ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময়ে আমি এবং তিন্নি একসাথে বসে সব প্রজেক্ট/অ্যাসাইনমেন্ট করতাম। কোন এক ম্যানেজমেন্ট কোর্সের প্রজেক্ট ডেডলাইন চলে এসেছিল, আমরা তখনও কাজই শুরু করিনি। এমন না যে সারা সেমেস্টার ফাঁকি দিয়ে বেরিয়েছি। বরং তখন আমরা ম্যানেজারিয়াল অ্যাকাউন্টিং নিয়ে বেশি ব্যস্ত থাকায় এটাতে সময় দেয়া হয়নি।
তিন্নির সমস্যা হচ্ছে সে খুব সহজে নার্ভাস হয়। এবং একবার নার্ভাস হয়ে গেলেই সে ঠান্ডা মাথায় কিছু চিন্তা করতে পারেনা।
আমি যতই বলি, "সমস্যা নাই, আমরা সময় মত শেষ করে ফেলতে পারবো।"
তার মুখ ততই 'ফর্সা' হয়ে যায়।
সে আমাদের এক সহপাঠি ছেলেকে সামনে পেয়ে তার কাছে ছুটে গিয়ে বলল, "তোমার প্রজেক্ট শেষ?"
আমার মেজাজ গেল বিগড়ে। এই ছেলেটাকে আমি পছন্দ করতাম না। আমার ধারনা ছিল, সে মনে মনে তিন্নিকে পছন্দ করে। শুধু ধারনা না, আমি জানতাম ঘটনা সত্যি। নিজের গার্লফ্রেন্ডের সাথে অতি সম্প্রতি তার ব্রেকআপ হয়েছিল। এবং তার পর থেকেই তিন্নির সাথে তার কথাবার্তার ধরন পাল্টে গিয়েছিল। চোখের দৃষ্টি একটু বেশিই রোমান্টিক, মুখের ভাষা একটু বেশিই মিষ্টি। হাসি একটু বেশিই মধুর। ব্যাটা ফাজিল!
নিজের কম্পিটিটরকে খুব কম মানুষই পছন্দ করে। আমি সেই সংখ্যালঘুদের মধ্যে নই।
তিন্নির প্রশ্নের জবাবে সে বলল, "হ্যা।"
"আমাকে একটু আউটলাইনটা দেখাবে? তাহলে আমি আইডিয়া পেতাম, কিভাবে করতে হবে।"
"আমি আমার প্রজেক্ট কাউকে দেখাই না।"
আমার মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। কারও প্রজেক্ট দেখে নকল মারবো, এমন বদভ্যাস আমার নেই। ছোটলোকটা আমাদের কি মনে করে?
জবাবটা তিন্নিই দিল।
"ভয় নেই, আমি তোমারটা কপি করবো না।"
"স্যরি। আমি কাউকে আমার প্রজেক্ট দেখাই না। আমি চাই না কেউ আমার প্রজেক্ট দেখে আমার চেয়ে বেশি নম্বর পাক।"
অতি উত্তম জবাব। আমি সন্তুষ্ট। কম্পিটিটর নিজেই হিট উইকেট করে আউট হয়ে গেছে! ব্যাটা আহাম্মক! মেয়ে পটাতে এসেছে, অথচ নিজের মন বড় করতে শিখেনি।
তিন্নি মন খারাপ করে আমার কাছে ফিরে এলো। বললাম, "চিন্তা নেই, আমরাই এই প্রজেক্ট শেষ করবো। ভয়ের কিছু নাই।"
তার মুখ আরেক পোচ বেশি ফর্সা হয়ে গেল।
এর কয়েকদিন পর আমি চলে এলাম অ্যামেরিকা। তিন্নি থেকে গেল দেশে।
আরেকটা সেমেস্টার ফাইনাল পরীক্ষার আগে আগে আরেকটি ছেলেকে(পূর্ব পরিচিত) সে বলেছিল, "আমরা (ও ছাড়াও আরও কয়েকজন) কয়েকটা চ্যাপ্টারের কিছুই বুঝতে পারছি না। তুমি আমাদের সাহায্য করতে পারবে?"
