somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

কোচিং ব্যবসা, বদলে যাওয়া শৈশব এবং আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার বানিজ্যিকীকরণ

২০ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:৪৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

কোচিং যে আজকাল একটা দারুণ লাভজনক ব্যবসা—তা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। তবে সম্প্রতি নিজের জীবন দিয়ে এর রূপান্তরটা চোখের সামনে দেখতে পেলাম।

স্মৃতির পাতা একটু পেছনে উল্টালে মনে পড়ে, আমি যখন নবম-দশম শ্রেণীতে পড়তাম, তখন বন্ধু মামুনের সাথে ‘ম্যাবস’ (মঞ্জু একাডেমি ফর বেসিক কেয়ার) নামের একটি কোচিং সেন্টারে ভর্তি হয়েছিলাম। স্কুল শেষ করে বিকেল ৩টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত চলতো ক্লাস। বুয়েট, ঢাকা মেডিকেল আর ঢাকা ইউনিভার্সিটির বেশ কজন তরুণ শিক্ষার্থী ক্লাস করাতেন। সাধারণ ক্লাসরুমের মতোই ২০-৩০ জন ছাত্র-ছাত্রী একসাথে বসে ক্লাস করতাম। প্রতি সপ্তাহে টিউটোরিয়াল পরীক্ষা, মাস শেষে মান্থলি পরীক্ষা—অর্থাৎ পড়াশোনার একটা সুন্দর শৃঙ্খলা আর চাপ ছিল সেখানে। আর ফাইনাল পরীক্ষার আগে সব বিষয়ের ওপর দেওয়া হতো গোছানো সাজেশন।

বহু বছর পর, গত ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে আবার একটি কোচিং সেন্টারে যাওয়ার সুযোগ হলো। তবে এবার কোনো শিক্ষার্থী হিসেবে নয়—এক শিক্ষার্থীর বাবা হিসেবে!

গত শুক্রবার সাভারের ‘উদ্ভাস-উন্মেষ’ কোচিং সেন্টারের তরফ থেকে পঞ্চম শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের জন্য একটি ‘গণিত অলিম্পিয়াড’-এর আয়োজন করা হয়েছিল। আমার ছোট মেয়েকে নিয়ে গিয়েছিলাম পরীক্ষা দেওয়ানোর জন্য। মেয়ে যখন ভেতরের ক্লাসরুমে পরীক্ষা দিচ্ছিল, আমি বাইরে বসে চারপাশের পরিবেশ-পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছিলাম আর মনে মনে ওদের ‘বিজনেস মডেল’টা বোঝার চেষ্টা করছিলাম।

উদ্ভাস-উন্মেষের একটি অ্যান্ড্রয়েড অ্যাপস রয়েছে, যেটির মাধ্যমেই আমার মেয়ের রেজিস্ট্রেশন করানো হয়েছে। অ্যাপে গিয়ে দেখলাম, সেখানে পঞ্চম শ্রেণী থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষা পর্যন্ত সব ধরণের কোচিংয়ের ব্যবস্থা রয়েছে! পঞ্চম শ্রেণীর বৃত্তি পরীক্ষার দুই মাসের জন্য ওদের টিউশন ফি ৫,০০০ টাকা।

সেদিন সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত দফায় দফায় পরীক্ষা চলল। আমার মেয়ের ব্যাচেই প্রায় শতাধিক শিক্ষার্থী ছিল। পুরো দিনে যদি গড়ে ১,০০০ শিক্ষার্থীও এই অলিম্পিয়াডে অংশ নিয়ে থাকে, আর সেখান থেকে যদি মাত্র ১০ শতাংশ শিক্ষার্থীও ওদের বৃত্তি কোচিংয়ে ভর্তি হয়—তবে সংখ্যাটা দাঁড়ায় ১০০ জন। অর্থাৎ শুধু সাভার ব্রাঞ্চ থেকেই আয়: ৫,০০০ × ১০০ = ৫,০০,০০০ (পাঁচ লাখ) টাকা!

