বেশ কিছুদিন আগে আমার স্কুলের একটা ছেলে আমারই স্কুলের একাধিক মেয়েকে ফেসবুক স্ট্যাটাসের মাধ্যমে সরাসরি আক্রমণ করে বসেছিল। একদম নাম মেনশন করে অ্যাটাক যাকে বলে! এমনসব কথাবার্তা বলছিল যেগুলো রীতিমত অপমানজনক।
বান্ধবীর স্বামী প্রতিবাদ জানাতে এলে তাকে নিয়েও রসালো আক্রমণ চলল ফেসবুক স্ট্যাটাসে।
স্বামী বেচারা তাঁর স্ত্রীকে শেষ পর্যন্ত জিজ্ঞেস করতে বাধ্য হলো, "যারা মেয়েদের রেসপেক্ট করতে জানেনা, সেই সমস্ত ছেলেদের সাথে তুমি পড়াশোনা করেছো?"
বেচারী! স্বামীকে কোনই জবাব দিতে পারেনি। মুখ ছোট করে বসেছিল।
আমার যে বিষয়টা খারাপ লেগেছিল সেটা হচ্ছে ছেলেটার ঐসব স্ট্যাটাসে আমাদেরই ক্লাসের বেশ কিছু ছেলে গিয়ে লাইক এবং কমেন্ট করেছিল। কমেন্টগুলোও উস্কানীমূলক। যেন বলছে, "চালিয়ে যা ব্যাটা! তোকে দিয়েই হবে!"
আমাদের ব্যাচের দুইজন ব্রিলিয়ান্ট ছাত্রীর সাথে একজন নোবডি "ফুঙ্গামি" করছে, এইটা দেখে তারা ভীষণ পুলকিত। তাদের সুখ ধরে রাখার ক্ষমতা নেই।
আমি আমার তরফ থেকে প্রতিবাদ জানালাম। ফেসবুকে স্ট্যাটাস লিখলাম। লিখলাম যে একজন মেয়েকে এইভাবে অপমান করা আর ধর্ষণে খুব একটা পার্থক্য নেই।
আমার একজন স্কুল ক্লাসমেট আমাকে লিখে জানালো, "কেন নিজের জাতটা চেনালে? নিজের স্কুলের, নিজের ক্লাসমেটের বদনাম বাইরের মানুষদের সামনে এইভাবে তুলে ধরতে তোমার লজ্জা করলো না?"
ইমোশনাল ব্যপার স্যপার। পোলা পারলে ফ্রেন্ডের দুঃখে কেঁদেই ফেলে।
আমার অবাক লাগলো ভেবে যে ও বুঝতে পারছে না যে তার ফ্রেন্ডরা একটা মেয়েকে সবার সামনেই অপমান করলো, নাম মেনশন করে(আমি তখনও কারও নাম উল্লেখ করিনি, এখনও করবো না), একটা মানুষও তার প্রতিবাদ করলো না, এতে কী স্কুলের অপমান হলো না? আমি প্রতিবাদ করাতেই জাত চলে গেল?
একটা ডাক্তারের কাছে আপনি গেলেন ব্লাড টেস্ট করাতে। ব্লাড রিপোর্ট দেখে ডাক্তার আপনাকে বলল আপনার এইচ.আই.ভি পজিটিভ ধরা পড়েছে।
এখন আপনি কী ডাক্তারকে বলবেন, "আপনি আমাকে 'রুগী' বলে চরম অপমান করেছেন! আপনি নিজের জাত চিনিয়ে দিলেন! আপনি ফাউল!"
নারে ভাই, ডাক্তার আপনাকে রিয়েলিটি শুনিয়ে দিয়েছে। এখন চিকিৎসা করিয়ে ভাল হবার দায়িত্ব আপনার।
যদি তিনি বলতেন, "বাহ্! আপনার রিপোর্ট খুব ভাল এসেছে! আপনি ব্যাপকভাবে সুস্থ্য!"
তাহলে আপনিও উচ্ছসিত মনে বাড়ি ফিরে গিয়ে নিজের বউকেও এইডস রোগী বানিয়ে কয়েক মাসের মধ্যেই মরে যেতেন.....কোন কাজের কথা হতো?