ছেলেটা এই সাবজেক্টে ভাল ছিল। অন্তত ক্যুইজগুলোতে ভাল মার্কস পাচ্ছিল। তার নাকি ফাইনালের জন্য প্রিপারেশনও ভাল। সে সানন্দে রাজি হলো।
ঠিক হলো, পরীক্ষার আগেরদিন সবাই ইউনিভার্সিটি লাইব্রেরিতে (মহাখালী) আসবে। এক থেকে দুই ঘন্টার মধ্যে ছেলেটা এসে সবাইকে পড়িয়ে চলে যাবে।
তিন্নি আসে মিরপুর থেকে। কেউ আসে উত্তরা থেকে। কেউ পুরান ঢাকা থেকে। পরীক্ষার আগের দিন সবাই কষ্ট করে লাইব্রেরীতে সময় মত আসার পর দেখে তাদের শিক্ষক বন্ধু আসেনি।
ফোন দেয়, সে ধরে না। আবার ফোন দেয়, আবার ধরে না।
দুই ঘন্টা পর সে ম্যাসেজ পাঠালো সে আসতে পারবে না। সে আপাতত নিজের পড়া নিয়ে ব্যস্ত।
আমাদের স্কুলজীবন (বাংলা মিডিয়াম) থেকেই দেখে এসেছি, এক শ্রেণীর ছাত্রছাত্রী থাকে, যারা নিজেদের নোটস কাউকে দিতে চায়না। পরীক্ষার হলে কাউকে দেখাতে চায়না। যদি তাকে ডিঙিয়ে অন্য কেউ বেশি মার্কস পেয়ে যায়!
আমার জীবনের শুরু ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে। সেখানে বরাবরই গ্রেডিং সিস্টেম চালু ছিল। কাজেই পাঁচ দশ মার্কস নিয়ে কিপ্টেমি করার মানসিকতা তৈরী হয়নি।
বুঝতাম না, ওরা কেন বুঝেনা, স্কুলের ক্লাসে ফার্স্ট হওয়াটাই জীবনের শেষ কথা নয়। যে ভাল ছাত্র, সে সফল হবেই। কারও নোটস চুরি করে কেউ যদি ফার্স্ট হয়েও যায়, বাইরের পৃথিবীতে সে অসফল হবেই। স্কুলের পরীক্ষাকে এত সিরিয়াসলি নেয়ার কিছু নেই।
উদাহরণ হতে পারে বৃত্তি পরীক্ষা, বা পাবলিক পরীক্ষা অথবা ভাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা। 'মায়ের দোয়া স্কুলের' ফার্স্ট বয়, যে কখনই তার স্কুলের কোন পরীক্ষায় সেকেন্ড হয়নি, দেখা গেল ক্লাস এইটের বৃত্তি পরীক্ষায় কোন স্থানই পেল না। এতেইতো তার চোখ খুলে যাবার কথা। বুঝে যাবার কথা হুদাই ক্লাসে ফাপর নিয়ে লাভ নেই। বাইরের দুনিয়ায় সে অতি তুচ্ছ একজন মানব সন্তান।
আমির খানের "থ্রী ইডিয়টস" সিনেমায় চাতুর রামালিঙ্গাম চরিত্রটি এইসমস্ত পোলাপান দেখেই তৈরী করা হয়েছে।
জন্ম থেকেই তারা কম্পিটিটর। কেউ তার চেয়ে এক মার্কস বেশি পেয়ে গেলেই জ্বলে পুড়ে অঙ্গার হয়ে যায়। তাদের হয়তো ভয় ছিল, তাদের চেয়ে গ্রেডস বেশি পেয়ে গেলে জব ফিল্ডে আমরা তার প্রতিযোগী হয়ে যাব।
বেকুবগুলা বুঝেনা যে বাংলাদেশে ব্র্যাক ইউনিভার্সিটিই একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় না। হাজার হাজার ইউনিভার্সিটি থেকে হাজার হাজার স্টুডেন্ট বিভিন্ন জিপিএ নিয়ে প্রতি সেমেস্টারেই বেরুচ্ছে। সাগরে এক বালতি জল ঢাললেই কি, আর না ঢাললেই বা কি!
প্রথম গল্পের ছেলেটি আমাদের সাহায্য না করে ঐ সাবজেক্টে পেয়েছিল A. আমরা তার সাহায্য না নিয়েও A পেয়েছিলাম. মানে সমানে সমান।
পরের গল্পের ছেলেটি পেয়েছিল A-. তিন্নি সেই সাবজেক্টে তাকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে পেয়েছিল A. আহারে বেচারা!
