somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মিরপুরের রূপবদল আর সাভারের দুরবস্থা: ফুটপাত মুক্ত করার এই যুদ্ধ কি আদৌ শেষ হবে?

০৩ রা অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ১০:৫৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

গতকাল শুক্রবার বেলা তিনটা নাগাদ রাজধানীর মিরপুর ১০ নম্বরের সি ব্লকের অ্যাভিনিউ-২ সড়কে পানির ট্যাংক এলাকায় এসে থামল একটা ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা। নামলেন দুই নারী। রিকশা থেকে নেমে তাঁরা কিছুটা সময় যেন থমকে দাঁড়িয়ে রইলেন, চারদিকে তাকাচ্ছিলেন একটু দ্বিধা নিয়ে। কারণ, যে জায়গায় তাঁরা কেনাকাটা করতে এসেছেন, তার চেনা রূপ যেন এক লহমায় গায়েব হয়ে গেছে!

রাস্তা আর ফুটপাত জুড়ে কোথাও কোনো দোকানপাট নেই, নেই হকার কিংবা ভ্রাম্যমাণ বিক্রেতাদের হাঁকডাক। সব একদম ফাঁকা, ছিমছাম!

শেওড়াপাড়ার একটি ছাত্রীনিবাসে থাকা সুরাইয়া মিম ও নওশীন জাহান নামের ওই দুই শিক্ষার্থী এসেছিলেন হোপ মার্কেটে কাপড় কিনতে। অতীতেও এখান থেকে কেনাকাটা করলেও বুধবারের অভিযানের খবর তাঁদের জানা ছিল না। হকার ও ভাসমান ব্যবসায়ীদের উচ্ছেদ করায় কেনাকাটা না করতে পেরে একটু আক্ষেপ হলেও ফুটপাত আর সড়কের এই খোলামেলা দৃশ্য দেখে তাঁদের চোখেমুখে ছিল স্বস্তির ছাপ। সুরাইয়া মিমের কথায় ফুটে উঠল সেই বাস্তবতা—এত দিন এই সড়ক যে এতখানি প্রশস্ত এবং পাশে হেঁটে চলার জন্য ফুটপাত আছে, তা বোঝার কোনো উপায়ই ছিল না। আর নওশীন বলছিলেন, দখলদারিত্বের কারণে স্থানীয় বাসিন্দাদের এত দিন কী পরিমাণ ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে, তা আজ এলাকাটা ফাঁকা না দেখলে হয়তো জানাই যেত না।

গত বুধবার সকালে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) এই উচ্ছেদ অভিযান কিন্তু খুব সহজে হয়নি। অভিযানের একপর্যায়ে হকারদের সঙ্গে পুলিশ ও সিটি করপোরেশন কর্মীদের দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটে। তবে দুপুরের দিকে ডিএনসিসির প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান নিজে উপস্থিত হয়ে মিরপুর ১০ থেকে ১৩ নম্বর পর্যন্ত সড়কের দুই পাশের ফুটপাত সম্পূর্ণ উচ্ছেদ নিশ্চিত করেন।

এখন মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বর থেকে বিআরটিএ পর্যন্ত পুরো এলাকা একদম খোল নলচে বদলে গেছে। আগে যেখানে বাঁশ-কাঠ আর ত্রিপলের ছাউনি দিয়ে ফুটপাত তো বটেই, মূল সড়কের ভেতর দুই-তিন সারিতে দোকান বসানো হতো, সেখানে এখন পথচারীরা মনের আনন্দে হেঁটে চলেছেন। ৬ নম্বর লেনের বাসিন্দা ফরিদা বেগম যেমন ছোট ছেলেকে নিয়ে নির্বিঘ্নে হাঁটতে হাঁটতে বলছিলেন, আগে ভিড়ের কারণে বের হওয়াই দায় ছিল, এখন স্বস্তিতে হাঁটা যাচ্ছে। আরেক বাসিন্দা রফিকুল ইসলামের কণ্ঠে একই আকুতি—এই ফুটপাত আর সড়ক যেন চিরকাল এমন দখলমুক্ত থাকে, সিটি করপোরেশন যেন আর কোনো অবৈধ দখলদারকে এখানে থাবা বসাতে না দেয়।

মিরপুরের এই পরিবর্তন দেখলে মনটা যেমন ভালো হয়, ঠিক তেমনই চোখের সামনে ভেসে ওঠে সাভারের পথগুলোর করুণ বাস্তবতা।

মিরপুর যদি মুক্ত হয়ে কিছুটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে, তবে সাভারের অবস্থা এখনও যেন সেই আঁধারেই ঢাকা। গত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আমি-ডামি নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত সংসদ সদস্য সাইফুল ইসলাম সাভারের প্রধান এলাকাগুলো—যেমন সাভার বাজার, অন্ধ মার্কেট, সিটি সেন্টার, নিউ মার্কেট এবং এর আশপাশের রাস্তাগুলোকে হকারমুক্ত করার একটা উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কিন্তু সেই স্বস্তি বেশিদিন স্থায়ী হয়নি, তাঁর পর থেকে আবারও পুরো এলাকা হকারদের কবলে চলে গেছে।

আসলে রাস্তা দখল করে হকারদের এই দোকান বসানো এখন আর সাধারণ কোনো বিষয় নয়, এটা একটা ভয়ংকর লাভজনক ব্যবসা! যারা হকারদের এই বেআইনি কাজের সুযোগ করে দেয়, তারা তো আর মাগনা দেয় না—এর পেছনে চলে বিপুল অঙ্কের লেনদেন। প্রতিদিন সন্ধ্যায় বা রাতে প্রতিটি দোকান থেকে নির্দিষ্ট হারে চাঁদা বা টাকা তোলা হয়। আর সেই টাকার ভাগ? পুলিশ, প্রশাসন থেকে শুরু করে স্থানীয় প্রভাবশালী ও রাজনৈতিক দল—সবাই মিলেমিশে ভাগবাটোয়ারা করে নেয়। পকেটে যখন নিয়মিত টাকা আসে, তখন আর কার সাধ্য আছে এদের বিরুদ্ধে মুখ খোলে!

