somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

"ধর্মের নামে পশু হত্যা খুবই পৈশাচিক রিতী" - আসলেই কী তাই?

১৩ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৬ রাত ১২:৫৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

কোরবানি হওয়া উচিৎ স্রেফ আল্লাহকে উদ্দেশ্য করে। "আল্লাহ শ্রেষ্ঠ" সেটা প্রমান করতে নয় - বরং এটাই নিয়ত থাকতে হয় যে, আল্লাহর চেয়ে প্রিয় আমার কাছে আর কোন কিছু হতে পারেনা। তিনি নির্দেশ দিয়েছেন এই দিনে পশু জবাই করে উৎসব পালন করতে, আমি উৎসব পালন করবো। টাকা পয়সা বা বাড়ির প্রিয় গবাদি পশু কোরবান হয়ে যাচ্ছে, ম্যাটার করেনা। যিনি দেনেওয়ালা, তিনিই দিবেন। না দিলেও অসুবিধা নাই।
বড় পশু, দামী পশু, কমদামী পশু ইত্যাদি এখানে মূখ্য বিষয় নয়। মূল বিষয় হচ্ছে নিজের ভিতরের পশুকে কোরবান করা। পশুর গলায় ছুরি চালানোরও আগে আমাদের নিজেদের বাজে অভ্যাস, যেমন মিথ্যা বলা, ঘুষ খাওয়া, পরচর্চা ইত্যাদি থেকে শুরু করে যেকোন ছোট বড় বদভ্যাসের গলায় ছুরি চালাতে হবে। শপথ নিতে হবে - যা করার করেছি, আর এইসব না। আজকে থেকে আমি পবিত্র মানুষ।
ভাল হওয়া আসলেই সহজ, শুধু একটু চেষ্টা নিলেই হয়। মন্দ হতেই বরং অনেক কসরত করা লাগে।
আগেও এক লেখায় বলেছি, আবারও বলি, পশু হত্যা করাটা এখানে নেগেটিভ অর্থে দেখার কিছু নেই। আমরা নিজেরা বাঁচার জন্য প্রতিদিন কয়েক লক্ষ গরু ছাগল মেরে ফেলছি। কোরবানির ঈদের মাংসও খাওয়া ছাড়া অন্য কোন কাজে ব্যয় হয়না। আমাদের এমন কোন ধর্মীয় আচার নেই যে আল্লাহর উদ্দেশ্যে এক ভাগ মাংস বা সামান্য এক টুকরা মাংসও ফেলে দিতে হবে। পশুর যাবতীয় মাংস আমাদেরই খাবার জন্য, ঠিক যেমনটা আমরা অন্য সময়ে মাংস খাই। একে আমি কাবাব বানালাম, না স্টেক বানালাম, না ভুনা বা শুটকি করে খেলাম সেটা আমার উপর। এখানে বিতর্কের কোনই অবকাশ নাই।
তবে, কোরবানির সবচেয়ে বড় মাহাত্ম্য হচ্ছে আমরা এর তিন ভাগের দুইভাগই দান করে দেই। অন্য সময়ে আমরা যে মাংস খাই, তখন কতটুকু দান করি? আপনি যদি নিজে প্রতিবার বাজার থেকে কেনা মাংসের তিনভাগ করে এক ভাগ নিজের জন্য রেখে বাকি দুইভাগ বিলিয়ে দেন, তাহলে আমার কোন কথা নাই। আর যদি তা না করে নিজের জন্যই রাখেন, যেটা অত্যন্ত স্বাভাবিক মানব চরিত্র, সেইক্ষেত্রে কোরবানির বিরুদ্ধে কোন কথা বলতে না যাওয়াই ভাল। কারন, একমাত্র হাড় কিপ্টা মানুষ বা পিওর ভেজিটেরিয়ান ছাড়া কারোরই কোরবানী নিয়ে আপত্তি করার কথা না। এক লাখ টাকার গরুর ৬০ হাজার টাকার মাংসই দান করে দিচ্ছি - কৃপণদেরতো কলিজা ছিড়ে ফালাফালা হয়ে যাওয়ার অবস্থা! তারাই তখন লাফালাফি করে, "ইহা অমানবিক। ইহা ব্লাসফেমি! ধর্মের নামে ইহা অনাচার।"
অথচ নিজে বিয়েবাড়িতে গিয়ে বাটি ভর্তি মাংস খেতে খেতে কলেস্তরল হাই করে ফেলে - তখন মানবতা কই যায়? পশুকি তখনও হত্যা করা হয়না?
মাংসাশীদের পক্ষে একটা সহজ যুক্তি দেই। কথাগুলো আমার না, ওস্তাদ সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের। সাথে আমি নিজে থেকেও কিছু কথা যুক্ত করে দিচ্ছি। দেখেন পছন্দ হয় কিনা।
