অস্ট্রেলিয়ায় নাকি একটি শিশুর জন্মের জন্য সরকার তার মা বাবাকে পাঁচ থেকে দশ হাজার ডলার দেন। পাঁচটা বাচ্চা জন্ম নিলে সরকারের পক্ষ্য থেকে সেই পরিবারকে নাকি একটা ল্যান্ডক্রুজার গাড়ি দেয়া হয়। যেন সরকার ঘোষণা করছে, "অধিক সন্তান জন্ম দিন, গাড়ির চাবি বুঝে নিন।"
এরই ফায়দা তুলে লেবানিজ ইমিগ্র্যান্টগণ। তাঁরা ইচ্ছা মত বাচ্চা পয়দা করে গাড়ি বাড়ির মালিক হয়ে যান।
শুনেছি ইংল্যান্ডেও নাকি একই সুবিধা আছে। রানীর ভাতা। সেখানে নাকি অনেক বাঙালিই মোটামুটি কাজ না করে শুধুমাত্র সন্তান উৎপাদন করেই আয়েশী জীবন যাপন করে চলেছেন।
আমি অস্ট্রেলিয়া যাইনি, ইংল্যান্ডেও হিথ্রো এয়ারপোর্টে ছিলাম মাত্র কয়েক ঘন্টা। এসবই আমার শোনা কথা। কেউ এর সত্যতা নিশ্চিত করলে উপকৃত হতাম।
অস্ট্রেলিয়া বিশাল দেশ। ওদের ইকোনমি বুমিং স্টেজে আছে। এর অর্ধেকেরও বেশি অঞ্চল খালি পরে আছে। যেহেতু তাদের মানুষের অভাব, তাই মানুষের কদরও সেই দেশে অনেক বেশি। আমাদের দেশে যেহেতু এই সমস্যা নেই, কাজেই আমাদের দেশে উল্টো চিত্র দেখা যায় - কেউ দূর্ঘটনায় মারা গেলে সরকারের পক্ষ থেকে একটা করে ছাগল 'উপহার' দেয়া হয়। একই পরিবারের বেশি মানুষ মারা গেলে ভবিষ্যতে হয়তোবা বাছুরসহ গরু দেয়া হবে।
যেন একটি সরকারী প্রচারণা, "অধিকহারে মারা যান, জনসংখ্যার হ্রাস ঘটান।"
কিছুদিন আগেই আমার স্ত্রীর আপন মামাতো ভাই মারা গেলেন সড়ক দূর্ঘটনায়। তাঁর মৃত্যুর খবর পত্রিকায় আসেনি। সেই একই দিনে সারা দেশে আরও প্রায় পনেরো বিশজন মানুষের দূর্ঘটনায় মৃত্যুর খবর পত্রিকায় পড়েছিলাম। পড়তে পড়তে ভাবছিলাম, মিরাজ ভাইয়ের মত আর কতজনের খবর আসেনি? তাহলে দেশে একদিনে কয়জন মানুষ কেবল দূর্ঘটনায় মারা যায়?
রানা প্লাজা ট্র্যাজেডিতে মৃতের সংখ্যা যখন হাজার ছাড়িয়ে গিয়েছিল, আমাদের প্রধাণমন্ত্রী তখন বিদেশী সাংবাদিককে বলেছিলেন, "দূর্ঘটনা ঘটতেই পারে।"
প্রধাণমন্ত্রী ভুল বলেননি। দূর্ঘটনা ঘটতেই পারে।
কিন্তু ফাঁটলওয়ালা একটি বিপজ্জনক ভবনে যখন হাজার হাজার গার্মেন্টস কর্মীকে ছাটাইয়ের ভয় দেখিয়ে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়েও জোর করে কাজ করানো হয়, সেটাকে 'দূর্ঘটনা' বলা চলেনা - সেটাকে 'হত্যা' বলে।
ধারণ ক্ষমতার চেয়ে অনেক অনেক বেশি সংখ্যক মানুষ নিয়ে যখন উত্তাল নদীতে লঞ্চ চলতে গিয়ে ডুবে যায়, সেটাকেও দূর্ঘটনা বলেনা - হত্যা বলে।
লঞ্চটি নাকি 'সাময়িক ফিটনেস সার্টিফিকেট' নিয়ে চলছিল। মূলটির মেয়াদ নাকি তিনমাস আগেই শেষ হয়ে গিয়েছিল। কি অদ্ভূত কথা! 'সাময়িক ফিটনেস' আবার কি ধরনের সার্টিফিকেট?
