somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

কবি ২০২৬

১০ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:১৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


(তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘কবি’ উপন্যাসের প্রেক্ষাপট অবলম্বনে ২০২৬ সালের এক কল্পিত নতুন সংস্করণ)

রাঢ় অঞ্চলের মাটি ২০২৬ সালেও তেমনই তামার মতো তপ্ত। বৈশাখের খাঁ-খাঁ রোদে এখন হাইওয়ে ধরে তীব্র গতিতে ছুটে চলে এসি গাড়ি, আর সেই রাজপথের কোল ঘেঁষে সাঁইথিয়ার মেলার ধুলোয় দাঁড়িয়ে থাকে নিতাই।

নিতাইয়ের কাঁধে ঝুলছে একটা পুরনো সেকেন্ডহ্যান্ড অ্যাকাউস্টিক গিটার। পকেটে একটা সামান্য অ্যান্ড্রয়েড ফোন, যার স্ক্রিনটা জায়গায় জায়গায় ফাটা।

মেলা শুরু হওয়ার আগে মাঠের কোণে একটা শুকনো নিমগাছের নিচে একা বসেছিল নিতাই। চোখ বুজতেই তার মনে পড়ে গেল সেই বিষণ্ন শৈশবের কথা—ডোমপাড়ার মেটে ঘর, আর মদের গন্ধে বুঁদ হয়ে থাকা চারপাশ।

কৈশোরে কুষ্ঠরোগে ভুগে মারা গিয়েছিল তার মা। গাঁয়ের মানুষ দূর-দূর করে তাড়িয়ে দিয়েছিল তাদের। ডোমপাড়ার অপরাধ আর অন্ধকারের বৃত্ত থেকে বের হতে চাওয়া নিতাইকে সমাজ সেদিন বলেছিল, "অপরাধীর রক্ত তোর গায়ে, তুই আবার কবি হবি কী রে?"

কিন্তু নিতাই তো চুরি করতে শেখেনি, সে শিখেছিল বুকের ভেতরের রক্তক্ষরণকে গানে রূপ দিতে। —গাছের কাণ্ড যত কালোই হোক, ফুল তো তার সাদাই ফোটে। নিতাইয়ের ডোমপাড়ার সেই কাদা থেকে ফুটেছিল তার কবিতার ফুল।

মেলার মাঠে তখন আলো ঝলমল করছে। সাউন্ড সিস্টেমে কানফাটা বেজে চলেছে আধুনিক রিমিক্স গান।

আকাশ নামে কুড়ি-বাইশ বছরের এক তরুণ ভিডিওগ্রাফার তার দামি ক্যামেরা আর গিম্বল নিয়ে নিতাইয়ের সামনে এসে দাঁড়াল। সে নিতাইকে কয়েক মুহূর্ত গিটার বাজাতে দেখে চোখ গোল-গোল করে বলল,

"ভাই! আপনার এই চেহারা, গায়ে ছেঁড়া ফতুয়া আর হাতে পুরোনো গিটার—ইউনিক কনটেন্ট! দাঁড়ান, একটা ১৫ সেকেন্ডের রিলস বানাই। ইনস্টাগ্রামে পোস্ট করলে রাতারাতি মিলিয়ন ভিউ হবে, স্পন্সর পাবেন, লাখ লাখ টাকা কামাবেন!"

নিতাই বিষণ্ন চোখে তরুণটির দিকে তাকাল। তার মুখে নেমে এল সেই নির্মোহ হাসি।

"কনটেন্ট?" নিতাই ধীরস্বরে বলল। "ভাই, গান তো কোনো ব্যবসাপাতি নয় যে তার 'ভিউ' মেপে দাম ঠিক হবে। এই গান আমার বুকের কষ্ট, হাজার ভিউ দিয়া কি বুকের সেই হাহাকার মুছবে?"

"আরে ভাই, আবেগ দিয়া ভাত জোটে না!" আকাশ বিরক্ত হয়ে বলল। "এখন গানের দাম নির্ধারণ করে 'ভিউ' আর 'লাইক'। অ্যালগরিদম যা চাবে, তা-ই বানাতে হবে। যুগের সাথে না চললে পচে মরবেন!"

নিতাই আকাশকে পেছনে ফেলে হেঁটে চলে গেল। নিচু স্বরে বিড়বিড় করে বলল, "আরে ব্যাডা, আমি গান করি মানুষের জন্য, তোদের ওই অ্যালগরিদমের জন্য না।"

আজকের বাজারে শিল্পীরা আর শিল্পী নেই, তারা সব কনটেন্ট ক্রিয়েটর। নিতাই যখন ভিড়ের মাঝে দাঁড়িয়ে কোনো গভীর বিষাদের গান গায়, কেউ তাকে একটা পয়সাও দেয় না; কিন্তু যখনই মেলা মাতানো চটুল গান গায়, তখন টাকার বৃষ্টি হয়। এই চরম বাণিজ্যিকীকরণের ধ্বংসলীলা নিতাইয়ের ভেতরটাকে প্রতিনিয়ত দুমড়ে-মুচড়ে দেয়।

