somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

৭১ পরবর্তি বাংলাদেশ ( পর্ব ১৩)

০৩ রা মার্চ, ২০২৬ বিকাল ৩:৫৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন ‘গণভবনেই স্বাধীন দেশের প্রশাসন পরিচালিত হতে শুরু করে। ‘গণভবনে’ দলীয় লোকজন ও আবেদন- নিবেদনকারীরা দলে দলে ভিড় জমাতো। তাদের কেউ কেউ শেখ মুজিবকে ফুলের মালা গলায় পরিয়ে দিত ও পা ধরে সালাম করতো । এমনকি কেউ কেউ তাঁর গলা জড়িয়ে ধরে উচ্চৈঃস্বরে কান্নায় ভেঙে পড়তো। শেখ মুজিবও তাদের আবেগ-উচ্ছ্বাসের সঙ্গে সজলচোখে একাত্ম হয়ে যেতেন।এই আবেদন-নিবেদনকারীদের প্রত্যেককেই তিনি তাঁর স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে আদর করে হাত বুলিয়ে দিয়ে বলতেন- ঠিক আছে যা, আমি ব্যাপারটি দেখছি। কিন্তু ওই দেখা তাঁর খুব কমই হয়ে উঠতো। স্বভাবগতভাবে তিনি অত্যন্ত উদার আর দয়ালু প্রকৃতির মানুষ ছিলেন। একই সঙ্গে তিনি দেশের প্রধানমন্ত্রী । শীর্ষ প্রশাসক এবং জনগণের শ্রেষ্ঠ বন্ধু— এই আপাত বিপরীত দুই মেরুকে একত্রে মিলাতে গিয়েই অনিবার্যভাবে বিপর্যয়ের দিকে ধাবিত হতে থাকলেন। আওয়ামী লীগের তরুণ অংশের মধ্যে একটা ধারণা ছিল, শেখ মুজিব স্বাধীন দেশে ফিরে সরকারের কোনো পদ গ্রহণ করবেন না। তিনি মহাত্মা গান্ধীর মতো নেপথ্যে থেকে জাতীয় অভিভাবকের দায়িত্ব পালন করবেন।পরামর্শকদের বক্তব্য ছিল এ রকম— প্রধানমন্ত্রীর উচিত তার নীতি ও কর্মসূচির প্রতি দেশবাসীর পূর্ণ সমর্থন আদায়ের জন্য তার সময়ের একটা বড় অংশ ব্যয় করা এবং জোরালো প্রচেষ্টা চালানো। তিনিই স্বাধীনতা পরবর্তী পরিস্থিতিতে দলকে এক নতুন জীবন দিতে পারতেন এবং দলের সদস্যদের উদ্বুদ্ধ করতে পারতেন। দেশ যে অনিশ্চয়তা ও চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছিল তাকে মোকাবিলা করার জন্য সর্বস্তরের জনগণকে প্রস্তুত ও উদ্বুদ্ধ করতে পারে, তিনি ছাড়া এমন দ্বিতীয় ব্যক্তি তখন ছিল না। জাতি গঠনের এই কাজ করতে গেলে একমাত্র কিছু নির্দিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ব্যতিরেকে সরকারের দৈনন্দিন কাজে তার সরাসরি অংশগ্রহণের ব্যাপারটি অনেক কমিয়ে ফেলতে হতো। প্রশাসনের প্রতিদিনের কাজ চালিয়ে নেয়ার দায়িত্ব তিনি সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও তাজউদ্দীন আহমদের মতো তার যোগ্য সহকর্মী এবং অন্য সিনিয়র নেতাদের হাতে ছেড়ে দিতে পারতেন।
অথচ তিনি তরুণদের প্রত্যাশাকে উপেক্ষা করে দেশের প্রধানমন্ত্রী হলেন। রাষ্ট্রপতির পদটি নিছক আনুষ্ঠানিক হলেও সেই পদের জন্য তিনি বাছাই করলেন বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী নামে অতিশয় ভদ্র এবং খুবই অনুগত একজন অরাজনৈতিক ব্যক্তিকে। বিচারপতি চৌধুরী মুক্তিযুদ্ধের সময় মুজিবনগর সরকারের আন্তর্জাতিক মুখপাত্র হিসেবে বিদেশে খ্যাতি অর্জন করেন।মুক্তিযুদ্ধের সময়ে শেখ মুজিবের নামেই মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হলেও তিনি সশরীরে উপস্থিত ছিলেন না । যে তাজউদ্দীন কাণ্ডারির মতো মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করেছিলেন, তার কাছেও জানতে চাননি সেই সময়টায় কী কী ঘটেছিল, যুদ্ধ কীভাবে হয়েছিল । কাকতালীয়ভাবে দেখা যায়, স্বাধীন বাংলাদেশের এই ‘প্রাণপুরুষ’ অতীতেও এই ভূখণ্ডে পরিচালিত গুরুত্বপূর্ণ কোনো আন্দোলনেই সময়মতো সশরীরে উপস্থিত ছিলেন না, অর্থাৎ উপস্থিত থাকতে পারেননি। ভাষা আন্দোলনের সময় তিনি ছিলেন ভিন্ন মামলায় ফরিদপুরে কারারুদ্ধ। '৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থানের সময়ও ছিলেন কারাবন্দি। '৭১-এ ছিলেন পাকিস্তানে অন্তরীণ ।