একটা বাস্তব উদাহরণ দেই।
ঢাকায় থাকা কালে এক বিকেলে নিচে নেমেছি ক্রিকেট খেলতে। আমি বরাবরই সাম্যবাদি, তাই কয়েক বাড়ির কাজের ছেলেরাও আসতো আমাদের সাথে ক্রিকেট খেলতে। সেদিন বিকেলে নিচে নেমে দেখি সবার মুখ থমথমে। কাজের ছেলেটা নেই।
"কী হয়েছে?"
"মাশুককে (কাল্পনিক) পুলিশে ধরে নিয়ে গেছে।"
"সেকি! কেন?"
"ও লিফটের মধ্যে একটা কাজের মেয়েকে রেপ করে ফেলেছে।"
আমি আসমান থেকে পড়লাম। লিফটের মধ্যে রেপ করে ফেলা সহজ ব্যপার নাকি! তারচেয়ে বড় কথা, সম্ভব?
জুয়েল বলল, "আমার দুলাভাই রমনা থানার ওসি। আমি দুলাভাইকে রিকোয়েস্ট করতে যাচ্ছি যাতে ওকে ছেড়ে দেন।"
"তুমি গিয়ে কী বলবে?"
"বলবো যে ছেলে এমনিতে ভাল, একটা ভুল করে ফেলেছে।"
আমার মাথায় রক্ত উঠে গেল। যেই হারামজাদা লিফটের ভিতরে রেপ করে ফেলে, সে কিভাবে ভাল হতে পারে?
আমি বললাম, "দুলাভাইকে গিয়ে বল কোর্টে নেবার আগে যেন পিটায়ে বদমাইশটার পিঠের হাড্ডি গুড়া করে ফেলে।"
"রাজীব ভাই আপনে এইসব কী বলেন? ও আমাদের সাথে খেলে।"
"আর ঐ মেয়েটা আমার বাড়িতে না হলেও এই কমপ্লেক্সেরই কারও বাড়িতে কাজ করতো। পাপ করলে শাস্তি পাইতেই হবে। কোন এক্সেপশন নাই। এখন নাম্বারিং কর, নইলে আমি আগে ব্যাটিংয়ে গেলাম।"
আমি ছোটবেলা থেকে শিখে এসেছি, অন্যায় যেই করুক, সে নিজের অতি আপনজন হলেও অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে হবে। কারণ আজকে যেই অন্যায় অন্যের সাথে হচ্ছে, সেটা কালকে আমার সাথেও হবে।
আজকে আমরা দেশের অবস্থার দিকে তাকাই এবং কেবল সরকারকেই গালি দেই। আসল দোষটা কিন্তু আমাদের। আমরা মামা/চাচা/ভাই/ভাগ্না ইত্যাদি রিলেশনশিপ দেখে অন্যায়কে প্রশ্রয় দিয়ে গিয়েছি। এখনও করেই যাচ্ছি। ভুলে যাই যে আমার সাথে যখন অন্যায়টা হয়, তখন অপরাধী অন্য কারও ভাই/ভাগ্না/চাচা/মামা।
আমার চেষ্টা থাকে আমার বান্ধবীর স্বামীর মতন কেউ যখন ঐ সমস্ত ছেলেদের দেখে তাঁর স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করে, 'এই সমস্ত ছেলেদের সাথে তোমার পড়াশোনা ছিল?' তখন যেন সে আমাদের মত ছেলেদের দেখিয়ে বলতে পারে, এই সমস্ত ছেলেদের সাথেও আমার পড়াশোনা ছিল।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইদানিংকার ঘটনা সবাই জানেন।
বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপিঠের কিছু ছাত্র এখন মেয়েদের লাথি দিতে এতটুকু চিন্তা ভাবনা করেনা। একজন বয়ষ্ক মুরুব্বি শ্রেণীর মানুষকে পিটিয়ে রক্তাক্ত করাতে বিরাট বীরত্ব বোধ করে।
আমি বরাবর শিখে এসেছি, কেউ যখন অন্যায় করে, তখন সেই দোষ কেবলই তার। তার 'জাত' তুলে গালাগালি করার প্রশ্নই উঠে না।
ঢাঃবিঃর কিছু ছাত্র এই কাজটি করেছে, তাই বলে পুরো প্রাচ্যের অক্সফোর্ডের সব ছাত্র ছাত্রী খারাপ, সেটা আমি এখনও মনে করি না, কখনও করবোও না।
আফসোস, সেই ঘটনার যখন প্রতিবাদ জানানো হলো, তখন দেখলাম বেশ কিছু ঢাঃবিঃ ছাত্র তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের পক্ষ্য নিয়ে কমেন্টে গিয়ে ভিকটিমদের গুষ্ঠী উদ্ধার করেছে।
এতে কী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইজ্জত বেড়ে গেল?