মে মাস ২০২৬। কলকাতার এক অভিজাত সাহিত্য আসরে ডাক পড়েছিল নিতাইয়ের। গ্রাম বাংলা থেকে উঠে আসা এক 'র গ্রামীণ গায়ক' হিসেবে তাকে এক কোণে জায়গা দেওয়া হয়েছিল—শুধুমাত্র শহরের সুশীল সমাজকে একটু বৈচিত্র্যের স্বাদ দেওয়ার জন্য।

মঞ্চের আলো ঝলমল করছে। সামনে সারিবদ্ধভাবে বসে আছেন শহরের নামজাদা কবি, সাহিত্যিক আর কর্পোরেট কর্তা।

দ্বিতীয় সারিতে বসে ছিল রাজলক্ষ্মী—নিতাইয়ের ছেলেবেলার সেই ‘ঠাকুর’। পাশে তার আইটি সায়েন্টিস্ট স্বামী। রাজলক্ষ্মী আজ দামি সিল্কের শাড়ি আর হিরের গহনায় সাজানো এক রাজরানি।

নিতাই মঞ্চে উঠে দাঁড়াল। তার চোখে-মুখে কোনো দ্বিধা নেই, কোনো অহংকারও নেই।

মাইকের সামনে দাঁড়িয়ে নিতাই শহরের এই কৃত্রিম আলোর দিকে তাকাল না, সে চোখ বুজে চলে গেল তার সাঁইথিয়ার সেই ধুলোয় ভরা স্মৃতিতে। গিটারের তারে আঙুল ছুঁইয়ে সে তার সুরটা ছাড়ল—যে সুরটা একসময় শুধু রাজলক্ষ্মীর জন্য বাঁধা হয়েছিল:

আমার চোখ তোরে খোঁজে না আর,

খোঁজে সুরের সীমানা...

ঠাকুর তুমি তো দূরের আলো,

আমার অন্ধকার তো তুমি বুঝলে না..
.”

নিতাইয়ের কণ্ঠের সেই অলৌকিক বিষাদ পুরো শীতাতপনিয়ন্ত্রিত হলঘরটাকে স্তব্ধ করে দিল।

দ্বিতীয় সারিতে বসে থাকা রাজলক্ষ্মীর চোখের কোণ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। কিন্তু সে কোনো সাড়াশব্দ করল না। পাশে বসা স্বামী বিরক্ত হয়ে ঘড়ি দেখল, রাজলক্ষ্মী চোখ মুছে কৃত্রিম হাসি হেসে স্বামীর দিকে তাকাল।

গান শেষে করতালি পড়ল। নিতাই মঞ্চ থেকে নেমে একমুহূর্ত রাজলক্ষ্মীর মুখোমুখি দাঁড়াল। দুটি চোখের দৃষ্টি মিলল। কিন্তু রাজলক্ষ্মী একটা শব্দও বলল না, চোখ সরিয়ে নিল।

নিতাই মৃদু হাসল। সে বুঝে গেল—ঠাকুর এখন আর স্মৃতি বা কবিতার রাজ্য নেই, ঠাকুর এখন অন্য কোনো সম্পূর্ণ অচেনা জগতের বাসিন্দা। সেখানে নিতাইয়ের কোনো অধিকার নেই।

কলকাতা থেকে ফিরে এসে নিতাই দেখল, বসন্তের শরীর আরও ভেঙে পড়েছে।

অতিরিক্ত দূষণ, অ্যালকোহল আর ক্ষয়রোগে শহরের এক সরকারি হাসপাতালের ভাঙা বেডে শুয়ে আছে বাসন্তী (বাসন)। ঝুমুর নাচের সেই চঞ্চল মেয়েটার ফর্সা মুখ আজ রক্তশূন্য, ফ্যাকাশে।

নিতাই বেডের পাশে এসে বসতেই বসন্ত তার শুকনো হাত দুটো জড়িয়ে ধরল।

"কলকাতায় তো তোমার 'ঠাকুর'-এর দেখা পেলে কবি?" বসন্ত কাশতে কাশতে বলল, তার চোখে জল আর বিষাদের করুণ হাসি। "তারে দেইখা কি আমারে আর মনে ধরে?"

নিতাই বসন্তের কপালে হাত রাখল। "ঠাকুর তো আসমানের তারা রে বাসন। তারে দেখা যায়, ছোঁয়া যায় না। আর তুই তো আমার এই ধুলোমাটির পৃথিবী। তোর রোগ, তোর যন্ত্রণা—সবই তো আমার।"

বসন্তের চোখের কোণ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। বর্তমান এই হাইটেক যুগেও বসন্তের ভালোবাসায় কোনো খাঁজ নেই, কোনো পরিমাপ নেই।

"আমার সময় শেষ রে কবি..." বসন্তের শ্বাস ছোট হয়ে আসছিল। "আমার জন্য একটা গান বাঁধো না... যে গানে কোনো শহরের আলো থাকবে না, শুধু থাকবে তুমি আর আমি।"

নিতাই গিটারের তারে হাত দিল। বাইরের খাঁ-খাঁ রোদের দিকে তাকিয়ে তার গলা দিয়ে বেরিয়ে এল সেই অমর লাইন—

এই খেদে খেদে কাটল জীবন,

ওহে শ্যাম রসরাজ...