এই অনুপস্থিতির কারণে মাঠের রাজনৈতিক বাস্তবতা আর মানুষের প্রত্যাশা বুঝে ওঠার ক্ষেত্রে একটা ব্যবহারিক সমস্যা দেখা দেয়াটা অস্বাভাবিক নয়। ১৯৭২ সালের মার্চ মাস শেষ হয়ে এসেছে। ঢাকায় এক জমজমাট গুজব ছড়িয়ে পড়েছে- অতিরিক্ত কাজের চাপে মুজিব অসুস্থ। তাই স্বাস্থ্যগত আর প্রশাসনিক প্রয়োজনে মুজিব পুনরায় তাজউদ্দীন আহমদকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করছেন। ৬
তাজউদ্দীনকে এ বিষয়ে সাংবাদিকরা জিজ্ঞেস করলে তিনি পরিষ্কারভাবে জানালেন যে, 'কেউ আমার গলা কাটার চেষ্টা করছে।'
এ ব্যাপারে শেখ মুজিবের প্রতিক্রিয়াও তীক্ষ্ণ ছিল। তিনি বললেন, 'তারা কি মনে করে যে, আমি সরকার পরিচালনায় অক্ষম?'
সুষ্পষ্টভাবেই স্বার্থান্বেষী মহলের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এ গুজব প্রত্যাশিত লক্ষ্য অর্জন করেছিল । শোনা যায়, এ থেকেই তাজউদ্দীনকে মুজিব সন্দেহের চোখে দেখতেন এবং তাকে সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করতে শুরু করেন।

মুক্তিযুদ্ধের পরে পুরো প্রশাসন ব্যবস্থা একেবারে ভেঙে পড়েছিল। আওয়ামী লীগের এমসিএ-নেতা-কর্মী-সমর্থকেরা বেপরোয়া লুটপাট আর সম্পদ সংগ্রহের প্রতিযোগিতায় নেমেছিলেন। শেখ মুজিব কখনো কঠোর, কখনো নরম হয়ে এই দুঃসহ অবস্থা মোকাবিলার চেষ্টা করলেন। প্রথমেই তিনি কঠোর হয়ে পরিস্থিতি মোকাবিলার চেষ্টা করেছিলেন। ১৯৭২ সালের ৬ এপ্রিল দুর্নীতি ও দেশবিরোধী তৎপরতার কারণে তাঁর দলের ১৬ জন সাংসদকে তিনি দল থেকে বহিষ্কার করেন। ৯ এপ্রিল ৭ জন এবং ২২ সেপ্টেম্বর আরো ১৯ জন সাংসদকে তিনি বহিষ্কার করেন।

স্বাধীনতার সুফল ভোগের দাবি নিয়ে এলেন আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা। তাদের ভাব এমন যে, তারা যুদ্ধে জয়ী হয়ে এসেছেন; সুতরাং বিজিতদের সবকিছুতেই তাদের অগ্রাধিকার। বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক যারা আত্মরক্ষার জন্য ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলেন, তারা সবাই নিজেদের পছন্দমতো বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বা অনুরূপ পদ বেছে নিলেন। ঠিক তেমনিভাবে শুধু ভারত ঘুরে এসেছেন সেই অধিকারে দু'টো-তিনটে পদ টপকে একেকজন উপরে উঠে বসলেন। 'শত্রুসম্পত্তি এই বাহানা দিয়ে গাড়ি, বাড়ি, ফ্রিজ, টেলিভিশন, দরজা, জানালা লুট করা হলো। যারা এই দুষ্কর্ম করলেন তাদের অনেকেই বেশ পরিচিত ও প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিত্ব। গোটা দেশ নিঃশব্দে দু'টি শিবিরে ভাগ হয়ে গেল।
স্বাধীনতা অর্জনের পর বাংলাদেশের সামগ্রিক নিয়ন্ত্রণ আওয়ামী লীগের হাতে চলে যায় । এ সময় মওলানা ভাসানী ছাড়া দেশে দৃশ্যত কোনো বিরোধীপক্ষের অস্তিত্ব ছিল না। এছাড়া ছিল ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (মোজাফ্ফর) ও বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) নামে অন্য দু'টি রাজনৈতিক দল। ন্যাপ (মো) এবং সিপিবি সরকারকে সমর্থন করছিল। সরকারের কাছে এই তিনটি দল ছিল ‘দেশপ্রেমিক' ।



আইন না মানার যে সংস্কৃতি চালু হয়, তা প্রশাসনের উচ্চপর্যায়কেও আক্রান্ত করে । একবার কমলাপুর থেকে টঙ্গী পর্যন্ত রেলের যাত্রীদের টিকিট চেক করে শতাধিক টিকিটবিহীন যাত্রীকে চিহ্নিত ও আটক করা হয়। অবাক হওয়ার মতো কাণ্ড, টিকিটবিহীন যাত্রীদের মধ্যে একজন ছিলেন পুলিশের ডেপুটি ইন্সপেক্টর জেনারেল, তাও আবার সপরিবারে।প্রশাসনের উচ্চ স্তরে পছন্দমাফিক নিয়োগ শুরু হয়। এ সময় পাবলিক সার্ভিস কমিশনও পছন্দমাফিক গড়ে তোলা হয়। ১৯৭২ সালের মে মাসে প্রথম পিএসসি গড়ে তোলার সময় যাকে চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়, সেই ড. এ কিউ এম বজলুল করিম ছিলেন মৃত্তিকা বিজ্ঞানের একজন শিক্ষক!১৯ গুরুত্বপূর্ণ এই পদটিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই শিক্ষককে নিয়োগ দেয়ার ক্ষেত্রে একমাত্র বিবেচ্য বিষয় ছিল, তিনি ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম ছাত্রনেতা তোফায়েল আহমেদের শিক্ষক।এদিকে আওয়ামী লীগের নেতারা সশস্ত্র প্রহরীসহ ঘোরাফেরা করতেন। যাকে- তাকে হত্যার হুমকি দিতেন, মারধর করতেন। সেই সময়ের চিফ হুইপ শাহ্ মোয়াজ্জেম হোসেন খুব গর্বভরেই লিখেছেন, কীভাবে সচিবালয়ে একজন সচিবকে হত্যার ভয় দেখিয়ে কাজ আদায় করেছিলেন, সেই কাহিনী। তিনি সেই সচিবের অসহায় অবস্থা সম্পর্কে লিখেছেন- সে পাগলের মতো একবার শিক্ষামন্ত্রীর ও একবার আমার পায়ে পড়তে লাগল । বারবার একই কথা বলল, স্যার এবারের মতো ছেড়ে দেন। আমি আর কোনোদিন আপনাদের কথার অবাধ্য হবো না। উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মচারীদের বাধ্য করার এই তরিকা ব্যাপকভাবে ‘জনপ্রিয় হয়ে উঠলো 1
আরেক ঘটনায় তিনি রোডস্ অ্যান্ড হাইওয়েজের চিফ ইঞ্জিনিয়ারকে তিন তলা থেকে ছুঁড়ে ফেলে দেবার ভয় দেখিয়ে কাজ আদায় করেছিলেন!চিফ ইঞ্জিনিয়ার উপায়ান্তর না দেখে শেখ মুজিবের কাছে এর সুরাহার জন্য যান এবং এই অন্যায় ও জবরদস্তিমূলক আচরণের প্রতিকার চান। উল্টো শেখ মুজিব তাকে বলেন, ‘মোয়াজ্জেম না হয়ে আমি হলে আপনাকে সঙ্গে সঙ্গে নিচে ফেলে দিতাম । আপনি কোন সাহসে চিফ হুইফের কথা অমান্য করেন! যান, যেভাবে বলেছে, সেভাবে কাজ করুন। প্রধানমন্ত্রীর কাছে ফাইল পাঠিয়ে দিয়ে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মন্ত্রীরা নিজে সিদ্ধান্ত নেয়া থেকে বিরত থাকতেন।” কোনো সিদ্ধান্ত পরে ভুল প্রমাণিত হলে প্রধানমন্ত্রী বিরক্ত হবেন—এই আশঙ্কায় অথবা নিজেদের যোগ্যতার প্রতি আস্থারঅভাবের কারণে তারা এই ঝুঁকি নিতে চাইতেন না।

