১।
ভোর ৫টা,
আমার বালিশের পাশে রাখা মুঠোফোন জোরে শব্দ করে বেজে উঠলো। স্ক্রীণে তাকিয়ে দেখলাম কয়টা বাজে। দেখেই মেজাজ চরমে উঠলো। এত স্বাদের ঘুম হারাম করার জন্য কলদাতার গুষ্ঠী উদ্ধার করতে লাগলাম। তবে বেশিক্ষণ করতে পারলাম না। কারণ সমানে বেজেই চলছে মূঠোফোন। যখন অনিচ্ছা সত্তেও ফোন ধরলাম তখন ওপাশ থেকে বিশাল একটা ঝাড়ি শুনতে হল ।
ওপাশ থেকেঃ তোরে চড় দেয়া উচিত।
আমিঃ (অপ্রস্তুত হয়ে), কে, কে আপনি?
ওপাশ থেকেঃ ন্যাকামি করস তুই!! আমারে চিনিস না??
আমিঃ (খানিকক্ষণ ভেবে) ওওওওও, লাকি আপু। কেমন আছো?
ওপাশ থেকেঃ যাক, চিনতে পেরেছিস তাহলে।
আমিঃ হ্যা, চিনেছি শেষ পর্যন্ত। (একটূ মুচকি হাসি)
ওপাশ থেকেঃ খাজুরে আলাপ বাদ দে। এখনই পিজিতে চলে আয়।
আমিঃ এত সকালে!! কেন কি হয়েছে?
ওপাশ থেকেঃ আসলেই বুঝতে পারবি।
এই বলে আমাকে কথা বলার সুযোগ না দিয়ে ওপাশ থেকে ফোন কেটে দিল।
কি আর করার?? আড়মোড়া ভেঙ্গে বিছানা থেকে যখন উঠলাম তখন সকাল ৬ টা বেজে গিয়েছে। সকালের মিষ্টি রোদে ঘুম থেকে উঠেই মনটা ভাল হয়ে গেল।
২।
আমার বাসা থেকে পিজি হাসপাতালের দূরত্ব খুব একটা বেশি নয়। আর তাই রিকশা করেই রওনা দিলাম হাসপাতালের দিকে। অসাধারণ সুন্দর সকালের পরিবেশ। নেই কোন যানবাহনের কালো ধোয়া, অসহ্য যানযট, চিল্লা পাল্লা। সুন্দর হাওয়া বইছে আজ। লাকি আপু আমার বড় বোনের বান্ধবী। ছোটবেলা থেকেই আমাদের বাসায় উনি আসেন। আমাদের পরিবারের সাথে তার সখ্যতা তখন থেকেই। বিয়ে করেছেন প্রায় ৪/৫ বছর হয়ে গেল। এখনও আমাদের বাসার সাথে তার যোগাযোগ কমে নি।
পিজি হাসপাতালের গেইটে যেয়ে আপুকে ফোন দিলাম। উনি আমাকে সি ব্লকের ৬ তলায় ৬৫০ নম্ভর রুমে আসতে বললেন। ভেতরে ভেতরে কেমন জানি একটা শিহরণ খেলে যাচ্ছে। যদিও জানি না কেন আমাকে এখানে এত সকালে ডাকা হল। লিফটে উঠে সোজা চলে গেলাম ৬ তলায় ৬৫০ নম্বর রুমে। যেয়েই লাকি আপুকে দেখে বেশ অবাকই হলাম।
তার ২য় বারের মত বাচ্চা হয়েছে। তাও আবার ২ দিন আগে। অথচ এই খুশির খবরটা উনি আমাকে কিংবা আমাদের পরিবারকে আগে জানানি। আমাকে সারপ্রাইজ দেয়ার জন্যই উনি এই প্লান সাজিয়েছিলেন। আমাকে দেখে উনি খুব খুশি হলেন। পাশে রাখা তার বাচ্চাকে দেখলাম। অবিকল মায়ের চেহারা পেয়েছে। যদিও বাচ্চার কিছু প্রব্লেম আছে এখনও। ২ দিন ডাক্তারদের নিবিড় কেয়ারে থাকার পর আজ সকালে বাচ্চাকে মায়ের কাছে দেয়া হয়েছে।
