somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

গুড প্যারেন্টিং

০৮ ই জানুয়ারি, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:২৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

সন্তান প্রতিপালনের ক্ষেত্রে মা-বাবা কর্তৃক সংঘটিত এমন কিছু ভুল আমাদের পরিবারগুলোতে ছড়িয়ে পড়েছে, যার ব্যাপারে সমাজের মানুষ অভ্যস্ত হয়ে পড়ায় এগুলোকে ত্রুটি হিসেবে চিহ্নিতই করা হয় না – অথচ তা সন্তানদের বহু সমস্যার মূল।এখানে কিছু ভুল নিয়ে আলোচনা করা হল। এগুলোর প্রভাবকে আমরা শক্ত পাথরে ক্রমাগত ফোঁটায় ফোঁটায় পানি পড়ার মত ভাবতে পারি – একটু বিলম্বে হলেও তা পাথরকে ক্ষয় করেই ছাড়বে!আমরা সাধারণত এই সমস্যাগুলোর ব্যাপারে উদাসীন থেকে একদিন যখন সন্তানদেরকে নিয়ে বড় বিপদে পড়ে যাই, তখন আকস্মিক সমাধান খুঁজি এবং এমন কিছু করে বসি যা প্রথম ভুলের তুলনায় আরও বেশি মারাত্মক।

ক্রোধের ধারাবাহিক স্থানান্তরঃ জীবনযুদ্ধে জর্জরিত বাবা অনেক সময় প্রেসার কুকারের চাপমুক্ত হওয়ার মত ক্রোধ বা হতাশার বাষ্প ছড়িয়ে দেন সন্তানদের কিংবা তাদের মায়ের মধ্যে, পরবর্তীতে ধারাবাহিকভাবে এর স্থানান্তর চলতে থাকে জন থেকে জনে। এর বহি:প্রকাশ ঘটে লঘু পাপে গুরু দণ্ড কিংবা সামান্য কারণে সন্তানদের ওপর রাগারাগি কিংবা তাদেরকে শাস্তি দেয়ার মাধ্যমে।তাই রেগে যাওয়ার আগে নিজেকে সামলানোর অভ্যাস গড়ে তোলা চাই। আমাদের সন্তানরা যেন কর্মক্ষেত্রে কিংবা অন্যত্র আমাদের ব্যর্থতার ক্ষোভের লাভা উদ্গিরণের লক্ষ্যবস্তু না হয়।

প্রকাশ্যে বাচ্চাদের দোষত্রুটি বলাঃ বাচ্চা বিছানায় প্রস্রাব করে কিংবা তোতলায় – এ ধরনের বিষয়গুলো অন্যদের সম্মুখে আলোচনা বাচ্চাদের জন্য মর্মবেদনার কারণ। এ ধরনের মর্মবেদনা অনেক বাচ্চার অবাধ্যতা বা উগ্র আচরণের কারণ হতে পারে। তেমনি যা কিছু উল্লেখ করা তাদের মনোকষ্টের কারণ তা উল্লেখ করা থেকে বিরত থাকা উচিৎ। অনেক সময় বাচ্চারা মজার কিছু করে থাকে যা মা-বাবা সবার সাথে শেয়ার করতে চান, কিন্তু বাচ্চারা চায় না সেটা বলা হোক।

গুপ্তচরবৃত্তিঃ বাচ্চারা কি করে, কার সাথে মেশে সে বিষয়ে অবশ্যই সজাগ থাকতে হবে, কিন্তু গুপ্তচরবৃত্তি ক্ষতিকর। এতে মা-বাবার সাথে সন্তানের আস্থার সম্পর্ক নষ্ট হয়।তেমনি বাচ্চাদের ওপর সিসি ক্যামেরার মত ২৪ ঘণ্টা নজরদারি নয়। অবশ্য এর পাশাপাশি এমন পরিবেশ তৈরী করতে হবে যেন নজরদারির প্রয়োজন না পড়ে। যেমন বাচ্চাদের হাতে এমন কোন ইন্টারনেট অ্যাকসেসই থাকবে না যা তারা গোপনে ব্যবহার করতে পারে। তাদেরকে অন্যায়ের সুযোগ করে দিয়ে তারপর ২৪ ঘন্টা নজরদারি ও সন্দেহ পোষণ যেন চোর ধরার জন্য টোপ দিয়ে তার ফাঁদে আটকানোর অপেক্ষা।

