somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

রক্ষকই যখন ভক্ষক: মাদকের নীল থাবা থেকে আমাদের ভবিষ্যৎ বাঁচানোর দায় কার?

০৮ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৫:১১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

যাঁদের হাতে সমাজের নিরাপত্তার দায়িত্ব, সেই হাতই যখন মাদকের কারবারে জড়িয়ে পড়ে—তখন প্রশ্নটা শুধু অপরাধের নয়, প্রশ্নটা মানুষের আস্থার।

সম্প্রতি সাতক্ষীরায় মাদক ব্যবসার অভিযোগে খোদ দুই পুলিশ সদস্যকে উইনসেরেক্স সিরাপসহ গ্রেপ্তার করেছে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, তাঁরা দীর্ঘদিন ধরে এই কারবারের সঙ্গে জড়িত। খবরটি পড়ার পর মনের ভেতর এক অদ্ভুত হাহাকার আর তীব্র বিরক্তি জন্মাল। যাঁদের কাছে মানুষ নিরাপত্তার ভরসা খোঁজে, তাঁদেরই একাংশ যখন এমন অপরাধে জড়িয়ে পড়েন, তখন সাধারণ মানুষ দাঁড়াবে কোথায়?

তবে সত্যি বলতে, এই খবরটি তো কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি আমাদের সমাজ ব্যবস্থার এক গভীর ক্ষতের উপরিভাগ মাত্র।

মাদকের এই নীল থাবা আজ আমাদের সমাজের নানা স্তরে ছড়িয়ে পড়ছে। আর সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে আমাদের যুবসমাজ—আমাদের অনাগত ভবিষ্যৎ।

আমার নিজের জীবনের কিছু স্মৃতি চোখের সামনে ভেসে ওঠে। যখন সরকারি তিতুমীর কলেজে পড়তাম, তখন মহাখালীর সাততলা বস্তি এলাকাটি মাদকের জন্য কুখ্যাত ছিল। গলিঘুঁজিতে, রিকশার গ্যারেজে কিংবা আড়ালে-আবডালে প্রকাশ্যে চলত নেশার বিকিকিনি। কত তরুণকে দেখেছি কেবল নিছক কৌতূহল থেকে, একটু ‘এডভেঞ্চার’ করার বশে কিংবা বন্ধুদের চাপে পড়ে প্রথম মাদক সেবন করতে। প্রথম প্রথম হয়তো শুধুই বন্ধুদের সঙ্গে তাল মেলানো, কিন্তু তারপর? তারপর কখন যে সেটা আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরা মারাত্মক আসক্তিতে পরিণত হতো, তা তারা নিজেরাও টের পেত না। আর ততক্ষণে পেছনে ফেরার পথগুলো কঠিন হয়ে যেত।

আজ তিতুমীর কলেজের সেই দিনগুলো পেছনে ফেলে বহু দূর চলে এসেছি, কিন্তু পরিস্থিতি কি খুব বেশি বদলেছে? না। এখন মাদকের বিস্তার আর কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণি বা এলাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; আমাদের বিভিন্ন সামাজিক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানিক পরিসরেও এর ঝুঁকি আর সহজলভ্যতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

মাদকের এই বিষবৃক্ষ উপড়ে ফেলতে হলে কেবল আইনি পদক্ষেপ যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি ও সর্বস্তরের সামাজিক জাগরণ:

যখন কোনো রক্ষক ভক্ষকের ভূমিকায় নামেন, তখন পুরো ব্যবস্থার ওপর মানুষের বিশ্বাস টলে যায়। এ ক্ষেত্রে নাগরিক সংগঠন ‘সুশাসন জন্য নাগরিক (সুজন)’-এর প্রতিনিধির যে বক্তব্য সংবাদমাধ্যমে এসেছে, তার সঙ্গে সুর মিলিয়ে বলতে হয়—দায়িত্বশীল সংস্থাগুলোতে কঠোর অভ্যন্তরীণ স্বচ্ছতা, ঝুঁকিভিত্তিক 'ডোপ টেস্ট' এবং মাদক-সম্পৃক্ততার বিরুদ্ধে শূন্য-সহনশীলতা (Zero Tolerance) নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।

অধিকাংশ তরুণ প্রথম ভুল পদক্ষেপটি ফেলে মানসিক একাকীত্ব, কৌতূহল বা সঙ্গ দোষে পড়ে। পরিবারে যদি খোলামেলা আলোচনার পরিবেশ থাকে এবং সন্তানের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নজর রেখে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দেওয়া যায়, তবে পথ হারানোর ঝুঁকি অনেকটাই কমে আসে।

