somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

যেদিন বাবারা তলোয়ার চালিয়েছিলেন নিজের মেয়েদের গলায়

১৪ ই আগস্ট, ২০১৪ রাত ১০:৫৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

পাঞ্জাবের একটি অখ্যাত গ্রাম। সময় মধ্যরাত্রি।
গ্রামের সব যুবতী মেয়েদের এক ছাদের নিচে জড়ো করা হয়েছে। সবার বয়স দশ থেকে চল্লিশের মধ্যে।
তাঁদের কারও মুখেই কোন কথা নেই। কেউ কেউ ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। জোরে কাঁদারও সাহস নেই।
একজনের ডাক এলো।
গুনিত কৌর।
পনেরো বছর বয়সী গুনিতের ভাইই তাঁকে ডেকে নিয়ে গেল।
মাথায় ওড়না ঠিক করে আলতো পায়ে হেঁটে গুনিত বাইরে তাঁর বাবার সামনে এসে দাঁড়ালো।
বাবা মস্ত জওয়ান একজন শিখ। লম্বা লম্বা দাড়ি, বড় বড় চোখ। মাথায় ইয়া মস্ত পাগড়ি। বাবাকে দেখতে যোদ্ধার মতন দেখায়।
গুনিত বাবার চোখের দিকে তাকালো না। বলা ভাল তাকাতে পারলো না।
সে মাথার ওড়না সরিয়ে হাঁটু গেড়ে বসলো। মস্তক ঝুঁকে আছে নিচের দিকে।
বাবা তোলোয়ার তুলে নিলেন। ম্লান জোছনার আলোয় ঝকঝক করছে তলোয়ারের ধাতব ফলা। তিনি তাঁর আদরের কন্যার মাথায় তলোয়ার চালাবেন।
মুসলমানেরা শিখদের ঐতিহাসিক শত্রু। দেশ ভাগ হলে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ পাঞ্জাব পাকিস্তানের ভাগে পড়তে পারে। জীবন থাকতে মুসলিম শাসকের অধীনে যাওয়ার প্রশ্নই আসেনা।
তাঁরা লড়বেন। প্রাণ বায়ু যতক্ষণ দেহে থাকবে, তাঁরা লড়াই চালিয়ে যাবেন।
মুসলমানেরাও বসে নেই। তাঁরাও শিখ গ্রামগুলোতে যখন তখন আক্রমন করছে। হত্যা করছে পুরুষদের, দখল করে নিচ্ছে সম্পত্তি। ধর্ষিত হচ্ছে শিখ মেয়েরা।
প্রাণের চেয়েও ইজ্জত অনেক বড়।
কোন মুসলমানের হাতে গণধর্ষণের জন্য বাঁচিয়ে রাখার চেয়ে বরং এই ভাল যে তাঁরা নিজেরাই নিজেদের কন্যাদের মৃত্যু নিশ্চিত করেন।
তীব্র বেগে নেমে এলো তলোয়ার। হালকা একটা শব্দ হলো শুধু। গুনিত কোন আর্তনাদ করলো না। দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে মাটিতে গড়িয়ে পড়লো তাঁর সন্দর মুখখানি।
অন্দরমহলে কান্নার রোল একটু বেগ পেল।
এরপর আরেকজনের পালা। হারলিন!
নিজের ডাক শুনে সেও উঠে দাঁড়ালো। চোখের পানি মুছে মাথায় ওড়না জড়িয়ে সেও মৃদু পায়ে হেঁটে ঘর থেকে বেরিয়ে এলো। বাইরে অপেক্ষা করছে তাঁরই বাবা, চাচা, ভাইয়েরা।