মারের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারঃ
আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত তিনি বলেন:আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ ছাড়া আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কখনও কোন কিছুকে হাত দিয়ে আঘাত করেননি: কোন নারীকে নয়, কোন খাদেমকেও নয়। মুসলিম (২৩২৮)

সকল বিষয়ে হস্তক্ষেপঃ সন্তানদের সকল বিষয়ে নিজেদের ইচ্ছা-অনিচ্ছা চাপিয়ে দেয়া ও খুঁটি-নাটি বিষয়ে হস্তক্ষেপ তাদের সাথে মা-বাবার দূরত্ব তৈরী করার পাশাপাশি তাদের আত্মবিশ্বাস ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাকে দুর্বল করে তোলে। যেখানে শরীয়ত সিদ্ধান্ত দিয়েছে – সেখানে প্রশ্রয়ের সুযোগ নেই। যেখানে শরীয়ত নিরব, সেখানে ছাড় দেয়াই ভাল।অনেক সময় সন্তানদের সকল বিষয়ে মা-বাবার বাড়াবাড়ি রকমের হস্তক্ষেপ সময়, সম্পদ ও মেধার অপচয় সহ অন্যান্য ক্ষতির কারণ হয়। এক ব্যক্তিকে চিনি যার বাবার ইচ্ছায় তিনি ঔষধ গেলার মত ডাক্তারী পড়ার পর বাকি জীবন ঠিকাদারী করে কাটিয়েছেন!সন্তানদের বয়স ও পরিপক্কতা বাড়ার সাথে সাথে মা-বাবার উচিৎ আদেশদাতার পরিবর্তে ক্রমান্বয়ে পরামর্শদাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়া। বাস্তবতা হল শুধু আদেশ-নিষেধের কড়াকড়ি দিয়ে শেষমেষ নিয়ন্ত্রণ করাও যায় না, সম্পর্কও সুন্দর রাখা যায় না।

কোন একজন সন্তানকে অতিরিক্ত মনোযোগ দেয়াঃ কোন এক সন্তান প্রতিবন্ধী কিংবা গুরুতর কোন ব্যাধিতে আক্রান্ত হলে তার প্রতি মাত্রাতিরিক্ত মনোযোগ চলে যাওয়া স্বাভাবিক, কিন্তু সেটা কাম্য নয়। এর একাধিক ক্ষতি রয়েছে। যেমন অতিরিক্ত মনোযোগ পেয়ে সে জীবনের বিপদাপদের বাস্তবতায় অভ্যস্ত হওয়ার পরিবর্তে অস্বাভাবিকভাবে স্পর্শকাতর হয়ে উঠতে পারে এবং পরিবারের সবাইকে তার ইচ্ছা-পূরণের বাধ্যবাধকতায় বেঁধে ফেলতে পারে। তেমনি এতে সে নিজ দুর্বলতার প্রতি অতি মনোযোগী হওয়ার কারণে তার সবল দিকগুলোকে কাজে লাগাতে অক্ষম হয়ে উঠতে পারে। আবার বাকি সন্তানরা এতে অবহেলার শিকার হতে পারে।

সন্তানকে দিয়ে যেকোন মূল্যে নিজের জীবনের শখ পূরণঃ নিজে যা করতে পারিনি সন্তান তা করুক – আমরা সবাই সেটা চাই। কিন্তু তা যেন সন্তানের ঝোঁক বা সামর্থ্যের ব্যাপারে উদাসীন থেকে নিজের শখ মেটানোর বিবেচনাহীন প্রয়াস না হয়। আমি ইংরেজীতে দুর্বল, তাই আমার সন্তানকে যেকোন মূল্যে ইংরেজীর বিশেষজ্ঞ বানাতে হবে – এমন দৃষ্টিভঙ্গী ক্ষতির কারণ হতে পারে।