মাদক সরবরাহকারী আর একজন আসক্ত তরুণকে একই চোখে দেখলে ভুল হবে। সরবরাহকারী নিশ্চিতভাবেই অপরাধী, কিন্তু আসক্ত ব্যক্তি একজন চিকিৎসা ও মানসিক দিকনির্দেশনা প্রত্যাশী মানুষ। মাদকাসক্তিকে কেবল অপরাধ না ভেবে উপযুক্ত চিকিৎসা, কাউন্সেলিং ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না করলে একজন তরুণকে সমাজে ফিরিয়ে আনা অসম্ভব হয়ে পড়বে।

মাদক বিক্রেতারা সমাজের বাইরে কেউ নয়। পাড়া-মহল্লায় খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক চর্চা এবং স্থানীয় সামাজিক প্রতিরোধের মাধ্যমে মাদকের সাপ্লাই চেইন ভেঙে দিতে হবে।

মাদক কেবল একজন ব্যক্তিকে পঙ্গু করে না; একটি পুরো পরিবারকে নিঃস্ব করে দেয় এবং রাষ্ট্রকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেয়।

মাদক ব্যবসায়ীকে শুধু গ্রেপ্তার করলেই এই যুদ্ধ শেষ হবে না। সেই ব্যবসার পেছনের নেটওয়ার্ক, দুর্নীতি, প্রশ্রয় এবং নীরব সহযোগিতাকেও ভাঙতে হবে। কারণ একটি প্রজন্মকে মাদক থেকে বাঁচানো শুধু পুলিশের দায়িত্ব নয়, শুধু পরিবারের দায়িত্ব নয়, এটি আমাদের সবার সম্মিলিত দায়। আজ যদি আমরা নীরব থাকি, তবে আগামীকাল আমাদেরই কোনো সন্তান যখন বিপদে পড়বে—তখন আমরা এই দায় এড়াব কীভাবে?

আসুন, সচেতন হই। নিজের চারপাশের তরুণ প্রজন্মকে বাঁচানোর দায়িত্ব নিজ নিজ জায়গা থেকে কাঁধে তুলে নিই।
সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৫:১২
৩টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

দেশের দুর্নীতি প্রতিরোধের জন্য একটি কাকতাড়ুয়া মডেল–২০২৬ নীতিপত্র প্রস্তাবনা দৃশ্যমান জবাবদিহি, নাগরিক নজরদারি ও AI প্রযুক্তিনির্ভর অনিয়ম প্রতিরোধ ব্যবস্থা

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ০৮ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৭:০৮


বাংলাদেশে দুর্নীতি ও অনিয়ম মোকাবিলায় প্রচলিত ব্যবস্থার একটি বড় অংশ হলো অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পরে তদন্ত ও শাস্তি।
কাকতাড়ুয়া মডেল–২০২৬-এর দর্শন হবে তার পাশাপাশি অপরাধ সংঘটিত হওয়ার আগেই প্রতিরোধমূলক... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাঁধনের ওপর হামলা নিন্দনীয়- কিন্তু নীতির মাপকাঠি কি সবার জন্য এক?

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ০৮ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:২৩


বাঁধনের ওপর হামলা নিন্দনীয়- কিন্তু নীতির মাপকাঠি কি সবার জন্য এক?

আজমেরী হক বাঁধন ইতালিতে হেনস্তা ও হামলার শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, জুলাই- আগস্টের আন্দোলনে... ...বাকিটুকু পড়ুন

"বাংলাদেশ কি একটি "ব্যর্থ রাষ্ট্রে" পরিণত হতে যাচ্ছে? - জঙ্গিবাদ ও পাকিস্তানপন্থার উত্থান"

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ০৮ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১:০৮


বাংলাদেশ কি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে টিকে থাকতে পারবে - যেখানে আইন, ব্যক্তি স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকারের প্রশ্নগুলো সংখ্যাগরিষ্ঠের ধর্মীয় পরিচয় কিংবা জনতুষ্টিমূলক ও সুবিধাবাদী রাজনৈতিক কৌশল দ্বারা প্রভাবিত না... ...বাকিটুকু পড়ুন

বৃষ্টি ও নিঃসঙ্গতা

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ২:২৬

বৃষ্টি এলে আজকাল আর জানালা খুলে দেই না,
ভিজে রাস্তায় ছাতা হাতে কাউকে খুঁজি না
শুধু মনে হয়, এই যে এত জল ঝরছে আকাশ থেকে,
এদেরও কি কোনো ঠিকানা আছে?

তুমি একদিন বলেছিলে
বৃষ্টি... ...বাকিটুকু পড়ুন

ট্রাক্টরগাজি → চাঁদগাজী → সোনাগাজী → জেনারেশন৭১ কে নিয়ে দুটি কথা।

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ০৮ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ২:৫৯


ব্লগার গাজী সাহেব জ্ঞানী কিন্তু তিনি কট্টরপন্থী তাঁর ছেড়া টাইপের মানুষ তবে আলাপচারীতার লোক হিবেবে উনি খারাপ না। আপনি যদি ওনার সংগে হিজড়া রানূ-র মতো জ্বীহুজুর জ্বীহুজুর বলেন এবং... ...বাকিটুকু পড়ুন

×