somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

রাষ্ট্রভাষা বাংলা কেন, শুধু উর্দু কেন নয়?

২৩ শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৬ সকাল ১০:৪৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ভাষার মাসে অতি গুরুত্বপূর্ণ কিছু কথা বলতে চাই। এতদিন ধারনা ছিল এটা কমন সেন্স, সবাই জানে, বুঝে - বলার কী আছে? কিন্তু বুঝে গেলাম বাঙালির কাছে কমন সেন্সটাই একটি আনকমন বিষয়। বিশেষ করে "সাঈদ মিনারে" ফুল দিতে যাওয়া মানুষের কাছে যখন "একুশে ফেব্রুয়ারী কী হয়েছিল?" জানতে চাওয়া হয়, তখন উত্তর আসে, "এইদিনে যুদ্ধ হয়েছিল, অনেক মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হয়েছিলেন, এইদিনে পাকিস্তানিদের সাথে আমরা বিজয় অর্জন করি" কিংবা একটি শিশুর সরলস্বীকারোক্তি, "বলতে পারছি না ভাইয়া" - কিছু কথা বারবার লিখতেই হবে।
প্রথম কথা - "উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্র ভাষা" - এতে সমস্যা কী? ইন্ডিয়াতেতো হিন্দি রাষ্ট্রভাষা, ওদেরতো সমস্যা হচ্ছে না। তাছাড়া ওরা পাঞ্জাবি, পশতু, সিন্ধি বা বেলুচি ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করেনি, কাজেই বাংলাকে করতে যাবে কেন?
খুবই ভাল প্রশ্ন। আপনি দ্বিধা দ্বন্দে পরে যাবেন। নিরপেক্ষ বনতে গিয়ে বেকুব বনে যাবেন। বলবেন, আসলেইতো, শুধু শুধু আন্দোলন ফান্দোলন, ১৪৪ ধারা ভাঙ্গাভাঙ্গি, গুলি খেয়ে মরা - এইসবতো হুদাই!
তাহলে চলেন, ক্লাস সেভেনে পড়ে আসা ইতিহাস রিভাইস দেয়া যাক।
মুঘল আমল থেকে মুসলিমরা ছিল উপমহাদেশের শাসনকর্তা। অফিস আদালতের ভাষা ছিল আরবি-ফার্সি। মানে যে আরবি-ফার্সিতে কথা বলতে পারবে, সেই আরামসে সরকারী চাকরি পাবে। যে পারবে না সে তার নিজের মতন কিছু একটা করে খাবে।
ব্রিটিশরা এসে অফিসের ভাষাকে করলো ইংলিশ, মুসলিমদের ইগোতে লেগে গেল। ফতোয়া জারি হলো, "ইহা কাফের নাসারাদের ভাষা, ইহা শিখিলে দোজখে যাইতে হইবে।"
আমরা আমাদের আরবি আর ফার্সি নিয়েই পরে রইলাম।
হিন্দুরা ইংরেজি শিখে চটজলদি চাকরি পেতে লাগলো। ফল, কয়েক শতাব্দী ধরে পিছিয়ে থাকা হিন্দু সমাজ মুসলিমদের চেয়ে কয়েক হাজার কদম এগিয়ে গেল। মুসলিমরা অনেক অনেক পরে এসে উপলব্ধি করলো ভাষার গুরুত্ব। কিন্তু ততক্ষনে যা ক্ষতি হবার হয়ে গেছে।
আমাদের পূর্বপুরুষেরা কিন্তু আজকের ইয়ো জেনারেশনের মতন বেকুব ছিলেন না। আমি জানিনা তাঁদের সিলেবাস কী ছিল, কিন্তু তাঁরা যাই পড়তেন, আসলেই শিক্ষিত হতেন। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছাত্রীর মতন "সাঈদ মিনারে মুক্তিযোদ্ধাদের শ্রদ্ধা" দিতে যেতেন না। তাই যখন তাঁরা শুনেছেন যে জিন্না সাহেব বলছেন, "উর্দূই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা" - তাঁরা বুঝে ফেলেছিলেন যে এর ফলে বাঙালিদের অবস্থা হবে এক শতাব্দী প্রাচীন মুসলমানদের মতন। তাই তাঁরা সাথে সাথে প্রতিবাদ করে উঠেছিলেন। পাঞ্জাবি, সিন্ধি, বেলুচি বা পশতু ভাষায় অভ্যস্ত মানুষ যত সহজে উর্দু শিখতে পারে, হাজার মাইল দূরের বাঙালিদের সেই একই ভাষা শিখতে অনেক কষ্ট হয়। সিলেটি, চিটাগনিয়ান বা নিউকেলির মানুষ ঠিকমতন বাংলাই শিখতে পারেননা, তাঁরা কথা বলবেন উর্দুতে! সমস্যা বুঝতে পারছেন?
ফুটনোট: পাকিস্তানের আরেকটা সমস্যা ছিল তাদের রাষ্ট্রক্ষমতায় শুরু থেকেই একদল মূর্খ ও আহাম্মক লোক বসেছিল। যাদের কাছে ভাষাটাও ছিল ধর্মীয় লেবাসযুক্ত। বাংলাকে ওরা হিন্দুদের ভাষা বলতো এইটা সবাই জানি (আশা করি) সাথে পাঞ্জাবিকেও তারা জ্ঞান করতো শিখদের ভাষা হিসেবে। প্রচুর আরবি ও ফার্সি শব্দ থাকায় উর্দুকে ওরা মনে করতো ইসলামী ভাষা - তাই মুসলিম রাষ্ট্রে উর্দুকে রাষ্ট্র ভাষা করতে চেয়েছিল। যেখানে ৫% লোকও উর্দুতে কথা বলতো না। জিন্নাহর নিজের মাতৃভাষাই ছিল সিন্ধি, এবং তিনি ইংরেজিতে কথা বলতে বেশি স্বাচ্ছন্দ বোধ করতেন।
অনেককেই দেখি জিন্নাকে গালাগালি করতে। কেন? কারন তিনি "উর্দুই হবে রাষ্ট্রভাষা" ঘোষণা দিয়েছিলেন। কিন্তু সত্যি বলতে যত বই আমি পড়েছি, সবগুলি থেকে মোটামুটি এইটা জানলাম যে এই লোকটির আমাদের অঞ্চল সম্পর্কে তেমন স্পষ্ট ধারনাই ছিল না। দুই ভাগওয়ালা রাষ্ট্র পেয়ে তিনি প্রথমে বলেছিলেন, "পোকায় খাওয়া পাকিস্তান নিয়ে আমি কী করব?" এবং তারপর এই দেশীয় কিছু চামচা তাঁর কানে ভরেছিল যে এই অঞ্চলের লোক উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বানন্দেই গ্রহণ করবে। যে কারনে তিনি ছাত্রদের প্রতিবাদে খুব অবাক হয়েছিলেন।
যাই হোক, ভদ্রলোক মাত্র আটমাস বয়সী রাষ্ট্রকে ফেলে পরপারে চলে গিয়েছিলেন, পাকিস্তানের যা সর্বনাশ করার শুরু করেছিল তাঁর উত্তরসুরি লিয়াকত আলী খান। এবং এই পরম্পরা একাত্তুর ছাড়িয়ে জারি আছে এখন পর্যন্ত। অভিশপ্ত জাতিটি আজ পর্যন্ত একজনও ভাল রাষ্ট্রনায়ক পায়নি। ৪৭ এ যে রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছিল মিলিয়ন মানুষ হত্যা ও বাস্তুচ্ছেদের মধ্য দিয়ে, ৭১ এ যারা স্নান করেছিল তিরিশ লক্ষের রক্ত গঙ্গায় - তারা এত সহজে শাপমুক্ত হবে কী করে?
সে অনেক লম্বা কাহিনী - বটম লাইন হচ্ছে, বঙ্গবন্ধু নিজেও কী কোনদিনও জিন্নাকে নিয়ে কোন কটুক্তি করেছিলেন? আমিতো পাইনি।
তাহলে আমরা অতি চেতনায় চেতীত হয়ে কেন শুধু শুধু লোকটাকে গালাগালি করি? পাকিস্তানি বলে? তাহলে ওদের আর আমাদের মধ্যে পার্থক্যটা কী থাকে?
সর্বশেষ এডিট : ২৩ শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৬ সকাল ১০:৪৫
২টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আ-তে আনন্দবাজার, আ-তে আওয়ামী লীগ

