলেন।

তাহলে চিন্ময়?” মিষ্টির গলা শুকিয়ে একাকার। “সে তো ফ্যানে ঝুলছিল! ভেতর থেকে দরজা লক করা ছিল! পুলিশ দরজা ভেঙে ঢুকেছে!

ভেতর থেকে লক করা দরজার একটা খুব পুরনো ট্রিক আছে, মিষ্টি দেবী। দরজার লকটা বৃত্তাকার নব-সিস্টেম (Knob lock)। বাইরে থেকে দরজার ফাঁক দিয়ে একটা শক্ত সুতা বা তার গলিয়ে নবের ওপর লুপ তৈরি করে টান দিলেই ভেতর থেকে লক হয়ে যায়। আপনি যখন রাত তিনটায় পুলিশকে কল করলেন, দরজা ভাঙার নাটকটা তখনই সম্পূর্ণ হয়।

আরিয়ান পকেট থেকে একটা ছবি বের করে মিষ্টির সামনে ছুড়ে দিলেন।

চিন্ময় বাবুর বাম হাতের কড় আঙুলে একটা সুতার কাটার দাগ আছে। তিনি ফ্যানে ঝুলছিলেন, কিন্তু তাঁর রক্তের টক্সিকোলজি রিপোর্টেও চড়া মাত্রার সিডেটিভ (Sedative) পাওয়া গেছে। একজন অচেতন পূর্ণবয়স্ক পুরুষ মানুষ নিজে হেঁটে গিয়ে ফ্যানে রশি বাঁধতে পারে না। আর এখানেই আসে আমার আসল প্রশ্ন।

আরিয়ান চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। হ্যালোজেন বাতির আলোয় তাঁর ছায়াটা দেয়ালজুড়ে লম্বা হয়ে উঠল। তিনি মিষ্টির একদম মুখোমুখি হয়ে নিচু স্বরে বললেন, “একজন অচেতন পূর্ণবয়স্ক পুরুষ মানুষকে একা একজন নারীর পক্ষে টেনে তুলে সিলিং ফ্যানের সাথে ঝুলানো শারীরিকভাবে অসম্ভব। বিজ্ঞানের সূত্র তা বলে না। তার মানে, মিষ্টি দেবী... সেই রাতে ওই ঘরে আপনি একা ছিলেন না। আপনি শুধু একটা চিত্রনাট্য সাজিয়েছেন, কিন্তু ভারী কাজটা অন্য কেউ করেছে।

মিষ্টির চোখ দুটো এবার আতঙ্কে কোটর থেকে বেরিয়ে আসার উপক্রম হলো। তিনি দুই হাতে নিজের মুখ ঢাকলেন।

রুমের কোণ থেকে নাঈম উত্তেজিত হয়ে বললেন, “তাহলে স্যার? সহযোগী কে? মিষ্টির স্বামী তো তিন বছর ধরে ইতালিতে!

স্বামী ইতালিতে,” আরিয়ান চশমাটা নাক বরাবর ঠিক করলেন। “কিন্তু ফ্ল্যাটের একটা অতিরিক্ত চাবি তো অন্য কারও কাছেও ছিল, নাঈম। প্রতিবেশীদের জিজ্ঞেস করেছ, মিষ্টি দেবীর অনুপস্থিতিতে কে এই ফ্ল্যাটের তদারকি করত? কার এই বাড়িতে অবাধ যাতায়াত ছিল?

নাঈম একটু ভেবেই বললেন, “সুমন! মিষ্টির সেই দূর সম্পর্কের ভাই, যে ঘটনার পরদিন সকালেই সবার আগে এখানে এসে কান্নাকাটি জুড়ে দিয়েছিল। পুলিশ আসার আগেই ও প্রতিবেশীদের বলছিল—চিন্ময় নাকি ব্যবসায় অনেক দেনাগ্রস্ত আর ডিপ্রেশনে ছিল।

ক্লাসিক ন্যারেটিভ বিল্ডিং,” আরিয়ান মৃদু হাসলেন। “খুনি সবসময় পুলিশের আগে একটা গল্প তৈরি করতে চায়। কিন্তু সুমন একটা বড় ভুল করে ফেলেছে। চিন্ময়কে ফ্যানে ঝুলানোর সময় সুমনের হাতের ঘড়ির চেইনটা ফ্যানের ব্লেডের সাথে লেগে একটা গভীর আঁচড় তৈরি করেছে। ফরেনসিক টিম ফ্যানের ব্লেড থেকে একটা রুপালী চেইনের লক উদ্ধার করেছে। আর সকালের সিসিটিভি ফুটেজে আমি সুমনের বাম হাতের ঘড়ির চেইনটা ভাঙা দেখেছি। মিষ্টি দেবী, নিজের প্রেমিককে বাঁচাতে পুরো দায় নিজের ঘাড়ে নেওয়ার এই চেষ্টাটা সুন্দর, কিন্তু বিজ্ঞানের লজিক ইমোশন বোঝে না।

