somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আমরা খুব শীঘ্রই অন্ধ হতে চলেছি

১২ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৫ রাত ১:২৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

নতুন স্কুলে আমার প্রথম দিনের ক্লাস। ধবধবে সাদা শার্ট স্কুলের ইউনিফর্ম।
ছোট ক্লাসরুম গিজগিজ করছে ছাত্র ছাত্রীতে। এ ওর গায়ের সাথে লেগে বসে ক্লাস করছে। এর ঘাম ওর শরীরে লাগছে, ওর কনুইয়ের গুতো তার বুকে লাগছে।
সবচেয়ে ভয়াবহ ব্যপার হচ্ছে সবার হাতেই ঢাকনামুক্ত কলম ধরা। কলমের খোঁচা একবার শার্টে লাগতেই সেই দাগ স্থায়ী হয়ে যাচ্ছে। ধবধবে সাদা শার্টে কুচকুচে কালো কালির দাগ দগ দগ করে চোখে লাগছে।
প্রথম দিনেই শিক্ষা পেলাম, ছোট বাচ্চাদের স্কুলের ইউনিফর্ম হিসেবে সাদা শার্ট মোটেও বুদ্ধিমান সিদ্ধান্ত নয়।
একটা ছেলেকে দেখলাম তার শার্টে যতখানি দাগ লেগেছে সে একদম নিখুঁতভাবে সেটার মেপে নিল। তারপর যে দিয়েছে তার শার্টে একদম মাপ মতন একটা দাগ এঁকে দিল। যে অনিচ্ছাকৃতভাবে দাগ দিয়েছিল, সেও দেখি চুপচাপ কোন প্রতিবাদ ছাড়াই এই কর্ম মেনে নিল।
খুনের বদলে খুন। Eye for an eye, tooth for a tooth!
বুঝে নিলাম এইটাই এখানে আইন।
এর কয়েকদিন পরে আমাদের সামনের বেঞ্চের এক পালোয়ান গোছের ছেলে নিজের পিঠে কলমের কালী আবিষ্কার করলো। স্বাভাবিকভাবেই সে আমাদের বেঞ্চের সব কটা ছেলেকেই দোষী সন্দেহ করলো।
আমরা কেউই দোষ স্বীকার করলাম না। জানিই না কে করেছে, স্বীকার করবো কী? পালোয়ান তখন গণহারে আমাদের সবার শার্টে নিজের কলম দিয়ে দাগ দিয়ে দিল।
আরেকদিন একটা ছেলে আরেকটা ছেলেকে মাপমত দাগ দিতে গিয়ে আধা ইঞ্চি বেশি দাগ এঁকে ফেলল। এইবার দ্বিতীয় ছেলে বলল, "তুই বড় দাগ দিলি ক্যান?" বলেই সে আরেকটা দাগ কাটলো। তারও ভাগ্য খারাপ, এই দাগটাও একটু বড় হয়ে গেল। এবার সেও শার্ট পেতে দিল। দাগা দাগী চলতে থাকলো।
অনেক পরে ঢাকায় ক্রিকেট খেলতে গিয়ে বারান্দায় নিজের প্রেয়সীকে দেখে অতি উৎসাহী হয়ে ব্যাটসম্যান বেচারা একটু জোরেই শট মেরে দিয়েছিল। বল গিয়ে একটা টয়োটা করোলার পেছনের ইন্ডিকেটর সিগনালের কভার ভেঙ্গে ফেলে। গাড়ির মালিককে আমরা চিনি। তিনি সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। ব্যাটসম্যান আন্তরিকভাবেই দুঃখ প্রকাশ করে। সিদ্ধান্ত নেয়া হয় ক্ষতিপূরন হিসেবে আরেকটা কভার কিনে এনে লাগিয়ে দেয়া হবে। আমরা খেলা সেদিনের মত সেখানেই থামিয়ে দেই।
পরের দিন দেখা যায় প্রতিটা খেলোয়াড়ের বাবাদের গাড়ির পেছনের সিগনাল লাইট কভার ভাঙ্গা। ঘটনা কে কতটুকু বুঝতে পেরেছিল জানিনা, তবে সুখের কথা, জল এরচেয়ে বেশি গড়ায় নি।
এখানেও Eye for an eye! খুনের বদলে খুন।
কারও অনিচ্ছাকৃত ভুলে একজনের ক্ষতি হয়ে গেলে দোষী ব্যক্তির ক্ষতি করলেই কী আগেরজনের ক্ষতিপূরণ হয়ে যায়?
আর অন্য কারও অপরাধে বদলা নিতে গিয়ে যে অসংখ্য নির্দোষের ক্ষতি হয়ে যায়, সেই হিসাব কে রাখে?