অনেক কথা হল লাকি আপুর সাথে। ফোনে তাকে কথা বলিয়ে দিলাম আম্মা আর বড় বোনের সাথে। মিষ্টি খেলাম। হাসি তামাসাও সমান তালে চলতে লাগলো।
৩।
দুপুর ৩ টা,
ডিউটি ডাক্তার এসে চেকআপ করে গেল বাচ্চা আর মা কে। কিছু জরুরি ঔষুধ কিনতে হবে। আশেপাশে কেউ না থাকাতে আমাকেই নিচের দোকানে যেতে হল। ঔষুধ গুলো কিনে কেবিনে ফিরে এসে দেখি বাচ্চা সমানে কান্নাকাটি করছে। ডাক্তারদের ডাকা হল। তারা ভালমত দেখে শুনে যা বললো তার মানে হল বাচ্চার শ্বাসপ্রশ্বাসে প্রব্লেম হচ্ছে অনেক। গায়ে লাল লাল অনেক দাগ উঠেছে। ঘন ঘন হাপাচ্ছে। এই অবস্থায় লাকি আপু কান্নাকাটি শুরু করে দিয়েছেন। কোন মতেই তাকে থামানো যাচ্ছে না। এরই মধ্যে খবর পেয়ে দুলাভাই সহ পরিবারের সবাই চলে এসেছেন। বড় বোনও এসেছেন বান্ধবীর পাশে থাকতে।
বাচ্চাকে কেয়ারে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আমরা চিন্তিত, বিরস মুখে বসে আছি। কেউ কেউ পায়চারী করছে। কেউ বা লাকি আপুকে সান্তনা দিচ্ছেন। পিজি হাসপাতেলারে এক ইন্টার্ণ ডাক্তারের সাথে আমার এরই মধ্যে সখ্যতা তৈরি হয়ে গিয়েছে। তার কাছ থেকে জেনেছিলাম এরকম সমস্যা বাচ্চার কেন এবং কি কারণে হতে পারে। কিভাবে এ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। ডাক্তারী পরিভাষায় একে কি বলে। এসময়ে মায়ের কিভাবে টেক কেয়ার করতে হয়। এরকম আরো অনেক কিছু। কথায় কথায় তার সাথে পরিচিত হয়ে গিয়েছি।
আল্লাহ এর অশেষ রহমতে বাচ্চা ৩ দিন পর কিছুটা সুস্থ হলে তাকে বেডে দিয়ে গেল ডাক্তার। সবার মুখে এক টুকরো আনন্দ যেন ছেয়ে গেল। খেয়াল করে দেখলাম আমার পরিচিত সেই ডাক্তারও খুব খুশি হয়েছেন।
৪।
৩ দিন পর,
হাসপাতাল থেকে রিলিজ দেয়া হয়েছে লাকি আপাদের। বাচ্চা এখন সুস্থ আছে। সবাই যে যার বাসায় চলে যাচ্ছে আজ। আমি টানা কয়েকদিন হাসপাতালেই ছিলাম। শুধু বাসায় গিয়ে রাতে ঘুমানো ছাড়া। বিদায়বেলায় সেই ইন্টার্ণ ডাক্তারের কাছ থেকে বিদায় নিতে তার বসার রুমে গেলাম। উনি কি এক বিষয় নিয়ে খুব চিন্তিত। সেটা তার চেহারা দেখেই বুঝতে পেরেছিলাম। হঠাৎ তার রুমে এসে দরজা টোকা দিতে উনি অন্যদিকে ফিরে চোখ মুছে আমার দিকে দৃষ্টি ফেরালেন।ব্যপারটা আমাকের বেশ অবাক করল। বুঝলাম না তার কি হল। তারপরও বললাম -
আমিঃ কাঁদছেন কেন?
সেঃ কই, না তো।
আমিঃ এই যে কাঁদছেন।
সেঃ না এমনি। বলুন, কেন এসেছেন?