হ্যাঁ, এটাও ঠিক যে এই হকার মার্কেটগুলোর একটা প্রয়োজনীয়তা আছে। সাধারণ মানুষ কম দামে এখান থেকে নিত্যপ্রয়োজনীয় জামাকাপড় ও অন্যান্য পণ্য কিনতে পারে, আমাদের মতো সাধারণ ক্রেতাদের একটু উপকার তো হয়ই। কিন্তু তাই বলে পুরো রাস্তা দখল করে ফেললে? গাড়ি চলাচল বন্ধ হয়ে যায়, ফুটপাত দিয়ে হেঁটে যাওয়ার জায়গা থাকে না, সাধারণ পথচারীদের ভোগান্তি পৌঁছায় চরমে।

সমাধানের চেষ্টা যে একেবারে হয়নি, তা নয়। সাভারের হকারদের একটি নির্দিষ্ট জায়গায় পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। রানা প্লাজার পরিত্যক্ত স্থান এবং সাভার মডেল মসজিদের পাশে ভূমি অফিসের জন্য নির্ধারিত জায়গায় হকারদের বসানোর পরিকল্পনা করা হয়েছিল। কিন্তু আফসোসের বিষয়, হকাররা সেখানে বসেনি! তারা আগের মতোই নিত্যদিন রাস্তা আর ফুটপাত দখল করে দোকান সাজিয়ে বসেছে, আর ভোগান্তির শেষ মাশুল গুনছে সাধারণ মানুষ।

মিরপুরে ডিএনসিসি প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান যেভাবে সাহসিকতার সাথে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে উচ্ছেদ চালিয়েছেন, সাভারেও আজ ঠিক তেমন একজন 'মিল্টন সাহেবের' মতো কঠোর ও সাহসী প্রশাসকের খুব প্রয়োজন। যিনি কোনো চাপ বা লোভের কাছে নতিস্বীকার করবেন না, সাহসের সাথে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে পুরো সাভারের রাস্তাগুলোকে এই অবৈধ দখলদারিত্ব থেকে চিরতরে মুক্ত করবেন। ঢাকার রাস্তায় যদি পরিবর্তন আসতে পারে, তবে সাভার কেন পিছিয়ে থাকবে?
সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ১০:৫৪
৩টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একজন ব্লগার

লিখেছেন হুমায়রা হারুন, ০৩ রা অক্টোবর, ২০২৬ ভোর ৫:০৯

যখন একজন ব্লগার
টরন্টো সময়ঃ সন্ধ্যা ৭ঃ০৩ ২রা অক্টোবর ২০২৬
বাংলাদেশ সময়ঃ ভোর ৫ঃ০৩ ৩রা অক্টোবর, ২০২৬

...বাকিটুকু পড়ুন

৩৬ জুলাইয়ের বিপ্লবের পর বাংলাদেশে সবচেয়ে দৃশ্যমান পরিবর্তনটা বোধহয় সরকারে নয়- আমাদের আচরণে!

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০৩ রা অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ১১:৫৫

৩৬ জুলাইয়ের বিপ্লবের পর বাংলাদেশে সবচেয়ে দৃশ্যমান পরিবর্তনটা বোধহয় সরকারে নয়- আমাদের আচরণে!

আমাদের মধ্যে বৃহত্তর একটা অংশের বদ্ধমূল বিশ্বাস- আইন মানতে হবে না, নিয়ম মানা বোকামি, সরকারের সবকিছুই মানুষের মৌলিক... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইমাম মাহদী আসার আগে নেতৃত্ব দাবী করা সকল দলই গোমরাহের পথে আছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৩ রা অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ২:১৭

সেক্যুলার দলকে সমর্থন ততো দিন পর্যন্ত দিয়ে যেতে হবে, যতো দিন ইসলামী দলগুলো 'যোগ্য' না হয়ে উঠছে।
বাংলাদেশের কোন ইসলামী দলই দেশ চালাতে সক্ষম নন।

ইসলামে বলা... ...বাকিটুকু পড়ুন

চেগা মিয়া

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৩ রা অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৪:০০



সকাল ৭ টা। আশ্বির্নের মাঝামাঝি।
হাজী শারাফত আলীর ছেলে মন খারাপ করে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছেন। রাতে তার ভালো ঘুম হয়নি। তার ভাই বোনদের কথা মনে পড়লেই... ...বাকিটুকু পড়ুন

গল্পঃ চোরের উপরে বাটপারি!!!!!

লিখেছেন ভুয়া মফিজ, ০৩ রা অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৫:১৭



টুং করে একটা নোটিফিকেশান আসলো।

ফাৎনার নড়াচড়া দেখে বুঝলাম, বড়শিতে একটা 'ব্রাউন ফিস' ধরা পড়েছে। এখন টেনে তোলার আগে খানিকটা খেলতে হবে। মৎস্য শিকারীরা জানে, এই কাজটা খুবই রোমাঞ্চকর... ...বাকিটুকু পড়ুন

×