কলকাতার বউ বাজারে ভিড়ের মধ্যে ঠ্যালাঠেলি করছে ফজলু। পেশায় ছোটখাট ব্যবসায়ী। কিছু দোকানে বকেয়া টাকা উসুল করতে এসেছে।
ভিড়ের ঠ্যালাঠেলিতে একটা ব্যপারে খুব মজা পেল সে।
ভিড়ের প্রায় সবাই হিন্দু। বেশির ভাগই ব্রাক্ষ্মণ। এরা সেই ব্রাক্ষণ যাঁদের বাড়িতে মুসলমানের প্রবেশ নিষেধ। মুসলমানের ছায়া মাড়ালেও তাঁদের শরীর অপবিত্র হয়ে যায়। গঙ্গা স্নানের প্রয়োজন হয়!
ফজলুদের আদি নিবাস ঢাকা। সেখানে অনেক মুসলমান প্রতিবেশী ছিল।
যেবার কলকাতায় তাঁরা প্রথম ঈদ করলো, তখন তাঁর মা হিন্দু প্রতিবেশীর বাড়িতে হালুয়া বানিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। ফজলুর মায়ের সামনেই সেই হালুয়া ছুড়ে ফেলে দেয়া হয়েছিল। মুসলমানের খাবার খেলে নাকি তাঁদের জাত যাবে!
যদিও তাঁদের বসার ঘরে বসতে দেয়া হয়েছিল, কিন্তু তাঁর মাকে রান্না ঘরে যেতে দেয়া হয়নি। সেখানেও নাকি মুসলমানের প্রবেশ নিষেধ।
গিন্নিমা শুনিয়ে শুনিয়ে বলছিলেন যে তাঁরা যাবার পরে ঘরকে গঙ্গা জল দিয়ে পবিত্র করতে হবে।
এরপর কি আর সেই বাড়িতে যেতে ইচ্ছে করে?
ফজলুর আরও অভিজ্ঞতা আছে এমন বৈষম্যের। হিন্দু মুসলিম এখনও এক কলের পানি পান করতে পারেনা। হোটেল রেস্টুরেন্টে খেতে গেলে মুসলমানদের থালায় খেতে দেয়া হয়না। ঠোঙ্গা ভরে খাবার এনে প্রায় ছুড়ে দেয়া হয়। পানি চাইলে দূর থেকে পানি ঢালা হয়, মুসলমানদের আজলা ভরে খেতে হয়। কাছে গেলে যদি ছায়া মাড়ানো হয়ে যায়!
বেশিরভাগ রেস্টুরেন্টে মুসলমানদের প্রবেশই নিষিদ্ধ।
একটা কুকুরের চেয়েও একজন মুসলমানের সম্মান তাঁদের কাছে কম।
জিন্না সাহেব যে মুসলমানদের জন্য আলাদা রাষ্ট্র দাবী করছেন, সেটা কি আর এমনি এমনি?
গান্ধীজি আবার চাননা দেশ বিভাগ হোক। দেশ বিভাগ রুখতে হলে সবার আগে হিন্দুদের শোধরাতে হবে। হিন্দু মুসলিম এক ঘরে বসে এক থালায় ভাত খেতে যেদিন রাজি হবে সেদিনই কেবল দেশ টিকবে। নাহলে "হাতমে বিড়ি মু'মে পান, লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান!"
মজার ব্যপার হলো, বাজারের ঠ্যালাঠেলিতে কেউ ছুত অছুত পরোয়া করেনা। এখানে সবাই সমান।

বকেয়া নিতে একটি পরিচিত দোকানে যেতেই দোকানদার তেড়ে উঠলো।
"এই! যবন এসেছে! যবন!"
আশেপাশের দোকান থেকেও কয়েকজন অতি দ্রুত ছুটে এলো। ফজলু এদের অনেককেই চেনে। এদের অনেকের সাথেই তার ব্যবসায়িক লেনদেন আছে। কিন্তু আজকে এদের সবার কি হলো?
সে কিছু বুঝে উঠার আগেই তাকে জাপটে ধরে মারতে শুরু করলো সবাই। কিছুক্ষণ আগেই নাকি খবর এসেছে মুসলমানেরা হিন্দু মারতে শুরু করেছে। হিন্দুরাই বা বসে থাকবে কেন? হাতের কাছে এই মুসলমান পাওয়া গেছে। একেই মার!
কিছুক্ষণের মধ্যেই কয়েকজন তলোয়ার নিয়ে হাজির।
"হরে রাম হরে হরে" বলতে বলতে একের পর এক কোপে ছিন্ন বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে লাগলো ফজলুর দেহ।
ফজলুর মৃত্যুর 'বদলা' নিতে মুসলমানেরাও মেরে ফেলল আরও কিছু হিন্দু। তার পরিণতিতে নিহত হলো আরও কিছু মুসলমান।
মাত্র তিনদিনের ব্যবধানে শুধু কলকাতাতেই মারা পড়লেন পাঁচ হাজার মানুষ।
রায়ট ঠ্যাকাতে বৃটিশ মিলিটারী পর্যন্ত রাস্তায় নামার সাহস পায়নি।