১৯৭২ সালের মাঝামাঝি সময় সরকার সাড়ে তিন শ উচ্চতর প্রারম্ভিক পদে (সিভিল সার্ভিস) মুক্তিযোদ্ধা প্রার্থীদের মধ্যে থেকে নিয়োগের উদ্যোগ নেয় । বলা হয়েছিল, এজন্য পরীক্ষা নেয়া হবে। কিন্তু এক্ষেত্রে প্রথাসিদ্ধ কোনো পরীক্ষা নেয়া হয়নি । নেয়া হয়েছিল একটি তড়িঘড়ি মৌখিক পরীক্ষা। মুক্তিযোদ্ধা প্রার্থীদের মধ্যে থেকে অফিসারদের এ নিয়োগ অবশ্য সাড়ে তিন শ'তে সীমিত থাকেনি। বরং প্রায় দেড় হাজার অনুরূপ প্রার্থীকে প্রশাসন, পুলিশ, নবগঠিত ইন্ডাস্ট্রিয়াল ম্যানেজমেন্ট সার্ভিস (আইএমএস) ইত্যাদিতে নিয়োগ দেয়া হয়। শিক্ষাগত যোগ্যতা ও প্রার্থীদের সর্বোচ্চ বয়সের ক্ষেত্রে অভাবিত শিথিলতার কারণে এ প্রক্রিয়ায় অত্যন্ত অসম প্রকৃতির প্রার্থীদের নিয়োগ লাভের সুযোগ ঘটে। উল্লেখ্য, ইতোপূর্বে সিভিল সার্ভিসে নিয়োগের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ২৫ বছর বয়সী গ্র্যাজুয়েটগণ সুযোগ পেতেন। এরূপ প্রার্থী আবার স্নাতক পর্যায়ে তৃতীয় শ্রেণির ডিগ্রির অধিকারী হয়ে থাকলে তা পুষিয়ে নেয়ার জন্য স্নাতকোত্তর পর্যায়ে তার প্রথম শ্রেণি থাকতে হতো। মাধ্যমিক বা উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে তৃতীয় বিভাগপ্রাপ্ত হলে তো প্রশ্নই ছিল না। কিন্তু এসব নিয়ম উল্লিখিত নিয়োগ প্রক্রিয়ায় একেবারেই উপেক্ষিত হয় । সর্বোচ্চ ৩৫ বছর বয়সী প্রার্থীকে এই নিয়োগে সুযোগ দেয়া হয়। সেই সাথে, গ্র্যাজুয়েট হলেই হলো, শ্রেণি বা বিভাগের বিষয়ে মাথা ঘামানো হলো না। ফলে এ প্রক্রিয়ায় এমনও অফিসার সিভিল সার্ভিসে পাওয়া গেল যারা এসএসসি, এইচএসসি ও স্নাতক— এই তিনটি পরীক্ষাতেই বসেছেন এবং এগুলোর প্রত্যেকটিতে তৃতীয় বিভাগ বা শ্রেণির সার্টিফিকেট অর্জন করতে পেরেছেন । ব্রিটিশ আমলের তো প্রশ্নই ওঠে না, পাকিস্তান আমলেও এ ধরনের প্রশাসনিক কর্মধারা ছিল অচিন্তনীয়।
"
এমন সব ব্যবস্থা সূচিত করার মাধ্যমে মেধার গুরুত্ব অস্বীকারই করা হয়েছে। সময়ে সময়ে মেধার গুরুত্ব উচ্চকিত করার স্বল্পপ্রাণ দু'-একটি চেষ্টা ছাড়া এ দেশের প্রশাসনকে অতি-সাধারণ পর্যায়ে নামিয়ে ফেলার অন্তহীন প্রচেষ্টার সূচনা ছিল স্বাধীনতার পর সম্পাদিত ওই অতি-যত্নের অতি-তাৎক্ষণিক নিয়োগকাণ্ড ।খন্দকার মোশতাক এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, আমাদের রাষ্ট্র পরিচালনায় কোনো অভিজ্ঞতা ছিল না। আবার স্বাধীন দেশে সিদ্ধান্ত গ্রহণে মন্ত্রীদের হাতে সম্পূর্ণ দায়িত্বভার ন্যাস্ত না হওয়ায় সাধারণভাবে মন্ত্রীরা 'কাজের মাধ্যমে অভিজ্ঞতা সঞ্চয়' করা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।শেখ মুজিবের প্রবণতা ছিল সচিবদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রক্ষা করা। সচিবদের সরাসরি নির্দেশনা দিয়ে তিনি দ্রুত ফলাফল ও কাজের অগ্রগতি প্রত্যাশা করতেন। এসব কারণে অনেক ক্ষেত্রেই মন্ত্রীরা নিজেদের অনেকটা দায়িত্ববিহীন ও জবাবদিহিতা থেকে মুক্ত বলে মনে করতেন। ক্রমান্বয়ে মন্ত্রীরাও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সব দায়-দায়িত্ব প্রধানমন্ত্রীর ওপর ছেড়ে দিয়ে তার ইশারা-ইঙ্গিতের দিকে চেয়ে বসে থাকতেন।