নিরাপত্তার বাড়াবাড়িঃ অপরাধ বাড়ার সাথে সাথে নিরাপত্তার গুরুত্ব বৃদ্ধি পেয়েছে সন্দেহ নেই, তবে তা মাত্রাতিরিক্ত হলে সন্তানরা ভীত-সন্ত্রস্ত, আত্মবিশ্বাসহীন, অপরিপক্ক, সিদ্ধান্ত ও দায়িত্ব নিতে অক্ষম বা অনিচ্ছুক হয়ে বেড়ে উঠতে পারে। এজন্য নিরাপত্তার ব্যাপারে মধ্যপন্থা অবলম্বনে যত্নবান হতে হবে। এ ব্যাপারে যুগোপযোগী সিদ্ধান্তের পাশাপাশি তাদেরকে নিরাপত্তার উপায় উপকরণ প্রশিক্ষণ দেয়া উচিৎ, যেমন: নির্জন স্থানে একাকী না যাওয়া, প্রয়োজনে চিৎকার করা ও দৌড় দেয়া, কেউ অনুসরণ করার ব্যাপারে সজাগ থাকা, বাসার একাধিক সদস্যের ফোন নম্বর মুখস্থ রাখা ইত্যাদি।

প্রমাণ ছাড়াই অভিযোগঃ উপযুক্ত প্রমাণ ছাড়া অভিযোগের আঙ্গুল না তোলা ইসলামী শরীয়তের অন্যতম একটি শিক্ষা, অপরপক্ষে মিথ্যা অপবাদ একটি গর্হিত অপরাধ। একজন মুসলিমের ওপর অপর যে কোন মুসলিমের এই অধিকার যেখানে সাব্যস্ত, সেখানে নিজ পিতা-মাতা, সন্তান কিংবা অন্যান্য আত্মীয়ের ক্ষেত্রে তা কতটা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে তা সহজেই উপলব্ধি করা যায়। দুঃখের বিষয় অনেক মা-বাবাই সন্তানদেরকে অভিযুক্ত করার ক্ষেত্রে তাকওয়া হারিয়ে ফেলেন এবং শরীয়তের বিধিনিষেধ ভুলে যান। এমনকি অজ্ঞতার কারণে অনেক মা-বাবা সন্তানকে যা খুশি বলাকে নিজেদের অধিকার ভাবতে শুরু করেন!
অনেক সময় সন্তানদের মধ্যে যে অপেক্ষাকৃত চঞ্চল বা দুষ্ট প্রকৃতির, তার ওপর শুরু থেকেই সব দোষ চাপতে থাকে। বিষয়টা যেন এমন যে তার নির্দোষ হওয়াটাই প্রমাণ-সাপেক্ষ! অথচ ইসলামের নীতি উল্টো – প্রমাণিত হওয়ার আগে অভিযোগ নয়। ইসলামে হত্যা, ব্যাভিচার, চুরি জাতীয় যে সকল গুরুতর অপরাধের শাস্তি নির্ধারণ করা হয়েছে – সেগুলো পর্যন্ত যথেষ্ট সংখ্যক উপযুক্ত সাক্ষীর অভাবে অনেক ক্ষেত্রেই কার্যকর হতে পারে না।
সন্তানদের ক্ষেত্রে উপযুক্ত প্রমাণ ছাড়া “এটা নিশ্চয়ই অমুকের কাজ” জাতীয় বক্তব্য আমাদেরকে পরিহার করতে হবে।