আমাদের দেশের মানুষদের লজিকটাও অদ্ভূত।
যানবাহনে চলাচলের একটি দোয়া আছে, নূহ(আঃ) নবীর বিখ্যাত দোয়া, "বিসমিল্লাহে মাজরেহা, ওয়া মুর্সাহা ইন্না রাব্বি লা গাফুরুর রাহিম।"
নিশ্চই আল্লাহর হুকুমেই একটি যানের গতি ও অবস্থান। তাঁর হুকুমেই সেটি থামবে।
এখন যেহেতু আল্লাহ ওয়াদা করে ফেলেছেন তিনি দেখভাল করবেন, কাজেই একটু বেপরোয়া হওয়াই যায়।
লঞ্চে ধারণ ক্ষমতা পঁচাশি? একশো জন তোলো, সমস্যা হবেনা।
একশো জন নিয়েতো ভালই চলে, এখন থেকে দেড়শোজন নিও।
দেড় শোতেও কোন সমস্যা হচ্ছেনা, মাশাল্লাহ! এক কাজ করো, কাল থেকে তিনশো যাত্রী নাও।
সংখ্যা এইভাবেই বাড়তে বাড়তে সাড়ে তিনশো হয়ে গেল। যদি লঞ্চটি না ডুবতো, আমি নিশ্চিত, পরের বার পাঁচশো মানুষ নিয়ে রওনা হতো।
শেষ মুহূর্তে আল্লাহ আল্লাহ করে লাভ নাই। আল্লাহ বলেন নাই, তোমরা পঁচাশির পরিবর্তে সাড়ে তিনশোজন উঠো, আমি দেখভাল করবো।
তিনি এতদিন যথেষ্টই দেখভাল করেছিলেন। কিন্তু সবকিছুরই একটা সীমা থাকে। সীমা অতিক্রম করলে তিনি কেন দেখবেন?
বরং তিনি বলেছেন, ধৈর্য্য ধরতে। তিনি ধৈর্য্যশীলদের পক্ষে থাকেন।
একটু কষ্ট করে পরের লঞ্চে উঠলেই কিন্তু এই দূর্ঘটনা এড়ানো যেত। সময়ের চেয়ে জীবনের মূল্য অনেক অনেক অনেক বেশি।
থাক। যাঁরা মারা গেছেন, তাঁদের কথা বলে লাভ নেই। মূল প্রসঙ্গে ফেরা যাক।
আমাদের প্রধাণমন্ত্রী কিছুদিন আগে বিমানের ফ্লাইটে করে লন্ডন থেকে দেশে ফিরছিলেন। হঠাৎ তাঁর মনে কিছু একটা এলো, তিনি ইকোনমি ক্লাসের সাধারণ যাত্রীদের সাথে দেখা করতে চলে এলেন। তিনি শিশুদের সাথে ছবি তুললেন। সব যাত্রীর ভাল মন্দ খোঁজ নিলেন। দেশনেত্রীকে এত কাছে পেয়ে সাধারণ যাত্রীরা নাকি সবাই উৎফুল্ল হয়ে উঠেছিল। বিটিভির সৌজন্যে সেই ভিডিও অনেকেই দেখতে পেলাম।
যারা আওয়ামী পন্থী, তাঁরা এই ঘটনাকে গাঢ়ভাবে হাইলাইট করলেন। তাঁরা পারলে শেখ হাসিনাকে হযরত উমর(রাঃ) বানিয়ে দেন। একজন সাংসদ অবশ্য কিছুদিন আগেই তাঁকে 'অলি আল্লাহ' ঘোষণা করেছিলেন। এখন এই ট্রেন্ড বেশ কিছুদিন চালু থাকবে।
আবার যারা বিএনপি পন্থী - তাঁরা এর মাঝেও ষড়যন্ত্র খুঁজে পেলেন।
"আরে, ভন্ডামিও বুঝেন না? এইসব হচ্ছে লোক দেখানো অভিনয়। আমি শিওর, বাচ্চাদের আদর করার পর তিনি বিমানের টয়লেটে গিয়ে ভাল মত এন্টিসেপ্টিক সাবান দিয়ে তাঁর হাত ধুয়ে ফেলেছিলেন। ভাইরে - পলিটিশিয়ানদের এখনও চিনলেন না?"