শেখ মুজিবের সাথে প্রশাসনিক বিষয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা সম্বন্ধে মুক্তিযুদ্ধকালে ভারতীয় সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় অধিনায়ক লে. জে. অরোরা বলেন, ‘পরবর্তী সময়ে আমি যখন তার সঙ্গে (মুজিব) আরো ঘনিষ্ঠভাবে মেলামেশার সুযোগ পেলাম, তখন আমি উপলব্ধি করলাম যে, তিনি প্রশাসনিক বিষয়ে যত না দক্ষ, জনগণকে উদ্বুদ্ধ করতে, তাদেরকে ক্ষেপিয়ে তুলতে তিনি তার চেয়ে অনেক বেশি দক্ষ ছিলেন। তিনি কথা বলে লোকজনকে নাচাতে পারতেন। কিন্তু প্রশাসন চালানোর ব্যাপারে তিনি তেমন দক্ষ ছিলেন না। সম্পদের অভাবনীয় স্বল্পতা এবং অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক মুদ্রার অভাবের কারণে ১৯৭৪ সালের প্রথম তিন মাসে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থার অতি দ্রুত এবং মারাত্মক অবনতি ঘটে। পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিও অর্থনীতিতে খারাপ প্রভাব ফেলে। সরকার সামাজিক ও রাজনৈতিক বিপর্যয়ের মুখে পড়ে।

১৯৭৩ সালের ১০ জুন দৈনিক পত্রিকায় একটি ভয়াবহ খবর ছাপা হয় । গাইবান্ধা শহর থেকে দশ মাইল দূরবর্তী মহিমাগঞ্জ এলাকা থেকে আগত পাঁচ শতাধিক অর্ধ-উলঙ্গ নারী মিছিল সহকারে শহরের প্রধান প্রধান রাস্তা প্রদক্ষিণের পর মহকুমা প্রশাসকের বাসভবন ঘেরাও করে কাপড়ের দাবি জানায়। এই একই প্রতিবেদনে দাবি করা হয় যে, সদর থানার তুলসীঘাট এলাকায় জনৈকা শাশুড়ি বস্ত্রাভাবে জামাইয়ের সামনে ঘর থেকে বেরুতে না পেরে আত্মহত্যা করেছেন। এমনই হয়েছিল বস্ত্র সংকটে জর্জরিত বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজের চিত্র।
শেখ মুজিব যখন যুগোশ্লাভিয়া সফরে গিয়েছিলেন, তখন তিনি আমলাতন্ত্রের ভূমিকা নিয়ে প্রেসিডেন্ট মার্শাল টিটোর সঙ্গে আলাপ করেছিলেন। একটি নতুন স্বাধীন রাষ্ট্রকে একটি ভিন্ন আর্থ-সামাজিক দর্শনের ওপর ভিত্তি করে গড়ে তুলতে হলে একজন নেতাকে কী সমস্যায় পড়তে হয়, এ নিয়ে দু'জনের মধ্যে আলোচনা হয়েছিল। পুরনো ধ্যান-ধারণা ও চিন্তা-ভাবনাসমৃদ্ধ কর্মকর্তাদের দিয়ে এই কাজটি যুগোশ্লাভিয়ায় কীভাবে হয়েছে, এটা জানতে শেখ মুজিব বিশেষ উদগ্রীব ছিলেন। এ ব্যাপারে শেখ মুজিবকে টিটো জানিয়েছিলেন,আমলাদের অবশ্যই রাজনৈতিক নেতৃত্বের আকাঙ্ক্ষা ও মতবাদের ধারণায় অংশীদার হতে হবে এবং তাদের অবশ্যই রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি অনুগত থাকতে হবে । টিটো গর্ব করে শেখ মুজিবকে বলেছিলেন, তিনি যুগোশ্লাভিয়ায় এসে যা দেখেছেন তাতে নিশ্চয় বুঝতে পারছেন যে, ওই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত ভুল ছিল না। সেই সময় সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে লোকজন নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীরা ব্যাপকভাবে হস্তক্ষেপ করেন, এমন কথাবার্তা লোকমুখে প্রচলিত ছিল।পরিকল্পনা কমিশনের উপ-প্রধান নুরুল ইসলাম শেখ কামালকে উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে পাঠিয়ে দিতে শেখ মুজিবকে পরামর্শ দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, এতে সে এই উত্তেজনাকর পরিস্থিতি থেকে দূরে থাকতে এবং নিজের ভবিষ্যতের ব্যাপারে প্রস্তুতি নিতে পারবে। শেখ মুজিব তার প্রস্তাবের সঙ্গে একমত হলেন; তবে এ ব্যাপারে তিনি তাঁর আর্থিক অক্ষমতার কথাও জানালেন। দাতা সংস্থা ও বিদেশি বেসরকারি দাতাদের সঙ্গে সম্পর্কের সুবাদে নুরুল ইসলাম বলেছিলেন, বাংলাদেশে তাদের নিয়মিত সাহায্য কর্মসূচির বাইরে কোনো বৃত্তির ব্যবস্থা করা যায় কি না, তা আমি চেষ্টা করে দেখতে পারি? তিনি উত্তর দিলেন, এ প্রস্তাব তাঁর কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। কামাল এমনিতে মেধাবী ছাত্র নয়, তার জন্য বৃত্তির ব্যবস্থা করলে সেটা ক্ষমতার অপব্যবহার কিংবা স্বজনপ্রীতি বলে গণ্য হবে। শেখ মুজিব তাঁর মন্ত্রীদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ ও বাজারে যে সব ‘গুজব’ ছিল সে ব্যাপারে অবগত ছিলেন। কিন্তু রাজনীতির জটিল ও বিপদসংকুল সময়ে যারা তাঁর সঙ্গে ছিলেন, সে সব সহকর্মীর বিরুদ্ধে তিনি কঠোর ব্যবস্থা নিতে দ্বিধান্বিত ছিলেন ।