ঠিক তখনই ইন্টারোগেশন রুমের ইন্টারকমটা কর্কশ শব্দে বেজে উঠল। নাঈম দ্রুত ফোন ধরলেন। ওপাশ থেকে ভেসে আসা কথাগুলো শুনে নাঈম স্তব্ধ হয়ে গেলেন।

ফোন রেখে তিনি আরিয়ানের দিকে তাকালেন। তাঁর চোখে এখন গভীর শ্রদ্ধা। “স্যার, সুমনকে বাস টার্মিনাল থেকে পালানোর সময় আটক করা হয়েছে। ওর পকেটে এক পাতা ঘুমের ওষুধ আর ভাঙা ঘড়ির বাকি অংশটা পাওয়া গেছে।

মিষ্টি বাড়ৈ এবার টেবিলটা খামচে ধরে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলেন। কিন্তু সেই কান্নায় আর কোনো লুকোচুরি ছিল না, ছিল এক সর্বগ্রাসী পরাজয়ের শব্দ।

আরিয়ান শান্তভাবে দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন। কোটের কলারটা সোজা করে নাঈমের দিকে তাকিয়ে বললেন, “নাঈম, এবার জবানবন্দিটা রেকর্ড করে নাও। সব উত্তর পাওয়া গেছে।

তিনি যখন ইন্টারোগেশন রুমের ভারী লোহার দরজাটা ঠেলে বের হলেন, বাইরে তখন মাদারীপুরের আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামছে। করিডোরের খোলা জানালা দিয়ে ঠাণ্ডা বাতাসের সাথে বৃষ্টির ছাঁট এসে আরিয়ানের মুখে লাগল।

নাঈম পেছন থেকে এসে ছাতাটা বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, “স্যার, একটা জ্যান্ত পরিবার শেষ হয়ে গেল স্রেফ ভালোবাসার টানে?

আরিয়ান চশমাটা পকেটে রাখতে রাখতে ধীর স্বরে বললেন, “মানুষ ভাবে মানুষের সবচেয়ে ভয়ংকর অপরাধগুলো জন্ম নেয় ঘৃণা থেকে, নাঈম। আসলে সবচেয়ে বড় অপরাধগুলো জন্ম নেয় বিকৃত মালিকানাবোধ থেকে। যেখানে মানুষ ভালোবাসার মানুষকেও নিজের সম্পত্তি মনে করে।

বৃষ্টির ঝাপসা আলোয় আরিয়ানের ধূসর কোট পরা অবয়বটি করিডোর দিয়ে থানার মূল ফটকের দিকে এগিয়ে গেল। বাইরে তখনো মুষলধারে বৃষ্টি পড়ছিল, আর থানার অন্ধকার করিডোরে একটা পরিবারের শেষ বিশ্বাসটুকুও ধীরে ধীরে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছিল।
সর্বশেষ এডিট : ১৮ ই মে, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৪
১টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ধূসর ওয়ালেট

লিখেছেন মোহাম্মদ সজল রহমান, ১২ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:৪৭

একটা ধূসর রংয়ের ওয়ালেট
সবুজাভ ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে বের হলো নীরবে
তার শান্ত হাতের উপর চেপে ধরতেই প্রশ্ন -
এটা আমার জন্য ?
ঘাড় নেড়ে সম্মতি দেখেই চঞ্চলতা ছুঁয়ে গেলো... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

যে যায় লঙ্কায় সে হয় রাবণ

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৩২


ব্যাংকের সিএসআর বা কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি (Corporate Social Responsibility) তহবিল জিনিসটা খাতায় কলমে বড়ই পুণ্যের কাজ। ব্যাংক ব্যবসা করে লাভ করবে, সেই লাভের একটা অংশ সমাজের জন্য আলাদা রাখবে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাকি রইলো; কাঁচা কলা

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১৩ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৪৭


স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্মৃতির নৌকা

লিখেছেন সেজুতি_শিপু, ১৩ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:১১

কোন কোনদিন আলোর শৈশবে চোখ মেলে
মাধবীলতার হাসিমুখ সম্ভাষণের ওপাশে স্বচ্ছ আকাশে
এক ঝাঁক কবুতরের ওড়াউড়ি দেখতে দেখতে-
নিজেকে বড় ভাগ্যবান বলে মনে হয়,
চকিতে অপার্থিব আলো যেন ঢুকে পড়ে আত্মায়।

কোন কোন সন্ধ‍্যেয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×