একটা ছাগল বছরে দুই থেকে তিনটা করে বাচ্চা দেয়। এখন মানুষ যদি ছাগল খাওয়া বন্ধ করে দেয়, তাহলে এক বছরে ছাগল সংখ্যা প্রায় আড়াই থেকে তিনগুন বাড়বে। তৃতীয় বছরে সেই সংখ্যা প্রথম বছরের পাঁচ থেকে ছয়গুন হবে। আপনাকে এক দেড়শো বছর অপেক্ষা করতে হবেনা, কেবল দশ বছরই যদি মানুষ ছাগল খাওয়া বন্ধ করে দেয় - প্রথিবী ভরে যাবে কেবল ম্যা ম্যা রবে। এইটা ছিল স্রেফ ছাগলের স্যাম্পল। এখন যোগ করুন গরু, মহিষ, উট, শূকর ইত্যাদি যাবতীয় প্রাণী যেগুলো মানুষ প্রতিদিন খেয়ে ফেলছে। যদি না খেত - তাহলে ইকোসিস্টেমটাই নষ্ট হয়ে যেত। ফুড চেইন খতম হয়ে যেত সেই কবেই।
মাছের কথাটাই ভাবুন। এক থেকে দুই বছর যদি বাংলাদেশের মানুষ মাছ খাওয়া বন্ধ করে দেয় - তাহলে মাছের ঘনত্বে নদীর পানি উপচে বন্যার সৃষ্টি হবে। মানুষই তখন সারভাইভ করতে পারবেনা।
কেবল বৃক্ষ লতা পাতা গুল্ম খেয়ে বেঁচে থাকবেন। তারও উপায় নেই। আমাদের আপনা আদমি জগদীশ চন্দ্র বসুই প্রমান করে গেছেন গাছেরও জীবন আছে - তারাও সংবেদনশীল। ওদের খেয়ে ফেলাটাওতো প্রাণ হত্যা! তাহলে আমরা বাঁচবো কিভাবে?
"নিষ্ঠুর" প্রকৃতির অতি "নিষ্ঠুর" নিয়ম এইটাই - অন্যকে খেয়ে বেঁচে থাকো।
ইসলাম বরং পশুদের প্রতি নিষ্ঠুরতা নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।
ব্যাক টু দ্য কোরবানি টপিক।
তিনভাগের এক ভাগ মাংস আমরা নিজে খাই। এক ভাগ পায় আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশী। আরেকভাগ পায় ফকির মিসকিনগণ। যদিও কেউ কেউ বলবেন, কোন ভাগ না খেয়ে পুরোটাই আপনি খেতে পারবেন। কথা ভুলও না। কিন্তু আমার ভাই এই তিনভাগ বাটোয়ারার নিয়মটাই ভাল লাগে। তো তা করতে গিয়ে আমাদের দেশে আমরা করি কি, হাড্ডিগুড্ডি ও যেসব মাংস আমরা খাইনা, ফকিরদের সেসবই দান করি। যুক্তি চমৎকার, "ওরা জীবনেও মাংস খায় নাকি যে মাংসের ভাল মন্দ বুঝতে পারবে? ওদের যে এটা দিচ্ছি - এই যথেষ্ট।"
এখানেই সমস্যা। দান করে ওদের আমরা ফেভার করছি না। ওদের দেয়াটা আমার উপর আল্লাহর নির্দেশ। কাজেই এইটা তাদের অধিকার। এবং তাদের হাড্ডি ও বাজে মাংস দিয়ে আমি প্রত্যক্ষভাবে তাদের ঠকাচ্ছি।
এরপর আসে আত্মীয়ের পালা। এখানেও দেখা যায় যারা খুব কাছের আত্মীয়, আমরা তাঁদের ভাগেই ভাল মাংস দেই। দূরের আত্মীয়, বা যাদের আমরা খুব একটা পছন্দ করিনা, তাঁদের ভাগে পড়ে হাড্ডিওয়ালা মাংস, মাংসওয়ালা হাড্ডি নয়। এখানেও ডিসক্রিমিনেশন। এবং তারচেয়ে বড় কথা, কোন আত্মীয়ই আমার নিজের জন্য রাখা মাংসের সমান কোয়ালিটির মাংস পায়না। এখানেও বৈষম্য।
এ থেকে বাঁচার আমার একটা আইডিয়া আছে, যা আমি নিজে অ্যাপ্লাই করি। দেখেন পছন্দ হয় কিনা।
বিদেশে আমাদের একটা সুবিধা আছে। বিভিন্ন দোকান আমাদের হয়ে র‌্যাঞ্চে পশু কোরবানি দেয়। তারপর আমাদের ভাগের মাংস বক্সে ভরে আমাদের বুঝিয়ে দেয়। আমি করি কি, দোকানেই মাংস তিনভাগ করে ফেলি। এক ভাগ গরিবকে দেই, একভাগ কোন আত্মীয়কে দেই, আরেকভাগ নিজের জন্য রাখি। নিজেও জানিনা আমার বক্সে কেমন মাংস পড়ছে। কাজেই নিজের কাছে অন্তত পরিষ্কার থাকি, আমি আসলেই আল্লাহকে খুশি করতে কোরবানী করেছি, তাঁর নির্দেশ মতই ভাগ করে বিলিয়ে দিয়েছি।
বাকি আল্লাহ ভরসা।
সর্বশেষ এডিট : ১৩ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৬ রাত ১২:৫৮
৩টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ওরা জিডিপি আর সেমিকন্ডাক্টরে ব্যস্ত , আমরা ব্যস্ত গোরুর জিয়াফত নিয়ে ....।