সন্তানদের বন্ধুবান্ধব ও প্রিয় মানুষকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করাঃ এটি সন্তানের সাথে মা-বাবার দূরত্ব বাড়ায়। বরং তাদের সাথে পরিচিত হতে হবে, তাদের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করতে হবে। যাদের সাথে মেশা মা-বাবা অপছন্দ করছেন, তাদের সাথে মিশতে না দেয়ার কারণ যৌক্তিকভাবে ও নম্রতার সাথে ব্যাখ্যা করা উচিৎ। বন্ধুদের সাথে তারা কোথায় কতক্ষণ মিলিত হচ্ছে সেটাও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। মোটকথা কাউকে খাটো না করেও বুদ্ধিমত্তার সাথে বিষয়টিকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব – আর সেটাই সঠিক পন্থা।
সকল সমস্যার ‘রেডি-মেড’ সমাধান হাতে তুলে দেয়াঃ এক্ষেত্রে তাদের সাথে আলাপচারিতার মাধ্যমে তাদেরকে সমস্যা নিয়ে ভাবতে দেয়া ও তাদের প্রস্তাবনা শোনা এবং সে অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে দেয়া তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের দক্ষতাকে শানিত করবে। এর বিপরীতে সব সমাধান প্রস্তুত করে দিলে তারা অতিমাত্রায় মা-বাবার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে।

গালাগাল ও আক্রমণাত্মক কথাঃ এগুলো একদিকে যেমন সন্তানদেরকে মা-বাবার প্রতি বীতশ্রদ্ধ করে তোলে, অন্যদিকে এই স্বভাব তাদের মাঝেও সংক্রমিত হয়। যাকে আল্লাহ তাআলা মনুষ্যসন্তান হওয়ার মর্যাদা দিয়েছেন, তাকে অন্য কোন প্রাণীর সাথে সম্পৃক্ত করা অত্যন্ত নোংরা একটি বিষয় – যা কোন মুসলিম তো দূরে থাক, সামান্য রুচি ও সম্ভ্রমের অধিকারীর পক্ষেও অশোভন।আর তারা এগুলো শিখে নিয়ে যখন অন্যত্র প্রয়োগ করবে, তখন সবার আগে কার সম্মান খোয়া যায়?

এবার আসুন শিশু মনোবিজ্ঞানীদের কিছু উপদেশ তুলে ধরি।
পারমিসিভ প্যারেন্টিংঃ এ ক্ষেত্রে সন্তানের সঙ্গে বাবা-মায়ের দৃঢ় মানসিক যোগাযোগ থাকে। এ ক্ষেত্রে একধরনের সতর্ক দৃষ্টির মাধ্যমে শিশু স্বাধীনভাবে বেড়ে উঠতে পারে। এতে বাচ্চারা আত্মপ্রত্যয়ী হয়ে বড় হয়।
সন্তানকে বুঝতে দিন আপনার শর্তহীন ভালোবাসা। সন্তানকে আপনার অবাধ ভালোবাসার উষ্ণতা একধরনের গভীর নিরাপত্তাবোধ দেবে। নিরাপত্তার এই বোধ তাকে পরবর্তী জীবনে সম্পর্ক স্থাপন বা চলার পথে নানা সমস্যা দক্ষতার সঙ্গে মোকাবিলা করতে সাহায্য করবে। নানাভাবে প্রকাশ করুন আপনার আদর, স্নেহ।

কোন আচরণে মনোযোগ দেবেনঃ মনোবিজ্ঞানের একটা নিয়ম হলো, অন্যের যে আচরণে আমরা মনোযোগ দেব, সে আচরণ আরও উৎসাহ পাবে এবং পুনরায় করবে। এই মনোযোগ সন্তানের আবদার পূরণ বা প্রশংসাসূচক কথা বলার মাধ্যমে যেমন হতে পারে, তিরস্কারের মাধ্যমেও হতে পারে। ফলে সন্তানের যে আচরণ আপনার কাছে গ্রহণযোগ্য বা কাঙ্ক্ষিত নয়, সেটা সম্পূর্ণ উপেক্ষা করুন। আপনার ক্রমাগত উপেক্ষা তার অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণ কমিয়ে আনবে।তবে আচরণ যদি অতিরিক্ত অগ্রহণযোগ্য হয় (যেমন বেয়াদবি করা, কথা একেবারেই না শোনা, ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করা) ইত্যাদির ক্ষেত্রে শাস্তির বদলে তার প্রাপ্য সুবিধা (যেমন আদর করা, যত্ন করা, কথা বলা, উপহার দেওয়া) ইত্যাদি সাময়িকভাবে কমিয়ে দিন।