জব ফিল্ডের কথা বলতে গেলে দুইজনই এখন বাংলাদেশে দুই দেশী কোম্পানির এক্সিকিউটিভ।
আমরা এখন অ্যামেরিকায়। আমি একটি প্রপার্টি ম্যানেজমেন্ট কোম্পানিতে, তিন্নি ব্যাংকে।
তাদের সাহায্য না পাওয়ায় আমাদের বিরাট লোকসান হয়ে গেল!
A, A- এর যুগে ছেলেমানুষী কম্পিটিশন হাস্যকর।
গ্রেডিং সিস্টেমের সবচেয়ে পজিটিভ দিক হচ্ছে, এটি কাউকে মনে মনে ছোট করেনা।
এখন আর কোন ছেলে নিরানব্বই পেয়ে ফার্স্ট হলে, অন্য ছেলে সাড়ে আটানব্বই পেয়ে সেকেন্ড হওয়ায় মন ছোট করেনা। যে নব্বই পেয়েছে সেও সমান আনন্দ পায়।
রেজাল্ট বেরোলে তাই দেখা যায় একই সাথে পুরো স্কুল আনন্দ করছে। সবাই A+ পেয়েছে! আশির উপরে সবাই সমান!
যারা যারা মিস করেছে, তাদের অভিভাবকদের কেউ কেউ বলেন, "তুমি কেন ৪.৮৮ পেলে? অমুক সাহেবের ছেলে A+ পেয়েছে। তমুক সাহেবের মেয়ে A+ পেয়েছে। এখন ওদের কাছে মুখ দেখাবো কি করে?"
কেউ হয়তো খারাপ রেজাল্ট করায় আত্মহত্যারও চিন্তা ভাবনা করছে।
তাঁদের সবার উদ্দেশ্যে বলছি, "রিল্যাক্স! আমরা গ্রেডিং সিস্টেমে পরীক্ষা দেয়া প্রথম ব্যাচ। আমাদের এসএসসিতে সারা বোর্ডে (সিলেট) মাত্র দুইজন A+ পেয়েছিল। এইচএসসিতে কয়জন পেয়েছিল, অথবা আদৌ কেউ পেয়েছিল কিনা মনে নেই। তাই বলে আমরা পথে বসে যাইনি।
এই দিন দিন নয়, আরও দিন আছে। আমার পরিচিত এক ছেলে এইচএসসিতে ৩.৭ পেয়েছিল। সে আইবিএ থেকে গ্র্যাজুয়েট হয়ে অ্যামেরিকায় একটা ভাল ইউনিভার্সিটি থেকে মাস্টার্স শেষ করেছে। তার জীবন থেমে থাকেনি। মা বাবাকেও মাথা হেঁট করে রাখতে হয়নি।"
যে একশোতে একশো পাচ্ছে, সে হয়তো একটু মন খারাপ করছে যে অন্য কেউ আশি পেয়েই তার সমান হয়ে গেল। তাহলে তাঁর পরিশ্রমের মূল্য কি রইলো? সঠিক মূল্য পেতে হলে তাকে কিছুটা সময় অপেক্ষা করতে হবে মাত্র। কোন পরিশ্রমই বৃথা যায়না। একটা সময়ে সে নিজেই পরিশ্রমের ফল হাতে হাতে পাবে।
ভাল দিক হচ্ছে, ধীরে ধীরে হলেও, গ্রেডিং সিস্টেমটি ছাত্রছাত্রীদের মন বড় করতে শেখাবে। ভবিষ্যতের ছাত্রছাত্রীদের কাছে কেউ প্রজেক্ট ডেডলাইনে সাহায্য চাইলে মুখের উপর জবাব দিবে না, "আমি চাই না কেউ আমার প্রজেক্ট দেখে আমার চেয়ে বেশি নম্বর পাক।"
একটা সময়ে স্ট্যান্ড করা ছাত্রছাত্রীদের ছবি ছাপা হতো পত্রিকায়। সেই সাথে সংক্ষিপ্ত ইন্টার্ভিউ। যেখানে তাঁরা বলতেন, "আমি দৈনিক ষোলো থেকে কুড়ি ঘন্টা পড়াশোনা করতাম। আমার কোন গৃহ শিক্ষক ছিল না। স্কুলের শিক্ষক শিক্ষিকাদের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ। আমার জীবনে মা বাবার অবদান সর্বোচ্চ।"
ইন্টার্ভিউর উপরে কৃতি ছাত্র/ছাত্রীর মুখে মিষ্টি ধরে রাখা মা বাবার হাস্যোজ্জ্বল ছবি।
এতে কয়েকজন মানুষ খুশি হতেন অবশ্যই।
বেশিরভাগই হতেন হতাশ। মনে মনে ভাবতেন, "আহারে, আমার ছেলে/মেয়ে আরও কিছুটা বেশি মার্কস পেলে হয়তো তারও ছবি ছাপা হতো!"