দেশের অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির এত নিদারুণ অবনতি ঘটেছিল যে, নানা রকম নিবর্তনমূলক আইন প্রণয়ন এবং ‘রক্ষীবাহিনী'র মাধ্যমে নির্যাতন চালিয়েও তার দুর্দমনীয় গতি রোধ করে অবস্থা অনুকূলে নিয়ে আসা সম্ভব হয়নি। এ সময় রাষ্ট্রায়ত্ত খাতগুলো অব্যাহত লোকসানের শিকার হতে থাকে এবং শ্রমিক অসন্তোষের ফলে শিল্প-কারখানাগুলোতে চলতে থাকে বিশৃঙ্খলার সর্বগ্রাসী রাজত্ব। দেশের খাদ্যোৎপাদন তখনও ছিল চাহিদার তুলনায় অনেক কম। তদুপরি '৭৪-এর সর্বগ্রাসী দুর্ভিক্ষ জনগণের মনোবল নষ্ট করে দেয়। অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও কোন্দলের জের হিসেবে প্রায় প্রতিদিনই আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হতে থাকেন। এতে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো শক্তি সঞ্চয় করতে থাকে এবং জনমনে সরকারবিরোধী অসন্তোষও ক্রমশ বেড়ে উঠতে থাকে। এদিকে মোটামুটিভাবে একটি জোট নিরপেক্ষ অবস্থান ধরে রাখার ব্যাপারে শেখ মুজিবের চেষ্টা সোভিয়েত ইউনিয়নকে হতাশ করে। প্রকৃতপক্ষে তাদের 
কাছে এটা মনে হয়েছে যে, বাংলাদেশ ধীরে ধীরে পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক জোরদারে ও বড় মুসলিম অধ্যুষিত দেশ হিসেবে ইসলামি দুনিয়ায় বাংলাদেশের কার্যকর ভূমিকার জন্য শেখ মুজিব উদ্যোগ নিয়েছিলেন। এর পেছনে শুধু বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অবস্থানকে জোরদার করার উদ্দেশ্যই কাজ করেনি বরং ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে জনগণের মধ্যে যে ভীতি-শঙ্কা কাজ করছিল, সেটা দূর করাও ছিল এর উদ্দেশ্য । কিন্তু এই নীতির কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও ছিল । বাংলাদেশের এ ধরনের উদ্যোগ ভারতের জন্য অস্বস্তির কারণ হয়ে দেখা দিয়েছিল। অনেক সময় শেখ মুজিবের নিজের নির্দেশনাও অনুসৃত হতো না। এই ধরনের ঘটনা তাকে ভীষণ ক্ষুব্ধ করতো। সেই সময়ের এক উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তার বর্ণনায় এমন একটা ঘটনা জানা যায়। মুজিব কিছুদিন আগে দেয়া তাঁর নির্দেশ পালিত না হবার কারণে ভীষণ রেগে গিয়েছেন। তিনি তাঁর সচিবালয়ের একজন কর্মকর্তাকে ডেকে ঘটনার কারণ জানতে চাইলেন । ওই কর্মকর্তা তাঁর কক্ষ থেকে বেরিয়ে যাবার পর তিনি বললেন, এই সব অফিসাররা হাফপ্যান্ট পরা এবং ক্যান্টনমেন্টের ইংরেজি বলা চালাক-চতুর ক্যাপ্টেনদের হুকুম খুব তৎপরতার সঙ্গে পালন করে। রাজনীতিকরা সাধারণ পায়জামা-পাঞ্জাবি পরে, সাধারণ বাংলায় কথা বলে, কেউ কেউ পান চিবায় । তাই তাদের কথা শুনতে বা আদেশ পালন করতে তারা উৎসাহী হয় না। আমাদের জায়গায় ক্যাপ্টেনরা এলে তারা খুশি হয়।

রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারের নিয়ন্ত্রণে নেয়ার পর তা পরিচালনার জন্য এমন একদল নির্বাহীর হাতে ছেড়ে দেয়া হয়, যাদের 'সমাজতন্ত্র' সম্পর্কে ধারণা এবং আগ্রহ কোনোটাই ছিল না। এতে দু'-তিন দশকে গড়ে ওঠা এ জনপদের শিল্পভিত, যার মধ্যে ছিল অন্য অনেক কিছুর পাশাপাশি ৭০টি পাটকল, ১৭টি চিনিকল, ৭২টি বস্ত্রকল, ৩টি কাগজকল এমনকি তেল শোধনাগারও, লোকসানে লোকসানে জাতীয় বোঝায় পরিণত হয় এবং সরাসরি তাতে লাভবান হয় কয়েকটি দেশ। মুজিব এক্ষেত্রে মারাত্মক ভুল পরামর্শের শিকার হন পরিকল্পনা কমিশনের তরফ থেকে। স্বাভাবিকভাবে তাকেই এসবের অব্যবস্থাপনাজনিত দুর্নামের রাজনৈতিক দায়ভার বইতে হলেও ব্যক্তিগত পর্যায়ে তার অসহায়ত্ব ফুটে ওঠে নিম্নোক্ত উক্তিতে" যাকে যেখানে বসাই সে-ই চুরি করে । অবস্থাপন্ন ঘরের শিক্ষিত ছেলেদের 
বেছে বেছে নানা কল-কারখানায় প্রশাসক বানালাম, দু'দিন যেতে না যেতে তারাও চুরি করতে শুরু করলো। যাকে পাই তাকেই বলি- 'আমি সৎ লোক খুঁজে বেড়াচ্ছি।