কাঙ্ক্ষিত আচরণঃ সন্তান যখন কাঙ্ক্ষিত আচরণ বা ভালো কাজ করবে, সেটা যত সামান্যই হোক, সেটাতে সঙ্গে সঙ্গে মনোযোগ দিন (যেমন প্রশংসা করা, আদর বাড়িয়ে দেওয়া ইত্যাদি)। আপনার সামান্য প্রশংসা তার আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দেবে। ভালো আচরণগুলো আরও বেশি বেশি করার উৎসাহ পাবে। সন্তানদের কাজের প্রতি উৎসাহ ও আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে তুলুন। আপনার সন্তান যে কাজে বেশি পারদর্শি তাকে সেই কাজে বেশি উৎসাহিত করুন। আবার, কোনও ভাল কাজ করলে ‘চমৎকার' বলার পরিবর্তে তার ‘বুদ্ধি'-কে বাহবা দিন। তার আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে তুলুন এবং একজন মানুষ হিসেবে সর্বক্ষেত্রে তার গুরুত্ব তুলে ধরুন। সাফল্য-ব্যর্থতার টানাপোড়েনের মাঝে আত্মবিশ্বাসকে কাজে লাগিয়ে কঠিন পরিস্থিতিকে মোকাবিলা করতে শেখান।

আচরণের সামঞ্জস্যঃ সন্তানের সামান্য যেকোনো বিষয়ের বাবা-মায়ের প্রতিক্রিয়া প্রকাশ একই রকম থাকবে। শুধু তা-ই নয়। এমন প্রতিশ্রুতি কখনো সন্তানকে দেবেন না, যা আপনি রাখতে পারবেন না। যেকোনো অসামঞ্জস্যতায় সন্তান বিভ্রান্তির মধ্যে বড় হয়। ঠিক-বেঠিকের ধারণা তার সঠিকভাবে হয় না। নৈতিক মূল্যবোধের ভিত্তি হয় দুর্বল, যা ভবিষ্যতে নেতিবাচক প্রভাব পরিবার ও সমাজে সুদূরপ্রসারী।সর্বদা সত্য কথা তুলে ধরুন। কারণ, জীবন কোনও রূপকথার গল্প নয়। ঘাত-প্রতিঘাত, ভাল-মন্দ ইত্যাদির মিলিত রূপ জীবন। তাই, সন্তানকে ভালোর পাশাপাশি মন্দ দিকের সঙ্গেও পরিচয় করান। ভাল-মন্দকে নিয়ে বেড়ে ওঠাই সঠিকভাবে বেড়ে ওঠা। তাই, শিশুদের থেকে মিথ্যা এবং খারাপ কিছু লুকিয়ে না রেখে, তাদের সেগুলি বলুন ও বোঝানোর চেষ্টা করুন।

কোনো কিছুতেই জবরদস্তি নয়ঃ
চাপ দিয়ে কোনো কিছু সাময়িকভাবে আদায় করা গেলেও সেটা মূলত দীর্ঘস্থায়ী হয় না। বরং সেটার প্রতি একধরনের বিরক্তিভাব তৈরি হয়। শিশুদের ক্ষেত্রেও এমনটা হয়। অনেক ক্ষেত্রে অতিরিক্ত জবরদস্তির জন্য ধীরে ধীরে যেমন বাচ্চাদের পড়ালেখার আগ্রহ কমে যেতে পারে, তেমনি চাপাচাপির কারণে শিশুদের খাওয়ার আনন্দও নষ্ট হয়ে যায়। শিশুকালে পড়াশোনায় ভালো ফলাফল করার চেয়ে বইয়ের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করার জন্য সুযোগ দিন। সন্তানের উপর নিজের জোর বা কর্তৃত্ব ফলাবেন না। যখনই আপনি সন্তানের উপর কর্তৃত্ব ফলানোর চেষ্টা করবেন, তখনই আপনার সন্তান আপনাকে ভয় পাবে এবং আপনার থেকে দূরে সরতে থাকবে। তাই, নিজের জোর খাটানো বা কর্তৃত্বের পরিবর্তে বন্ধুর মতো মিশতে শুরু করুন এবং তাকে বোঝার চেষ্টা করুন।

