somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

গেরিলা একটি অসম্পূর্ণ শিশু ও একটি অমার্জনীয় জন্মদান পদ্ধতি

১৬ ই ডিসেম্বর, ২০১১ দুপুর ২:৩৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

কিশোরী শিমুল (বিল্লাহ্‌) ইউসুফের গান গাওয়ার দৃশ্য এবং তার চিত্রায়ণ প্রতিটি লোমকূপে শিহরণ তুললেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সাউন্ড ইফেক্ট ভাল লাগেনি। ইতিমধ্যেই যেহেতু এ বিষয়ে বেশ সমালোচনা হয়েছে তাই তার পুনরাবৃ্ত্তি আর করছি না। তবে উল্লেখিত গানের চিত্রায়ণে মসজিদ-মন্দির-গির্জা-প্যাগোডায় প্রার্থনার দৃশ্যে এটি পরিস্কার হয়ে যায় ’৭১-এর যুদ্ধ কোন ধর্মযুদ্ধ/জিহাদ/ক্রুসেড ছিল না। এ বিষয়টি আরও ফুটে উঠেছে পুরুষদের নিম্নাঙ্গ পরীক্ষা করা, টুপি/দাড়ি/বোরকা নেই বলে কটাক্ষ করায়। আর এ পরীক্ষা কারা নিয়েছে? মদ, নারী আর সম্পত্তি লোভী হানাদার বাহিনী আর বেঈমানেরা। চরম পাকি’পন্হী হয়েও যদি ধর্মযুদ্ধ বলে এ যুদ্ধকে ধরে নেই এবং নিম্নাঙ্গ পরীক্ষা যদি যৌক্তিক বলে ধরে নেই, তবুও মুসলমান প্রমাণ হওয়ার পরও তাঁদের বিদ্রুপ/হত্যা করা এটিই প্রমাণ করে যে এটি ছিল একটি জাতিকে তীব্র ঘৃণার বিষয়। এ কারনেই আমরা ছিলাম পাকি'দের কাছে "মাক্ষি"। আর এ গণহত্যাগুলো বাঙালি জাতির মেরুদন্ড ভেঙ্গে দেয়ার চেষ্টা ছাড়া অন্যকিছুই নয়।

সংক্ষিপ্ত হলেও চমৎকার রূপায়ণ ছিল মিসেস খান, কাজের মেয়ে বা সর্দার সাহেবের চরিত্রগুলো। কিন্তু অসম্পূর্ণ ও অপ্রয়োজনীয় অনেক চরিত্রের উপস্হিতিও ছিল দৃষ্টিকটু। লিজেন্ডারী শাচৌ, হাবিবুল আলম বীরপ্রতীক, শহীদ আলতাফ মাহমুদ প্রভৃতি চরিত্রগুলো ছিল অসম্পূর্ণ। আর আজাদ আবুল কালাম বা ট্রেনের ক্যানভাসার ইত্যাদি চরিত্রগুলো ছিল অপ্রয়োজনীয়।

সমাপ্তিতে বিলকিসের হাতের গ্রেনেড থেকে উড়ন্ত ধোঁয়া লক্ষ শহীদ খোকা'র লাশের চরম অবমাননার নির্মম ঘটনাগুলোর প্রতীকী চিত্রে পরিণত হয়েছিল। আর খোকা হত্যাকান্ডের পর থেকে বিলকিস-খোকার ছোটবেলার স্মৃতির চিত্রায়ণ অশ্রু ঝরিয়েছে অনেকক্ষণ। :# (দাগ কেটেছে মনের গভীরতম স্থানে।) টর্চারের কিছু দৃশ্য (গ্রামের পটভূমিতে) বেশ বাস্তব লেগেছে।

তবে, প্রচুর লাইভ অ্যামুনিশন আর এক্সপ্লোসিভ শুটিংয়ে ব্যবহার করা হলেও, তার শব্দ প্রকাশ বা চিত্রায়ণ ছিল হাস্যকর। একটি গ্রেনেড চার্জের সাথে সাথে একটি মিলিটারি জিপ উড়ে যাওয়া কি হাস্যকর না? বিলকিস গ্রেনেড বিস্ফোরণ ঘটানোর কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে একটি বিল্ডিং উড়ে যাওয়া ভ্রুকু্ঞ্চন ছাড়া অন্য কোন অনুভুতির উদ্রেক করে না। আবার মেজর সরফরাজকে বাম দিক থেকে দুজন ব্রাশ করলেও একটি মাত্র গুলি দেখান হলো তার মাঝ কপালে।