উনিশশো সাতচল্লিশ সালের চৌদ্দ ও পনেরো আগস্ট কেবল ধর্মের ভিত্তিতে জন্ম হয়েছিল দুইটি দেশের। নিজেদের প্রতিবেশী, বন্ধুবান্ধবদের হাতে খুন হতে হয়েছিল লক্ষ লক্ষ মানুষকে। কোটি কোটি পরিবারকে চৌদ্দ পুরুষের বাস্তু ভিটা ছেড়ে পাড়ি দিতে হয়েছিল ভিনদেশে। জেনারেশনের পর জেনারেশন ধরে উদ্বাস্তুর জীবন যাপন করতে হয়েছে লক্ষ লক্ষ মানুষকে।
আজকে দুই দেশ স্বাধীনতা দিবসের আনন্দ করছে।
স্বাধীনতা দিবসের অনেক অনেক শুভেচ্ছা ভারত ও পাকিস্তান!
৪টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

কোথায় পাই পাগলের শ্বশুর

লিখেছেন আলমগীর সরকার লিটন, ০৩ রা নভেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:৪৮


পাগলের পাতা ছাগলে খায়,
দাঁতের দোষটা হাতেই যে কয়;
দেয় রে দোষটা দেয় চোখের,
মনটা যে ধোয়া তুলসীপাতা,
কেউ দেখে না রে মুখের।

মুখের কথা ঠোঁটে কয়,
ছাগল ডাকে রে ভাই, ব্যাঁ-ব্যাঁ;
পাগলের কাজ পাগল করে সই,
সাধু... ...বাকিটুকু পড়ুন

পরিস্থিতি কি জটিল?

লিখেছেন শেরজা তপন, ০৩ রা নভেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:৫৯

বাইরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে বসে আছি, অথচ বাইরে পুলিশের সাউন্ড গ্রেনেড আর টিয়ার গ্যাসের শব্দে চারদিক প্রকম্পিত! মিরপুরে আমার বাসার কাছেই মেট্রো রেলের নিচে আগুন দেওয়া হয়েছে; কিছুক্ষণের জন্য মেট্রো... ...বাকিটুকু পড়ুন

আজকের ডায়েরী- ২০৩

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৩ রা নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৯



খাওয়া দাওয়া করাটা আজকাল বিরক্তকর লাগে।
কিন্তু মানুষের বেঁচে থাকতে হলে- খেতে হবে। না খেলে শরীর দুর্বল হয়ে যাবে। প্রিয় খাবার গুলোও খেতে ইচ্ছা করে না। ভালো লাগে... ...বাকিটুকু পড়ুন

আজ আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচন কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ০৩ রা নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ২:৫৬


এই লেখাটি যখন লিখছি, তখন এই গুজবটি ছড়িয়ে পড়েছে যে, ইসরায়েল ট্রাম্পকে রাজি করিয়েছে, যাতে মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরপরই আমেরিকা ইরানে পারমাণবিক বোমা হামলা করে। বিগত বছরগুলোতে ইসরাইল সারা বিশ্বের... ...বাকিটুকু পড়ুন

Haze দমনে সিঙ্গাপুরের কুটনৈতিক দক্ষতা

লিখেছেন ঢাবিয়ান, ০৩ রা নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৪:৩১

সিঙ্গাপুর সাম্প্রতিককালে স্মরনকালের ভয়াবহ Haze (ধোঁয়াশা ও বায়ুদূষণ) এর কবলে পড়ে। সেপ্টেম্বরের শুরুতেই সারা শহর ঘন ধোয়ার আবরনে ঢেকে যায়। জানালা দিয়ে বাইরে তাকালে মনে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×