খেলাধুলাঃ যেসব খেলায় শারীরিক পরিশ্রম, সেসব খেলা শুধু শরীরের জন্যই জরুরি নয়, মানসিক বিকাশের জন্যও প্রয়োজন। খেলার মাধ্যমে একজন শিশু আরেকজন শিশুর মানসিক গঠনের সঙ্গে পরিচিত হতে পারে। বন্ধুত্ব ও সামাজিকভাবে মেলামেশার দক্ষতা তৈরি হয়। খেলার মাধ্যমে ছোটখাটো ঝগড়া-বিবাদ বা ঝামেলা সামলানো শেখে। এ অভিজ্ঞতা তার ভবিষ্যৎ জীবনের নানা সমস্যা মোকাবিলা করতেও সাহায্য করবে।

মোবাইল বা কম্পিউটার গেমে নিরুৎসাহিত করাঃ মোবাইল বা কম্পিউটার গেমে একধরনের আসক্তির উপাদান থাকে। এসবে অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা শিশুকে চারপাশের সামাজিক জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন রাখে। তবে একেবারে নিরুৎসাহী না করতে চাইলে কম্পিউটার বা মোবাইল ব্যবহারে সময় বেঁধে দিন।

সমালোচনা নয়ঃ কঠিন তিরস্কার, সমালোচনা করা কিংবা অন্য শিশুদের সঙ্গে তুলনা করা ইত্যাদি তাদের আত্মবিশ্বাস কমিয়ে দেয়। বেড়ে ওঠার সময় শিশুর নিজের প্রতি ধারণা অনেকখানি তৈরি হয় বাবা-মা তাকে কীভাবে দেখছেন, তার ওপর। সুতরাং কোনো কাজ অপছন্দ হলে কঠোর সমালোচনা না করে অল্প কথায় আপনার অপছন্দ স্পষ্ট করে জানান।

সন্তানের সামনে কখনোই কারো সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করবেন না। বিশেষ করে, গালিগালাজ বা ঝগড়া থেকে দূরে থাকুন। কারণ, সন্তানের সামনে আপনি যেমন আচরণ করবেন, সেও কিন্তু ঠিক তাই শিখবে। এতে, সন্তানের ভালর পরিবর্তে খারাপ বেশি হবে। পারিবারিক যেকোনও কাজে পরিবারের সকলের পাশাপাশি নিজের সন্তানেরও পরামর্শ গ্রহণ করুন। এতে, সন্তান খুশি হবে। হাতে কাজের দায়িত্ব তুলে দিন এবং সঠিকভাবে কাজকে পরিচালনা করতে পরামর্শ দিন। দেখবেন, আপনার প্রতি সন্তানের শ্রদ্ধা ও মান্যতা বাড়বে।