আমিঃ বিদায় নিতে এসেছি। আপনি অনেক সহযোগিতা করেছেন আমাদের। সে জন্য অনেক ধন্যবাদ আপনাকে।
সেঃ এ আর এমন কি!! আমি আমার ডিউটি পালন করেছি শুধু।
আমিঃ তারপরও এরকম কেউ করে না কারো জন্য সাধারণত।
সেঃ (কিছুক্ষণ চুপ থেকে) আপনাদের আপন ভেবেই করেছি। বিশেষ করে আপনাকে। ভাল থাকবেন। আর ফোন নম্বর তো দেয়াই আছে। ফোন দিবেন সময় করে।
আমিঃ আল্লাহ হাফেজ
বিদায় বেলায় তার চোখে আবারো পানি দেখতে পেলাম। যা আমাকে কিঞ্চিত ভাবিয়ে তুললো।
৫।
৫/৬ মাস পর,
এরই মধ্যে সেই ইন্টার্ণ ডাক্তারের (প্রমা) সাথে আমার বেশ ভাল একটা রিলেশন তৈরি হয়েছে। আমাদের এই সম্পর্ক এর ব্যপারটা ২ জনের পরিবার খুব ভাল মতই জানেন। তারপরও এমন কিছু আমাদের মধ্যে হয় নি যে তারা কোন সন্দেহ করবেন। তাকে নিয়ে সময় পেলেই আমি ঘুড়তে বের হই। সিনেমা দেখি। রাত জেগে কথা বলি। যদিও সে অনেক ব্যস্থ কিন্তু তারপরও সে আমাকে অনেক সময় দেয়। এটা মাঝে মাঝে অনেক অবাক করে আমাকে।
প্রমা মাঝে মাঝে বেশ আবেগ প্রবণ হয়ে যায়। তখন সে আমাকে কাছে পেলে সমানে চোখের পানি ফেলতে থাকে। আর শুধু বলে আমাকে সে হাড়াতে চায় না। তাকে তখন শান্তনা দেয়া ছাড়া আমার আর তেমন কিছুই করার থাকে না।
আর এভাবে করেই চলে যাচ্ছিল আমাদের দিন গুলো
৬।
১৩ই এপ্রিল সকাল ৮ টা,
আজকে প্রমার জন্মদিন। তাকে সারপ্রাইজ দিবো বলে সকালেই তার বাসার সামনে গিয়ে উপস্থিত হলাম। তাকে ফোন দিয়ে আসতে বললাম বারান্দায়। সে আমার কথা মত বারান্দায় এসেই জোরে একটা চিৎকার দিল। এমন মধুর সারপ্রাইজ সে আগে কখনো পায় নি। দৌড়ে নিচে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরলো সবার সামনে রাস্তার মধ্যে। তাকে উইশ করলাম। গিফট গুলো দিলাম।
সে এতটাই খুশি হল যে আমাকে টানতে টানতে বাসায় নিয়ে গেল তার। আংকেল আন্টিও ছিল বাসায় সে সময়। তাদের সাথে কথা বললাম কিছুক্ষণ। এর মধ্যেই প্রমা শাড়ি পরে আমার সামনে উপস্থিত হল। শাড়ি পড়া অবস্থায় তাকে কখনও দেখি নি। সেদিন প্রথমবারের মত তাকে শাড়ি পরা দেখে নিজেই অবাক হলাম। কিছুক্ষণ হা করে তাকিয়ে ছিলাম তার দিকে। আমার এরকম অবস্থা দেখে হয়ত আংকেল আন্টিও বেশ মজা পেয়েছিলেন।
প্রমা আমাকে ১০ মিনিট পর তার রুমে আসতে বললো। আংকেল আন্টিও তাতে সায় দিল। আমি বেশ অবাক হলাম সেই সময় এই ভেবে যে তারা এত সহজে ব্যপারগুলো মেনে নিচ্ছে কিভাবে। খটকা লাগলো নিজের কাছেই।
যাই হোক, ১০ মিনিট পর প্রমার রুমের দরজায় টোকা দিয়ে তার অনুমতি নিয়ে ঢুকলাম। এই প্রথম তার রুমে ঢুকে আশ্চর্য হয়ে গেলাম। দেয়ালে দেয়ালে, কিংবা জানালার কাচে কিংবা শোকেসে, দরজায় আমার আর তার তোলা অনেক ছবি। এতদিন যেসব জায়গায় ঘুরেছি সেসব ছবি। তার আর আমার কিছু ছবি দেখলাম বাধিয়ে রেখেছে সে। আমার বিশ্বয়ের সীমা থাকলো না এসব দেখে।
আমি প্রমার দিকে ফিরে তাকাতেই সে হাত ইশারা করে তার রুমের দরজার দিকে তাকাতে বললো। আমি তাকাতেই ওখানে দেখলাম একটা পোস্টার সাটানো আছে সযত্নে। দূর থেকে বুঝতে না পেরে কাছে যেয়ে দেখলাম।
সেখানে লেখা -
“তোমার চলার পথের সঙ্গী হয়ে থাকতে চাই আজীবন। বলো, আমাকে কি তোমার সাথে নেবে?”
আমি হতবাক হয়ে তাকিয়ে ছিলাম এই লেখাটার দিকে অনেকক্ষণ। পরে যখন প্রমার দিকে মুখ ফিরে তাকালাম তখন সে লজ্জায় লাল হয়ে গিয়েছে। আমার চোখের দিকে সে তাকাতে পারছে না। তার কাছে যখন গেলাম তখন তার লজ্জা বাড়তেই লাগলো।
আমি তাকে বললাম -
“তোমাকে আমার সঙ্গী করতে কোন আপত্তি নেই”
এ বলে তার হাতে একটা আলতো করে চুমু দিয়ে সেখান থেকে বিদায় নিলাম।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