আসা যাক visual F/X প্রসঙ্গে। মানুষ জবাইয়ের নির্মম দৃশ্য না দেখলেও প্রতি বছরই গরু/খাসি জবাই নিয়মিত দেখতে হয়। সর্দার সাহেব বা খোকন কমান্ডারকে জবাইয়ের দৃশ্য দেখে কি বলার আছে? ফিনকি দিয়ে রক্ত ছোটা নয়! নয় কুৎসিত ঘড়ঘড় শব্দও! Rookieদের থেকে আর কি আশা করা যায়। জনাব তারেক মাসুদ বৈরী পরিবেশে আর আর্থিক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও "মাটির ময়না" তৈরী করে দেখিয়েছেন। আবার শ্রদ্ধেয় জহির রায়হান শুধুমাত্র কাহিনী আর তৈরীতে ক্যারিশমা দেখিয়ে "জীবন থেকে নেয়া" করেছেন, যা বহুবার দেখার পরও নতুন করে দেখতে গেলে নতুন অর্থ নিয়ে ছবির বিভিন্ন চরিত্রগুলো মনে জায়গা করে নেয়। ইমপ্রেস টেলিফিল্ম, সরকার আর সামরিক বাহিনীর সরাসরি সাহায্য পাবার পরও ইউসুফ সাহেব পুরো ছবিতে বারবার হাঁসি/বিরক্তির উদ্রেক করেছেনX(

এবার শতাব্দী ওয়াদূদ প্রসঙ্গ। একাধিক সাক্ষাতকারে তিনি বলেছেন একজন সামরিক অফিসারের প্রতিচ্ছবি ফুঁটিয়ে তোলার জন্য একজন মুক্তিযোদ্ধা ও অবসরপ্রাপ্ত লে. কর্নেলের অধীনে কত মাস পরিশ্রম করেছেন। তা সার্থক হয়েছে! মেজর সরফরাজের চরিত্রটি স্রেফ Simulation মনে হয়েছে।তার চুল আর মুখ দেখে ফেসওয়াশ/হেয়ারোবিকস্/পারসোনা নামগুলোই ঘুরেফিরে মনে এসেছে। এছাড়াও অনেক চরিত্রের (বিশেষ করে যেসব বিচ্ছুরা মাত্রই মেলাঘর থেকে এসেছে) মুখ আর চুল দেখে ওসব নাম বা অন্যান্য ব্রান্ডের বিউটি পার্লারের কথাই বারবার মনে পড়েছে।

ফিরে যাই ভাল লাগায়। নৌকায় খাবার দৃশ্যে পানিতে লাশের স্তুপ দেখে বিলকিস বানু (মূল চরিত্র) বমি করলেও বাচ্চা ছেলেটির নির্বিকার খেয়ে চলা আর বিলকিসদের প্লেট টেনে নিয়ে ছাতুটুকু শেষ করার কয়েক সেকেন্ডের সিকোয়েন্স আবারও দাগ কেটেছে মনের গভীরতম স্থানে। অন্যদিকে ক্যাপ্টেনের ডায়লগেও এ বিষয়ও সুন্দরভাবে ফুঁটে উঠেছে যে পাকিদের চরম শারীরিক অবমাননার অন্যতম একটি উদ্দেশ্য ছিল সাচ্চা মুসলমান (পাকি) জন্ম দিয়ে বিভাজন জিইয়ে রাখা। তাদের মনোবেদনার কারণ হচ্ছে এরকম অনেক সাচ্চা মুসলমান জন্ম নিলেও তাদের উদ্দেশ্য পূরণ হয়নি। পুরনো সাচ্চা (!) মুসলমানরা তা জিইয়ে রাখলেও অধিকাংশ নতুনরা তা রাখেনি।

