২০১২ সাল, তখন সারা দেশে সম্ভবত উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা চলছিল। হঠাৎ দেখি সারা দেশ উত্তাল। কারণ, সিলেটের জনপ্রিয় বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীকে গুম করা হয়েছে। সমগ্ৰ দেশ তোলপাড়। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইলিয়াস আলীর পরিবারকে ডেকে সান্ত্বনা দিলেন। কিন্তু দীর্ঘ ১ যুগেরও বেশি সময় পরেও ইলিয়াস আলী ফিরে আসেননি। ইলিয়াস আলীর শিশুকন্যা বাবার প্রতীক্ষায় দীর্ঘ ১ যুগ কাটিয়ে দিলো কিন্তু বাবা আর ফিরে আসেননি। পরে জানা গেল, খোদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে ইলিয়াস আলীকে হত্যা করা হয়েছে। অথচ তার মৃতদেহটা পর্যন্ত পরিবারকে দেওয়া হয়নি। তার স্ত্রী সন্তান শেষবারের মতো তাকে দেখতে পারেনি। তার কোনো কবর হয়নি, যেখানে দাঁড়িয়ে তার স্বজনরা চোখের পানি ফেলে নিজেদের মনকে শান্ত করবে।
বিতর্কিত এক বিচারে জামায়াত নেতা মীর কাসিম আলীর ফাঁসির রায় হয়েছে। কয়েকদিন পর ফাঁসির দণ্ড কার্যকর করা হবে। তার মামলা দেখাশোনা করছেন তার ব্যারিস্টার পুত্র মীর আহমেদ বিন কাসিম আরমান। হঠাৎ একরাতে আরমানকে তুলে নিয়ে গুম করা হলো। একদিকে পিতা ফাঁসির মঞ্চে, অন্যদিকে পুত্রকে গুম করে রাখা হলো। ফাঁসির আগে পিতা-পুত্রের শেষ দেখা হলো না। শেখ হাসিনার পতনের পর দীর্ঘ ৮ বছর শেষে ব্যারিস্টার আরমান গুম অবস্থা থেকে মুক্তি পান ।
জামায়াতের সাবেক আমীর গোলাম আযম। তাঁর পুত্র ব্রিগেডিয়ার আযমী বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম সেরা সেনা কর্মকর্তা। একদিন হঠাৎ তাঁকে বাসা থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হলো। তারপর তাঁর আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। হাসিনার পতন হলে দীর্ঘ ৮ বছর পর গোপন সামরিক কারাগার “আয়নাঘর” থেকে তিনি মুক্তি পান।
এভাবে একে একে প্রায় ৩০০০-এর অধিক মানুষকে গুম করা হয় ফ্যাসিস্ট শাসনের ১৬ বছরে। বিরোধী দলীয় নেতা-কর্মী, আলেম-ওলামা, নারী, শিশু, বৃদ্ধ, ছাত্র, ব্যবসায়ী কেউই বাদ যায়নি গুমের নৃশংসতা থেকে ।গুম হওয়া ব্যক্তিদের ভেতর ৫৬ শতাংশ মানুষ জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মী, ৩৭ শতাংশ বিএনপির নেতাকর্মী। অর্থাৎ, মোট গুমের শিকার ব্যক্তিদের ৯৩ শতাংশ হচ্ছে বিএনপি এবং জামায়াতের নেতাকর্মী। সুতরাং, পলাতক ফ্যাসিস্ট সরকার গুমকে তার রাজনৈতিক বিরোধীদের দমনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছিল।গুম হওয়া ব্যক্তিদের নির্মম শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হতো। অনেককে নির্যাতনের মাধ্যমে হত্যা করা হয়েছে। যাদের বাঁচিয়ে রাখা হতো তাদের ওপর নির্মম নির্যাতন চালাত। নির্যাতনের নির্মমতা থেকে নারীদেরও রেহাই দেওয়া হতো না । র্যাবের আলেপ উদ্দিন নামের এক কর্মকর্তা বন্দির স্ত্রীকে রোজা ভাঙিয়ে ধর্ষণ করেছিল। আলেম-ওলামা বা ধার্মিক মুসলিম হলে নির্যাতনের মাত্রা বেশি হতো।
অবশেষে এক অভূতপূর্ব ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে ফ্যাসিস্ট শাসনের অবসান ঘটলে প্রফেসর ড. মোহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়। সরকার ফ্যাসিস্ট আমলের গুমের ঘটনা তদন্তের জন্য গুম-সংক্রান্ত কমিশন অব ইনকোয়ারি গঠন করে। কমিশন গুমের ঘটনাগুলোর রহস্য উন্মোচনে অমানবিক পরিশ্রম করে। নানা বাধা- বিপত্তি অতিক্রম করে তারা কাজ চালিয়ে যেতে থাকে। গুম কমিশন একের পর গুমের রহস্য উদ্ঘাটন করে দায়ী ব্যক্তিদের সামনে আনতে থাকে। কমিশন তাদের তদন্তে প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত দুটি রিপোর্টের মাধ্যমে প্রধান উপদেষ্টার নিকট উপস্থাপন করে। এই রিপোর্ট মামুলি কোনো রিপোর্ট নয়। এটা বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে অন্ধকারতম দিকের নির্মম বর্ণনা। শুম কমিশন যে অসাধ্য সাধন করেছে তার জন্য এই জাতি আজীবন তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকবে, ইনশাআল্লাহ । পরের পর্ব গুলো তে গুম কমিশনের রিপোর্ট , জাতিসংঘ মানবাধিকার দপ্তেররর তথ্য- অনুসন্ধানি প্রতিবেদন এবং দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক গনমাধ্যমে আওয়ামীলীগ এবং হাসিনার নৃশংসতার খবর ছবি এবং ভিডিও , এবং সবশেষে আন্তর্জাতিক গনমাধ্যমে শেখ হাসিনার পতন ও পলায়ন নিয়ে বিভিন্ন চিত্র তুলে ধরবো ইনশাল্লাহ।
সর্বশেষ এডিট : ০৭ ই মার্চ, ২০২৬ রাত ৯:০২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