ছাত্রছাত্রীদের এমন আচরণের কারণ একটাই, অন্ধ আনুগত্য। আমরা ছোটবেলা থেকেই শিখে এসেছি, আমি এবং আমার কাছের মানুষদের কোন দোষ থাকতে পারেনা। তারা যতই অন্যায় করুক, আমাদের চোখ বুজে তাদের সাপোর্ট করে যেতে হবে। শুধুমাত্র এই কারণেই আমরা প্রতি নির্বাচনে নৌকা/ধানের শীষ অথবা লাঙ্গল/দাড়িপাল্লার সমর্থনে মিছিল হতে দেখি। যুদ্ধাপরাধীর নামাজে জানাজায় ভিড় করতে গিয়ে রাস্তা বন্ধ করে ফেলি।
কুকুরের স্বভাবের সাথে মিল খুঁজে পাচ্ছেন? মালিক যতই পাপী হোক, দিন শেষে সেই মালিকেরই পা চাটবে। হিটলারেরও একটা জার্মান শেফার্ড ছিল। মানব ইতিহাসের সবচেয়ে হিংস্র ব্যক্তিটির হাতকে সে লেজ নাড়তে নাড়তে চাটত। আনুগত্য বলে কথা! যেদিন তিনি আত্মহত্যা করেন, সেদিন বিশ খাইয়ে সেই কুকুরটিকেও হত্যা করেছিলেন। বার্লিনের পতনে রাশিয়ানরা আর যাই হোক, কুকুরটাকে হত্যা করতো না মোটামুটি নিশ্চিত। তাকে কিনা মরতে হলো নিজেরই মালিকের হাতে!
মানুষকে আল্লাহ কুকুর হিসেবে পৃথিবীতে পাঠাননি। তিনি আমাদের পৃথিবীর আর সব প্রাণীর চেয়ে বড় মস্তিষ্ক দান করেছেন। অন্ধ আনুগত্যের জন্য নয়। বরং ভাল মন্দের মধ্যকার পার্থক্য বের করে ভালোর পক্ষ্যে যেন অবস্থান নিতে পারি, সেই জন্য।
আফসোস, আমরা কুকুরের স্বভাব থেকে নিজেদের বের করতে পারছি না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েক ছাত্রীকে নাকি নামাজ আদায় এবং ইসলামী বই পড়ার জন্য হল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। একজন তখন নাকি হুঙ্কার দিয়ে বলেছে, "এখন কোথায় তোদের আল্লাহ? দেখা!"
এর কয়েকদিনের মধ্যেই নাকি কিছু ছাত্র পর্ন ব্যবসা করতে গিয়ে ধরা পড়েছে। রাজধানীর এক হোটেল থেকে সেই সব ছাত্র ও কিছু পতিতাসহ পুলিশ তাদের হাতেনাতে গ্রেপ্তার করেছে।
এরপরও কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের দোষ নেই, দোষ শুধুমাত্র ঐসব ছাত্রদের। কাজেই বিশ্ববিদ্যালয় এতে একটুও ছোট হয় না।
কিন্তু যদি সব ছাত্র্ছাত্র্রীরা এর পক্ষ্যে অন্ধভাবে অবস্থান নেয়া শুরু করে, তাহলে অপমানটা বিশ্ববিদ্যালয়েরই। তখন যদি কেউ বলে, ঢাঃবিঃর পোলাপানরা সব খারাপ, তাহলে সেটা কিন্তু তাদেরই আচরণের ফসল। সাধারণ মানুষকে তখন দোষ দিয়ে লাভ হবে না।
আরও লেখা পড়তে
https://www.facebook.com/groups/canvasbd/
সর্বশেষ এডিট : ১৪ ই নভেম্বর, ২০১৪ রাত ৩:০৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