আর এটা তো শুধু সাভারের একটি ব্রাঞ্চের দুই মাসের একটা কোর্সের হিসেব। পুরো দেশে নাকি ওদের এমন আরও ১১৭টি ব্রাঞ্চ রয়েছে! একবার ভাবুন, কত বিশাল এই ব্যবসার পরিধি!

বাংলাদেশে কেবল উদ্ভাস-উন্মেষই নয়, এমন আরও অসংখ্য কোচিং সেন্টার গড়ে উঠেছে। কিছুদিন আগে আমার এক সহকর্মীর মুখে শুনলাম, ওঁর ছোট ভাই পেশায় একজন চিকিৎসক হলেও ‘রোড টু ডক্টর’ নামের একটি মেডিকেল ভর্তি কোচিং পরিচালনা করেন। সারা দেশেই তাদের শাখা বিস্তৃত। তিনি নাকি এত ব্যস্ত থাকেন যে শুক্র-শনিবার প্লেনে করে দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে এক ব্রাঞ্চ থেকে আরেক ব্রাঞ্চে যাতায়াত করেন!

আমরা যখন ছোট ছিলাম, কোচিং ছিল পিছিয়ে পড়া পড়ালেখা একটু গুছিয়ে নেওয়ার একটা মাধ্যম। আর আজ প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার দুর্বলতা ও অসুস্থ প্রতিযোগিতার সুযোগ নিয়ে কোচিং হয়ে উঠেছে অত্যন্ত সুসংগঠিত ও বাণিজ্যিক এক ইন্ডাস্ট্রি। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা যে এখন ভালোভাবেই বাণিজ্যিকীকরণের দিকে হেঁটে চলেছে, সাভারের সেই অলিম্পিয়াডের ভিড়ে দাঁড়িয়ে তা আরেকবার স্পষ্ট অনুধাবন করলাম।
সর্বশেষ এডিট : ২০ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:৪৭
১টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

এই ধরণের মানুষগুলোই বি,এন,পি-কে আবারও ডোবাবে!

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ৮:০১



পড়ালেখার পিছনে টাকা খরচ করা 'টাকা পাচার'?
যারা বিদেশে পড়ালেখা করতে যান, তাঁরা কি দেশের টাকা লুট করে নিয়ে যান, নাকি নিজের বাপের টাকায় পড়ালেখা করেন?

পড়ালেখার... ...বাকিটুকু পড়ুন

এক কাপ চা, আর ফিরে দেখা ২০০৯-এর সেই দিনগুলো

লিখেছেন নাহল তরকারি, ১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ৯:০১



এক কাপ চা, আর ফিরে দেখা ২০০৯-এর সেই দিনগুলো

কিছু জায়গা শুধু জায়গা নয়—সেগুলোর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে আমাদের জীবনের একটি সময়, কিছু মানুষ, কিছু অভ্যাস আর অসংখ্য ছোট ছোট স্মৃতি।... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশের ফরেন কারেন্সি আয়ের মাধ্যম কি?

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১১:৩০



প্রায় বিশ কোটি মানুষের এক লক্ষ সাতচল্লিশ হাজার বর্গ কিলোমিটারের দেশ বাংলাদেশ। আর বাংলাদেশের ফরেন কারেন্সি আয়ের মাধ্যম মাত্র: - রেমিট্যান্স আর পণ্য রপ্তানি।

রেমিট্যান্স: সাধারণত কোনো ব্যক্তি যখন... ...বাকিটুকু পড়ুন

জীবনের স্টেশনে

লিখেছেন হুমায়রা হারুন, ২০ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ভোর ৫:৫৭

রেল স্টেশনে অপেক্ষা। ট্রেন আসছে। এখনো ঐ দূরে। কিন্তু তার আগমন দেখলেই আমার ভেতরে এত কন কন করে উঠে কেন জানি না। কেন এই কষ্ট বারবার হয়?... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাথর ছুঁড়ে হত্যা করার কথা!

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ২০ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৪:১৯


সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) গাজী নজরুল ইসলামকে দল থেকে বহিষ্কারের পর তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে স্পিকার ও নির্বাচন কমিশনে চিঠি দিয়েছিল জামায়াতে ইসলামী। কিন্তু এখন পর্যন্ত তাঁর এমপি... ...বাকিটুকু পড়ুন

×