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৪ ঠা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১:১৫


ইন্টারনেটে খবর পড়তে পড়তে হঠাৎ একটা শিরোনাম সামনে এলো। পড়েই কয়েক সেকেন্ডের জন্য মনে হলো, বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে বুঝি বিশাল কোনো ঘটনা ঘটে গেছে। শিরোনাম, “আধ পয়সা বেশি... ...বাকিটুকু পড়ুন

২০১৮ সালের পর ঢাকাতেই ৪টা এক্সপ্রেসওয়ে

লিখেছেন মাথা পাগলা, ০৪ ঠা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ৩:৫৩



একটা দেশের উন্নয়ন কতটা এগিয়েছে, সেটা বোঝার অনেকগুলো উপায় আছে। তবে সবচেয়ে সহজ উপায় হলো সেই দেশের রাস্তা, সেতু আর যোগাযোগব্যবস্থা। কারণ এগুলোর পরিবর্তন সরাসরি মানুষের দৈনন্দিন জীবনে চোখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

আজকের ডায়েরী- ১৯৭

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৪ ঠা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৪



শরতের সকাল! সকাল ৮ টা।
ভাদ্র মাস। ইংরেজি সেপ্টেম্বর মাস। ২০২৬ সাল। ঘটনাটা কি হয়েছে, আমি বলি। মোটামোটি ভয়াবহ ঘটনা বলা যেতে পারে! যে কোনো সময় রোদ উঠবে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশে বর্তমান গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট: দায় কার?

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ০৪ ঠা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:০৭


সংক্ষিপ্ত রায় সবচেয়ে বড় দায় বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ নীতির। এর মধ্যে ২০০৯–২০২৪ সময়কালের সরকারের সিদ্ধান্তগুলোর দায় তুলনামূলকভাবে বেশি, কারণ ওই সময়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা দ্রুত বাড়ানো হলেও... ...বাকিটুকু পড়ুন

যাপিত জীবন.....

লিখেছেন কলিমুদ্দি দফাদার, ০৪ ঠা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৫:২৭


১।মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ব্রুনাই দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কিছু দেশে জুম্মার নামাজ পড়ার সুযোগ হয়েছে। ১২.৫০ এ আজান তারপর ১.১৫ দিকে জুম্মার নামাজের সকল আনুষ্ঠানিকতা শেষ। আজানের কিছুক্ষণ পর খুতবা শুরু তারপর... ...বাকিটুকু পড়ুন

×