মা বাবাকে হতাশ হতে দেখে ছেলে মেয়েদেরও মন খারাপ হতো।
এরচেয়ে পরীক্ষার সাফল্যের গণউৎসবের ছবি দেখাটা কি বেশি আনন্দের না? একটি স্কুলের একটি ব্যাচের অনেক অনেক ছাত্রছাত্রী এক সাথে বিজয় সূচক 'ভি' দেখাচ্ছে, ছবিটা দেখতেওতো ভাল লাগে।
যদিও, সাংবাদিকেরা কেবল মেয়েদের স্কুলেরই ছবি ছাপতে বেশি আগ্রহী। ছেলেরা যেন কেউই জিপিএ ৫ পায়না।
রাস্তায় দুই পরিচিতের দেখা হলে একজন যখন বলেন, "আমার ছেলে A+ পেয়েছে, আপনার মেয়ের কি অবস্থা?"
তখন আরেকজন যদি জবাবে বলেন, "আমার মেয়েও A+!"
তখন কি ইচ্ছে করেনা দুইজনকেই মিষ্টি মুখ করাই?
এখনকার পাবলিক পরীক্ষার রেজাল্ট ধর্মীয় উৎসবের মত হয়ে গেছে। সবাই সমানভাবে আনন্দিত। 'কাস্ট সিস্টেম' নির্মূল হতে চলেছে। এটা খারাপ কি?
পাবলিক পরীক্ষার মান নাকি অনেক অনেক কমে গেছে। প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রমাণও পেশ করা হয়েছে। জাফর ইকবাল স্যারতো পাশাপাশি দুইটা (ফাঁস হওয়া এবং আসল পরীক্ষার) প্রশ্নের ছবি দিয়ে সবার চোখ কপালে তুলে দিয়েছিলেন।
একটি জেনারেশন ধ্বংশ করা হয়েছে ফাঁস হওয়া প্রশ্নের মাধ্যমে। খুবই দুঃখজনক ঘটনা। সরকার কেন এর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেন না, সেটা বুঝতে পারিনা। আমাদের সময়ে এক পরীক্ষার জন্য কয়েক সেট প্রশ্ন করা হতো। আমরা বুঝতে পারতাম না কোন সেটের প্রশ্ন পাবো। 'ঘ' সেটের প্রশ্ন নাকি হতো সবচেয়ে ভয়ংকর। দোয়া করতাম, 'ঘ' সেটের প্রশ্ন যেন না আসে।
এখনও নিশ্চই চার সেটের প্রশ্ন করা হয়। একটি সেটের প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে, তাহলে ভিন্ন সেটের প্রশ্নে পরীক্ষা হলেইতো ঝামেলা হয়না। এত জটিলতার কী আছে, বুঝিনা। ইচ্ছার অভাব হয়তো।
অনেকেই আশঙ্কা করছেন, সবাই গোল্ডেন জিপিএ পাওয়ায় প্রকৃত মেধাবীদের অবমূল্যায়ন করা হলো।
আমার বিশ্বাস, এটি কেবলই একটি সার্টিফিকেট। যারা নকল করে পাশ করেছে, তারা নিজেদের পায়েই কুড়াল মেরেছে। ভবিষ্যত জীবনে তারা অন্যের প্রজেক্ট/আইডিয়া নকল করে টিকে থাকার লড়াই করবে।
আর যারা প্রকৃত মেধাবী, তাঁরা ভবিষ্যতের আসল পরীক্ষাগুলোয় ঠিকই সাফল্য দেখাবে। তাঁদের টেনশনের কিছুই নেই।
আজকের এইচএসসি পাশের ফলাফলের আনন্দ চিরস্থায়ী হোক।
পাশ করা প্রতিটা ছাত্রছাত্রীকে অভিনন্দন।
তাঁদের সামনের জীবন সাফল্যের হোক!

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