জীবন এত ছোট কেনে?

জীবন এত ছোট কেনে রে...


গানের শেষ লাইনে বসন্তের হাতটা নিতাইয়ের হাত থেকে খসে পড়ল। তার ঠোঁটের কোণে রয়ে গেল এক অদ্ভুত তৃপ্তির হাসি। জীবনদেবতা বসন্তকে তার কষ্ট থেকে মুক্তি দিয়েছেন।

বসন্তকে হারানোর পর নিতাই আর কোথাও থিতু হলো না।

২০২৬ সালের শেষপ্রান্তে দাঁড়িয়ে নিতাই এখন এক যাযাবর। সে স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে, মেঠো পথের ধারে কিংবা ট্রেনের বগিতে গান গেয়ে বেড়ায়। তার কোনো সোশ্যাল মিডিয়া পেজ নেই, কোনো গান সে রেকর্ড করে সংরক্ষণ করে না।

আকাশের মতো ডিজিটাল কনটেন্ট ক্রিয়েটরা এখনো তাকে দেখে অবাক হয়, কিন্তু নিতাই জানে—অনন্তকাল ধরে মানুষ যে ভালোবাসে, কাঁদে আর কষ্ট পায়, তা কোনো দিনও অ্যালগরিদম দিয়ে বাঁধা যাবে না।

জীবনকে যারা ভালোবাসে, তারা তো কেবল পাওয়ার হিসাব করে না। কবির কাজ তো বিলিয়ে দেওয়া—দুঃখের আগুনে পুড়ে সুর তৈরি করা, আর সেই সুর দিয়ে অন্য মানুষের বুক জুড়ানো।

সর্বশেষ এডিট : ১০ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:১৬
১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

এই প্রথম খাল বাবার পলিটিক্যাল ম্যাচুরিটির নিদর্শন পেলাম

লিখেছেন অপলক , ০৯ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৯:৫৪

২০১০ সালে ফেব্রুয়ারীর ২২ তারিখ। মেয়েলি ব্যাপার বলি, প্রতিহিংসার ব্যপার বলি অথবা পলিটিক্যাল ইমম্যাচুরিটির কথা বলি, বাংলাদেশ জিয়া আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের নতুন করে আকীকা দিয়ে নাম রাখা হয়েছিল হযরত শাহজালাল... ...বাকিটুকু পড়ুন

ভাষণময়

লিখেছেন আলমগীর সরকার লিটন, ০৯ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:৫১


বিশ্বাসগুলো হাবুডুবু খাচ্ছে
ভাগ্যের কম দোষটার হাত
ঝাঁকনি কম নেই তো- তাহলে
বিশ্বাসগুলো মরে যাচ্ছে এই;
মাটির আনন্দটা শুধু ফুল গন্ধ
নাকের সুসংবাদ যে দৌড়াচ্ছে
রাতের ঘুমটা যেনো স্বপ্নবিরল কষ্ট
ভোরের শিশির গড়ে না আর শক্ত;
তবু নিশ্বাসে... ...বাকিটুকু পড়ুন

।।মাদার অব ড্রাকুলা হাসিনার রাস্ট্রীয় জঙ্গীবাদ।।

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ০৯ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:২৮


মাদার অব ড্রাকুলা হাসিনা ভারতের প্রযোজনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীদেরকে দিয়ে জঙ্গী জঙ্গী নাটক মঞ্চস্থ করতো। বহিবিশ্বকে বোঝাতো দেশে ইসলামী জঙ্গী দিয়ে ভরে গেছে এবং সেই জঙ্গীরা ইউরোপ আমেরিকার ভয়াবহ ক্ষতি করবে... ...বাকিটুকু পড়ুন

=শরত তুই যাস নে ! =

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৯ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১০:১৩



ভ্যাপসা গরমে নাভিশ্বাস জীবনে কেবল বৃষ্টির হাপিত্যেশ,
মেঘ বলেছে আসবো আসবো আমার উদ্দেশ,
শুভ্র মেঘেদের নাচন
উত্তাপ হাওয়ায় যায় না আর বাঁচন,
তবুও স্নিগ্ধ আবেশ মনজুড়ে,
হঠাৎ হাওয়ার ঝাপটা, বাজে পাতার বাঁশি সুরে।

বিকেলের হাওয়ায় দেহ... ...বাকিটুকু পড়ুন

১ কোটি চাকরি: শর্ত প্রযোজ্য, মেধার প্রবেশ নিষেধ !

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১০ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ৩:২৫


ভোটের আগে বলা হয়েছিল, ক্ষমতায় এলে প্রথম আঠারো মাসেই এক কোটি মানুষকে চাকরি দেওয়া হবে। কথাটা শুনে দেশের বেকার তরুণেরা তো মহাখুশি, কেউ ভাবল সরকারি চাকরি হবে, কেউ ভাবল... ...বাকিটুকু পড়ুন

×