ছোট-বড় সকল পরিত্যক্ত সম্পত্তির ব্যবস্থাপক, প্রশাসক এবং বোর্ড সদস্য হিসেবে ঢালাওভাবে দলীয় নেতা-কর্মীদের অথবা রাজনৈতিক নেতা বা মন্ত্রীদের পৃষ্ঠপোষকতাপ্রাপ্ত লোকদের নিয়োগ করা হয়।বিভিন্ন এলাকার বিভিন্ন ধরনের প্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য প্রশাসকের নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা-কর্মী অথবা তাদের পৃষ্ঠপোষকতাপ্রাপ্তদের নিয়োগ করা হতে থাকে। অনেক শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে অভিজ্ঞতা এবং কারিগরি জ্ঞানবিহীন দলীয় নেতা-কর্মী অথবা প্রতিষ্ঠানের অধঃস্তন কর্মচারীদের ব্যবস্থাপক হিসেবে নিয়োগ করা হয়।এভাবে দীর্ঘদিন যাবৎ পাকিস্তানি ব্যবসায়ী অথবা তাদের বিশ্বস্ত ব্যবস্থাপকদের দ্বারা পরিচালিত বহুসংখ্যক পাটকল, বস্ত্রকল এবং আরো শত শত শিল্প প্রতিষ্ঠান কতিপয় অদক্ষ, অনভিজ্ঞ ম্যানেজারের করায়ত্ত হয়। গোলযোগ, দুর্নীতি, লুট হয়ে দাঁড়ায় এর অনিবার্য ফল।সংঘবদ্ধ চোরাচালানীদের মাধ্যমে শিল্প প্রতিষ্ঠানের দামি যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল দেশের বাইরে পাঠিয়ে দেয়া হয়, উৎপাদন দ্রুত নেমে আসে নিচের দিকে, যেকোনো সুবিধাজনক মূল্যে এই সম্পত্তি বিক্রি বা বিনিময় করা হতে থাকে । প্রতিষ্ঠানের নগদ অর্থ বা তার নামে ব্যাংকে রক্ষিত টাকা হিসাববিহীনভাবে চলে আসে ব্যক্তিবিশেষের হাতে। ফলে অচিরেই এ ধরনের অধিকাংশ শিল্প প্রতিষ্ঠান দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, সেগুলো বন্ধ বা বিক্রি করে দেয়া হয়।এটা ছিল এমনই একটি ক্ষেত্র, যেখানে মন্ত্রী, সরকারি কর্মকর্তা, ‘ষোড়শ বাহিনী'র সদস্য যা-ই হোন না কেন, তাদের মধ্যে দেশপ্রেমের ছিটেফোঁটাও ছিল কি-না সন্দেহ; তাদের আত্মীয়-স্বজন, সমর্থক এবং পৃষ্ঠপোষকতাপ্রাপ্তদের কথা তো বলাই বাহুল্য ।১৯৭২ সালে সরকারি কর্মকর্তাদের বেতনের সিলিং কমিয়ে দেয়া হলে এ ব্যাপারে তারা তেমন কোনো অসন্তোষ বা ক্ষোভ প্রকাশ করেনি। এটা বলা মুশকিল যে, এই ঘটনা তাদের চিন্তাবিহীন আদেশ পালন, নাকি আত্মত্যাগ ছিল ।

এদিকে শেখ মুজিবের ঘনিষ্ঠজনরা প্রভূত সম্পদের মালিক হয়ে যান। বিনিয়োগবিহীন ব্যবসায়িক অংশীদারিত্বে শেখ কামাল বেশ এগিয়ে ছিলেন । মুজিবের ছোট ভাই বহুসংখ্যক বার্জ ও অন্যান্য নৌযানের মাধ্যমে প্রভূত অর্থের অধিকারী হয়ে গেলেন ।
শেখ মুজিবের ভাগ্নে শেখ মণি ১৯৭০ সালে ২৭৫ টাকা বেতনে সাংবাদিক হিসেবে পেশাগত জীবন শুরু করেন। কিন্তু '৭২ সালের মধ্যেই তিনি মতিঝিলে ‘বাংলার বাণী ভবন'সহ অনেক টাকা-পয়সার মালিক হয়েছিলেন। যুবলীগের প্রধান হিসেবে তার রাজনৈতিক ক্ষমতাও তুঙ্গে উঠেছিল। আরেক ভাগ্নে শেখ শহীদুল ইসলাম মাত্র ২৫ বছর বয়সে আওয়ামী ছাত্রলীগের প্রধান হিসেবে বাকশালের মন্ত্রী পর্যায়ের ১৫ জনের মধ্যে একজন মনোনীত হন।শেখ মুজিবের ভগ্নিপতি আবদুর রব সেরনিয়াবাত নিজে 'দুর্নীতিমুক্ত বলে সুনাম অর্জন' করলেও, মন্ত্রী হওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ রাজনীতিক ছিলেন না। তিনিও মন্ত্রী হয়েছিলেন । অন্য এক ভগ্নিপতি সৈয়দ হোসেন '৭১ সালে সেকশন অফিসার হিসেবে পশ্চিম পাকিস্তানে কাজ করছিলেন। '৭২ সালে দেশে ফিরে তিন বছরের মধ্যে অতিরিক্ত সচিব হয়েছিলেন। একমাত্র ভাই শেখ নাসের শেখ মুজিবের নাম ভাঙিয়ে তিন-চার বছরের মধ্যে বিরাট ধনী হয়েছিলেন ।শুধু সরকারদলীয় লোকেরাই নয়, শেখ মুজিবের বড় ছেলে শেখ কামালও দুর্বিনীত আচরণ করতেন। ঢাকার মাঠে আবাহনী'র সঙ্গে অন্য একটি টিমের খেলা চলছে। আবাহনী জিতবে। এগিয়েও আছে। শিক্ষা ও সংস্কৃতি মন্ত্রী ইউসুফ আলী, চিফ হুইপ শাহ্ মোয়াজ্জেম হোসেন ও শেখ কামাল একসঙ্গে বসে বাদাম খাচ্ছিলেন এবং খেলা দেখছিলেন। মধ্যমাঠে আবাহনীর এক খেলোয়াড় ফাউল করলো। রেফারি ননী বসাক, পাকিস্তানের খ্যাতনামা চিত্রনায়িকা শবনমের বাবা, খেলা পরিচালনা করছিলেন। আবাহনীর বিপক্ষে ফাউল দিলেন। কিকও হয়ে গেল। এই ফাউল ধরা ঠিক, না বেঠিক বলা যাবে না। কিন্তু খেলার তাতে কোনো লাভ-ক্ষতি হলো না। শেখ কামাল গর্জে উঠলেন: দেখলেন, ব্যাটা কীভাবে অন্যায় ফাউল দিলো!
সবাই চুপ করেই রইলো। খেলা শেষ হলো। মন্ত্রী ও শেখ মুজিবের পুত্রকে দেখে মাঠ থেকে তাদের দিকেই ননী বসাক উঠে এলেন । তিনি হাসিমুখে সবার সাথে হাত মিলাতে এগিয়ে এলেন।কথা নেই, বার্তা নেই, শেখ কামাল ননী বসাককে প্রচণ্ড এক ঘুষি মেরে ফেলে দিলেন। তার মুখ থেকে রক্ত ঝরতে লাগলো। শেখ কামাল রাগত স্বরে তখন চিৎকার করে বলছেন— 'ব্যাটা সব সময় এমনই করে, আবাহনীর বিরুদ্ধে বাঁশি বাজায়। তাকে আজ উচিত শিক্ষা দিয়ে ছাড়বো।