সেট পিস কিছু যুদ্ধদৃশ্য দেখানো হয়েছে। কথা হচ্ছে ২/৩ জন শত্রু মারা যাবার সাথে সাথেই কি সব যোদ্ধারা অক্ষয় কুমারের (থাম্বস আপের বিজ্ঞাপনের) মত করে চলতে চলতে গুলি করে যুদ্ধ জিতে যায়? শেষ দিকের যুদ্ধে শতাধিক যোদ্ধাকে লাইন ধরে এগুতে দেখে টিভি ক্যামেরার সামনে দলীয় পেশাজীবীদের (কাঙ্খিত নেত্রীর নজরে পড়ার জন্য) ধাক্কাধাক্কি করার দৃশ্যের কথাই চকিতে মনে পড়েছে আর সেট পিসে বাংলার অসংখ্য সূর্য সন্তান শহীদ হয়েছেন (যেমন ৩১ জুলাইয়ের কামালপুরের যুদ্ধ)। কিন্তু একটি বড় মাপের সেট পিস দেখানো হলেও আমাদের পক্ষের কোন ক্ষতি দেখানো হলো না যা একদমই বৈসাদৃশ।

ছবির ট্রেলারে প্রদর্শিত কিছু সংখ্যা দেখে মনে হয়েছে ক্রাক প্লাটুনের দুধর্ষ গেরিলা বাচ্চু সাহেব কিছু রেকর্ড করার দিকে যতটা মনোযোগ দিয়েছেন অসাধারণ একটি ছবি তৈরীতে ততোটা মনোযোগ দেননি।

একটি প্রশ্ন করেই এ লেখার যবনিকা টানতে চাই। ৩০ আগস্টের প্রথম প্রহরের নির্মম ঘটনার মূল ব্যক্তিটির পরিচয় আবারও কেন গোপন করা হলো? ব্যক্তিটি যদি শহীদ বদি বা শহীদ বাশার হয় তবে বলার কিছু নেই। কিন্তু ছবিতে দেখানো হয়েছে সেই ব্যক্তি গেরিলাদের পরিচয় আর অবস্থান ফাঁস করে এবং রাজসাক্ষী হয়ে remedy নিয়েছিল। [এবং বর্তমানে প্রভাবশালী পরিবার, মুক্তিযুদ্ধের ....] তাহলে কেন এই গোপনীয়তা?



পুনশ্চ: যারা সংখ্যাতত্ত্ব দিয়ে ৩০ লক্ষ শহীদের সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তাদের ‘৭১-এর ২০ মে চুকনগর গণহত্যার কথাটি মনে করিয়ে দিতে চাই। সংখ্যাটি ছিল কমপক্ষে ১০,০০০+ এবং এটি ছিল বাংলাদেশের মাত্র একটি অংশ।

আর চরম শারীরিক অবমাননার সংখ্যাটি বর্তমান হলিফ্যামিলিতে তখন কর্মরত ছিলেন এমন ব্যক্তিবর্গের বক্তব্য থেকেই বোঝা যায়। সমস্যা হচ্ছে যারা এসব প্রশ্ন তোলেন তারা কখনও এসব সাক্ষাৎকার পড়েন বা দেখেন না।
৪টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফিরে যাওয়া বলে কিছু নেই

লিখেছেন রানার ব্লগ, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:৫৫

আমি যে নদীর কথা ভাবি,
সে নদী জল নয় সময় বয়ে নিয়ে চলে।
এক পাড়ে মানুষের কোলাহল,
হাটের গুঞ্জন, ভাতের গন্ধ, সন্ধ্যার আহবান,
অন্য পাড়ে কেবল শূন্যতা,
যেন কেউ কোনোদিন সেখানে ছিলইনা।

তবু দু পাড়ই... ...বাকিটুকু পড়ুন

১০০০-তম পোস্টঃ কন্যা আপন সাজন সাজে রে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:২৪

আমাকে ও রাহমিনকে এনিমেট করলে কেমন দেখাবে? এই আইডিয়া থেকেই গানটা রিমিক্স করে এনিমেটেড ভিডিও সং বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়েছি। ছোটবেলায় মেঝ খালার বিয়েতে এই গানটা শুনেছিলাম। সবাইকে গানটি দেখা ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

×