আজকে নর্থ ক্যারোলাইনায় একটি বাড়িতে একটা উন্মাদ পিস্তল হাতে ঢুকে গিয়ে তিনজন মানুষকে গুলি করে হত্যা করেছে। সদ্য বিবাহিত নিহত পুরুষের বয়স তেইশ, তাঁর নিহত স্ত্রীর বয়স একুশ এবং নিহত শ্যালিকার বয়স ঊনিশ। এই বয়সে আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস করতে যেতাম। ক্যাফেটেরিয়ায় বসে বন্ধুবান্ধবের সাথে আজাইরা হাহাহিহি আড্ডা দিতাম। এই বয়সেই কিনা তাঁরা অন্ধকার কবরে! তাঁদের "দোষ" তাঁরা মুসলিম!
যে মাথা মোটা উন্মাদ প্রতিবেশী এই হত্যাকান্ড ঘটালো, সে একজন নাস্তিক, এবং অতি অবশ্যই ইসলাম বিদ্বেষী। তার ইসলাম বিদ্বেষের কারন হচ্ছে আই.এস.আই.এস, আল কায়েদা, তালেবান, বোকো হারাম জাতীয় আরেকদল উন্মাদ জঙ্গী গোষ্ঠী, যারা নিজেদের "মুসলিম" বলে দাবী করে।
Eye for an eye, খুনের বদলে খুন!
ঐসব মাথা মোটা জঙ্গি ফাজিলগুলি নিরীহ মানুষ হত্যা করছে, কাজেই এই ফাজিলটাও নিরীহ মুসলিম মেরে ফেলেছে!
নিহত ছেলেটার আঠাশ জানুয়ারির ফেসবুক স্ট্যাটাস ছিল "It's so freaking sad to hear people saying we should "kill Jews" or "Kill Palestinians". As if that's going to solve anything SMH"
এই একটা স্ট্যাটাস থেকেই বুঝা যায় ছেলেটা ছিল শান্তিকামী। ধর্মের নামে মানুষ হত্যার মতন বর্বরতাকে সে কখনই সমর্থন করেনি। ছেলেটি শুধুই যে ফেসবুক স্ট্যাটাস লিখে চুপ থাকতো তাই না। সে নাকি মুসলিম সমাজেও অনেক সক্রিয় ছিল। কে জানে, তাঁর সাথে কথা বলেই হয়তো অনেক সম্ভাব্য জঙ্গি ভাল হয়ে গিয়েছিল। অথচ তাঁকেই কিনা এইভাবে মরতে হলো!
আমরা সাধারণ মানুষ, তাই আমরা অন্য সাধারন মানুষের হত্যার প্রতিবাদ জানাই।
নিরীহ মানুষকে জিম্মি করে যারা জবাই করে, আগুনে পুড়িয়ে মারে, তারা ধ্বংস হোক!
দেশের সাধারন মানুষকে পেট্রোল দিয়ে ঝলসিয়ে যারা হত্যা করে, তারা ধ্বংস হোক!
ধর্ম বা অধর্মের নামে মানুষের বাড়িতে ঢুকে ঢুকে যারা গুলি করে খুন করে, তারাও ধ্বংস হোক!
একটা হত্যা করতে যে পরিশ্রম করা লাগে, তার তুলনায় কিছু না করেই একটা বই পড়া যায়।
একটা হত্যা আপনার এবং নিহতের পরিবারকে চিরতরে পঙ্গু করে দিতে যথেষ্ট, একটা ভাল বই আপনার মনুষত্ব জাগিয়ে তুলতে পারে।
কিন্তু আমরা কষ্ট করে হলেও খারাপ কাজটাই বারবার করি। একটুও বুঝতে চেষ্টা করিনা আমার ছোড়া একটি পেট্রোল বোমায় কেবল একজন মানুষেরই প্রাণ যায়না, একই সাথে তাঁর পরিবারটিও ধ্বংস হয়ে যায়!
আমি যখন ট্রিগার টেনে ধরি, বন্দুকের নল থেকে ছুটে যাওয়া বুলেট কেবল একজন মানুষকেই হত্যা করেনা, তাঁর আশেপাশের আরও অসংখ্য মানুষকে শেষ করে দেয়!
ভাল হতে পয়সা লাগেনা, তবু বারবার পয়সা খরচ করে আমরা খারাপ হই।
মহাত্মা গান্ধী বলে গিয়েছিলেন, "An eye for an eye will make the world blind."
আফসোস, আমরা খুব শীঘ্রই অন্ধ হতে চলেছি।
৪টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

