একটা সময়ে যেখানে বিশাল ময়দান ছিল, সেখানে দেয়াল তুলে জমি ভাগ করে ফেলা হয়েছে।
একটা সময়ে যেখানে ক্রিকেট পিচ ছিল, এখন সেই পিচকেই গোটা মাঠ বানিয়ে ক্রিকেট খেলতে হয়। নগরায়নের কুফল!
প্রয়োজনীয়তা সকল উদ্ভাবনের জনক। সেই হিসেবে ক্রিকেটের নিয়মেও পরিবর্তন আনা হলো।
- পিচ ছোট হওয়ায় অতিরিক্ত জোরে বল করা যাবেনা।
- বল গড়িয়ে দেয়ালে লাগলে দুই, সরাসরি লাগলে চার।
- বল বাউন্ডারির ওপারে সরাসরি চলে গেলে আউট! যদি এক/দুই ড্রপ খেয়ে যায়, তবে তিনবার এমন হলে আউট। এবং প্রতিবারই যে পাঠিয়েছে, তাকেই আনতে হবে।
- কোন দৌড়ে 'রান' নেই।
এইভাবেই আরও অনেক নিয়ম।
বাউন্ডারির ঐপারে বল যাওয়ায় ব্যাটসম্যান আউট হলে যতটা না আফসোস করে, তারচেয়ে বেশি আফসোস করে যখন তাকে বলটা আনতে যেতে হয়। কারন ওখানে একজন বৃদ্ধলোক লোক ফুল, শাকসবজির চাষ করেন। লন্ডনি জমির মালিক তাঁকে একটি ঘর বানিয়ে দিয়েছেন জমির দেখভাল করার জন্য। তিনি নিজে থেকেই এই বিশাল জমির সদ্ব্যবহার করছেন গাছপালা লাগিয়ে।
আমাদের বল বারবার তাঁর বাগানে গেলে তাঁর গাছপালার ক্ষতি হয়। তারউপর তাড়াহুড়ায় আমাদের "প্লেয়াররা" তাঁর লতানো সবজির গাছ মাড়িয়ে আসে। এতে গাছের অকাল মৃত্যুও ঘটে।
কাজেই ঐপারে বল গেলে আমরা প্রথমে দেয়ালের এপার থেকে চোরের মত উঁকি দিয়ে ভাল করে দেখে নেই বুড়ো আশেপাশে আছে কিনা। না থাকলে কমান্ডো কায়দায় প্রায় নিঃশব্দে দেয়াল টপকে বল নিয়ে ছুড়ে ফেলে দিয়েই আবার দেয়াল টপকে এইপাড়ে চলে আসি।
বুড়ো তারপরেও মাঝে মাঝে দেখে ফেলে। চিৎকার চ্যাচামেচি করে। একবারতো সে দা দিয়ে কুপিয়ে আমাদের ক্রিকেট বল দুফলা করে ফেলেছিলেন।
বুড়ো তখন আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় শত্রু।
একদিন বুড়োর বাগানে আরেকজন লোককে কাজ করতে দেখে আব্বু তাকে জিজ্ঞেস করলেন, "ঐ বুড়ো মিয়াকে অনেকদিন দেখিনা। তাঁর কি চাকরি চলে গেছে?"
লোকটা জবাব দিল, "না, তিনি দুই তিনমাস হলো মারা গেছেন।"
আব্বু খবরটা আমাকে দিল।
ইশ! মনে আছে, কতটা মন খারাপ হয়েছিল আমার সেদিন।
আব্বু বলেছিল, "ও যে এতগুলো ফুলের গাছ লাগিয়ে গেছে, প্রতিটা গাছেই একদিন ফুল আসবে, অথচ তা দেখতে সে উপস্থিত থাকবেনা।"
ফিলোসফিক্যাল কথাবার্তা। আমার চোখে প্রায় কান্না চলে এলো।
বুড়োর সম্মানে আমরা বেশ কিছুদিন খেলা বন্ধ রাখলাম। কেউ আমাদের শিখিয়ে দেয়নি। বিবেকের তাড়নায় কাজটি করা। তখন বয়স কতই বা? ক্লাস সেভেন-এইটে পড়ি হয়তো।
শত্রু, সে যত বড় শত্রুই হোক না কেন, তার মৃত্যুতে উল্লাস করা মানুষের সাজেনা। তার মৃত্যুদিনে পার্টি করাটাতো আরও খারাপ দেখায়।
বরং তার কষ্টের দিনে পাশে এসে দাঁড়ালে নিজের উচ্চতা মাইল খানেক বেড়ে যায়।
একটি দেশের স্কুল পড়ুয়া ছাত্রদের যে মানবিক বোধ থাকে, সেই দেশেরই সাবেক প্রধানমন্ত্রীর সেটা নেই।
ক্ষমতা, টাকা পয়সা সবাইকেই ধনী বানাতে পারে, কিন্তু সবাইকে 'বড় মাপের মানুষ' বানাতে পারেনা।
সর্বশেষ এডিট : ১৬ ই আগস্ট, ২০১৪ রাত ১২:১৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