শেখ মণিও তার অপছন্দের কর্মকর্তাদের শায়েস্তা করার জন্য শেখ মুজিবকে দিয়ে তাদের চাকরিচ্যুত করতেন। একদিন চিফ হুইপ শাহ্ মোয়াজ্জেম হোসেনের উপস্থিতিতে শেখ মণি হন্তদন্ত হয়ে শেখ মুজিবের লিভিং রুমে প্রবেশ করলেন। শেখ মুজিব তখন পোশাক পরছিলেন। বললেন: মামা, কয়েকজন অফিসার বেশি বেড়ে গেছে, তাদের শায়েস্তা করা প্রয়োজন।তিনি কোনো প্রশ্ন না করে বা কিছু জানতে না চেয়ে নির্বিকারচিত্তে বললেন, নামগুলো আমার অফিসে পাঠিয়ে দিস। কারা বেড়ে গেল, কি তাদের অপরাধ, মণির সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততা কী— কোনো প্রশ্নই তিনি করলেন না! পরদিন সকালে খবরের কাগজে এলো কয়েকজনের চাকরি নেই। পিও নাইন-এ তাদেরকে বরখাস্ত করা হয়েছে। শিল্পোন্নয়ন সংস্থার অর্থ পরিচালক,বিক্রমপুরের কাজী রোমান উদ্দীন সাহেবেরও চাকরি নেই। জানা গেল, মণি কোনো অন্যায় অনুরোধ করলে তিনি তা অস্বীকার করায় আরো কয়েকজনের সঙ্গে তারও এই শাস্তি হলো। তদন্ত হলো না। অপরাধের কার্যকরণ কিছুই বিশ্লেষণ করা হলো না। অফিসারদের অতীতের রেকর্ড পরীক্ষা করা হলো না-এমনকি তাদেরকে আত্মপক্ষ সমর্থন করার সুযোগ বা কারণ দর্শানোর সময়ও দেয়া হলো না ।
শেখ ফজলুল হক মণি একটি শ্লোগান জনপ্রিয় করে তোলার চেষ্টা করেন, ‘মুজিবের শাসন চাই, আইনের শাসন নয়'। তিনি ‘বাংলার বাণী'তে লেখেন: "বাংলাদেশের মানুষ মুজিবের শাসন চায়, 'আইনের শাসন' নয়। পক্ষান্তরে আমীর, ওমরাহ, নায়েব, মোসাহেব, আমলা, পেয়াদার দল, যাদেরকে আমরা সাবেকি আমলের সেক্রেটারিয়েটের দালানবাড়ির সাথে ফার্নিচার, ব্যভিচারের মতোই উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছি, তারা বায়না ধরেছেন 'আইনের শাসন' দাও। পক্ষ দু'টো। এক পক্ষ আমাদের সাথে বরাবর ছিল। তারা জনতা-কামার, কুমার, তাঁতী, মজদুর, কৃষক। অন্য পক্ষ ‘মুক্তি'র ভয়ে ভিরমি খেয়ে ‘লাশঘরে’ গিয়ে ঢুকেছে। বিপ্লবের পরে আমরা তাদেরকে মালঘরে এনে বসিয়েছি।
বাংলাদেশ ‘আইনের শাসন মেনে চলবে কি-না, প্রথম দলের সেজন্যে মাথা ব্যাথা নেই । কারণ, তারা কোনোদিন 'আইন' মেনে এগোয়নি। মুজিবকে মেনে চলেছিল । আন্দোলনে, সংগ্রামে, দুঃসহ-দুর্দিনে, আকাশে, বাতাসে, পানিতে, ইথারে জনজাগরণের প্লাবন ঘটিয়ে তারা আইনের কেতাব পুড়িয়ে দিয়েছিল। জনতার এই তূর্যধ্বনির দুন্দুভি নিনাদ বাংলার হাট-বাজার, নগর-বন্দর, পথে- মাঠে কাঁপুনি ধরালেও আইনমানা লোকগুলোর কুম্ভকর্ণের ঘুম ভাঙেনি অনেক দিন । '৭১-এর মার্চের অসহযোগে তারা অফিসে যায়নি এই কারণে যে, জনতার প্লাবন পেরিয়ে সেখানে যাওয়া সম্ভব ছিল না। ইসলামাবাদের হ্যারিকেনের তেল তখন ফুরিয়ে এসেছে। মুজিবের নির্দেশে বাংলাদেশে মশাল জ্বলছে। অর্থাৎ প্রাণের টানে যতটা নয়, প্রাণ ভয়ে তার চাইতে অনেকটা তারা মুজিবের নির্দেশ তখন মেনে চলেছিল।লক্ষ্যণীয় যে, মার্চ মাসের বাংলাদেশ শাসিত হয়েছিল আইনের শাসনের বন্ধন মেনে নয়, মুজিবের নির্দেশ মেনে।বাংলাদেশ পাকিস্তানি বনেদি আইন মানবে অতিবড় শাস্ত্রজ্ঞও বিপ্লবের পরে এটা আশা করেনি । রাজনীতি শাস্ত্রের গুণাগুণ বিচারে তর্কালংকার অধ্যাপকদের তৈলাধার পাত্র, কি পাত্রাধার তৈলের কুটিল বিতর্কের মারপ্যাচের মধ্যে না ঢুকেই জনসাধারণ মুজিবকে ভোট দিয়েছিল। তাদের বিশ্বাস ছিল, মুজিব যেটা বলছেন সেটা কল্যাণের। পণ্ডিতের নথিপত্রে যেটা লেখা রয়েছে সেটা বিতর্কের। আর বিতর্কের ঔরসেই জন্ম দ্বন্দ্বের। দ্বন্দ্ব থেকে কলহের সূত্রপাত, অনৈক্যেরও। মুজিব সব বিতর্ক, দ্বন্দ্ব, কলহের ঊর্ধ্বে। বাঙালি জাতির ঐক্যের প্রতীক তিনি। তাই মুজিবকে পাকিস্তানের কারাগারে রেখে যেদিন স্বাধীনতা এলো, সেদিন জনতা রব তুললো, স্বাধীনতা পেয়েছি ভালো কথা, এখন ওই স্বাধীনতার নবজাত শাবকটাকে বাঁচাবার জন্যে মুজিবকে চাই। তাদের দৃষ্টিতে মুজিববিহীন স্বাধীনতা হলো কূলহীন দরিয়ার মাল্লাহীন তরীর মতোই।আজ স্বাধীনতা এনেছি, মুজিবকেও পেয়েছি। বরাভয় কাটিয়ে উঠে নির্ভয়ে আছি। নির্দ্বিধায় বলেছি, মুজিবই আমাদের শাসন করুন। কিন্তু ঐ মুজিবের শাসনকে উড়িয়ে দিয়ে 'আইনের শাসন' কায়েম করবার কথাটা উঠতেই বুকের মধ্যে ধক্ করে উঠছে। মনে সন্দেহের দোলা লাগছে। "
সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা মার্চ, ২০২৬ বিকাল ৩:৫৭
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পেজেশকিয়ান ও আরাগচি কেন ট্রাম্পের টার্গেট লিস্টে নেই?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০২ রা মার্চ, ২০২৬ রাত ১০:০৭