জগন্নাথবাসীগণ, আমার কথা শুনছেন কি?

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১৬ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ৯:০৩

জগন্নাথবাসীগণ,
আপনাদের গরু কোরবানি যদি হযরত জাবের (রাঃ)-এর মতো
নবীজীর সম্মানে হয়ে থাকে, তাহলে মোবারকবাদ।
আর, শুধু প্রতিবাদ দেখাতে একটি অবলা পশুকে হত্যা করে থাকলে,
তার জন্যে খোদার দরবারে বিচার দিলাম।
...বাকিটুকু পড়ুন

রংয়ের মানুষ

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৭ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১২:৫০


গ্রেট মাদ্রাজ ফ্যামিন যখন অনুপ্রেরণার উৎস
একদিন আমাদের সবার প্রিয় সংসদ সদস্য আমির হামজা ওয়াজে বেশ গরম গরম কথা বলছিলেন। মহান আল্লাহ তায়ালার সৃষ্টির সৌন্দর্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে হঠাৎ রাশমিকা... ...বাকিটুকু পড়ুন

অভিনন্দন নাবিহা সাকলায়েন: ৩০ বছর পরের এআই পটেনশিয়াল

লিখেছেন কলাবাগান১, ১৭ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ৩:৩৮


কনসেপ্ট টা খুবই সোজা...পৃথিবীর তাবত মানুষ ই জানে যে আপনার বিশ বছর বয়সে শরীরে যে কোষ গুলি আছে তা আপনার ৬০ বছর বয়সের কোষ আর সেইম না ..লম্বা সময়... ...বাকিটুকু পড়ুন

লক্ষ্মীপুরের সুপারি থেকে উপকূলের অর্থনীতি: কৃষিজ সম্পদই পারে গ্রামীণ ভাগ্য বদলাতে

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ১৭ ই অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮


বাংলাদেশের প্রতিটি অঞ্চলে এমন কিছু নির্দিষ্ট ফল, ফসল বা মৎস্য সম্পদ প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদিত হয়, যা শুধু স্থানীয় চাহিদা মেটায় না, বরং পুরো অঞ্চলের অর্থনীতিতে জোরালো প্রভাব ফেলে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

”আমার রাজনীতির রূপরেখা” -- জিয়াউর রহমান

লিখেছেন প্রামানিক, ১৭ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৪:০০


শহীদুল ইসলাম প্রামানিক
আমি তখন দৈনিক দেশ পত্রিকায় চাকরি করি। এটা আমার দ্বিতীয় চাকরি। প্রথম চাকরি নিয়েছিলাম ব্রিটিশ আমলের প্রকাশিত দৈনিক আজাদ পত্রিকায়। আজাদ পত্রিকাটি ব্রিটিশ আমলে মুসলমানের পক্ষের একমাত্র... ...বাকিটুকু পড়ুন

×