আমার নিজের অনুভূতি বলার আগে একটা ছোট ঘটনা বলে নেই।
সিলেটে তখনকার অর্থমন্ত্রী সাহেব (এখন পর্যন্ত দেশের সব অর্থমন্ত্রীই সিলেটি, কাজেই নাম বললাম না) এসেছিলেন। তাঁর সম্মানে একটি ইফতার মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে। আমার আব্বু দাওয়াত পেয়েছেন। আমাকে এবং আমার ছোট ভাইকেও নিয়ে যেতে চান।
আমার বিখ্যাত মানুষদের সামনে যেতে ভাল লাগতো না। নিজেকে অতিরিক্ত ক্ষুদ্র মনে হয়, এমন কোথাও আমি যেতে চাইতাম না। আমার ভাই গেল।
অনেক অনেক মানুষ এসেছিলেন সেখানে। ইফতারের মেনু তাই আহামরি কিছুই ছিল না।
কিন্তু মন্ত্রী মহোদয়ের জন্য আলাদা করে খাস ইফতারের ব্যবস্থা ছিল।
সেখানে পিয়াজু, বেগুনি যেমন ছিল, বিরানি, মুরগির রোস্টও ছিল। সবচেয়ে দৃষ্টি কটু যে ব্যপারটি ছিল, মন্ত্রী মহোদয় সেই বিপুল সংখ্যক মানুষের সামনেই তাঁর সেই স্পেশাল ইফতার খেয়েছিলেন। সাধারণ মানুষের ভিড়ে অনেক শিশুও ছিল। তারা মন্ত্রী সাহেবের খাবারের মেনুর দিকে লোভাতুর নয়নে তাকিয়ে ছিল। মন্ত্রী সাহেব নিজের ইফতার খাওয়া নিয়েই তখন ব্যস্ত। সাধারণ জনতা পাতলা খিচুরী ও চানাবুট খেয়ে 'রাজভোজ' সারলো।
মন্ত্রী মহোদয় যদি একবারের জন্য হলেও ঘোষণা দিতেন, "আমি সাধারণ মানুষ যা খাবে, তাই খাব" তাহলেই কিন্তু তিনি সাধারণ মানুষ থেকে একটু উচ্চ স্তরে চলে যেতে পারতেন।
আফসোস, আমাদের দেশে খুব বেশি মানুষ উচ্চ স্তরে যাবার সুযোগ পেয়েও যেতে পারেননা।
প্রসঙ্গক্রমে আরেকটা ঘটনা বলেই ফেলি। আজকে লিখতে ভাল লাগছে।
আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সবচেয়ে বড় নায়ক, সৈয়দ তাজউদ্দিন আহমেদ যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে একবার লাঞ্চ খেতে বসেছিলেন। তিনি ছিলেন বাঙ্গালির প্রাণ ভোমরা। কাজেই তাঁর লাঞ্চের মেনু ছিল ভাল।
বাইরে শয়ে শয়ে গেরিলা মুক্তিযোদ্ধাদের যা খাওয়ানো হচ্ছিল, তা সাধারন সময়ে আমরা কাঙ্গালি ভোজেও খাওয়াই না।
তাজউদ্দিন আহমেদ থালা হাতে দুইজন গেরিলার মাঝখানে বসে গেলেন। হাসিমুখে তাঁদের সাথে সাধারণ খাবারই খেলেন।
এব্যপারে কোনই সন্দেহ নেই যে আমরা যুদ্ধে জয় করেছি ভারত ও রাশিয়ার সাহায্য নিয়ে।
কিন্তু এটাও সত্যি যে আমরা যুদ্ধে নির্ভয়ে লড়তে পেরেছি সৈয়দ তাজউদ্দিন আহমেদের মত নেতাদের কারনে।
অকালে পরিবারের আপন কাউকে হারালে কেমন লাগে, সেটা আমাদের দুই নেত্রীরই খুব ভাল করে বুঝার কথা। একজন হারিয়েছেন তাঁর স্বামীকে। একজন পুরো পরিবারকে। সেই সময়ে ক্ষতিপূরন হিসেবে সরকারের পক্ষ থেকে কেউ যদি ছাগল নিয়ে এসে তাঁদের হাতে দড়ি ধরিয়ে দিতেন, তাহলে তাঁদের মনের অবস্থা কেমন হতো? কেউ যদি বলতো, "দূর্ঘটনা ঘটতেই পারে" তাঁদের কেমন লাগতো? তাহলে তাঁরা কেন এমন করেন?
বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার করতে আওয়ামীলীগকে ক্ষমতায় আসতে হয়েছে। তাহলে কি 'রানা প্লাজা ট্র্যাজেডি,' গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে আগুন, গত কয়েক দশকে শয়ে শয়ে লঞ্চ ডুবিতে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যুর বিচার করতে তাঁদের পরিবারের সবাইকেও ক্ষমতায় আসতে হবে? সেটা কি বাস্তবে সম্ভব? তারমানে এইসব হত্যাকান্ডের কোনই বিচার দেশে হবেনা?
আমরা সবাই প্রায় ভুলতে বসেছি, চিটাগংয়ে একটি ট্রাক উল্টে গিয়ে একই গ্রামের পুরো এক জেনারেশন ছেলে মেয়ের মৃত্যুর ঘটনা। তখন টাকা দিয়ে ড্রাইভিং লাইসেন্স কিনতে পারা যেত!
আমাদের প্রধাণমন্ত্রী যখন বিজনেস ক্লাস থেকে ইকোনমি ক্লাসে নেমে এসে মানুষের সাথে সাক্ষাৎ করেন, আমাদের খুব ভাল লাগে। তিনি যখন শিশুদের সাথে হাসিমুখে ছবি তোলেন, আমাদের খুব ভাল লাগে। তিনি যদি আড়ালে গিয়ে সাবান দিয়ে হাত ধুয়েও ফেলেন, আমাদের কিছুই আসে যায় না।
তেমনি তিনি যদি দূর্ঘটনায় জনগণের পাশে এসে দাঁড়াতেন, আমাদের খারাপ লাগতো। তিনি যদি তাঁর সরকারের পক্ষ্য থেকে ক্ষমা চেয়ে দায়ীদের বিচার করতেন, আমাদের ভাল লাগতো।
কিন্তু তিনিই যখন বলেন, "দূর্ঘটনা ঘটতেই পারে" - তখন মন ভেঙ্গে যায়। তখন মনে হয়, আমাদের মৃত্যুতে তাঁদেরও কিছুই আসে যায় না।
ইয়াহিয়া খাঁর সময়ে আমাদের উপকূলীয় অঞ্চলে এক প্রলয় কান্ডে লাখ লাখ মানুষ মারা গিয়েছিল। ইয়াহিয়া খাঁ সেই সময় সেই অঞ্চল পরিদর্শনের প্রয়োজন বোধ করেননি। তিনি পশ্চিম পাকিস্তানি ছিলেন। বাঙ্গালিদের আপন করে কখনই দেখতে পারেননি। ইয়াহিয়া খাঁর শাসনের পতনের পেছনে এই ঘটনাটিও অনেক বড় নিয়ামক ছিল।
আমাদের দেশে এখন সবাই এক একজন ইয়াহিয়া খাঁ। আফসোস, সবাই বাংলাদেশি।
বিদেশে এমন দূর্ঘটনা ঘটলে সরকার পদত্যাগ করে। ঘটনার দায়ভার নিজের কাঁধে নিয়ে জনগণের কাছে ক্ষমা চায়। তাঁদের কাছে দেশের জনগণের জীবনের মূল্য আছে বলেই এমনটা ঘটে।
আমাদের সরকার পদত্যাগ দূরে থাকুক, ক্ষমা চাওয়া তার চেয়েও বেশি দূরে থাকুক, স্বীকারই করতে চায়না এতে তাদের দোষ আছে।
এই ব্যপারে তাদের যখন প্রশ্ন করা হয়, তারা উত্তর দেন, "বিগত সরকারের তুলনায় এই সরকারের আমলে লঞ্চডুবি কম হয়েছে।"
এই উত্তর শোনার পর আমরা চুপ হয়ে যাই। আমাদের আর কোন প্রশ্ন থাকেনা। চরমভাবে হতাস কোন মানুষের মনে আর কোন প্রশ্ন আসেনা।
শুনলাম উদ্ধারকারী জাহাজগুলো এখনও লঞ্চের হদিস করতে পারেনি। অনেক অনেক স্বজন তাঁদের প্রিয়জনদের লাশ খুঁজে পাননি।
দোয়া করি সবার লাশ যেন দ্রুত খুঁজে পাওয়া যায়।
কবরের সামনে গিয়ে সূরা ফাতেহা পড়ে দুই ফোঁটা চোখের জল ফেলার জন্যেও লাশগুলো খুঁজে পাওয়ার প্রয়োজন আছে।
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই আগস্ট, ২০১৪ রাত ৯:১৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