তেহরানের ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে এখন এক অদ্ভুত সমীকরণ মেলাচ্ছে ইরানিরা। যে অভিযানে আয়াতুল্লাহ খামেনি থেকে শুরু করে দাপুটে সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদ এবং সামরিক ও পুলিশ বাহিনীর ৪৮ জন... ...বাকিটুকু পড়ুন

ওমর খাইয়ামের পোস্টে কমেন্ট করতে পারছি না!

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০২ রা মার্চ, ২০২৬ রাত ১১:৩৫

(সাময়িক পোস্ট)
ব্লগার ওমর খাইয়ামের পোস্টে কমেন্ট করতে গিয়ে বুঝতে পারলাম, তিনি আমাকে ব্লক করেছেন। আজকে তাঁর একটি পোস্টে কয়েকটি কমেন্ট করেছিলাম, একসাথে ৬- ৭টা! এরপরে, দেখি, লেখা উঠছে -... ...বাকিটুকু পড়ুন

শূন্যতাকে ছুঁয়ে

লিখেছেন স্প্যানকড, ০৩ রা মার্চ, ২০২৬ রাত ২:৩৯

ছবি নেট



কে বলেছে আমার কেউ নেই
এইযে সুনীল আকাশ
যার বুক ভরা থোকা থোকা মেঘের দল
নক্ষত্রের উঠানামা
ওরা কি আমার পর?

এইযে রোদ
যা গায়ে মেখে চলে যাই কতোদূর
নিমেষে দু:খ ভুলি
এইযে বৃষ্টি জল
কখনো কখনো... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইরান যুদ্ধ

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ০৩ রা মার্চ, ২০২৬ বিকাল ৫:০৬



ইরানের মাটি পানি ও আবহাওয়া কৃষি উৎপাদনের জন্য খুবই অনুকূল পরিবেশ। বাংলাদেশের তুলনায় ইরানের সমতল ভূমি কম তারপরও ইরানে গম উচ্চ ফলন হয়। ভোজ্য তৈল জাত শষ্য উচ্চ ফলন... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধোলাই-৭১

লিখেছেন মায়াস্পর্শ, ০৩ রা মার্চ, ২০২৬ বিকাল ৫:২২



মধ্যপ্রাচ্যে আছি। দেশে ফেরার টিকেট কাটা ছিল ২ তারিখে। এর মধ্যেই শুরু হয়ে গেলো যুদ্ধের দামামা।আমি আরবি বুঝিনা। এয়ারপোর্টে কাউকে ইংরেজিতে কিছু জিজ্ঞেস করলে বলে ''খালাস খালাস'' মাফি মাফি।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×