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ২:৩৫


গতকাল মামার ফোন এল দুবাই থেকে, রাতের বেলা। বললেন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে গরু জবাই করে জিয়াফত খাওয়ার খবর এখান পর্যন্ত পৌঁছে গেছে, ব্যাপার কী? আমি বললাম, মামা, ওরা গরুর মাংস... ...বাকিটুকু পড়ুন

মীর জাফর ও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ঐতিহাসিক চুক্তি! যে চুক্তির জন্য বাংলার স্বাধীনতার সূর্য ২০০ বছরের জন্য অস্তমিত হয়েছিল!

লিখেছেন নূর আলম হিরণ, ১৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ২:৪২


আমরা পলাশী যুদ্ধের কথা জানি। কিন্তু এই যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে যে একটি ঐতিহাসিক চুক্তি হয়েছিল মীরজাফর ও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্ণধার লর্ড ক্লাইভের এর সাথে সেটা সম্পর্কে খুব কমই... ...বাকিটুকু পড়ুন

তাবলিগে গিয়ে যা শিখলাম না

লিখেছেন মুনতাসির, ১৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৮:৫৯

আমি যখন ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ি, তখন আমার কয়েকজন বন্ধু তাবলিগ করত। তাবলিগের প্রতি আমার কখনোই আগ্রহ ছিল না। তবে ওরা নিজেরা রান্না করত, আর আমি রান্না করতে পছন্দ করি। তাই একদিন... ...বাকিটুকু পড়ুন

যার যার ধর্ম, তার তার উৎসব....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ১৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৯:১০


যার যার ধর্ম, তার তার উৎসব....

“ধর্ম যার যার, উৎসব সবার”- শুনতে চমৎকার, জনপ্রিয়ও বটে। কিন্তু কথাটি কি ধর্মীয় বিশ্বাসের বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সংগতিপূর্ণ?
আমার কাছে তা নয়। এধরণের বাণী... ...বাকিটুকু পড়ুন

সৌদি আরবে নারীসহ দুই বাংলাদেশির শিরশ্ছেদ: প্রতিমন্ত্রী, নাকি পাপেট?

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ১৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৩:৫০


গত বুধবার সৌদি আরবের শরিয়া আদালত একজন নারীসহ দুই বাংলাদেশি অভিবাসী শ্রমিকের শিরশ্ছেদ কার্যকর করেছে। এ বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ যে বিবৃতিটি দিয়েছেন, সেটা পড়ে বোঝা গেল যে, পররাষ্ট্র... ...বাকিটুকু পড়ুন

×