ব্যর্থতা মেনে নিতে শেখানঃ একটা কথা মনে রাখতে হবে, আপনার অসীম নিরাপত্তার ছায়ায় আস্তে আস্তে বড় হওয়া আদরের সন্তানটিকে বড় হওয়ার পর অবশ্যম্ভাবীভাবেই জীবনের নানা জটিল পথ পার হতে হবে। সফলতার সঙ্গে সঙ্গে নানা ব্যর্থতাও তার জীবনে আসবে। শিশুর বর্তমানের ছোটখাটো ব্যর্থতা স্বাভাবিকভাবে নিন এবং তাকে সহজভাবে মেনে নিতে শেখান। এ ছাড়া শিশুর চাহিদার সবটাই সব সময় পূরণ করার প্রয়োজন নেই। জীবনে আমরা যা চাই, যেভাবে চাই তার কিছু ঘটবে, কিছু ঘটবে না—এই সত্য, এই বোধ সে আপনার কাছ থেকেই একটু একটু করে জানবে। সন্তান কোনও ভুল করলে তাকে বড় শাস্তি দেওয়ার পরিবর্তে তা শুধরে দেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। আঙুল দিয়ে ভুলের জায়গাটা ধরিয়ে দিন এবং তার ফলে কী ক্ষতি হয়েছে তাও বুঝিয়ে দিন। চেষ্টা করুন বাস্তব উদাহরণ দিয়ে বোঝানোর, যাতে সে সহজেই নিজের ভুল বুঝতে পারে।
সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই জানুয়ারি, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:২৪
২টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

সক্কাল বেলা একটা জোক্সস শোনাই

লিখেছেন ধূসর সন্ধ্যা, ২৯ শে জানুয়ারি, ২০২৬ সকাল ৯:০৬


বাংলাদেশের ইতিহাসে শেখ হাসিনার আমলে যতটা নিকৃষ্ট ভাবে ভোট চুরি হয়েছে আর কারো আমলে হয় নি। এমন কি এরশাদের আমলেও না। ...বাকিটুকু পড়ুন

গো ফুলের নিয়ামত

লিখেছেন আলমগীর সরকার লিটন, ২৯ শে জানুয়ারি, ২০২৬ সকাল ১১:৪৩


এখন নাকি বিবেক বুদ্ধির জন্ম হচ্ছে-
ঘুরপাক বুড়োরা মৃত্যুর কুলে দুল খাচ্ছে;
রঙিন খাট পালঙ্কে- মাটিতে পা হাঁটছে না
শূন্য আকাশে পাখি উড়ু উড়ু গো ফুলের গন্ধ
উঠান বুঠানে বিবেক বুদ্ধির বাগান... ...বাকিটুকু পড়ুন

ছোট পোস্ট!

লিখেছেন নূর আলম হিরণ, ২৯ শে জানুয়ারি, ২০২৬ দুপুর ২:৪৯


জুলাই সনদে স্বাক্ষরের দিন ড. ইউনুস বলেছেন, “এই সনদে স্বাক্ষর করলে আমরা বর্বরতা থেকে সভ্যতায় উন্নীত হবো।”
আর গতকাল উনি বলতেছেন বাঙালি হচ্ছে বিশ্বের মাঝে সবচেয়ে জালিয়াত জাতি! তো জুলাই সনদে... ...বাকিটুকু পড়ুন

শের

লিখেছেন এ.টি.এম.মোস্তফা কামাল, ২৯ শে জানুয়ারি, ২০২৬ দুপুর ২:৪৯

তিন শ' এক//
আমার সাহস দেখে, জানি. তুমি খুব রেগে যাবে।
ঘরহীন, সর্বহারা ভালোবাসা জানায় কিভাবে ?

তিন শ' দুই//
চোখের মালিক ঘোর নিঃশ্বতার আঁধারে ডুবেছে;
তবুও বেকুব চোখ সুন্দরের নেশায় ডুবেছে!
...বাকিটুকু পড়ুন

=দাও হেদায়েত ও আল্লাহ=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ২৯ শে জানুয়ারি, ২০২৬ রাত ৯:৪৫


পাপ মার্জনা করো মাবুদ,
দয়া করো আমায়,
না যেন আর মোহ আমায়
মধ্যিপথে থামায়!

শুদ্ধতা দাও মনের মাঝে
ডাকি মাবুদ তোমায়
দিবানিশি আছি পড়ে
ধরার সুখের কোমায়!

হিংসা মনের দূর করে দাও
কমাও মনের অহম ,
ঈর্ষা হতে বাঁচাও আমায়
করো... ...বাকিটুকু পড়ুন

×